ধর্ম ও জীবন

ইনসাফের ঝলক

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০২-২০১৮ ইং ০১:১৬:৩৬ | সংবাদটি ৮২ বার পঠিত

হযরত উমর (রা.) তখন ছিলেন খলীফাতুল মুসলিমীন। হযরত উবাই ইব্ন কা’ব (রা.) এর সাথে একটি বাগান নিয়ে তাঁর বিবাদ দেখা দিল। হযরত উমর (রা.) প্রস্তাব করলেন, বিচারক বা তৃতীয় পক্ষের কাছে বিবদমান উভয় পক্ষেরই যাওয়া উচিত। কাজেই তারা উভয়ে বিষয়টি নিয়ে যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) এর কাছে উপস্থিত হলেন। উমরকে দেখে যায়েদ ইবনে সাবিত বিচারকের আসন ছেড়ে দিয়ে উমরের উদ্দেশ্যে বললেন, আমীরুল মুমিনীন! আপনি এখানে তশরীফ রাখুন। বিচারক যায়েদ ইবনে সাবিতের উদ্দেশ্যে তখন উমর (রা.) বললেন, যায়েদ! তুমি শুরুতেই আইন ভঙ্গ করেছ। তুমি আমাদের উভয়কে সমপর্যায়ের আসনে বসতে বল। অত:পর বিবদমান উভয় পক্ষ উমর ও উবাই ইবন কা’ব একই সারিতে যায়েদ ইবনে সাবিতের মুখোমুখি বসলেন।
উবাই ইবনে কা’ব তার বাগানের দাবী বিচারক যায়েদের কাছে উপস্থাপন করলে উমর তা প্রত্যাখ্যান করলেন। ‘অভিযোগকারীর দাবীর সত্যতা প্রমাণের জন্যে সাক্ষী আর অভিযোগ অস্বীকারকারীর জন্যে শপথ’ বিচারের এই মূলনীতির ভিত্তিতে উবাই ইবনে কাবকে সাক্ষ প্রমাণ উপস্থাপনের নির্দেশ দিলেন যায়েদ ইবনে সাবিত। উবাই বললেন, আমার কোন সাক্ষ নেই। এমতাবস্থায় বিচারক যায়েদ উমরকে বললেন, আপনাকে শপথ করতে হবে। সেই সাথে উবাইকে বললেন, উবাই! আমীরুল মুমিনীনকে শপথ করতে বাধ্য করো না। ইত্যবসরে হযরত উমর (রা.) দাঁড়িয়ে বিচারক যায়েদ ইবনে সাবিতের উদ্দেশ্যে বললেন, যায়েদ, সবার বিচারের ক্ষেত্রেই কি তুমি এভাবে ফায়সালা করো? যায়েদ বললেন, না। তাই যদি হয় তবে যেভাবে অন্য সবার বিচার করো আমাদের ব্যাপারটিও সেভাবেই ফয়সালা করো।
উমরের একথার পর উবাই ইবনে কা’ব উমরকে কসম করার প্রস্তাব দিলে উমর বলেন, ‘যে বাগানের ফুল খেতে আমি কোন দ্বিধা করি না, এর ব্যাপারে কসম করতে আমার কোন কুণ্ঠা নেই। যাঁর হাতে আমার জীবন সেই পরম সত্তার কসম, আমার এই জমির মধ্যে উবাই ইবনে কা’ব এর কোন অধিকার নেই।’ উমরের এই কসমের পর স্বাভাবিক ভাবেই বিচারের রায় উমরের পক্ষে হয়। সেই রায়ের পর উমর বিচারক যায়েদের ব্যাপারে যে উক্তি করেছিলেন, তা ইতিহাসে ন্যায়বিচারের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। উমর (রা.) বলেছিলেন, যায়েদ বিচারকের যোগ্য বিবেচিত হবে না, যদি সে উমর ও সাধারণ মানুষের বিচার একই মানদ-ে না করে। (আখবারুল কাযা : খ- ১, পৃ. ১০৮, ১০৯, ১১০)
একবার হযরত আলী (রা.) এর একটি শিরস্ত্রান হারিয়ে গেল। এক ইহুদীর হাতে সেটি দেখতে পেলেন হযরত আলী (রা.)। ইহুদি লোকটি শিরস্ত্রানটিকে কুফার বাজারে বিক্রি করার চেষ্টা করছিল। আলী ইহুদীর কাছে গিয়ে বললেন, এই শিরস্ত্রানটি আমার, এটি আমি কাউকে দান করিনি, কারো কাছে বিক্রিও করিনি। ইহুদী লোকটি বললো, শিরস্ত্রান এখন আমার কব্জায় অতএব এটি আমার। হযরত আলী তাকে বললেন, তাহলে চলো কাযীর (বিচারকের) কাছে যাই। অতঃপর উভয়ে কাযী শুরাইহির আদালতে হাজির হলেন। হযরত আলী শিরস্ত্রানটির মালিকানা দাবী করলে ইহুদী লোকটি তা প্রত্যাখ্যান করলো। এমতাবস্থায় কাযী শুরাইহি হযরত আলীর দাবীর পক্ষে সাক্ষী উপস্থাপনের নির্দেশ দিলেন। আলী স্বীয় পুত্র হাসান (রা.) এবং তারই আযাদ করা গোলামকে সাক্ষী হিসেবে পেশ করলেন। কাযী শুরাইহি বললেন, আমীরুল মুমিনীন! পিতার পক্ষে পুত্রের সাক্ষ গ্রহণযোগ্য নয়। আলী তা শুনে বললেন, কি আশ্চর্য! জান্নাতী লোকের সাক্ষও গ্রহণ করা হবে না? আমি তো নবী করীম (স.) কে বলতে শুনেছি, হাসান ও হোসাইনকে জান্নাতে যুবকদের নেতৃত্ব দেয়া হবে।
প্রয়োজনীয় সাক্ষ না থাকার কারণে ফয়সালা যখন অবধারিতভাবে আলীর বিপক্ষে আর ইহুদীর পক্ষে এমতাবস্থায় ইহুদী লোকটি বললো, আমীরুল মুমিনীন! আমাকে আপনার অধীনস্থ বিচার আদালতে নিয়ে এলেন, আর সাক্ষী না থাকার কারণে বিচারক আমার পক্ষে রায় দিলেন, তা থেকেই আমি সাক্ষ দিচ্ছি, ইসলাম সত্যধর্ম। আমি আরো সাক্ষ দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ (উপাস্য) নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও রসূল। আমীরুল মুমিনীন, শিরস্ত্রানটি আপনারই। রাতের বেলা এটি রাস্তায় পড়ে পতিত ছিল, আমি কুড়িয়ে নিয়েছিলাম।
ইসলামের ইতিহাসে বিখ্যাত বিচারক কাযী শুরাইহির ছেলে একদিন পিতার কাছে এলো। তখন এক লোকের সাথে তার বিরোধ চলছিল। বিরোধের ব্যাপারে ছেলে পিতার পরামর্শ চাইলে পিতা আদালতে মামলা করার পরামর্শ দিলেন। মামলা দায়ের করা হলো। শুনানির পর কাযী শুরাইহি মামলাটি আমলে না নিয়ে খারিজ করে দিলেন। শুরাইহির ছেলে তখন পিতার উদ্দেশ্যে বললো, এই যদি রায় হবে তবে আপনি তা আমাকে আগেই বলে দিতে পারতেন, মামলার কি প্রয়োজন ছিল? পুত্রের জবাবে কাযী শুরাইহি বললেন, এই রায়ের বিষয় যদি তুমি আগেই জেনে নিতে পারতে, তাহলে মামলায় হেরে যাওয়ার আশংকায় তুমি প্রতিপক্ষের সাথে সমঝোতা করতে উদ্যোগী হতে এবং সেই জিনিসটি কব্জা করতে। মামলার কারণে এটি কব্জা করা তোমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। অপর এক মামলায় কাযী শুরাইহি নিজপুত্র আব্দুল্লাহকে জেলখানায় পাঠিয়ে দেন। এরপর বিচারকের আসন ত্যাগ করে তার সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আবদুল্লাহর জন্যে জেলখানায় বিছানাপত্র পাঠিয়ে দাও। সেই ছেলে শাস্তি ভোগের পর মুখোমুখি হলে ছেলের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, বাবা! তুমি আমার খুব প্রিয়পাত্র বটে কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি আমার কাছে তোমার ভালোবাসার চেয়েও বেশি প্রিয়। (আখবারুল কাযা : খ- ১, পৃ. ৭৬, ৮০, ৯২)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT