ধর্ম ও জীবন

দেনমোহর : নারীর অধিকার

প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০২-২০১৮ ইং ০১:১৮:৩৬ | সংবাদটি ৩২ বার পঠিত

নওরোজ জাহান মারুফ
মানুষ সামাজিক জীব। মানুষকে সমাজবদ্ধ হয়ে চলতে হয়। সমাজে কিছু রীতি, নীতি, প্রথা আছে যেগুলো মেনে চলা নিয়ম। সুশৃঙ্খল জীবন-যাপন পালনে বিবাহ জরুরী ও অপরিহার্য্য একটি বিষয়। মানব জীবনের পূর্ণতা প্রাপ্তি এই বিবাহের মাধ্যমেই হয়। বিবাহে দেনমোহর একটি শর্ত। বিবাহ ও দেনমোহর একটার সাথে আরেকটি সম্পর্ক অভিন্ন ও অত্যন্ত সুদৃঢ়।
বিবাহে দেনমোহরকে আলাদা করে দেখার কোন সুযোগ নেই। আমাদের মুসলিম সমাজে অতিব জরুরী ও প্রয়োজনীয় এই দেনমোহরকে (মোহরানা) অনেকেই তেমন একটা গুরুত্ব দেন না। অথচ ইসলামে দেনমোহরকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রহণ করতে তাগিদ দেয়া হয়েছে। মোহরের পরিমাণ বিবাহকালে ধার্য্য করতে হয়। মোহরানার সর্বনি¤œ পরিমাণ ১০ দিরহাম হওয়া উচিত।
উর্ধ্বে যত ইচ্ছা ধার্য্য করতে পারেন। হযরত মোহাম্মদ (স:) বিয়ে-শাদিতে ব্যয় যত কম হয় তার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। হযরত (স:) বলেছেন ‘যে বিয়েতে অর্থের বোঝা যত কম, বরকতের দিক থেকে সে বিয়ে ততই কল্যাণকর’ (মুসনাদে আহমদ)’।
যৌন সম্পর্কের পূর্ণতার জন্য বিবাহের সময় যে অর্থ প্রদান করতে হয় বা প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তাকে মোহর বলে। মোহর ২ প্রকার: ক) মোহরে মো’য়াজ্জল খ) মোহরে মু’অজ্জল। তবে উত্তম ব্যবস্থা হল পাত্রের আর্থিক সংগতির প্রতি লক্ষ রেখে মোহর ধার্য্য করা, যাতে পাত্র যত শীঘ্র সম্ভব আদায় করতে পারে। অনেকে অতিরিক্ত মোহর ধার্য্য করাকে অধিকতর গৌরব ও মান-মর্যাদার নিদর্শন মনে করেন। যা একান্তই অনুচিত। মনে রাখতে হবে মোহর বস্তুটিকে যত সাধারণ বা খেলো জিনিস মনে করা হয়, আসলে তা নয়। মোহর আদায় করা স্বামীর পক্ষে ওয়াজিব। আদায় না করলে স্ত্রীর নিকট কঠিন ঋণে আবদ্ধ থাকতে হয়। এটি এমন ধরণের ঋণ যে, স্বামী স্ত্রীর নিকট বলে কয়ে মাফ করালে মাফ হয় না। অবশ্য স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় ক্ষমা করে দেন তবে মাফ হবে। যদি কোন বিবাহে মোহর ধার্য্য না করা হয়, তবে বিবাহ হয়ে যাবে এবং স্বামীর নিকট মোহরে মেছেল আদায় করা ওয়াজিব হবে। মোহরে মেছেল হল: পাত্রীয় বংশীয় পূর্বে কোন রমনীর জন্য নির্ধারিত মোহর। যেমন পাত্রীর ফুফু ভগ্নির মোহরের পরিমাণই মোহরে মেছেল হিসেবে গণ্য হবে।
বিবাহের কালে নগদ আদায়ের শর্তে মোহর ধার্য্য করা হলে তা আদায় না করা পর্যন্ত স্ত্রী-স্বামীকে শারীরিক সম্পর্কে বাধা দান করতে পারবে। এমনকি স্বামী তাকে কোথাও নিয়ে যেতে চাইলে তাতে অসম্মতি প্রকাশ করাও জায়েজ আছে। অবশ্য স্ত্রী স্বামীর গৃহ হতে অন্য কোথাও যেতে পারবে না। বর্তমান সমাজে কাবিননামায় যে মোহরানার কথা লিখা থাকে তা অনেকেই অগ্রাহ্য করে; তারা মনে করেন এগুলি দিতে হয় না শুধু কাবিননামায় লিখা থাকে। লোক দেখানো বড়লোকী জাহির করে বড় অংকের মোহর তারা লিখে দেন। দশ লাখ, পনেরো লাখ এমনকি বিশ লাখ পর্যন্ত। বিয়েতে বেশি মোহর ধার্য্য করে ইজ্জতের মাত্রাটা বাড়াতে পারলে মন্দ কি? এমন ধারণা অনেকেই পোষণ করেন। আসলে এমন ধারণা ভুল। মোহরানা যত সহনীয় পর্যায়ে হবে ততই মঙ্গল তাতে পরিশোধ করারও সুযোগ থাকে। কাবিনে মোহরানার পরিমাণ যত লিখা হবে সে পরিমাণই দিতে হবে। বড় ফিগারে দেনমোহর থাকায় অনেকেই পরিশোধ করতে পারে না। আমাদের দেশে বিদেশী পাত্র হলে মোহরানা ও কয়েক ডিগ্রী বেড়ে যায়। বড় চাকরী করলেও বড় মোহরানা চাওয়ার নজির সর্বদাই। সহনীয় পর্যায়ে মোহরানা ধার্য্য হলে সহজেই কাবিনের দেনা শোধ করাও সম্ভব।
এক শ্রেণী আছেন তারা মোহরানাকে কনের জন্য সেইফ এন্ড সিকিউরিটি মনে করেন। আসলে কি তাই? আল্লাহ না করুক কোন কারণে বিয়ে ভেঙ্গে গেলে নিয়ম অনুযায়ী কনে মোহরানা পাবার অধিকার রাখে। এখানে কেউ গায়ের জোরে তা আদায় করার সুযোগ নেই। বড় অংকের মোহরানা হলে তাতে কি বিয়ে টিকে থাকবে? যদি বনিবনা না হয় কাবিনের দয়ায় কেউ বিয়ে ভাঙ্গা থেকে সরে আসবে না। আর যারা বলেন, দুর এগুলো দিতে হবে না যত পারো লিখো (শুধু কাবিননামায় লিখা থাকবে) তখনই এটা বড় গুনাহের কাজ বলে গণ্য হবে। সময় মত কাবিন পরিশোধ না করলে স্বামী মারা গেলে কেয়ামতের দিনে মোহরানার জন্য দায়ী থাকতে হবে। এই জন্য মুরব্বী বা গার্জিয়ানদেরও ভালোভাবে জেনেশুনে দেনমোহর ঠিক করা দরকার।
দেনমোহর স্বামীর কাছে স্ত্রীর ঋণ। স্ত্রী যাই হোক ঋণের দায় কমবে না, শোধ করতেই হবে। স্ত্রীকে যত খুশি উপহার বা গিফ্ট দেন না কেন তাতে দেনমোহর পরিশোধ হবে না। দেনমোহর পরিশোধের উদ্দেশ্যে কিছু দিতে হবে অন্যথায় নয়। যেমন বাড়ী, গাড়ী, দামী গহনা ইত্যাদি যতই দেন না কেন না বলে (কাবিনের হক) দিলে শোধ হবে না। মোহরানা পরিশোধ করতে হবে অবিকল যা কাবিননামায় লিখা হয়েছে হুবহু তাই। দেনমোহরের কোন বিকল্প নেই যদি স্ত্রী রাজী না থাকে। কোন রকম শর্ত করে মোহরানা দিবার নিয়ম নাই। অনেকে দ্বিতীয় বিয়ে না করার অঙ্গীকার করে মোহরানা দিতে চায়। অঙ্গীকার করেও ইদ্দত পালনের পর দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবে। মোহরানা অবশ্যই নিঃশর্তে পরিশোধযোগ্য, এতে কোন শর্ত থাকলে চলবে না। এটা বেআইনি। যদি স্বামীর আগে স্ত্রী মারা যায় তবে স্ত্রীর ওয়ারিশগণকে মোহরানার টাকা দিতে হবে। এটা অবশ্যই করণীয়। এক্ষেত্রে স্বামী নিজেও একজন ওয়ারিশ। স্ত্রীর আগে যদি স্বামীর মৃত্যু হয় উইল বা অন্যান্য ঋণের মত মোহরানা পরিশোধ করতে হবে, পরে সম্পত্তি বণ্টন।
মোহরানার বলে স্ত্রী সম্পূর্ণ সম্পত্তি বা আংশিক সম্পত্তি ভোগ দখল করতে পারে। প্রয়োজনে স্বামীর অন্যান্য পাওনাদারের বিরুদ্ধে লড়েও সম্পত্তি ভোগের অধিকার রাখে। স্ত্রী যদি নিজেই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটান মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইনানুসারে স্বামীর কাছ থেকে প্রাপ্য মোহরানা আদায় করতে পারবে। এমনকি যদি স্বামী মোহরানা পরিশোধে অক্ষমতা দেখায় বা অস্বীকৃতি জানায়- এক্ষেত্রে স্বামীর পিতা বা মোহরানার জিম্মাদার তা পরিশোধ করতে বাধ্য। মোহরানা অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে না করলে আল্লাহর কাছে কঠিন পরিস্থিতির স্বীকার হতে হবে। মোহরানা শোধ না করলে স্ত্রী স্বামীকে পারিবারিক আদালতের কাঠগড়ার প্রকোষ্ঠে দাঁড় করাতে পারবে। দাম্পত্য জীবনের দাবী অগ্রাহ্য করতে পারবে অথচ স্ত্রী ভরণপোষণ পাবার অধিকার রাখে। এমনকি স্ত্রী স্বামীকে তালাক পর্যন্ত দিতে পারবে। এরপর আছে পরকালের শাস্তি। বলা আছে তোমরা স্ত্রীদের মোহরানার দায় থেকে মুক্ত হও অর্থাৎ মোহরানা দিয়ে দাও। (সুরা আননিসা: ৪)
মুসলিম আইনে প্রবাদ আছে- ডযবৎব ঃযবৎব রং ধ সধৎৎরধমব, ঃযবৎব রং ধ ফড়বিৎ. অর্থাৎ যেখানেই বিবাহ সেখানেই দেনমোহর। নির্ধারিত হোক বা অনির্ধারিত হোক বিবাহ থাকলে মোহরানা থাকবেই। ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা থেকে দেনমোহর প্রদানের ক্ষেত্রে স্বামী শুধু দুইভাবে মুক্ত হতে পারে- ১। স্ত্রী যদি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে তখন। ২। যদি স্ত্রী স্বতঃস্ফুর্তভাবে আন্তরিকভাবে মুক্ত মনে কোন প্রতিদান আশা না করে দেনমোহরের পুরো বা অংশ বিশেষ মাফ করে, সেটাই হবে আইনত ও প্রকৃত মাফ।
স্ত্রীর করুণা নিয়ে বা ভালোবাসার দোহাই দিয়ে স্ত্রীকে চাপ প্রয়োগ করে তার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে মোহরানা মওকুফের চেষ্টা করলে তা মাফ হবে না। স্ত্রীর নিঃশর্ত প্রতিদানহীন স্বতঃস্ফুর্ত মওকুফই স্বামীকে মোহরানার দায় থেকে মুক্তি দিতে পারে। স্ত্রী খুশি হয়ে মোহরানা থেকে যে অংশ ছেড়ে দেয় তা স্বামী স্বাচ্ছন্দে ভোগ করতে পারবে। (সুরা আননিসা: ৪)
আমাদের দেশের বেশীর ভাগ স্ত্রীলোকই জানে না যে, মোহরানা তাদের প্রাপ্য ও এটা শরিয়ত সম্মত অধিকার। এ অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা ঠিক নয়। এ দেশে খুব কম সংখ্যক স্ত্রীলোকের ভাগ্যে মোহরানা জোটে। তারা মোহরানা সম্বন্ধে তেমন জ্ঞান রাখে না বিধায় সমাজে এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এ ব্যাপারে এ দেশের স্ত্রীরা অজ্ঞ। এ অজ্ঞতার সুবাদে সুবিধা ভোগ করে স্বামীরা। স্ত্রীদের সজাগ বা সচেতন না হলে সমাজে বৈষম্য থেকে যাবে। স্ত্রীর কওয়ার বা বলার দরকার কি আপনি দেনমোহর দিয়ে দিন। একান্ত নিজের স্বার্থেই মোহরানা শোধ করুন, এতে ইহলৌকিক ও পরলৌকিক শান্তি নিহিত আছে। মনে রাখবেন মোহরানা স্বামীদের গলার কাঁটা, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ কাঁটা তুলে ফেলুন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT