সম্পাদকীয়

জলাভূমি রক্ষায় সচেতনতা

প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০২-২০১৮ ইং ২২:২৯:২২ | সংবাদটি ৩৭ বার পঠিত

আজ দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব জলাভূমি দিবস। জলাভূমি রক্ষা ও সংরক্ষণে সচেতনতার লক্ষে প্রতি বছরই পালিত হয় দিবসটি সারা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশেও। যখন এই দিবসটি পালিত হচ্ছে তখন আমাদের দেশে জলাভূমির অবস্থা ভালো নয়। আমাদের জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। কৃষি জমি কমছে, এই খবরটি আজ আর কারও অজানা নয়। প্রতিদিনই কৃষি জমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে কৃষি জমির পরিমাণ সংকুচিত হলে ভবিষ্যতে এমনও দিন আসবে যেদিন চাষ করার মতো জমি হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। শুধু কৃষি জমিই নয়, সেই সঙ্গে হ্রাস পাচ্ছে জলাভূমিও। এক জরিপে দেখা গেছে, গত চার দশকে দেশের জলাভূমি কমপক্ষে ৬৫ লাখ হেক্টর হ্রাস পেয়েছে। জলাভূমির ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় এবং কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে হ্রাস পাচ্ছে জলাভূমি। আর এই জলাভূমি হ্রাস পাওয়ায় দেশে মৎস্য উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। দেখা দিয়েছে পরিবেশগত বিপর্যয়ও।
জাতিসংঘের আহ্বানে ১৯৯৭ সাল থেকেই পালিত হয়ে আসছে বিশ্ব জলাভূমি দিবস। মূলত জলাভূমি সংক্রান্ত সম্মেলনে স্বাক্ষর গ্রহণের দিনকে স্মরণীয় করে রাখতেই পালিত হয় দিবসটি। জলাভূমি কমছে আমাদের প্রতিনিয়ত। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশে জলাভূমি কমেছে কমপক্ষে ৭০ ভাগ। এটা হচ্ছে সরকারি পরিসংখ্যান। ১৯৭১ সালে দেশে জলাভূমি ছিলো ৯৩ লাখ হেক্টর। বর্তমানে জলাভূমি রয়েছে ২৮ লাখ হেক্টরের কম। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে আমাদের সংবিধানে দেশে কৃষি জমি, বনভূমি, বসতবাড়ি ছাড়া কোনো জলাভূমির উল্লেখ নেই। ফলে বিদ্যমান জলাভূমি নিয়ে কোনো জটিলতা দেখা দিলেও কোনো আইনী সহায়তা পাওয়া যায় না। তাছাড়া সংবিধানে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না থাকায় এই জলাভূমি বেদখল করাও সহজ হয়ে পড়েছে। আর তাই প্রভাবশালীরা একে একে দখল করে নিচ্ছে জলাভূমি। অতিমাত্রায় কৃষি জমি আবাদের লক্ষ থেকেও জলাভূমির ওপর চাপ পড়ছে। অনেক সময় আবাসনসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের জন্যও ভরাট করা হচ্ছে জলাভূমি।  
পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে জমি রয়েছে তিন কোটি ৭৪ লাখ একর। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ কৃষি জমি। এর মধ্যে এক কোটি ৩০ লাখ একর ব্যক্তিমালিকানাধীন। আর এক কোটি একর জমি ব্যবহৃত হচ্ছে সরকারি কাজে। আর চিহ্নিত খাসজমির পরিমাণ ৫০ লাখ একর। অর্পিত সম্পত্তি ২১ লাখ একর এবং পরিত্যক্ত সম্পত্তি দশ লাখ একর। এই খাসজলা ও জমির বেশির ভাগই রয়েছে প্রভাবশালীদের দখলে। ২০০১ সালে সরকার জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি প্রণয়ন করলেও তা কার্যকর হয়নি এখনও। বারবার সরকারি নীতির পরিবর্তন জলাভূমি সংকুচিত হওয়াকে ত্বরান্বিত করছে বলে অনেকের অভিমত। উল্লেখ করা যেতে পারে, বাংলাদেশ ১৯৫১ সালের ইন্টারন্যাশনাল প্লান্ট প্রোটেকশন কনভেনশন থেকে ১৯৯২ সালের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সংক্রান্ত কনভেনশন এবং সর্বশেষ ধরিত্রী সম্মেলন পর্যন্ত অনেক আন্তর্জাতিক চুক্তি ও বিধিতে স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু দেশের জলাভূমি রক্ষা করে পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি এ পর্যন্ত।
পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি মৎস্য সম্পদের উন্নয়নের জন্য জলাভূমি রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। সর্বোপরি দেশের মৎস্য সংকট নিরসনে জলাভূমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জলাভূমি সংকুচিত হওয়ার পরও বিদ্যমান জলাভূমিতে ৫৮টি মৎস্য অভয়াশ্রম গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। আর তাই দেশের জবরদখলকৃত জলাভূমি উদ্ধার এবং পুরনো জলাভূমি সংস্কার করে তাতে মৎস্য অভয়াশ্রম গড়ে তোলা দরকার। আরেকটি বিষয় হলো, সরকারি জলাভূমি দেখাশোনার দায়িত্ব কোন দপ্তরের এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলার পর এই দায়িত্ব পড়েছে বন বিভাগের ওপর। আর অপ্রিয় হলেও সত্য যে, বন বিভাগ নিজেদেরই বন সম্পদ রক্ষা করতে পারছে না, তার ওপর জলাভূমি রক্ষার বাড়তি দায়িত্ব তারা কীভাবে পালন করবে, সেটাও বড় প্রশ্ন। বিদ্যমান জলাভূমি রক্ষার পাশাপাশি জবরদখলকৃত জলাভূমি উদ্ধার ও মজে যাওয়া জলাভূমি সংস্কার করার উদ্যোগ নেয়া হোক। এই অঙ্গীকারই হোক আজ বিশ্ব জলাভূমি দিবসের।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT