পাঁচ মিশালী

কিছু দেখা, কিছু শোনা

এম এ মালেক চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০২-২০১৮ ইং ২৩:৩৫:২৮ | সংবাদটি ১০৯ বার পঠিত

আদিকাল থেকে মানুষ স্বভাবগত যাযাবর। রুটি-রুজির তালাশে মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গিয়েছে। আবার অনেকে যুদ্ধের কারণে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে জন্মভূমি ছেড়েছে। মুসলমান এবং হিন্দু দ্বি-জাতিগত ভিত্তিতে ’৪৭ সালে ভারত ভাগ হলে অনেক বিহারী এবং উর্দুভাষী ও বাংলাভাষী মুসলমান তদানিন্তন পূর্বপাকিস্তান (বর্তমান স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তানে (বর্তমানের পাকিস্তান) চলে আসে। তবে বাঙালি-আসামি ও কাচাড়ি বাংলাভাষী সব মুসলমান পূর্ব পাকিস্তানে ও উর্দুভাষী বেশিরভাগ করাচী ও লাহোরে আশ্রয় নেয়া বিহারী ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আগতদের তখন ‘মোহাজির’ বলা হতো। তবে বাংলাভাষীদেরকে কোনো নামেই ডাকা হতো না। তারা এ দেশের সমাজে মিশে গিয়েছেন। তবে স্থানীয়দের সাথে ঝগড়া-ফ্যাসাদ লেগে গেলে সিলেটি ভাষায় ‘বাউটা’ অভিধায় স্থানীয়রা গালি দিত। এখন তা আর নেই।
যতটুকু মনে পড়ে ১৯৬৪ বা ’৬৫ সনের ঘটনা। আমাদের স্থানীয় শাহগলি বাজারে দুই ব্যক্তিতে কথা কাটাকাটি থেকে হাতাহাতির পর্যায়ে মধ্যখানে অনেক লোক জমায়েত হয়। তখন ঝগড়ারত একজন তার প্রতিপক্ষকে ‘বাউটার বাউটা’ বলে গালি দেয়। তখন উপস্থিত লোকদের মধ্যে দু’তিন জন গালিরত ব্যক্তিকে ‘এসব গালিগালাজ ভালো নয় বলে থামিয়ে দেয়। ঝগড়ারত উভয় ব্যক্তিকে আমি চিনি এবং গালিরত লোকটি আমার পার্শ্ববর্তী গ্রামের। এর দু’তিন দিন পর আমার গ্রামের সামনে গাড়ির ফাঁড়ি স্টেশনে দেখা হলে তাকের জিজ্ঞাসা করলাম ভাই ঐ দিন বাজারে আপনি অমুখ ব্যক্তিকে ‘বাউটার বাউটা’ বলে গালি দিলেন কেন আমি বুঝতে পারিনি। ব্যক্তিটি আমাদের এলাকার মধ্যে কৌতুকপ্রিয় বলে আগেই আমরা জানতাম। তিনি আমার প্রশ্নের জবাবে রস সৃষ্টি করে বললেন ঐ ব্যক্তির পিতা ’৪৭ সালে ভারতের করিমগঞ্জ থেকে এখানে হিন্দুর বাড়ি ক্রয় করে পাকিস্তানী হয়ে বাস করছে। যাদের জন্মস্থান এলাকায় নয় তারা হলো ‘বাউটা’, তার ছেলে হলো বাউটার বাউটা। শোন, যার সাথে তর্কে জেতা যায় না তাকে নরম করতে তার নাড়ি ধরে টান দিতে এ রকম হালকা গালি দিতে হয়। তিনি আরও বললেন, তুমি জেনে রেখো এ দেশে চার রকমের ‘বাউটাদের’ বসবাস রয়েছে। স্থান ছাড়লে মান যায় তাতো জান-ই। তো, প্রথম বাউটা ভিন দেশ থেকে এসে যারা অন্যস্থানে স্থায়ী নিবাস গড়ে। ২ নম্বর বাউটা হলো মামুর বাড়ী বা আশপাশে যারা স্থায়ী নিবাস এ রকম ৩নং হলো বোনের বাড়ি ভাই এবং ৪র্থ শ্বশুরবাড়ি দামান্দ। কিশোর বয়স আমার তখন। তার কথার প্রতিবাদের জ্ঞান ছিল না।
যুবা বয়সে সাবেক পশ্চিম জার্মানীতে গিয়ে নিজেকে ‘বাউটা’ অপবাদ সইতে হয়েছে। জার্মানরা খুবই রেসিয়েল এবং রক্ষণশীল জাতি। গোটা পৃথিবীকে দু’বার চ্যালেঞ্জ করে দু’টি বিশ্বযুদ্ধ লাগিয়ে লড়েছে। বার বার যুদ্ধে নেস্তেনাবুদ হয়ে ১৫/২০ বছরের মধ্যে মাথা তুলে দাড়িয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানে তারা সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে অগ্রসরমান জাতি। মেশিনারী ও প্রযুক্তির অর্ধেক আবিষ্কারক জার্মানরা। তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তিও অনেক মজবুত। ইইউসিতে জার্মানী-ই প্রধান মোড়ল। সেই সভ্য জার্মানরা বাদামী রঙের ভারতীয় (ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানী, বাংলাদেশী) দের এবং আফ্রিকানদেরকে রেগে গেলে ‘সাইজে আউসল্যান্ডার’ (সিলেটি ভাষায় বাউটা-ই বলা যায়) বলে গালি দেয়। তবে উচ্চশ্রেণির শিক্ষিত জার্মানদের মধ্যে এ মানসিকতা নেই। জার্মানগণ মন্ত্রী-এমপিদের চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদের সম্মান করে বেশি। এর কারণ জানতে চাইলে এক সহকর্মী জানিয়েছিল যে, তাঁরা গবেষণা করে, নতুন নতুন জিনিস, প্রযুক্তি আবিষ্কার করে। আর আমাদের দেশের সম্মানীত প্রফেসরগণ রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিতে সদা ব্যস্ত থাকেন, ক্লাস নেওয়ার ফুরসতও নেতাদের কম থাকে। গবেষণায় বরাদ্দ টাকা, কতটুকু সত্য পুরো জানিনা, বছরান্তে নাকি নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেন কোন গবেষণা না করেই। তবে ব্যতিক্রম আছে, সবাই একই মানসিকতাসম্পন্ন নন।
বিলাতেও ‘ব্লাডি ফরেনার’ বলে গালি প্রচলিত আছে। ‘কালো আর ধলো’ বৈষম্য তো ব্রিটিশদেরই সৃষ্টি। কলোনীসমূহে নেটিভদের সাথে তারা রাজা-প্রজার ব্যবহার করেছে। কিঞ্চিত প্রতিশোধ নিয়েছিলেন উগান্ডার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইদি আমিন। সোয়ারীতে তিনি মাঝে মধ্যে চলাফেরা করতেন। সোয়ারী বহনকারীরা সাদা চামড়ার ব্রিটিশ ছিল। তাঁর সাথে ব্রিটিশ দূত, প্রতিনিধি বা ব্যবসায়ীরা সাক্ষাতে আসলে ‘কহববষ ফড়হি’ হয়ে আলাপ সারতো। চেয়ারে বসার অনুমতি ছিল না। শেষ পর্যন্ত ইদি আমিন ক্ষমতায় টিকতে পারেন নি। সৌদি আরবে নির্বাসিত হয়ে মারা গেছেন ইদি আমিন।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজাশাসিত দেশগুলোতে এশিয়ান শ্রমিকদেরকে ‘মিসকিন’ বলে থাকে। এশিয়ানদের রফিক (বন্দু) আর ইউরোপ-আমেরিকানদেরকে ‘সাদিক’ (বিশ্বাসী বন্ধু) বলে ডাকে তা আমরা সবাই জানি। আসলে নিজ দেশে আমি রাজা, ভিনদেশে আমি বাউটা তথা ‘ব্লাডি ফরেনার।’

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT