পাঁচ মিশালী কানাডার চিঠি --------------------

পাগলা ঘণ্টা

মো. আজিজুর রহমান লসকর প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০২-২০১৮ ইং ২৩:৩৭:১৮ | সংবাদটি ২২ বার পঠিত

শেষ দুপুরে হঠাৎ এপার্টমেন্ট ভবনের সবগুলো বাসায় পাগলা ঘণ্টা বাজতে শুরু করলো। টি (ঞ) আকৃতির চারতলা এপার্টমেন্ট ভবনে প্রায় শ’ খানেক ইউনিট রয়েছে। বিশাল ভবনের কোথাও আগুনের সূত্রপাত হলেই প্রত্যেক বাসায় পাগলা ঘণ্টা বেজে উঠে।
ঘণ্টাগুলো কিন্তু ভয়ঙ্কর স্বরে ও উচ্চ নিনাদে বাজে না। বরং মৃদু শব্দে একই লয়ে বাজতে থাকে। তাই এ ঘণ্টাকে পাগলা ঘণ্টা না বলে শান্ত বা ভদ্র ঘণ্টা বলা যেতে পারে। তবে ঘণ্টা শান্ত বা ভদ্র হলেও অগ্নিকান্ডের ইঙ্গিত বহন করে বলেই আমরা সবাই ভীত ও আতঙ্কিত হয়ে উঠলাম! এখনই ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে যেতে হবে; এটাই নির্দেশ। লুঙ্গি পরা অবস্থায় ছিলাম। তাড়াতাড়ি একটি ট্রাউজারের ভিতর শরীরের অর্ধাংশ ঢুকিয়ে দিলাম। বাকি অর্ধাংশ রইলো বাইরে। কোনো অসুবিধা নেই। সার্ট তো আছেই!
অত্যন্ত জরুরি কাগজপত্র ফাইলের মতো একটি ব্যাগে থাকে। ব্যাগটি হাতে নিয়ে বগলদাবা করলাম। স্ত্রীকে বললাম, ‘চল, বেরিয়ে পড়ি!’ ছেলে দু’জন বাসায় নেই, বাইরে। তাড়াহুড়ো করে দু’জন বাসা থেকে বেরিয়ে লম্বা করিডোরে এসে দাঁড়ালাম। অন্যান্য এপার্টমেন্টের বাসিন্দারাও বেরিয়ে পড়েছেন। সবার চোখে-মুখে ভীষণ আতঙ্ক! দুপুর বেলা অধিকাংশ বাসার লোকজন নিজ নিজ কর্মস্থলে ব্যস্ত। বাসা খালি। তাই লোক সমাবেশ ছোট।
এপার্টমেন্টগুলোয় পাগলা ঘণ্টা বাজার সাথে সাথে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে ফায়ার বিগ্রেড সেন্টারে তাদের যন্ত্রে তা ধরা পড়ে গেছে। কাউকে ফোন করে অগ্নিকান্ডের খবর ফায়ার ব্রিগেডকে জানাতে হয়নি। ক্ষণিকের মধ্যে ফায়ার ব্রিগেডের দক্ষ লোকজন অগ্নিনির্বাপক বিশাল গাড়ি নিয়ে অকুস্থলে উপস্থিত হয়েছে।
আতঙ্ক উৎকণ্ঠা নিয়ে আমরা দাঁড়িয়ে আছি করিডোরে! করিডোরের প্রান্তে অবস্থিত ইমার্জেন্সি দরোজা খোলেনি! ইতোমধ্যে পাগলা ঘণ্টা থেমে গেল। বোঝা গেল, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। আল্লাহর ইচ্ছায় বিপদ কেটে গেছে। দেহে যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। একটু গলা খাঁকারি দিয়ে সম্মুখে এগিয়ে গেলাম এবং এলিভেটারে করে চার তলা থেকে গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমে এলাম। ইউনিফরম পরিহিত ফায়ার ব্রিগেডের লোকজনদের দেখতে পেলাম। ইতোমধ্যে ওরা সমস্ত ভবন পরীক্ষা করে নিয়েছে। ফ্রেঞ্চ ভাষায় কি বললো, মালুম হলো না। প্রতিবেশি পেরুভীয় এক কিশোরী ইংরেজিতে বললো, ‘কিভাবে যেন ভবনের কোথায় একটু ধোঁয়া দেখা দিয়েছিল, অমনি পাগলা ঘণ্টা বেজে উঠেছিল।’
গত জুন মাসের শেষ দিকে, তখন পবিত্র রমজান। আমি তখন কুবা মসজিদে ইতেকাফে ছিলাম। বাসায় আমার স্ত্রী ও দুই পুত্র সেহরি খেয়ে ঘুমিয়ে আছেন। এপার্টমেন্ট ভবনের সকল ইউনিটে প্রত্যুষে  সবাই ঘুমে। তখন পাগলা ঘণ্টা বেজে উঠে! সেদিন সত্যি আগুন লেগেছিল। ধোঁয়া চার তলায়ও পৌঁছে যায়! শুরু হয় ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখ নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত মানুষের ছোটাছুটি, শিশুদের কান্না! ভয়, ভীতি ও উৎকণ্ঠা নিয়ে নারী, পুরুষ, শিশু সবাই ভবনের ইমার্জেন্সি সিঁড়ি মেড়ে বাইরে বেরিয়ে খোলা মাঠে জড়ো হয়েছিলেন।
সেদিন আগুনের সূত্রপাত হয় এপার্টমেন্ট ভবনের নিচ তলায় প্রবেশ পথে। প্রবেশ পথের কমন প্লেসে একটি বহু তাক বিশিষ্ট শেলফ রয়েছে। শেলফের তাকগুলোয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সেইলের অর্থাৎ মূল্য হ্রাসের সাপ্তাহিক প্রচারপত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র থাকে। কোনো দায়িত্বহীন ধূমপায়ী অগ্নিসহ সিগারেটের শেষ প্রান্ত সম্ভবত ঐ কাগজগুলোয় ছোড়ে ফেলেছিল! সেই থেকে আগুনের সূত্রপাত! আগুন লাগার সাথে সাথেই ফায়ার ব্রিগেডের লোকজন দ্রুততার সাথে এসে পৌঁছে এবং আগুন বিস্তৃতি লাভের আগেই নিভিয়ে ফেলে। আল্লাহর রহমতে সবাই রক্ষা পান।
সে দিন আগুন প্রত্যক্ষ করার দুর্ভাগ্য হয়নি। কিন্তু দগ্ধ কাগজপত্র ও দেয়ালে আগুনের ভীতিপ্রদ ছাপ দেখে শিহরিত হয়েছি! এখানে বাড়িগুলো বাইরে থেকে দেখে মনে হয় ইট-সিমেন্টে তৈরি। আসলে ভেতরে রয়েছে বিপুল পরিমাণ কাঠ প্লাইউড ও সিন্থেটিক দ্রব্যাদি, যা আগুনের সংস্পর্শে এলেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠবে।
অক্টোবর মাসে ফায়ার ব্রিগেড কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একটি চিঠি পেলাম। একই চিঠি ভবনের প্রত্যেক এপার্টমেন্ট বিলি করা হয়েছিল। চিঠির বক্তব্য হচ্ছে, আগামী ২০ তারিখ সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টার মধ্যে প্রত্যেক এপার্টমেন্টের অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হবে। এ ব্যাপারে তাদের লোকজনকে যেন সহযোগিতা করা হয়। অতঃপর অনুরোধ করা হয়েছে, ঐ সময় যারা এপার্টমেন্টে অনুপস্থিত থাকবেন তারা যেন এপার্টমেন্টের চাবি কেয়ার টেকারের কাছে রেখে যান। অন্যথায় এপার্টমেন্ট পিছু ১৫০ ডলার জরিমানা কার্যকর হবে। এরপর বলা হয়েছে, জরিমানার অর্থ ব্যয় করে অন্য দিন সংশ্লিষ্ট এপার্টমেন্টের অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হবে। চিঠি পড়ে ভেবেছিলাম দীর্ঘ সময় ব্যাপী জটিল কোনো কার্যক্রম হয়ে থাকবে। নির্দিষ্ট তারিখে প্রায় সারাদিন ব্যাপী একজন লোক ভবনের বিভিন্ন এপার্টমেন্ট পরিদর্শন করেছিলেন। কিন্তু প্রত্যেক এপার্টমেন্টে মাত্র ক’মিনিট অবস্থান করেছিলেন। তাঁকে সহায়তা করেছিল ভবনের দু’জন কেয়ারটেকারের মধ্যে অন্যতম একজন, নাম গ্লেন। গ্লেন দীর্ঘ দেহী কালো তরুণ। তাকে দেখলেই নাইজেরিয়ায় আমার প্রাক্তন ছাত্রদের কথা মনে পড়ে। ভাবলাম তাকে জিজ্ঞেস করি সে নাইজেরীয় তথা আফ্রিকান কি না! কিন্তু এভাবে সোজাসুজি জিজ্ঞেস করলে গ্লেন মাইন্ড করতে পারে। কারণ এখানে সবাই নিজেকে কানাডীয় ভাবতে ভালোবাসে। তাই একদিন একটু ঘুরিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমি কানাডীয়। তুমিও কানাডীয়। কিন্তু আমার অরিজিন হচ্ছে বাংলাদেশ। তোমার অরিজিন কোন দেশ?  জামাইকা। সে হেসে হেসে বলেছিল। অতঃপর আমি গ্লেনকে বলেছিলাম, আমি চার বছর নাইজেরীয়ায় শিক্ষকতায় ছিলাম। কখন? গ্লেনের সাগ্রহ প্রশ্ন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত। ওহো! আমার জন্মের আগে। বললো গ্লেন। ওখানে তোমার মতো আমার অনেক ছাত্র ছিল। তোমাকে দেখলেই ওদের কথা মনে পড়ে। শুনে সে মৃদু হেসেছিল। যা হোক। জনগণের স্বার্থে অগ্নিনির্বাপক কর্তৃপক্ষের কর্মতৎপরতা লক্ষ করে তাদের প্রতি আমার মনে গভীর শ্রদ্ধা বোধ হলো।
শুনেছি পাশ্চাত্যে মাঝে মাঝে অগ্নিকান্ড বিষয়ক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। নিয়ম হচ্ছে সাইরেন বাজার সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভবনগুলোর প্রত্যেক বাসিন্দা ঘরে যে অবস্থায়ই থাকুন না কেন, অবশ্যই বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে। নইলে অর্থদন্ড! এ প্রসঙ্গে আমার সহপাঠী বন্ধু ডা. মোহাম্মদ আছাদ উদ্দিনের এক অভিজ্ঞতা মনে পড়ে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অফিসার হিসেবে তিনি একবার কোনো এক ট্রেনিং-এ ইংল্যান্ড অবস্থান করছিলেন। থাকার ব্যবস্থা ছিল একটি আবাসিক এলাকায় বহুতল বিশিষ্ট ভবনে। একদিন দুপুরে মহড়ার অংশ হিসেবে সাইরেন বেজে উঠলো। সাথে সাথে ভবনের সবাই নিচে নেমে এলেন। নিচে জড়ো হওয়া মানুষগুলোকে দেখা গেল বিভিন্ন রূপে। একজন ছবি আঁকার কাজে ছিলেন, তাই হাতে রং, তুলি ইত্যাদি। আরেকজন রান্না করছিলেন, তাই হাতে মসলা মাখানো তাড়–! একজন তরুণীকে দেখা গেল ভেজা শরীর দিগম্বর, সে গোসল করছিল!

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT