সাহিত্য

স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্নের ঘর

আবদুস সবুর মাখন প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০২-২০১৮ ইং ০২:৩৭:০১ | সংবাদটি ৯৯ বার পঠিত

এক.
বিমানটি যথাসময়ে নামলো রানওয়েতে। বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছে তার শাঁ শাঁ আওয়াজ। লোকজন এদিক সেদিক ছুটছেন; হৈ চৈ করছেন। অপেক্ষার প্রহর গুনছেন; কখন দেখা যাবে তাদের নিকটাত্মীয়দের। কিন্তু ইমিগ্রেশনসহ অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময়তো একটু লাগবেই। তবু তর সইছে না।
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এর চারপাশ। ছোট ছোট পাহাড়-টিলা আর সবুজের বেষ্টনীতে গড়ে ওঠা এই বিমানবন্দরটি যে কাউকে মুহূর্তেই আকৃষ্ট করবেই। তার ওপর পৌষের কনকনে শীতের বিকেলে সঞ্চারণশীল কুয়াশার চাদরে ক্রমান্বয়ে পশ্চিমাকাশে সূর্যকে ঢেকে দেয়ার দৃশ্যটি স্বপ্নীল জগতে নিয়ে যায় মানুষকে। আর যদি কেউ একটু বেশি প্রকৃতিপ্রেমিক হয়, আবেগ প্রবণ হয়, দু’য়েকটা কবিতা টবিতা লিখে নিজেকে কবি কবি ভাবে- তাহলে তো কোনো কথাই নেই; এমনি সময়ে দুয়েকটা লাইন লিখে নেয়ার কসরত তো করবেই। অন্তত: মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় কুয়াশার ঢেকে যাওয়া সবুজ প্রকৃতি আর ডুবন্ত সূর্যের দৃশ্যটি বন্দী করতে ভুল করবে না। ভুল করেনি শাহানও। পকেট থেকে মোবাইল ফোনটি বের করে একটু উঁচু জায়গায় ওঠে। রেলিং টপকে ছোট একটা টিলার ওপরে ওঠে ছবি তুলে নেমে পড়ে সে। আর ততোক্ষণে সূর্যটি পুরোপুরি ডুবে যায়। বিমানবন্দরের চারদিকে বাতিগুলো জ্বলে ওঠে। বিদেশ ফেরত যাত্রীরাও একে একে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছেন ব্যাগ এন্ড ব্যাগেজ নিয়ে। কেউ হাতে আবার কেউ ট্রলিতে। যানবাহনগুলোও ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যাত্রীদের নিয়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষবর্ষের ছাত্র শাহানের বাবা গিয়েছেন ভ্রমণে ল-নে। মাস কয়েক থেকে তার মা, বড়বোন, দুলাভাইসহ অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ফিরছেন আজ। সে এসেছে রিসিভ করতে। বহির্গমণ গেইটে যাত্রীদের সংখ্যা কমে আসছে। কিন্তু তার বাবাকে তো দেখা যাচ্ছে না। একটু চিন্তায়ই পড়ে গেলো সে। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত সিকিউরিটির লোকদের বলে ঢুকে গেলে ভিআইপি লাউঞ্জে। সেখানে বেশ কিছু যাত্রীর আনাগোনা লক্ষ করা যায়। চারদিকে চোখ ঘোরায়। এমন সময় একটা জায়গায় চোখ আটকে যায় তার। লাউঞ্জের একটি কর্নারে সোফায় একটি মেয়ে বসে আছে একা। সামনের টেবিলে রাখা একটি লাগেজ। কালোকেশী উজ্জ্বল শ্যামলা মধ্যম গড়নের অষ্টাদশী মেয়েটিকে সামনে থেকে দেখার জন্য কাউকে খোঁজার ভান করে মেয়েটির কাছাকাছি ঘুরোঘুরি করতে থাকে শাহান। একবার চোখাচোখিও হয়। হরিণ হরিণ চোখ দু’টি যেন মুহূর্তেই তার ধমনীর রক্ত চলাচল স্তব্ধ করে দেয়। আরেকবার চোখে চোখে তাকানোর বড়ই ইচ্ছে হয় শাহানের। কিন্তু তাতে আত্মসম্মানে বাধে। বড্ড হ্যাংলামি মনে হয়। লোভ প্রশমিত করে। এমন সময় দেখে সামনে দাঁড়ানো তার বাবা শাহরিয়ার আহমদ। হাতে ধরা ট্রলিতে ছোট বড় চারটি লাগেজ। সে প্রশ্ন করে- ‘এতোগুলো লাগেজ কার বাবা?’
: আমাদের নয়। আমার তো মাত্র একটা। বাকীগুলো আরেকজনের।
: তোমার কাছে কেন?
: বলছি বলছি...... বলেই তিনি এগিয়ে ওই মেয়েটির সামনের সোফাতেই বসে পড়লেন। ডাকলেন ছেলেকে তার পাশে বসতে। সে তো পেয়ে গেলো একেবারে হাতে আসমান। ‘মেঘ না চাইতে বৃষ্টির’ দেখা পেয়ে ভেতরে ভেতরে খুশিতে আটখানা শাহান। মুখোমুখি বসা থাকলে একবার আধবার চোখ বিনিময় তো হতেই পারে- এমনি সুখানুভূতি সৃষ্টি হয় তার মধ্যে। বাবা তাকে সামনের মেয়েটিকে দেখিয়ে বললেন-
: এই মেয়েটিরই লাগেজগুলো। হিথ্রোতে এসে এদের সঙ্গে দেখা। তার মা সাথে ছিলেন। গন্তব্য যেহেতু একই, তাই তার মা-ই অনুরোধ করে মেয়েটিকে আমার সঙ্গে দিয়ে দিলেন। তিনি আসেননি। হ্যাঁ পরিচয় করিয়ে দেই। ছেলের পিঠে হাত রেখে মেয়েটিকে বললেন- এই আমার ছেলে শাহান। আর শাহানকে বললেন- এই মেয়ের নাম চাঁপা; মিষ্টি নাম। কথাবার্তা এই পর্যন্তই। তারপর যে যার মতো বসে থাকলো কিছুক্ষণ।
এক সাথে ভিআইপি লাউঞ্জ থেকে বের হয়ে চাঁপা চলে গেলো তাকে নিতে আসা গাড়িতে। যাবার সময় একটু হাত নাড়লো। বললো- চলি আঙ্কেল। হ্যাঁ আপনার ফোন নম্বরটা নিয়ে যাই। ফোন নম্বরটি দিয়ে শাহরিয়ার আহমদ বললেন- ঠিক আছে চাঁপা যোগাযোগ রেখো। আল্লাহ হাফেজ। দরোজা খুলে গাড়িতে ওঠার সময়ও অন্তত একবার যদি তার দিকে তাকায়, সেই অপেক্ষায় ছিলো শাহান। কিন্তু চাঁপা ভয়ঙ্কর আত্মমগ্ন হয়ে কোন দিকে না চেয়ে গাড়িতে ওঠে দরোজাটা লাগিয়ে দিলো। শাহান এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো চলে যাওয়া গাড়িটির দিকে। চলে গেলো চাঁপা। রেখে গেলো শাহানের জন্য কিছু সুখস্মৃতি।
বাবা ছেলে ঘরে ফেরে। বিদেশের দিনগুলোর গল্প করেন শাহরিয়ার আহমদ স্ত্রী ও ছেলের সঙ্গে। বিলেতের সমাজ ব্যবস্থা, রাজনীতি, বাঙালিদের জীবন জীবিকা, সাহিত্য সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়ে সময় সুযোগেই গল্প করেন তিনি। কিন্তু এসবের কিছুই মাথায় ঢুকে না শাহানের। তাকে পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে রেখেছে ওই মেয়েটি। তার মোহনীয় চোখ, স্থির ধীর চলন বলন, তার সঙ্গে চোখ বিনিময়, বিদায় বেলার মুহূর্ত চোখের সামনে জ্বল জ্বল করছে সব সময়। এই সবকিছুর চিত্রকল্পই এখন তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। লেখাপড়ায়ও মন বসছে না। এই অবস্থাকে কী বলে? যাকে বলে ‘প্রথম দেখাতেই প্রেম’- সেটা কি হয়েছে তার? কিছুই বুঝতে পারে না সে। মা বাবার চোখেও ধরা পড়ে ছেলের আচরণের এই পরিবর্তন।
চাঁপা বিলেতেই থাকে মা বাবার সঙ্গে। লেখাপড়া ওখানেই করছে। এবার ছুটিতে এসেছে ¯্রফে বেড়াতে। প্রায় ছয় সপ্তাহ থাকার ইচ্ছে আছে তার। মা বাবা আসবেন সপ্তাহ দুই পরে। চাঁপা ভাবলো- ছুটি যেহেতু আছে, মা-বাবার সাথে না এসে দুই সপ্তাহ আগেই চলে আসা ভালো। ছুটির সময়টুকু পুরোপুরি কাজে লাগানো যাবে। আর বিলেত ফিরে যাবার সময় না হয় একসাথে মা বাবার সঙ্গে যাওয়া যাবে। যে ভাবনা সেই কাজ। এসেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ঘুরোঘুরিতে। শৈশবের সহপাঠী বন্ধুদের খুঁজে বের করে তাদের সঙ্গে বেশ জমিয়ে ফেলেছে আড্ডা। এঘর ওঘর, এবাড়ি ওবাড়ি, পাড়া প্রতিবেশী কেউ বাদ যাচ্ছে না। সবার সঙ্গেই দেখা হচ্ছে তার। চলছে গল্প গুজব। বিমানবন্দরে শান্তশিষ্ট শীতল মেজাজের মেয়েটি যে বাড়িতে এসে এতো প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠবে, সেটা ভাবা যায়নি আগে। অথচ এই হচ্ছে তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। সবাই বলে- ‘তুই তো আগের মতোই আছিসরে চাঁপা’।
: কেন, বদলে যেতে হবে নাকি?
বদলে যাওয়াই কি মানুষের স্বভাব?
: আমরা দেখছি তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক মানুষই বদলে যায়।
: আমি হয়তো ওদের দলে নই।
এসব থাক। আমি এসেছি ক’টা দিন হৈ চৈ আড্ডাবাজি হাসিখুশীতে কাটিয়ে দিতে। আমি আর কিছু বুঝি না।
এভাবেই কেটে গেলো দুই সপ্তাহ। চাঁপার মা বাবারও দেশে ফেরার সময় হয়ে এলো। তারা যথারীতি দেশে এসে পৌঁছুলেন। মা বাবা আর মেয়েতে মিলে পারিবারিক জলসা ষোলোকলায় পূর্ণ হয়ে উঠলো।
ফোন আসে একদিন শাহরিয়ার আহমদের মোবাইলে; সকালে যখন ঘর থেকে বেরুবেন তখনই। তিনি ফোনটি রিসিভ করতে পারেননি। ঘন্টাখানেকের মধ্যে ফোন আসে আবার। তিনি যাচ্ছেন শহরের বাইরে বাসে চড়ে। অপরিচিত নম্বর, রিসিভ করেন। অপর প্রান্ত থেকে নারী কন্ঠ-
: হ্যালো, স্লামালিকুম।
: আলাইকুম আসসালাম।
: শাহরিয়ার সাহেব বলছেন।
: জ্বি।
: আমি বলছিলাম চাঁপার আম্মা।
: ও আচ্ছা! আপনি দেশে আসলেন কবে?
: গতকালই এসেছি। সেদিন তো হিথ্রোতে সময়ের অভাবে আপনার সঙ্গে আলাপই হলো না। আপনার কাছে কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য এই ফোনটা করলাম।
: কেন?
: না মানে, আমার মেয়েটাতো কখনও একা জার্নি করেনি; আপনার সঙ্গে দিতে পেরে বেশ নিশ্চিন্তই ছিলাম।
: এখানে কৃতজ্ঞতার কিছু নেই। তো আসুন না একদিন চাঁপাকে নিয়ে আমাদের বাসায় গল্প করা যাবে।
: আসবো, অসুবিধা নেই। কিন্তু তার আগে আপনারা আসুন একদিন, শহরের কোলাহল ছেড়ে আমাদের শান্ত সুনিবিড় ছোট্ট গ্রামটিতে। এখানে যন্ত্রদানবের বিকট আওয়াজ আপনাকে বিরক্ত করবে না। আমাদের এখানে এখনও পাখির গানে সূর্য ডুবে, ভোর হয় পাখির গানে। ভাগ্য ভালো হলে নির্জন দুপুরে দূরে কোন কদমতলা থেকে রাখালের বাঁশির সুরও আপনি শুনতে পারেন। কী, আসবেন কি একদিন আমাদের গ্রামে?
রীতিমতো বিমোহিত হয়ে গেলেন শাহরিয়ার আহমদ কথাগুলো শুনে। তিনি বিস্মিতও হলেন এই ভেবে যে, ভদ্রমহিলা এক নিঃশ্বাসে এতো সুন্দর সুন্দর কথাগুলো বলে গেলেন কীভাবে? মুহূর্তের মধ্যে কিছুটা নস্টালজিয়ায় পেয়ে বসে তাকে। কিছুই বলছেন না তিনি। অপর প্রান্ত থেকে ভদ্রমহিলা কেবল গাড়ির হর্ণ আর বাতাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন। তিনি জবাবের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে অধৈর্য্য হয়ে ওঠেন।
: হ্যালো, শুনতে পাচ্ছেন আমাকে?-
স্মৃতির ঘোর ভাঙ্গে শাহরিয়ার আহমদের।
: শুনছি, বলেন।
: আমি তো এতোক্ষণ বললাম। এখন বলবেন তো আপনি।
: আমি কী বলবো?
: মানে? এই যে এতোকিছু বললাম, তার কোনো কিছুই কি শুনেননি?
: শুনেছি।
: তাহলে?
: আসবো একদিন। তবে কেমন করে আসবো, গ্রামের নাম- ঠিকানা, রাস্তাঘাট কিছুই তো জানি না।
: বলছি। গ্রাম পলাশতলী, ডাকঘর.... উপজেলা.... সিলেট।
উচ্ছ্বসিত শাহরিয়ার আহমদ। ভদ্রমহিলার কথা থামিয়ে দেন। বলেন-
: শুনেছি এই গ্রামের নাম। আমার কাছে তো বেশ চেনাই মনে হচ্ছে।
: কীভাবে? এসেছেন কখনও এখানে?
: আসিনি, তবে এই গ্রামের নামটি এক সময় মুখস্থ ছিলো।
: কেন?
: সে অনেক কথা, আপনাকে বলা যাবে না।
: তা ঠিক, আমি তো আর আপনার কাছের কেউ না!- একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন ভদ্র মহিলা।
: কৈশোর উত্তীর্ণ সেই সময়টির কথা আসলে ভুলে যাবার নয়। পারিনি আজও আমি ভুলতে সেই অদেখা বন্ধুটিকে, সেই ‘মিতা’কে।
-শব্দটি শুনে চমকে ওঠেন ভদ্রমহিলা। কারণ ‘মিতা’ শব্দটি তার অতি প্রিয়। এক সময় তিনি এই নামেই পরিচিত ছিলেন একজনের কাছে। সেও তো ছিলো দূরে। পত্রে পত্রে মিতালী; মানে পত্রমিতা। তবে কি এই সেই ব্যক্তি?’ ভাবনায় পড়ে যান তিনি। অবশ্য এর কিছুই বুঝতে দেননি শাহরিয়ার আহমদকে। কিছুটা লুকোচুরির আশ্রয় নেন তিনি।
: তাহলে হয়তো পেয়েও যেতে পারেন এতোদিন যে অদেখা বন্ধুটিকে বুকের পিঞ্জরে পোষে রেখেছেন, তাকে।
: কীভাবে? আপনি কি চেনেন তাকে? আমি তো তার প্রকৃত নাম ঠিকানা কিছুই বলিনি।
: বলেন নি; তবে আমি কিছুটা অনুমান করতে পারছি।
-অস্থিরতা বেড়ে যায় শাহরিয়ার আহমদের।
: হেয়ালী রেখে কি বলবেন আসল কথাটি?
: না, আজ রাখছি। পরে বলবো।-
বলেই ফোন রেখে দিলেন ভদ্রমহিলা।
দৈনন্দিন কাজকর্ম, চাকরি ইত্যাদির সঙ্গে নতুন একটি চিন্তার বিষয় যুক্ত হলো শাহরিয়ার আহমদের জন্য। রাতে বাসায় ফিরলেন। ভাবলেন ফোন দেবেন। পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন। ভাবছেন কেবল ‘আসলেই সে-ই মিতা? নিজের পরিচয় লুকিয়ে রেখে কি আমার সঙ্গে মজা করছে?’ পরদিন সকালে নাস্তার টেবিলে ছেলে শাহান ও স্ত্রীসহ তিনজন একসাথে। শাহরিয়ার আহমদের মোবাইল ফোনটি বেজে উঠলো পাশের রুমে। স্ত্রীকে বললেন ফোন রিসিভ করতে। অপরিচিত নম্বর থেকে আসা কলটি রিসিভ করেন শাহানের মা। অপর প্রান্ত থেকে মেয়ে কন্ঠ বললো-
: এটা কি শাহরিয়ার আঙ্কেলের নাম্বার?
: হ্যাঁ।
: আপনি কি আন্্টি?
: হ্যাঁ।
: তাহলেতো ভালোই হলো, আন্্টি। আমি চাঁপা। আমাকে কি চিনতে পেরেছেন?
: কেন চিনবো না। তোমাকে না দেখলেও তোমার কথা অনেক শুনেছি। তো চাঁপা তোমরা সবাই ভালো তো?
: হ্যাঁ আন্্টি ভালো। আমার আম্মা আব্বা দেশে এসেছেন। আমরা সবাই চাচ্ছিলাম আপনারা একদিন আমাদের বাড়িতে আসুন। একসঙ্গে সবাই গল্প করবো।
: আচ্ছা ঠিক আছে মা, দেখি তোমার আংকেলের সাথে আলাপ করে।
: তাহলে রাখি আজ?
মা’য়ের সঙ্গে চাঁপার ফোনালাপ শুনে ভেতরে ভেতরে আনন্দে আত্মহারা শাহান। কিন্তু মুখে কিছু বলে না। অপেক্ষায় থাকে মা বাবা কখন চাঁপাদের বাড়িতে যাওয়ার তারিখ ঠিক করেন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো পরবর্তী শুক্রবার তিনজন মিলে যাবেন চাঁপাদের বাড়ি শিমুলতলীতে।
শুক্রবার শীতের সকালে মিঠে রোদে তিনজন রওয়ানা দিলেন পিকনিকের আমেজে শহর থেকে দূরে। দু’পাশে সবুজ বনানী, ছোট ছোট টিলা ছাড়িয়ে পিচঢালা আঁকাবাঁকা পথে চলেছে তাদের গাড়ি। স্পিকারে বেজে চলেছে- ‘মাথার সিঁথির মতো মেঠোপথ ধরে, বেতসলতার বন যায় পিছু সরে, নাম না জানা কোন অচিন গাঁয়ে, চলো না দু’জনে আসি ঘুরে.....।’ সবকিছু যেন একটি অপরূপ মায়াময় দৃশ্যের অবতারণা করে। বিমোহিত শাহরিয়ার আহমদ; কিছুটা রোমাঞ্চিতও। ইচ্ছে হচ্ছে প্রাণ খুলে গান ধরতে। মনের মধ্যে শুরু হয়েছে তারুণ্যের চঞ্চলতা। যেন ভুলেই গেছেন বয়স তার অর্ধশতাব্দী পূর্ণ হয়ে গেছে। ঘন্টা দেড়েক যাত্রার পর শিমুলতলী পৌঁছলো তাদের গাড়িটি। সত্যি মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। শাহরিয়ার আহমদও গ্রামে জন্ম নিয়েছেন; শৈশব কৈশোর তো গ্রামেই কেটেছে। কিন্তু নিজের গ্রাম থেকেও যেন মনোরম মনে হচ্ছে এই গ্রাম, এই বাড়ি। তিনি তো রীতিমতো প্রেমেই পড়ে গেলেন এই গ্রামের। মনস্থির করে ফেললেন আজ সারাদিন ঘুরবেন গ্রামে। শহরে ফিরবেন রাত্রে। স্ত্রী বা ছেলেরও এতে কোন আপত্তি নেই।
আপত্তি নেই চাঁপা কিংবা তার মা’রও। তবে তার বাবা সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাইরে চলে গেলেন জরুরি কাজে। পড়ন্ত বিকেলে গ্রামের আঁকা বাঁকা মেঠো পথ ধরে হাঁটছেন তারা পরিভ্রাজকের মতো। দু’পাশের অপরূপ দৃশ্যাবলী কিংবা ঘর বাড়িগুলো মন কাড়ে শাহরিয়ার সাহেবের। কোন বাড়ি রাস্তার সমান্তরাল ভূমিতে, আবার কোন বাড়ি টিলার ওপরে, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় বাড়িতে। এই ধরনের বাড়ি ইতোপূর্বেও যে দেখা হয়নি শাহরিয়ার আহমদের তা নয়। তবে আজ যে একটু বেশিই আকৃষ্ট করছে তাকে এই বাড়িগুলো।
হাঁটতে হাঁটতে তারা একটু দূরে গ্রামের শেষ প্রান্তে চলে গেলো। সেখানে ছোট একটি মাঠ। মাঠের পশ্চিম প্রান্তে হিজল, তমাল, বট, কদম ইত্যাদি বিশালায়তনের কয়েকটি বৃক্ষ বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছায়া ফেলেছে। নীচে পড়ে আছে শুকনো পাতাগুলো। হাঁটতে থাকেন শাহরিয়ার আহমদ শুকনো পাতার ওপর। একে একে সবাই হাঁটা শুরু করে গাছের নীচে। শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনিতে মুখরিত হয় শীতের বিকেল। গুনগুনিয়ে শুরু করে দেন শাহরিয়ার আহমদ। ...... আয় আরেকটিবার আয়রে সখা প্রাণের মাঝে আয়, মোরা সুখের দুঃখের কথা কবো- প্রাণ জুড়াবে তায়.....। স্ত্রী, শাহান ও চাঁপা বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করে দেয় আস্তে আস্তে। সেদিকে যেন খেয়ালই নেই শাহরিয়ার আহমদের। তিনি যেন চলে গেছেন অন্য জগতে। যেখানে কেবল লাফালাফি করছে কলেজের উচ্ছ্বলতাপূর্ণ দিনগুলোর কিছু আবছা কিছু উজ্জ্বল স্মৃতি, কিছু রোমাঞ্চিত মুহূর্ত। নিমেষেই চোখের সামনে বিলীন হয়ে গেছে তিন দশক। মনে হচ্ছে, যেন সেদিন একটি চিঠির অপেক্ষায় ডাকঘরে বসে থাকা, আবার রাত জেগে মনের মাধুরী মিশিয়ে এর জবাব লেখা, পরদিন চিঠি ডাক বাক্সে ফেলা। আবার প্রতীক্ষার প্রহর গোনা; এক সপ্তাহ পরে আবার আসে চিঠি। কতো যে ভালো লাগতো সেই চিঠি পড়তে কিংবা এর জবাব লিখতে। প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে একটা চিঠি যে গ্রামের ঠিকানায় আসতো, আর যে গ্রাম থেকে সপ্তাহে একটা চিঠি তার ঠিকানায় যেতো, সেই স্বপ্নের গ্রামেই এখন অবস্থান করছি; কিন্তু কোথায় সেই অদেখা মিতা- পত্রমিতা?- ভাবতে ভাবতে কখন যে সূর্য ডুবে গোধূলী নেমে এসেছে বুঝতেই পারেননি শাহরিয়ার আহমদ। চেয়ে দেখেন সবাই চলে গেছে। কেবল দাঁড়িয়ে আছেন চাঁপার মা। একটু অবাক হয়েই শাহরিয়ার আহমদ বললেন-
: আপনি গেলেন না?
: আপনাকে একা রেখে যাই কীভাবে?
পরে যদি আপনি বাড়ির পথ ভুলে যান।
: ত্রিশ বছরে যে পথ খুঁজে পেয়েছি, সেটা এতো সহজে কি হারানো যায়?
: পথ হারাবে না ঠিকই, তবে পথের শেষ কোথায় জানেন কি?
: না হয় পথের শেষ খুঁজতে আরও পড়ি দেবো নদী-সাগর।
: হয়তো আর কষ্ট করতে হবে না আপনাকে।
: মানে?
: মানে আর কী? যার জন্য এতো সাধনা, সে তো আপনার কাছেই। আমিই আপনার সেই মিতা- নাসরিন আখতার।- ততোক্ষণে বাড়ির গেইটের ভেতরে ঢুকে যান দু’জন।- শাহরিয়ার আহমদের পা বুঝি চলে না। কেন? খুশিতে না কষ্টে, কিছুই বুঝেন না তিনি।
দুই.
কৈশোরের পত্র

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT