সাহিত্য

যেন সেই এ্যানি ফ্রাঙ্কের আরেক ডাইরি

সেলিম আউয়াল প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০২-২০১৮ ইং ০২:৩৮:২১ | সংবাদটি ১১৯ বার পঠিত

মহান এক অর্জন আমাদের স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতার জন্যে হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। লাখো শহিদের আত্মত্যাগ, মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা অর্জন। মুক্তিযুদ্ধ বার বার সংঘটিত হয় না এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সৌভাগ্যও সবার হয় না। মন্ত্রী-এমপি-চেয়ারম্যান হবার সুযোগ আসে বার বার, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হবার সুযোগ আসে না সব সময়। জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ভাষায়Ñ‘কে আছো জওয়ান হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যৎ’। ভবিষ্যতের ডাকে, দেশের জন্যে, দেশের মানুষের জন্যে আগুয়ান হবার জওয়ান সবাই হতে পারে না। সবার সেই ভাগ্য হয় না। যাদের সুযোগ হয়, নিঃসন্দেহে তারা ভাগ্যবান। তেমনি এক সৌভাগ্যবান হচ্ছেন আতিকুর রহমান চৌধুরী। তার গ্রামের বাড়ি বিশ^নাথ উপজেলার চান্দভরাং গ্রামে। বাবা এখলাছুর রহমান চৌধুরী ছিলেন সরকারি চাকুরে, বাবার চাকরির সুবাদে সিলেট শহরের মিরাবাজারে তার  বসবাস-বেড়ে ওঠা। পড়াশোনায় ভালো হলেও তিনি ছিলেন দুরন্ত স্বভাবের। স‹ুল পালিয়ে ঘুড়ি ওড়ানো, সিনেমা দেখা ছিলো তার প্রিয় বিষয়। পড়াশোনায় তার খামখেয়ালীপনা দেখে বাবা তাকে নামিয়ে দেন রিকসার ব্যবসায়। তার ছিলো দশটি রিকসা, কিন্তু রিকসার ভাড়াটাড়াও ঠিকমতো আদায় করতে পারতেন না। এই নিয়ে বাবা বকাঝকা করলে তিনি আড়াইশ’ টাকায় একটি রিকসা বিক্রি করে বাড়ি ছেড়ে পালান। ঢাকার সদরঘাট থেকে চলে যান খুলনা, তারপর হাজির হন কুমিল্লা শহরে। সেখানে তখন সেনাবাহিনীতে রিক্রটিং চলছিলো, তিনি ঢুকে পড়েন সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। সময়টি ছিলো ১৯৭০ সনের আগস্ট মাস। প্রাথমিক ট্রেনিংয়ে তাদেরকে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। সত্তরের ডিসেম্বরে তাদের ট্রেনিং শেষ হয়। তার কিছুদিন পরই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ২৫ মার্চ রাতে তাদের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কাছাকাছি থাকা বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা তাদের হেডকোয়ার্টারে কামান মর্টার মেশিনগান দিয়ে হামলা চালায়। কিন্তু বাঙ্গালী সৈন্যদের কাছে সেই আক্রমণ প্রতিহত করার মতো অস্ত্র ছিলো না। অনেকের কাছে বন্দুক ছিলো, কিন্তু গুলি ছিলো না। সুসজ্জিত বালুচ বাহিনীর আক্রমণের মুখে সামান্য অস্ত্রশস্ত্র থাকা অসংগঠিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা তাদের ব্যারাকের টয়লেট দিয়ে পালিয়েছিলেন। ভাগ্য ছিলো ভালো, তখন প্রচন্ড কুয়াশার জন্যে এক হাত দূরের কিছুও ভালো করে দেখা যাচ্ছিলো না, তাই তারা পেরেছিলেন পালাতে। সেই রাতটিতে আতিকুর রহমানের ছিলো বদলী ডিউটি, এজন্যে তিনি ইউনিফর্ম পরে শুয়েছিলেন। বালুচ রেজিমেন্টের আক্রমণ শুরু হলে তিনি সেই অবস্থায় বেরিয়ে পড়েন। তারপর দীর্ঘ নয় মাস বনে বাদাড়ে জীবন হাতে ছুটে বেড়ান। বার বার মরতে মরতে বেঁচে গেছেন। আর এইসব বিষয় নিয়ে আতিকুর রহমান লিখেছেন ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধ এক সৈনিকের স্মৃতিকথা’।
আতিকুর রহমান ছিলেন একজন সাধারণ সৈনিক। তিনি খুব সহজ সরলভাবে লিখেছেন তার যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার টুকটাক যা পড়ার সুযোগ হয়েছে, আমার কাছে মনে হয়েছে তার বইটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী বই। কারণ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বর্ণনায় তিনি কোন কৌশল গ্রহণ করেননি। তার বইটিতে বানানে প্রচুর ভুল, সাধু-চলিতের মিশ্রণ, নেই কোন দার্শনিক-তাত্ত্বিক আলোচনা, কোন ধরনের সম্পাদনা নেই এবং এইসব কারণে বইটি আলাদা একটি চরিত্র গ্রহণ করেছে। কারণ তিনি যদি কাউকে দিয়ে সম্পাদনা করাতেন তাহলে হয়তো বানান ভুল কম হতো, সাধু চলিত মিশ্রণ থাকতো না, কিন্তু দেখা যেতো সেই সম্পাদক নিজের চিন্তা ভাবনা ঢুকিয়ে দিতে চাইছেন বইটিতে, বইটির মৌলিকত্ব নষ্ট হতো এবং আরো দশটি বইয়ের মতো একটি গতানুগতিক বইয়ের রূপ লাভ করতো।
যুদ্ধ নিয়ে অনেকের লেখা পড়লে যুদ্ধকে একটি শিল্প মনে হয়, কিন্তু আতিকুর রহমানের বইটি পড়লে অনুভব করা যায় কতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিলো ক্যান্টনমেন্ট থেকে তাদের পালিয়ে যাওয়া। যারা কমান্ডারের নির্দেশে চলাফেরা করতে অভ্যস্ত, তারা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়েছেন, কিন্তু তাদের সাথে কোন কমান্ডার নেই। কোন ম্যাপ নেই। চেনা নেই পথঘাট। তারা যাচ্ছেন কোথায় জানেন না। যাকে নিয়েছেন গাইড হিসেবে, সে কী সত্যিকারভাবে তাদেরকে সাহায্য করবে, না তুলে দেবে শত্রুদের হাতে, জানা নেই। তারা যে সামনে এগুচ্ছেন, সামনেই কি দাঁড়িয়ে আছে শত্রু সেনারা। তারা কি ঘুরতে ঘুরতে খুব সহজেই শত্রুদের হাতে ধরা পড়তে যাচ্ছেন। বইটি না পড়লে বুঝা যাবে না, তাদের সেই ভয়াবহ অবস্থা। কোথায় খাবেন, কি খাবেন, কোন পরিকল্পনা নেই, এমন কি খাবেন যে সেই টাকাটাও নেই। একদিন দু’দিন চলে গেছে, খাবারের দেখা নেই। আতিকুর রহমান ভয়াবহ এইসব কথা লিখে, মুক্তিযুদ্ধের একটি অকৃত্রিম ছবি এঁকেছেন। এখানে তার বইটি মুক্তিযুদ্ধের আরো দশটি বইয়ের চেয়ে আলাদা। বলা যায় এ যেন দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সেই এ্যানি ফ্রাঙ্কের লেখা একটি ডাইরি।
আতিকুর রহমানের সৈনিক জীবন খুব কম দিনের হলেও তার মধ্যে একটি পেশাদারী মনোভাব ফুটে উঠেছে। তিনি পাহাড়তলীতে জার্মানির তৈরী একটি জি-থ্রি অটোমেটিক রাইফেল তুলে নিয়েছিলেন হাতে, সেই ষোল ডিসেম্বর পর্যন্ত আর কোন অস্ত্র বদলাননি। অনেক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেও তিনি একজন নিষ্ঠাবান সৈনিকের মতো অস্ত্র ছাড়েননি।
আতিকুর রহমান কোন পেশাদার বা নিয়মিত লেখক নন। কিন্তু তার বইটি কেউ পড়তে শুরু করলে এক টানেই শেষ করতে পারবেন। কারণ প্রতিটি অধ্যায় পাঠে থ্রিল অনুভব করা যায়। দেখা যাচ্ছে মুক্তিযোদ্ধার দলটি একটি পাহাড়ি খাল ধরে হেঁেট যাচ্ছে, এই যাত্রাটি বড়োই অনিশ্চিত, কারণ তারা জানেন না, তারা সঠিক পথে যাচ্ছেন না সরাসরি পাক আর্মির ক্যাম্পে চলে যাচ্ছেন। একটি খুবই প্রচলিত বাক্যÑ‘মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে’। কিন্তু আতিকুর রহমানের বইটি পড়লে খুবই থ্রিল অনুভব করা যায়। আতিকুর রহমানের সরল বর্ণনায় ফুটে উঠেছে একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রতিটি পদক্ষেপের অর্থই ছিলোÑহয় মৃত্যু গুহায় পা রাখছেন অথবা বিজয়ের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন।
লেখক রামগড়ে গিয়ে আমাশয়ে আক্রান্ত হয়েছেন, পেটে প্রচন্ড ব্যথা, বার বার টয়লেটে যাচ্ছেনÑএই পর্যায়ে একজন পাঠক নি:সন্দেহে উদ্বিগ্ন হবেন, এই লোকটির কি হবে। লেখক স্থানীয় বাজারে ঔষধ কিনতে গিয়েছেন, পাঠক উদ্বিগ্ন, তিনি কি ঔষধ পাবেন। ফার্মেসিতে গিয়ে দেখলেন সেখানে মাত্র ছয়টি ক্যাপসুল আছে, পাঠক স্বস্তির নিঃশ^াস ফেললেন। এইভাবেই পুরো বইটি এগিয়ে চলেছে।
দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ নিয়ে অনেক গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে। প্রায়ই দেখা যায়, একটি নিয়মিত বাহিনী অন্য একটি নিয়মিত বাহিনীকে মোকাবেলা করছে। আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে দেখা যায়Ñনামমাত্র ট্রেনিং নেয়া একজন সাধারণ যোদ্ধা সাধারণ একটি রকেট লাঞ্চার নিয়ে একটি সুসজ্জিত বাহিনীর ট্যাংক আটকে দেবার অদম্য মনোবল নিয়ে জঙ্গলে বসে আছেন।
আতিকুর রহমানের বইয়ের বৈশিষ্ট হচ্ছেÑমৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা একজন মুক্তিযোদ্ধার সম্পাদনাবিহীন সরল বর্ণনা। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা যদি এইভাবে আরো লেখতেন, তাহলে আমাদের হাতে চলে আসতো মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকারের ইতিহাস। বইটি পড়লে ভালো লাগবে। পরবর্তীতে কোন সংস্করণ বের হলে অনুরোধ থাকবে বইটির বানান ছাড়া আর কিছু যেন সম্পাদনা না করা হয়, কারণ বইটি একটি অসাধারণ বই। বইটির ভূমিকা লিখেছেন লেখকের অগ্রজ চাচাতো ভাই বীরমুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট মুজিবুর রহমান চৌধুরী।  
স্বাধীনতা সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধ এক সৈনিকের স্মৃতিকথা, লেখক- সৈনিক মুক্তিযোদ্ধা আতিকুর রহমান চৌধুরী, প্রকাশকাল : ডিসেম্বর ২০১৭, সিলেট

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT