সাহিত্য

গি / র / গি / টি

আবদুল হাই মিনার প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০২-২০১৮ ইং ০২:৩৯:৩৪ | সংবাদটি ৯৭ বার পঠিত

পরের হপ্তায় পেটের ক্ষুধা মরে গেলে, মাথার ওপরের হীরার গোলকটি যখন দিক-বিদিক অবলুপ্ত করে শুধুই তার ক্ষীণ অবয়বটিকে প্রগাঢ় করে তুলেছে, সেইক্ষণে চারদিকে তাকাতে তাকাতে সে চা-বাগানের উপান্তে এসে দাঁড়ায়। আগষ্টের হাজামজা দুপুরে গাছের কালচে সবুজ পাতাগুলোও যেন শত্রু। ঝিম্-ধরা বনের নাগালের বাইরে দূরের মাটি-ক্ষয়া টিলাটাকে দেখে রাগ বেতালা হলে দাঁত কটমট করে হিঁসিয়ে ওঠে সে। লবন-জাগা কপালের ভাঁজে কেমন চিড়বিড়ে ব্যথা সঞ্চারিত হয়। তখন খেয়ালে আসে মাটির হাড়িতে আতপ চালের ঘ্রাণ!
বাগান-সংকীর্তনের দল এখানে একটি লাল তেকোণা সুদর্শণ উড়িয়ে দিয়েছে বিগত সন্ধ্যায়। নূতন মাটির হাড়িতে আতপ চাল জবা ফুল তিনটুকরো বাকল ছাড়ানো আখ আর তিনটে বাতাসা, ছোট্ট ভাড়ে উপে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচা হাড়িয়ার খানিকটা তখনো এক উদাস গন্ধ ছড়াচ্ছে।  আসলে পচা ভাতের গন্ধ বাতাসে পূব দিকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সে শুধুই  হাড়িয়ার গন্ধ পাচ্ছিলো। কিন্তু মগজে তখন অন্য ছবি। সেখানটায় সাদা দানার রেশনের চালের গোটা গোটা ভাতগুলো লাফিয়ে তাকে ব্যঙ্গ করছিলো। যেন নাচছিলো ঝুমুর, বা ফাঁগুয়ার লাঠিখেলা।   
‘লাচ ভায়া, লাচ। বহুদিন এমন লাচ দেখ্যি নাই।’ শিকারী কুকুরের মত শ্রবণকে সতর্কাবস্থায় নিয়ে এসে পরিপার্শ্ব জরিপ করতে সামনের দিকে দৃষ্টি হানে সে। কেউ নেই। না একটা মানুষ, না পাখপাখালি। পোঁকামাকড়েরও বংগিশ নেই। তার অববোধ জানান দেয় তবু, আছে হে। হাঁ, সত্য। সে ঘাড় হেলিয়ে এদিক ওদিক তাকায়।  সকালের দিকে হাওয়া ছিলো অথির। তখন গাছের পাতায় কত রকমের নাচ। মেডেলার চিকন ধড়গুলোসুদ্ধ পুরো গাছ দুলছিলো। টিলা আর ঝক্ঝকে পানির ঝরণাগুলোও। কি জানি! পাখির গানে কান পাতা দায়। আর এখন এই মাঙা দুপুরে সবকিছু এমন ঝিম্ ধরে আছে। গেল হপ্তায়ও সে এখানে এসেছিলো। তখন পেয়ারা চানাফল পিয়াল আর কচুশাক খেয়ে দিনরাত পার করার আটদিন পুরা হয়েছে। আগের দিন বৃহস্পতিÑ হাজরিবার ছিলো। দুইকুড়ি পনেরো বছরের ভিতর প্রথম সেদিন তলবের টাকার জন্য তাকে ডাকা হয়নি। উদাস মন নিয়ে দরমাশালায় গিয়ে বসেছিলো একটি কোণে। যদি ডাক দেয়! রাত আটটায় বাঙলাগোড়ায় আর ফ্যাক্টরির লোহার ঘন্টায় যখন ডান্ডার ঘা পড়ল, তখনও সে বসেছিলো ঠায়। জানতো সবশেষে মর্দানা-দফার তিলকহরি আর কালকুদরার তলব। এরপর যদি ভুলেভালে হাজরিবাবু তাকে ডেকে ফেলেন! ক্ষীণ আশায় নয়টার ঘন্টাও পার করে দিয়েছিল। কিন্তু হাজরিবাবু ভুল করার মানুষ লয়কো। তার জিভ শুকিয়ে তখন লাল আটার রুটি। সেখানে একটুকুও লালা জমা নেই। কথা বলতে আড়ষ্ট হয়ে আসছিলো জিভ। মনে বড় কষ্ট পেয়েছিলো। মাত্রই তো চৌদ্দটা টাকা! চৌদ্দটাকা ছত্রিশপয়সা। কী ক্ষতি হতো হে? ওই তলববারে হাতের শেষ এক টাকা হাপিস্ হলো রবিবাবুর মদের পাট্টায়। এরপর থেকে সে রাজাধিরাজ। টাকাপয়সা ছাড়া খালিহাতের এক বনুয়া কুকুরের রাজা। রাগ গোস্সা অভিমান তার নেই। কে? সে-ই। একা, একক। মাত্র দশদিনের মাথায় সর্দার থেকে পথের মানুষ। বাহা! তবে সে এখনো অভিয়াই হে।  
আবার আকাশের দিকে তাকায় আর হীরার ঝিলিক তাকে মোহগ্রস্ত করে। এতো হীরা ঝিলমিল করে! সে ওদিকে দিকে হাত বাড়ায় তবে খালি মুঠি মুহূর্তেই লজ্জিত ভঙ্গিতে কোমরের নিচে যখন ফিরে আসে আপন মনেই  বিড়বিড় করে দুর্বোধ্য সব গালি ঝাড়ে। এবার আর সময় নেয় না, উবু হয়ে প্রায় শুয়ে পড়ার কাছাকাছি ভঙ্গিতে চার হাতপায়ে এগিয়ে যায় মাটির হাড়ির দিকে। হাড়িটা হাতে নিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে নিঃশব্দে হাত চালিয়ে দেয় ভেতরে। একমুঠি প্যাচপেচে পচা ভাত হাতে উঠে আসে। আরো আসে হাত ভরতি কালো পিঁপড়ার স্রোত। সুড়–সুড়ি জাগে, জ্বলুনিও। তবে সে অবাক হয় উঠে-আসা ভাতের পরিমান দেখে। চোখ পিট্পিট্ করে হতাশ ভঙ্গিতে হাতের তেলোর ওপর  ভেজা আর অন্যায্য গন্ধযুক্ত ভাতটুকু দেখতে থাকে। তার হলুদ থ্রাশঅলা বিশুষ্ক জিভে ভাতটুকু ঠেকায় সে। তারপরই সেটি অমৃত। একটুকু পর চেটোর ভাত শেষ হলে বিক্ষুব্ধ পিঁপড়াগুলোর দিকে আবার নজর যায়। জিভের অগ্রভাগ আরো সরু হয়ে এবার হাতের উল্টোবাগে এগিয়ে যায়। একটা একটা করে সব কালো পিঁপড়া জিভ দিয়ে মুখের ভেতর টেনে নিয়ে উল্লাসভরে শিরা-আকির্ণ হাতের দিকে তাকায়। সেখানে দুয়েকটা মরা পিঁপড়ার সাথে ভাতের ঘোলা জলুই বাতাসে উবে যাওয়ার অপেক্ষায় মনমরা হয়ে আছে। এটুকুও রেহাই দেয় না। আধভেজা জিভে চটচটে জলুইটুকুও চেটে শেষ করে। এবার দ্বিতীয় হাড়ির দিকে হাত বাড়ায়। সেখানে পিঁপড়ায় খাওয়া বাতাসা আর আখের টুকরোগুলো মায়া মমতায় চিবোয়।  চরাচরে এক্ষণে শুধুই সে, একা। হঠাৎ খেয়াল করে কেউ শনির দৃষ্টিতে তাকে দেখছে। কে হে তুমি? একটা পিচাশপাতা বাতাস নেই কিছু নেই বেমক্কা দুলছে, আর সেই পিচাশের অন্যসব পাতা দ্যাখো কেমন নিথর। ই’ তো বড়ই তাজ্জব! সে মাথা কাত করে নিবিষ্টমনে পাতাটাকে দেখতে থাকে। রোদের তাপে চামড়া পোড়ে। তখন চোখে পড়ে লিক্লিকে বিঘতখানেকের চেয়ে বেশি লম্বা সরীসৃপ। পীতের সাথে রক্তের গাঢ় রং মিশে চেহারাটা মিষ্টি। ক্ষণে ক্ষণে বদলাচ্ছে রং। গোল চোখে ঈর্ষা না হিংসা। ঠিক বোধে আসে না। ভায়া, রাগ লেগেছে? যদিও রগড়ের সময় এটি নয় তবু সন্দেহের চোখে প্রাণীটিকে দেখতে দেখতে গলার ভেতর থেকে শব্দক’টা বেরিয়ে আসে। সে নিজেও ঈর্ষান্বিত। এই জঙ্গলে তার অধিকার যত তার থেকে একশো’ গুণ বেশি ধড়-থেকে-হঠাৎ-বেরিয়ে-যাওয়া লম্বা লেঙ্গুড়ের এই চিকনা প্রাণীর। এটা বিলক্ষণ জানে। জানে বলেই ঈর্ষায় তার কালো শরীরে বড় জ্বলুনি হে। জ্বালা বুকের ভিতরেও। তুমি শালো বনের সব কিছু খাওয়ার পা-া, আর হামি মানুষ। তার লেকিন ধরে-বেন্ধে যেটুক খাওয়া যায় নির্যস তাই খাবো! পিঁপড়া খায়ে লিলম বোলে তুমার রাগ। এই জঙ্গলার পিঁপড়া ফড়িং পরজাপতি সাপ গহি খরা চ্যালা জোক ক্যাড়া শামুক ঘুগরা গুবরা তুমরা আপনকার মাঝে ভাগ করি খাও হে, হামি মানুষ বোলে পারবো নাই কেনে? দেখ্অ, স-অব খায়ে লিব! ঝাড়ি লিবার তুমি কে? তারপর একটু তোষামুদে ভাব গলায় ঢেলে তেলতেলে হাসি ঠোঁটে ধরে চোখ নাচায়, তুই ভায়া ভরপেট খাওয়া তাজা জানোয়ার, হামি ভুখামাঙা লোক। ডাঁট নাই দেখাবি। মানলাম, তোর তলুয়া হামি। হামার বড়কা লাগিস তুই। না হে। ভাই। ইক্ষণে হামরা দুই ভাই। বুঝলি?
ভরদুপুরে এক পেট মদ খেয়ে এসেছিস বুঝি, মুখে কথার ফুলঝুরি ফোটাচ্ছিস বড়!   প্রাণীটা চোখ ঘোরায়। সবজেটে হলুদ চোখ। একটু আগে গায়ের রং ছিলো লালচে সবুজ। এখন শুধুই সবুজ। যেন বলল এই কথাগুলো, এ’ভাবে আবারও চোখ ঘুরিয়ে দুবলা-পাতলা লোকটাকে সমঝে নেয়। স্থির অচঞ্চল  ধড়ের ভেতর শুধু সমুখভাগে ঢেউ-খেলানো মাথার দুইপাশে গোল চোখ নড়ছে। শঠ খল নাকি বেআক্কেল, এই অনুভবের আভাস পেতে চাইছে নিরবে।
চক্ষের পাতি ফেল্ ভায়া, জবর মায়া লাগছে তুকে দেখ্যে। কাজকাম নাই বুড়াকে ভাই বলি ডাকি লিলেক তো তুর লেজ খস্যি নাই পড়বেক। পেটের ভেতর এ’ সময় নাড়িভুড়ি হঠাৎ মোচড় খায়, কিছু একটা ওপর দিকে উঠে আসছে। চিড়চিড়ে ব্যথায় মুখ বিকৃত করে হতাশভাবে সরীসৃপটার দিকে তাকায়। গলার নালি দিয়ে পচা ভাতটুকুর সাথে সবজেটে হলুদ পানি বেরিয়ে আসে। সংগ্রাম করে বমিটাকে থামানোর চেষ্টার পরও বিফল হয়। বাঁ হাত দিয়ে পেট চেপে ধরে উঠে দাঁড়ায় সে। ফুটবল খেলার রেফারির মতো ডান হাত ঘাড়ের ওপর দিয়ে মাথা ছাড়িয়ে সমুখের দিগন্ত আর আকাশের মাঝামঝি কোণ বরাবর বিস্তৃত করে প্রাণীটিকে জানান দেয়, আজ আর পারছে না। ঘরক্যে চলি যাই হে, পেটে বড় দরদ লাগছে। তুমার সাথে আর একোইদিন বাতচিত হব্যেক। ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া ভঙ্গিতে ধীর লয়ে হেঁটে জঙ্গল ছাড়িয়ে দানাঙ্গামের রূপালি বালির বড় মমতাভরা পথ ধরে নিজ নিঃসঙ্গ ঘরের পানে জখমি জন্তুর মতো চলতে থাকে। এতোক্ষণে চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া নোনা পানি তার ধূলাবালিতে ভরতি খরখরে কালচে গাল ভাসিয়ে থুতনি, তারপর গলা বুক পার হয়ে উদোম গায়ের নাভির কাছ পর্যন্ত এসে অস্পষ্টো হয়। হাঁটতে বড় কষ্ট হচ্ছে।  কি জানি ঘরকে ফিরা হব্যেক কিনা!
তবে সে ফেরে। এবং পরের হপ্তায় লাঠিতে ভর দিয়ে আবার সেই উপান্তে, সেই কোণায়, বনের ধারটাতে এসে হাজির হয়। এবারের আসাটা নিতান্তই পূণর্মিলনী। কোনো স্বার্থ নেই, দেয়া-নেয়া নেই, শুধুই মনের তাকিদ। দুনো ভাই একটুকু দুখ-সুখের কথা বোলবেক। বুকে হাঁটা চিকন লেজের, ক্ষণে ক্ষণে রং বদলানো সরীসৃপকে ভাই বলে ডেকেছে, সেই ভাই-এর সাথে টুকুন বাতচিত দিনের কর্ম বলে মানে। তবে দিনের কর্ম হপ্তা পেরিয়ে যায়। দোষ লিবি না ভায়া, বিমারী মানুষ, দেখি আসতে দিরং হয়্যে গেল। বলে সে। এ’ হপ্তায় হাতে লাঠি ধরেছে, হাঁটার ধরণ আরো করুণ। ছেঁড়াখুঁড়া কালচে হাফপ্যান্ট আরো জ্বরাজীর্ণ, আরো মলিন। চোখমুখের অসহায় ভাবে এক্ষণে একধরণের ক্ষ্যাপামি চুপি দিচ্ছে। যেন সমুদ্রে ফেনিয়ে-ওঠা নি¤œচাপ নিচের সংকেত থেকে উর্ধ্বগামী হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ের সুপ্ত রুদ্ররোষ! তার চোয়ালের হাড়, হাটু আর পাঁজরের ফালি ফালি বাঁকা হাড়গুলো আরো স্পষ্টো হয়েছে। পায়ের গিঁটের ফোলায় পানি টস্টস্ করছে। মাথার ভেতরটাও কেমন ফাঁকা। পেটটা ছোট্ট এক পোটলার মতো ফোলে ওঠছে। মনে হয় কিসে যেন সেখানটা ঠেঁসে ধরেছে। ভাল লাগে না, কিছুই ভাল লাগে না হে। চা-বাগানের ডাক্তার আর জিলার বড় ডাক্তার বলেছে মদ খাওয়ার ফল। লিভার পচে গেছে। মরে যাবে সে। ডাক্তার দেখানোর তাও ছ’মাস হয়ে গেল। এখন আর কেউ পোছে না। গেল হপ্তার সারাদিন  পূবের কুত্তামারার জঙ্গলে ঘুরে কাটিয়েছ্।ে সেখানে চানাফল পিয়াল আর যষ্টিমধুর বাকল খেয়ে দিন রাত পার করেছে। হঠাৎ আজ ভাইএর কথা মনে পড়ায় ইদিকে একটু আসতে মন চাইলো।
হামার ভাই কুথা? কেমন আছ্যিস হে তুই?  
বনের মাথার ওপর আজও বাতাস নেই। রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। এখন উত্তপ্ত সূর্য তার সবটুকু দয়া ঢেলে আকাশ বাতাস আর মাটিটাকে তাতিয়ে ঘামিয়ে আধমরা করে রেখে দিয়েছে। ধীর পায়ে নিঃশব্দে মাথা বে’র করে তার ভাই।
তুমি কেমন আছো হে বুড়ো? যেন টলটলে চোখের মিরমিরে চাউনি সে কথাই বলল।
ভাল। খুউব ভাল।
উঁহু। অবস্থা তো মোটেই ভাল ঠেকছে না। সকালে খাওয়া-দাওয়া করেছো? ডাক্তারের কাছে একবার যাওয়া উচিত ছিলো।
যাবো। হাতে টাকাকড়ি নাইকে রে ভাই। রতিরাম একখান টেকা হাওলাত লিয়েছ্যিলো এক বছর আগে, ইখনো শোধের নাম নাই। মানুষকে বিশ্বাস নাই হে। টাকাটো হাতে পায়ে লই, যাবো।
টাকা পেলে কি করবে? সত্যি ডাক্তার দেখাবে?
চাওল-ডাইল কিনব। তেজপাতা আর আলু লিবো। দুটা পুটিমাছ। ডাক্দরবাবু তো বাগানেই আছে।
সত্যি তো? নাকি মদের পাট্টায় টাকাটা শেষ হবে?
প্রাণীটা সড়সড় করে কয়েক পা এগিয়ে আসে। একদম তার হাতের কাছে। হাত বাড়িয়ে দেয় সে। মরা নখের আঙ্গুল শুঁকে বুকে-হাঁটা প্রাণীটা। তারপর নিঃসঙ্কোচে হাতের তেলো বেয়ে শিরাআকীর্ণ হাত, হাতের কনুই-এর কাছে মাথা নিয়ে এসে নিঃশব্দে উঁচু হয়ে দাঁড়ায়। তুমি কেমন আছো, ভাই? যেন আবার বলে।
বললাম তো ভাল আছ্যি। তুই কেমন আছ্যিস, অ্যাঁ?  
খুব ধীরে ধীরে লেজ নাড়ে ওটা। মাথা বাঁকা করে স্থির চোখে তাকায়। তারপর হাত বেয়ে তার কাঁধ পর্যন্ত চলে আসে। নির্ভয়ে সেখানে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর পুরো শরীরটাকে ঘুরিয়ে আবার হাতের তেলোয় গিয়ে একটুখানি কু-লি পাকিয়ে সেখানেই স্থিতি নেয়। বুড়ো কাঁপা কাঁপা হাতে মাটিতে নামিয়ে দেয় প্রাণীটাকে। মাথা দুলিয়ে ঘোলা চক্ষে একটুখানি ঝিলিক হানার চেষ্টা করে বিড়বিড় করে, দেখছি তো ভালোই আছ্যিস। তুর ক্ষুধা লাগে নাই, ভরপেট খায়েছ্যিস ভায়া।
হা। তুমি খাওনি?
হামার তো বিমার ওই একখানোই, খাওয়া-বিমার। কেউ খাইতে দেয় না। পেটও চায় না হে। খালি মুখের ক্ষুধাখান।
কেনো, পেট চায় না কেনো?
বমি আসি যায়। যা খাও তুমি, সব বাইরি‌্যয়ে আসবে। হিংসা আছে, বুঝলি হিংসা! পেটেরও হিংসা আছ্যে হে।
তোমার পেট তোমার সাথে হিংসা করবে কেনো?
কি জানি।
অসুখে পড়েছো, ভাই, বড় অসুখ। এখনি ডাক্তারের কাছে যাও।
যাচ্ছ্যি। তবে কেউ কিছু করতে লারবেক। মরে যাবো।
সে ফিরে আসে জন-বসতিতে।
এখন আর কারো কাছে হাত পাততে ইচ্ছা হয়না। কিংবা হাত পাতলেও কেউ কিছু দেয় না। অথচ নিজেরা কেমন ভাত-মাছ খায়, লাল রঙের ডিংলা আর খেসারি খায়, পয়সা ওড়ায়। পেটের রাক্কসটা ঘুমিয়ে আছে বলে রক্ষা। তবু মুখের লাগাম তো তার হাতে নাই। শুষ্ক জিভের মুখখান ভাত দেখলে কেমন বিজবিজা হয়ে ওঠে। খাবারের জন্য হাহাকারে মাথা কুটে মরে। পুরো হপ্তা উপোষ কাটানোর পর আবার বনে বেরোয় সে। ঝোপঝাড়ে তুলসিগাছ দেখে কিছু পাতা তুলে নিয়ে চিবোয়। রেনট্রি-র কাঁচা বিচি খাওয়ার অযোগ্য, তবু মাটিতে পড়ে থাকা দুটো তেঁতুল হাতে উঠিয়ে নেয়। গিলতে পারেনা। হতাশ করুণ মুখে বনের আরো গভীরে ঢুকতে থাকে। যষ্টিমধুর পুরো গাছ কে উপড়ে নিয়ে গেছে। জঙ্গলে পিয়াল আর চানাফলও বাড়ন্ত। অনেকদিন পর টের পায় পেটটাও কিছু খাদ্য চাইছে। তীব্র ক্ষুধায় নেতিয়ে পড়া শরীরটাকে বিশ্রাম দিতে কিছুক্ষণের জন্য একটা মালাকানার ছায়ায় ছড়িয়ে দেয়। হেলান দিয়ে বসে পড়ে গাছের গুড়ায়। চোখে আন্ধার লাগে। মুখের লালা শুকিয়ে আসছে, আর এই নিথর ছায়ার গাছের নীচেও দ্যাখো গায়ে ঘাম দেখা দিয়েছে হে। মরে যাচ্ছে নাকি! বিচিত্র এক অববোধ তাকে উঠে দাঁড়ানোর তাড়া দেয়। একবার এক কুকুরের মরে যাওয়া দেখেছিল সে। বিমারি কুকুরটাকে সেই অন্তিমযাত্রার সময় কেউ কচুপাতা ভরতি করে সাদা চালের গোটা গোটা ভাত দিয়েছিল। অনাগ্রহে সবটুকু ভাত কচুপাতাতেই পড়ে থাকে। কুকুরটা ছুঁয়ে দেখেনি। বড়ই তাজ্জব! তাকে কেউ ভাত দেয়নি। মানেটা কি? ভাতের ছবি চক্ষে ভাসে। অনেক কসরত আর হাচড়পাছোড়ের পর সে উঠে দাঁড়ায়। লাঠি আনেনি। হাঁটাটা মুশকিলের ভেতর পড়ে যায়। এক পা’ এগোনোর পর ধপাস্ করে আবার জংলা মাটিতে শয়ান নেয়। এইবার আর উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা নেই। অনেক্ষণ পড়ে থাকার পর ধীরেসুস্থে উঠে বসে সে। একটুকু হাঁপিয়ে নেয়। হাঁপানোয় আরাম লাগছে। মনটা আনমনে কোথায় যে উড়ে যায়। বড় অন্যমনস্কভাবে এবার বুকে-হাঁটা সরীসৃপটার কথা মনে উদয় হয়। ভাই বোলে ডাক্যেছি হে। কুথা আমার ভাই? জংলী কুকুরের মতো চার হাত-পায়ে ভর করে একটা নির্দিষ্ট দিকে দ্রুত ছুটার চেষ্টায় গলদঘর্ম হয়। তবে যতো জলদি যেতে পারবে ভেবেছিল তা হয় না। তবু শেষ পর্যন্ত পৌঁছোতে পারে। হপ্তা শেষে এখানটার মাটি এখন গুড়ের রঙের। অথচ পথটা দ্যাখো, কেমন রূপালি সাদা! গাছের তীব্র সবুজ পাতায় খর রৌদ্রের তেজ আর আগের রাতের বৃষ্টির মমতায় এখন বিশাল রন্ধনের আয়োজন। আজ গাছের ভোজ। আসলে এখন রোজদিনই এ’রকম ভোজের খেলা চলছে। চা-গাছের গোড়ায় মাটি ডেলা করে তুলেছে গুবরেপোঁকা। আর ডগায় দেখো মেকেনিয়ার লতা কেমন আগ্রাসী হয়ে ওঠেছে। টিলাবাবু আর সর্দারগুলো ইদিকটা দেখ্যেই না! কি কা-। রেডস্পাইডারও  জমেছে পাতাগিলানে। চারদিক তাকিয়ে হতাশ হয় সে। বিড়বিড় করে মনের ভেতর জমানো অনেক কথাই বলে। কেউ শোনে না। ভাঙা গলায় আস্তে আর ফ্যাসফেসে স্বরে বলে, হামার ভাই কুথা? বাঁশের আগায় আটকানো সুদর্শন এখন ছিঁড়েখুঁড়ে গেছে। চিকন পিছলি বাঁশের গায়ে ছত্রাক আর কালো কার্বন যত্রতত্র ছড়িয়ে আছে। আবার ফিস্ফিসিয়ে ডাক পাড়ে, কুথা হে হামার ভাই? তখন শুকনো যে কটি ঘাস আর ঝরাপাতা, তাদের দু’দিকে সরিয়ে গুটি গুটি পায়ে এসে হাজির হয় প্রায় মাটির-সাথে-মিশে-যাওয়া প্রাণীটা। আজ তার গায়ের রঙেও অনেক তফাৎ। সে চিনতেই পারে না। বলে, ভাই নাকি হে!  এত্যো মোটা হয়্যে গেছ্যিস, আর মাট্টিপারা রঙ। তুকে হামি চিনতে লারছি ভায়া!
কী যে বলো। আমি আগের মতোই আছি। তুমি কেমন আছো, ভাই? মাথা উচিয়ে মমতায় মাখামাখি চোখে এ’রকমের কথাই যেন বলল।  
ভালো নাইকে রে ভাই। ক্ষুধা, বুঝলি, আজকা পেটের ভিতরও ক্ষুধা লাগ্যেছে। মরণ আস্যেছে মাথার কাছে।
বাজে কথা বলো না, তুমি অনেকদিন বেঁচে থাকবে। বান্দরকুঠিতে অনেক কামরাঙা আর ডুমুর হয়েছে। সেখানে গিয়ে ও’গুলো খাও। খি

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT