স্বাস্থ্য কুশল

শীতকালে হাঁপানি নিয়ন্ত্রণে করণীয়

সৈয়দা রওশন আরা পারভীন প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০২-২০১৮ ইং ০০:২৮:১৯ | সংবাদটি ৯৮ বার পঠিত

দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ এবং তার প্রতি সংবেদনশীলতাই অ্যাজমা বা হাঁপানি। এর উপসর্গ হিসেবে দেখা দেয় হাঁচি, কাশি, বুকে চাপা ভাব, শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণে বাধা, ঘড় ঘড় করে শব্দসহ শ্বাস-প্রশ্বাস ইত্যাদি। বিশ্বে ২০ কোটি মানুষের হাঁপানি বা অ্যাজমা রোগ আছে। এর মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি। বাংলাদেশের ৭০ লাখের বেশি মানুষ হাঁপানিতে আক্রান্ত। তাদের মধ্যে ৬০ শতাংশেরই বয়স ১৫ বছরের নিচে। হাঁপানি হলো অতি সংবেদনশীলতার জন্য শ্বাসনালীর শাখা প্রশাখার সাময়িক সংকোচন। ফলে শ্বাসনালী সংকুচিত হয়ে পড়ে, তখন শ্বাস নিতে ও ছাড়তে কষ্ট হয়। হাঁপানির সঠিক কারণ অজানা। তবে বংশগত ও পরিবেশগত কিছু কারণকে দায়ী করা যায়। নিকটাত্মীয় কারো হাঁপানি বা অ্যালার্জির ইতিহাস থাকলে এই রোগের ঝুঁকি বেশি থাকে।
শ্বাসকষ্ট জনিত কারণে সাধারণত অ্যাজমা বা হাঁপানির সৃষ্টি হয়ে থাকে। হাঁপানি মানুষের দেহের এক অসহনীয় ও যন্ত্রনাদায়ক ব্যাাধি। আর এই শ্বাসকষ্টের উপদ্রব হয় নানা রকম অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী অ্যালার্জনের কারণে। অ্যালার্জোনগুলো হচ্ছে-ধূলাবালি, ফুলের রেনু, মাইটের মল, পরিবেশের ধুলা, পোষা প্রাণীর লোম ইত্যাদি। অ্যালার্জিজনিত হাঁপানির একটি প্রধান কারণ হচ্ছে ধুলা। মানুষের প্রত্যাহিক জীবনে ধূলাবালি এমন এক বিরক্তিকর জিনিষ যা কিনা এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। বাসাবাড়িতে বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা ধূলাবালি, অফিসের খাতাপত্র বা ফাইলে জমে থাকা ধুলা এবং রাস্তাঘাটে প্রতিনিয়ত যে ধুলা উড়ছে তা হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের প্রধান উদ্রেককারী।
ধূলাবালি মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে শ্বাসযন্ত্রে প্রবেশ করে শ্বাসকষ্টের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। অন্য সব অ্যালার্জনের চেয়ে ধুলা খুব সহজে নিঃশ্বাসের সঙ্গে মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে। ফলে খুব দ্রুত সর্দি-কাশি হয় এবং শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি হয়। সব ধরনের বা সব জায়গার ধূলোই যে হাঁপানি বা অ্যাজমার জন্য খুব বেশি ক্ষতিকারক তা কিন্তু নয়। ঘরে বা অফিসে জমে থাকা ধুলাতে থাকে অজৈব পদার্থ যাতে হাঁপানি, অ্যাজমা, সর্দি-কাশি, হাঁচি বা শ্বাসকষ্টের তেমন ক্ষতি হয় না। তবে রাজপথে যানবাহন চলাচল করার সময় যে ধূলাবালি, ধোঁয়া থাকে তা হাঁচি বা শ্বাসকষ্টের উদ্রেককারী অন্যতম পদার্থ।
ঋতু পরিবর্তন বিশেষ করে শীতের সময় বা শীতের শুরুতে হাঁপানি বা অ্যাজমার লক্ষণগুলো বিশেষভাবে চোখে পড়ে। যাদের রোগটি নতুন করে শুরু হয় তাদের এই আক্রমণটি দিনের যে কোন সময় হঠাৎ হতে পারে, তবে সাধারণত ভোরের দিকেই শুরু হয়। প্রথম প্রথম শ্বাসকষ্ট হালকা ধরনের এবং খুব ক্ষণস্থায়ী হতে পারে। এই ধরনের হাঁপানিকে এক্সট্রিনসিক ধরনের বলা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কতগুলো লক্ষণ আগেই দেখা যায়। আবার অনেকের গলা খুসখুস করে, ব্যথা ও জ্বর হয় এবং বেশি হতে থাকে বা ঢোক গিলতে কষ্ট হয়। হাঁপানি যদি পুরনো হতে থাকে এর লক্ষণ-উপসর্গগুলোও কিন্তু কিছু কিছু পরিবর্তিত হতে থাকে। আগে যেমন হাঁচি এবং নাক দিয়ে পানি অবিরাম পড়তে থাকত সেটা কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়। হাঁপানির কষ্টটাও সে অনুপাতে বাড়ে।
যারা সুস্থ সবল মানুষ তাদের জন্য শীত আনন্দের। আর যারা অ্যাজমা বা হাঁপানিতে আক্রান্ত তাদের জন্য এই শীত অনেক সময় নিরানন্দের। পরিবেশ একটু বেশি অস্বাস্থ্যকর হয় এই শীতের মৌসুমে। কোন কোন শহরে আবার সালফার-ডাই অক্সাইড (একটি মারাত্মক দূষণকারী গ্যাস) এই সময়ে বাতাসে বেশি থাকে। এটি ফুসফুসে ঢুকে ভয়ানক প্রদাহের সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে হাঁপানির টান বেশ বেড়ে যায়। সূক্ষ্ম ভাসমান পদার্থের কণা শীতের সময় ভারী আবহাওয়ায় অনেক পরিমাণ থাকে। আর তাই আমাদের এই শহরগুলোতে শীতের সময় হাঁপানি এবং ফুসফুসের ব্যাধি ব্যাপক হারে বেড়ে যায়।
অ্যাজমা বা হাঁপানি এমন এক ধরনের অসুস্থতা যার জন্য কম-বেশি সারা জীবন চিকিৎসা গ্রহণ করা প্রয়োজন হয়। বর্তমান সময়ে অ্যাজমার চিকিৎসার বেশ অগ্রগতি হয়েছে। সুচিকিৎসা গ্রহণ করলে রোগীরা প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। তবে দিনে দিনে আক্রান্ত ব্যক্তির ফুসফুসের প্রভূত ক্ষতি সাধিত হতে থাকে, যা এক সময় হৃৎপিন্ডকে আক্রান্ত করে থাকে। যারা খুব বেশি ধুমপান করেন বা খুব বেশি ধূলাময় পরিবেশে কাজ করেন এমন ব্যক্তিদের প্রায়ই কাশিতে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। কাশি দীর্ঘমেয়াদি হলে আক্রান্ত ব্যক্তির ফুসফুসে প্রদাহ সৃষ্টি হয়, ফলে ধীরে ধীরে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। বায়ু দূষণের মাত্রা খুব বেশি হওয়ায় দিন দিন এ রোগে আক্রান্তের হার আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিছানা ঝাড়ায় ধুলা নাকে গেলে আগে হাঁচির যে দমকটা আসত তা না হয়ে সঙ্গে সঙ্গে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। আমরা সুচিকিৎসার মাধ্যমে হাঁপানি যদি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারি তবে কিন্তু রোগী তার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। কারো কারো হাঁপানির আক্রমণ আবার অন্য রকমের উপসর্গ দিয়ে শুরু হয়। তাদের এগুলো হলো ইনট্রিনসিক ধরনের। তাদের এই শ্বাসকষ্ট বহু সময় ধরে আস্তে আস্তে ক্রমাগতই চলতে থাকে। মাঝে মাঝে কখনো বা একটু বাড়ে আবার মাঝে মাঝে একটু কমে। তাদের হাঁচি-কাশি নাক চুলকানো বা পানি পড়া নাও থাকতে পারে। এদের বুক থেকে সা সা শব্দ খুব বেশি হয়তো শোনা যায় না কিন্তু শ্বাসকষ্টটাই হয়ে দাড়ায় খুব ভয়ঙ্কর।
শীতে জামা কাপড় ধুঁয়ে ব্যবহার করতে হবে। বাক্স থেকে বের করে সরাসরি পরবেন না। লেপ প্রথমে ৪-৫ দিন ক্রমাগত রোদে দিন এবং ঝাঁড়–ন। কম্বল ব্যবহার করা লেপের চেয়ে ভালো। তাই সম্ভব হলে কম্বল কাভার ব্যবহার করুন। যাদের হাঁপানি আছে তারা এই সময় ঠান্ডা পানি এবং পানীয় খাবেন না। অল্প গরম পানি পান করুন। প্রচন্ড শীতে ঘর থেকে বের হলে মাফলার ব্যবহার করা ভালো। তাই শীতের সময়টায় সবাইকে যতœবান হতে হবে। প্রতিকার নয়, প্রতিরোধ সর্বদা উত্তম।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT