স্বাস্থ্য কুশল

নিরামিষের তুলনা নেই

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০২-২০১৮ ইং ০০:৩০:৩৭ | সংবাদটি ২৪ বার পঠিত

নিরামিষ ভোজন হৃদযন্ত্রকে ভাল রাখে, হৃদরোগ না হতে সাহায্য করে। আমিষাশীদের তুলনায় নিরামিষাশীদের মধ্যে হৃদযন্ত্রের বিবিধ ব্যাধির প্রকোপ লক্ষণীয় রূপে কমÑএকের পর এক গবেষণায় তা প্রতিপন্ন হয়েছে। সুষম নিরামিষ খাদ্যগ্রহণের সঙ্গে মাদক পরিহার করলে, মদ্যপান ও ধূমপান না করলে, খৈনি বা জর্দাপান না খেলে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ক্যান্সার প্রতিরোধ করা যায়। গবেষকদের অভিমত, সব ক্যান্সার যদি না-ও হয়, বহু ক্যান্সারের ক্ষেত্রেই কম বেশি মাত্রায় খাদ্য পানীয়ের ভূমিকা আছে।
বিবিধ রোগব্যাধির মধ্যে নীরব ঘাতক একটি রোগের নাম ‘ডায়াবেটিস’Ñ‘মধুমেহ’ বা ‘বহুমূত্র রোগ’ নামেও যা পরিচিত। ইদানীং আমাদের দেশে শহরবাসী এবং অধিক আয়সম্পন্ন গ্রামীণ মানুষদের মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাব ক্রমশ উদ্বেকজনকভাবে বাড়ছে। কারণÑখাদ্যভ্যাসসহ জীবনযাত্রার পরিবর্তন। নিরামিষ আহার ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাব্য বিপদ কমায়, এমনকি ডায়াবেটিস হয়ে থাকলে তার চিকিৎসাতেও সাহায্য করে। বৃদ্ধাদের মধ্যে গবেষণায় দেখা গেছে, নিরামিষাশীদের তুলনায় আমিষাশী মহিলাদের হাড় ক্ষয়ে যাওয়ার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ। যেসকল বয়স্কা মহিলা খাদ্যে উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের তুলনায় প্রাণিজ প্রোটিন বেশি গ্রহণ করেন, তাঁদের কোমরের হাড় ভাঙার সম্ভাব্য বিপদও বেশি।
নিরামিষ আহার কিডনিকে ভাল রাখে, কিডনির অসুখ হওয়ার সম্ভাব্য বিপদ কম থাকে। ‘কিডনি স্টোন’ কিডনির অন্যতম একটি রোগ, যা থেকে কিডনি বিকলও হতে পারে। প্রগ্রাবে বেশি পরিমাণে ক্যালসিয়াম, অক্সালেট, ইউরিক অ্যাসিড প্রভৃতি নিঃসৃত হলে ‘কিডনি স্টোন’ হওয়ার সম্ভাব্য বিপদ বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। মাংসে ‘পিউরিন’ নামক রাসায়নিক যৌগ বেশি থাকে, যা থেকে প্রগ্রাবে ক্যালসিয়াম এবং অক্সালেটের পরিমাণ বাড়ে। গবেষণায় তাই পরিলক্ষিত হয়েছে প্রত্যাশিত ছবিÑআমিষাশীদের তুলনায় নিরামিষ ভোজীদের মধ্যে মাদক দ্রব্য ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষণীয়ভাবে কম। নিরামিষাশী মদ্যপ ব্যক্তি বিরল। স্বাভাবিকভাবেই মদ্যপানজনিত ‘গ্যাসট্রাইটিস’, ‘প্যানক্রিয়াটাইটিস’, সিরোসিস’ ইত্যাদির প্রকোপ থেকে নিরামিষাশীরা বহুলাংশে মুক্ত থাকেনÑএই অনুমান বিশেষ প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। গবেষণায় নিরূপিত হয়েছে, নিরামিষাশীদের মধ্যে ধূমপায়ী কম বলে ফুসফুসের ক্যান্সার জনিত মৃত্যুহারও কম।
দীর্ঘমেয়াদি দুরারোগ্য একাধিক রোগের উপশমে নিরামিষ খাদ্য উপযোগী বিভিন্ন অনুসন্ধানে পরিলক্ষিত হয়েছে, হাঁপানি, রিউম্যাটয়েড আর্থারাইটিস ইত্যাদি রোগে নিরামিষ আহার বিশেষ উপকারী। দেখা গেছে, নিরামিষ আহার শুরু করার পরে রিউম্যাটয়েড আর্থারাইটিস রোগীদের উপসর্গ কমে। অস্থি সন্ধি বা হাড়ের সংযোগস্থলে ফুলে যাওয়া, আড়ষ্টতা এবং যন্ত্রণা কম থাকে। ফলস্বরূপ বেদনাহারী ওষুধের ব্যবহার বা তার মাত্রা কম রাখতে নিরামিষ আহার সাহায্য করে।
নিরামিষ আহারে খাদ্যে বিষক্রিয়া এবং খাদ্যবাহিত বিভিন্ন অসুখ থেকে অনেকখানি রক্ষা পাওয়া যায়। আমিষ খাদ্য, যথা লবণাক্ত বা মিষ্টি পানির মাছ, মুরগি এবং পাঁঠা-ছাগল-ভেড়া-গরু-মহিষ-শুয়োর ইত্যাদির মাংস খাদ্যবাহিত বিবিধ অসুখ ও বিষক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বৈজ্ঞানিক গবেষণার সঙ্গে জীবনের অভিজ্ঞতাও মেলে। মোচার ঘন্ট, সুক্তো বা ফুলকপির ডালনা খেয়ে ‘ফুড পয়জনিং’ হয়েছে  বিশেষ শোনা যায় না। কিন্তু কষা মাংস, মাছের বা বিরিয়ানি খেয়ে ভয়ানক পেটের অসুখের কথা সংবাদপত্রে প্রায়শই দেখা যায়।
নিরামিষ ভোজন অবিসাংবাদিতভাবে প্রকৃতি-পরিবেশের পক্ষে ভাল। প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার ও পরিবেশ দূষণ যদি সত্যিই আমাদের পীড়া দেয়, পৃথিবী নামক এই গ্রহের ভবিষ্যৎ নিয়ে যদি কোন চিন্তা বা আগ্রহ থাকে, তাহলে অবশ্যই আমিষ খাদ্যাভ্যাস পুনর্বিবেচনা করতে হবে। প্রসঙ্গত, খ্যাদ্যাভ্যাসে পাশ্চাত্যের প্রভাব যত বাড়ছে, মাংসাদি আহারও তত বাড়ছে, বাড়ছে মাংসের চাহিদা এবং মাংস উৎপাদন বাড়ানোর জন্য পশুপালনও বাড়ছে। ফলত, আমাদের দেশেই ২০২০ সাল নাগাদ পশুখাদ্য ব্যবহারের পরিমাণ বেশ ক’গুণ বেড়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গবেষকদের অভিমত, বাংলাদেশ এ মুহূর্তে খাদ্য স্বয়ম্ভর হলেও অদূর ভবিষ্যতে খাদ্যভাব সমস্যার সম্মুখীন হতে চলেছে।
উল্লেখ্য প্রতিদিন আমেরিকায় ২ কোটি ২০ লক্ষ প্রাণী হত্যা করা হয় মাংসের যোগান দিতে। ব্রিটেনে হত্যা করা হয় ২৫ লক্ষ। বাংলাদেশে এই সংখ্যা সুনির্দিষ্টরূপে জানা না থাকলেও বছরে বেশ কয়েক লক্ষ টন মাংস উৎপাদন করতে কত লক্ষ প্রাণী হত্যা করতে হয়, তা সহজেই অনুমেয়। নরহত্যায় আমরা কেঁদে ভাসাই বা প্রতিবাদ করি, কিন্তু পশুহত্যায় উদাসীন থাকি-এটা সম্ভব হয় নৈতিক ভিত্তি দুর্বল বলে। ধর্মীয়-নৈতিক কারণে নিরামিষ ভোজনের শ্রেষ্ঠতা বহুকাল স্বীকৃত। প্রথিতযশা বিজ্ঞানী-দার্শনিক-শিল্পীরাও অনেকে আমিষ বর্জন করে নিরামিষভোজী হয়েছেন, নিরামিষ আহারের সপক্ষে কথা বলছেন। আমাদের আহার্যের জন্য কোন প্রাণিহত্যা করা হয়নি এবং মাংস খাওয়ার বাসনায় রসনায় তৃপ্তির জন্য কোন নিহত প্রাণীর দেহাংশ আমাদের খাওয়ার টেবিলে উঠে আসেনি, আমরা আসতে দেইÑএটি জেনে আহারের মধ্যে এমন এক সাত্তিক তৃপ্তি আছে, যা বলা বাহুল্য , আমিষ ভোজনে নেই, থাকা সম্ভবও নয়। এই তৃপ্তি, দুর্লভ আনন্দ কী বস্তু তা আমিষ বর্জন করে নিরামিষাশী হলেও আপনিও জানবেন বোধে-অনুভবে, যেমন অন্যান্য নিরামিষভোজীরা জানেন, জেনেছেন। এর সঙ্গে নিরামিষ আহারের যাবতীয় স্বাস্থ্যগত উপকারিতা উপভোগ করবেন এবং প্রকৃতি-পরিবেশ সংরক্ষণেও আপনার সদর্থক ভূমিকা থাকবে। নিরামিষ আহারে আপনার কল্যাণ, আপনার পরিবারের কল্যাণ, কল্যাণ দেশ ও দশের। প্রাত্যহিক নিরামিষ ভোজন সকলেরই মঙ্গল বয়ে আনে।

শেয়ার করুন
স্বাস্থ্য কুশল এর আরো সংবাদ
  • শরীরের মেদ কমাতে কমলালেবু
  • ঝাল খাবারে ক্যানসারের ঝুঁকি কমে
  • হঠাৎ হাতের কব্জিতে ব্যথা
  • ডায়রিয়া রোগে ভেষজ চিকিৎসা
  • নিরামিষের তুলনা নেই
  • রোগ প্রতিরোধে মটর শুঁটি
  • শীতকালে হাঁপানি নিয়ন্ত্রণে করণীয়
  • শীতের সুস্বাদু ফল
  • অতিরিক্ত লবণ : নানা রোগের উৎস
  • শীতে খান ফুলকপি, বাঁধাকপি
  • শিশুদের শীতকালীন রোগ থেকে বাঁচাতে যা করবেন
  • আর নয় ধূমপান, এই হোক অঙ্গীকার
  • শরীরের যে ছয়টি উপসর্গ অবহেলা নয়
  • শীতকালে প্রতিদিন গায়ে রোদ লাগানোর ১২টি উপকারীতা
  • নিঃসন্তান দম্পতিদের জন্য
  • নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনে ক্যান্সার প্রতিরোধ
  • রোগের লক্ষণ জানাবে চামচ!
  • ওষুধ ছাড়াই প্রশান্তি মিলবে পিরিয়ডের ব্যথায়!
  • চোখে লেন্স ব্যবহারে দৃষ্টিশক্তি হারানোর শংকা
  • জ্বর হলে কী খাবার খাবেন
  • Developed by: Sparkle IT