সম্পাদকীয়

হাওরে দুই ফসল চাষ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০২-২০১৮ ইং ২৩:৩৪:০২ | সংবাদটি ১৬৪ বার পঠিত

হাওর অঞ্চলকে কাজে লাগিয়ে দেশের ফসল উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এতে খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে। বিশেষজ্ঞগণ দীর্ঘদিন ধরে এই ধরণের মন্তব্য করে আসছেন। সেই লক্ষে সরকার নানা পরিকল্পনাও নিয়েছে অতীতে। কিন্তু তার বাস্তবায়ন চোখে পড়ছে না। প্রায় এক দশক আগে গৃহীত সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে ছিলো-হাওর এলাকায় পরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ ও খাল খনন। সেই সঙ্গে এলাকার সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের কথা বলা হয়। একই সঙ্গে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীসহ হাওর এলাকার অন্যান্য নদী অববাহিকায় পরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ ও খাল খননের মাধ্যমে নাব্যতা বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের পরিকল্পনাও নেয়া হয়। কিন্তু তার বাস্তবায়ন চোখে পড়ছে না। বরং হাওর অঞ্চলের ফসলহানিসহ নানা বিপর্যয়ের ঘটনা বেড়ে চলেছে।
হাওর-বাওর-বিল অধ্যুষিত আমাদের এই বাংলাদেশ। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল তথা সিলেটসহ পার্শ্ববর্তী জেলার ২৫ ভাগ এলাকা জুড়েই রয়েছে হাওর। এই এলাকায় বসবাস প্রায় দুই কোটি মানুষের। এই অঞ্চলে হাওরের সংখ্যা ৪শ’ ২৩টি। এর মধ্যে সুনামগঞ্জেই রয়েছে একশ’ ৩৩টি, সিলেটে ৪৩টি, হবিগঞ্জে ৩৮টি, মৌলভীবাজারে ৪টি, কিশোরগঞ্জে একশ’ ২২টি, নেত্রকোণায় ৮০টি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ৭টি। এছাড়া, উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে রয়েছে ছোট-বড় ৩শ’ ৫০টি হাওর। এর বাইরে দেশের সর্বত্র রয়েছে নানা আয়তনের কয়েক লাখ বিল-ডোবা। দেশব্যাপী এই হাওর-বাওর-বিলের আয়তন কমপক্ষে ৫ হাজার বর্গমাইল। এই বিশাল হাওর অঞ্চলে রয়েছে নানা সম্পদ। প্রতি বছর নতুন পলি পড়ে বলে এই অঞ্চলের মাটি দেশের যে কোন অঞ্চলের চেয়ে বেশি উর্বর। বোরো ধানের ৯০ ভাগই চাষ হয় এই অঞ্চলে। যথাযথ প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে চাষ করলে এই অঞ্চলে বছরে ৮০ লাখ টন খাদ্যশস্য উৎপাদন করা সম্ভব।
অথচ বিপুল সম্ভাবনার এই হাওর অঞ্চলকে ব্যবহার করা হচ্ছে না সেভাবে। বছরের বেশির ভাগ সময়ই, বিশেষ করে জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত হাওর অঞ্চলের ৯০ ভাগ জমিই পানিতে তলিয়ে থাকে। এই জমিতে বছরে একটি মাত্র ফসল বোরো উৎপাদন হয়। অন্য কোন ফসল চাষ হয় না। ফলে এই অঞ্চলের মানুষের বছরে কমপক্ষে ছয় মাস কোন কাজই থাকে না। পরিকল্পিতভাবে এইসব হাওরকে বাধের আওতায় আনতে পারলে বিপুল পরিমাণ জমিকে অনায়াসে দু’ফসলী জমিতে পরিণত করা যায়। এছাড়া, মাছের প্রধান আশ্রয়স্থল হচ্ছে হাওর অঞ্চল। হাওরগুলোতে পরিকল্পিতভাবে মাছের চাষ করা যায়। সঠিকভাবে পরিকল্পনা নিতে পারলে হাওর অঞ্চল থেকে প্রতি বছর দেড় হাজার কোটি টন মাছ আহরণ করা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন। অর্থাৎ পরিকল্পনা নিলে হাওরে ধান এবং মাছ দুটিরই উৎপাদন বাড়বে।
এক ফসলী জমিকে দু’ফসলী জমিতে পরিণত করে হাওর অঞ্চলে ধানের উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব। বাড়ানো সম্ভব মাছের উৎপাদনও। এছাড়াও, হাওর অঞ্চলের মিঠা পানিকেও একটা সম্পদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিশেষজ্ঞগণ। মূল্যবান মুক্তার চাষও হতে পারে হাওরের পানিতে। এসব হাওরে ডুবে থাকা ঝিনুকে মুক্তা তৈরি হয় প্রাকৃতিকভাবেই। এছাড়া, হাওর অঞ্চলকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে পর্যটন স্পট। মোটকথা, হাওর অঞ্চল দেশের আয়তনের একটা বিরাট অংশ। যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে এই অঞ্চলের উন্নয়ন করলে গোটা দেশেরই সার্বিক অগ্রগতিতে তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। ইতোপূর্বে হাওরের উন্নয়নে গঠন করা হয়েছিল হাওর উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু এই বোর্ড তেমন কোন কাজ করতে পারেনি। এছাড়া বছর দুই আগে হাওর অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা তথা হাওর অঞ্চলকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য তথ্য ভান্ডার তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়। তারও বাস্তবায়ন নেই।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT