ক্রোড়পত্র

ভাষা : বাংলা ও বিদেশী

আতিকুর রহমান নগরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০২-২০১৮ ইং ২৩:৪৪:৫৭ | সংবাদটি ২০৫ বার পঠিত

‘হায় মাম্মি, হ্যালো ড্যাডি, হাওয়ার ইউ ব্রাদার, আইএম ভেরি হ্যাপি ইত্যাদি ইংরেজিতে কথা বলছে আমাদের ছোট্র সোনামনিরা। শুধু তা-ই নয় ভারতীয় টিভি-চ্যানেলগুলোর সামনে বসে সিরিয়াল-ড্রামা, কার্টুন ইত্যাদি দেখে দেখে ‘আপ কেয়সে হে, মেরি পিয়ারি দোস্ত, মুজছে দুস্তি করো গি, হাম ছব বহুত খুশ হে’ ইত্যাদি হিন্দি ভাষায়ও কথা বলছে। আব্বু-আম্মু বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও তাতে বেজায় খুশি হচ্ছেন। তবে সেই খুশির আড়ালে যে, বায়ান্ন’র বাংলা ভাষার আন্দোলনের সার্থকতা নিষ্পেষিত হচ্ছে তা কি আমরা ভেবে দেখেছি।
সুজলা-সুফলা এই বাংলা মায়ের বুকে জন্মগ্রহণ করে নিজ মাতৃভাষাকে অসতর্কতা, অবহেলা আর চর্চার অভাবে হারাতে বসেছে আপনার-আমার, আমাদের ছোট্র ছোট্র খোকামনিরা। কেন? তার পিছনে কারণ কি? সময়ের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে নিজেকে হারানো, নিজের অস্তিত্বকে অন্যের কাছে বিলীন করে দেয়ার মানেটা কি? তথ্য-প্রযুক্তি, কম্পিউটার আর সায়েন্সের যুগে মানুষ এখন ক্রমান্বয়ে এরোপ্লেন গতিতে ক্রমশঃ অগ্রসর হতে চলেছে। প্রশংসার কথা। অহংকার আর গর্বের বিষয় এটা। তবে নিজের সংস্কৃতিকে সাথে নিয়ে পথচলা হোক বহুদূরে। ইংলিশ মিডিয়ামের স্কুলগুলো বর্তমানে আমাদের দেশের শিক্ষাখাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
এই ইংরেজি ভার্সনের স্কুলগুলো গড়ে উঠায় আমাদের কোমলমতি শিশুরা শিখতে পারছে ইন্টারন্যাশনাল ল্যাংগুয়েজ। তাদের চলনে-বুলন আর কথন হচ্ছে টেকসই। তবে দুর্বলতা হচ্ছে বাংলায় অনিহা। বাংলায় লেখা বা পড়ায় তাদের হাতটা কাঁচা। কাঁচা হবেনা কচি খোকা যে তারা তা-ই। এই দুর্বলতা থেকে তাদের রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন বাংলা ভাষার চর্চা। ভাষা আল্লাাহ পাকের এক স্পেশাল নেয়ামত। বিশ্বের প্রত্যক জাতিরই স্ব-স্ব ভাষা রয়েছে। আমাদের ভাষা হচ্ছে বাংলা। বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা।বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষা বলার কারণ হল, একটি শিশু জন্মের পর যখন মুখ ফুটে কথা বলতে শিখে তখন তার প্রথম কথা হয় ‘মা’, ‘আম্মু’ ইত্যাদি। অথবা মাতৃভাষা বলার আরেকটি কারণ এও হতে পারে যে ভাষা শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হচ্ছেন আমাদের পরম শ্রদ্বাভাজন মা জননী।
বাংলা ভাষা আমাদের জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আমাদের পূর্বপুরুষরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি সাধন এবং মুসলিম শাসকরা এ ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করলেও রাজভাষা হিসেবে তারা ফার্সি ভাষা ব্যবহার করেছিলেন। ১৭৫৭ সালে আমরা ইংরেজদের কাছে স্বাধীনতা হারালাম। হারালাম রাষ্ট্রভাষা ফার্সিকে। ইংরেজরা রাজভাষা তথা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চালু করলো ইরেজি। প্রায় দু’শ বছর ইংরেজরা আমাদের শাসন করেছে। যারা তাদের ভাষা শিখেছিল ঘুরেছিল তাদের ভাগ্যের চাকা। আর যারা শিখেনি তারা অনেক পিছিয়েছিল।
এ কারণে ঐতিহাসিক ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার বলেন, ‘এদেশের মুসলিমরা ছিল শাসকের জাতি। কখনো তারা দরিদ্র হওয়ার আশংকা ছিলনা। কিন্তু বাস্তবতা হলো ইংরেজ শাসনে তারা এখন হত দরিদ্র জাতি। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট ভারত বিভক্ত হলেও মুসলিমদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠিত হয়, এর নাম রাখা হয় পাকিস্তান। আর তা দুই প্রদেশে বিভক্ত একটি দেশ। ভারতের পূর্বাঞ্চলে ছিল পূর্বপাকিস্তান। আর পশ্চিমাঞ্চলে ছিল পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ অর্থ্যাৎ আমরা নৃ-তাত্ত্বিক দিক থেকে বাঙ্গালি। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা আর পশ্চিম পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। অর্থ্যাৎ একই রাষ্ট্রে আমরা দু’টি ভাষার আশাবাদি ছিলাম। এই আশা করাটা আমাদের অন্যায় ছিল না।
যার যার ভাষায় মানুষ কথা বলবে, কাজ করবে, লেখাপড়া করবে, শিখবে, জানবে এটাইতো স্বাধীনতা। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে বরকত, সালাম, রফিক ও জববারসহ বহু মানুষকে জীবন দিতে হয়। এবং পূর্ববাংলার কারাগারগুলো ভাষা সৈনিকে ছিল ভরপুর। পৃথিবীতে মাতৃভাষার জন্য প্রথম জীবন দিয়েছে একমাত্র বাংলার মানুষ। বাংলা আমার মায়ের ভাষা। এ ভাষাকে আরো সমৃদ্ধ করতে হবে। আর খেয়াল রাখতে হবে বিজাতীয়দের ভাষা যেন আমাদের এ মায়ের ভাষাকে ধংস না করে। মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, মাতৃভাষার সম্মান করা, বিজাতীয় ভাষা ছেড়ে দিয়ে নিজ মাতৃভাষার চর্চা করা। পরিশেষে বলি আমাদের সোনামনিদের কোমলকন্ঠে উচ্চারিত হোক বাংলা মায়ের ভাষা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT