পাঁচ মিশালী

শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণে মায়েদের ভূমিকা

রওশন আরা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০২-২০১৮ ইং ২৩:৪৫:৩০ | সংবাদটি ১৯৩ বার পঠিত

মায়ের সাথে শিশুর পরিচয় জন্মের আগে থেকেই। মায়ের কণ্ঠস্বর, শ্বাস-প্রশ্বাস, ধ্বনি, হৃৎস্পন্দন সন্তানের খুবই চেনা। তাই প্রতিটি মানুষের জন্যই তার ‘মা’ যে ভাষায় কথা বলেন, সে ভাষাই তার মাতৃভাষা। মা বাংলা ভাষায় কথা বললে, সে ভাষাই একজন বাঙালির জন্য মাতৃভাষা। মায়ের মুখ থেকে নিঃসৃত ভাষাতেই সন্তানের মুখে ভাষা ফুটে ওঠে। সন্তান জন্মের পর থেকেই মায়ের সাথে ভাব-বিনিময় করে সেই ভাষাতেই, সেই ইঙ্গিতেই। সেই চিরচেনা ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার তাই মা-কেই নিতে হবে। মাতৃভাষার শুদ্ধ উচ্চারণ একান্ত অপরিহার্য।
মা তার খুশী, সুখ, দুঃখ এই ভাষাতেই সন্তানের কাছে প্রকাশ করে। এই ভাষাকেই হৃদয়ঙ্গম করে সন্তান মায়ের সাথে ভাব বিনিময় করে। হাসে, কাঁদে, খেলা করে, ইশারা আর চাহনি দিয়ে মা-কে কাছে ধরে রাখে। সারাক্ষণ মা-কে জড়িয়ে থাকলেও যেন সুখ শান্তি শেষ হয় না। সাবলীল আর আনন্দ এই ভাব প্রকাশ আর কোন ভাষা বা অঙ্গভঙ্গী দিয়ে প্রকাশ করা মানবশিশুর পক্ষে আনন্দঘন হয় না। মায়ের মুখের ভাষাই শিশুর প্রধান অবলম্বন। অন্তর খোলে প্রকাশ করার বাহন মাতৃভাষা।
এই ভাষা পাওয়ার জন্য আমরা রাজপথে রক্ত ঢেলেছি, চিৎকারে-চিৎকারে আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ করেছি, শোসকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছি ১৯৪৭, ১৯৪৮, ১৯৫০, ১৯৫১, ১৯৫২ ইংরেজি সালে শাসকের রক্তচক্ষু, অত্যাচার, নির্যাতন, শোষণ, প্রতিহত করে আদায় করেছি। বাংলাভাষায় আমাদের অফিস আদালতের কাজ, সংস্কৃতির চর্চা প্রতিষ্ঠিত না হলে আমরা পদলেহী কুকুরের মতো হয়ে যেতাম। যথাসময়ে যথাযথভাবে প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়ায় পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ আর লাল সুবজ পতাকা। এখানেই শেষ নয়, বিশ্বের মাঝে ‘বাংলা ভাষাকে’ গৌরবান্বিত স্থানে অধিষ্ঠিত করা এখন হবে আমাদের নিরন্তর প্রচেষ্ঠা। ইতোমধ্যে আদায় করেছি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে পালন করার স্বীকৃতি। পৃথিবীতে কয়টা দেশে ইংরেজি ভাষা ও আঞ্চলিক ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষার চর্চা হয়? কিন্তু অত্যন্ত গৌরবের বিষয় ‘বাংলা ভাষা’ নিয়ে এখন রীতিমতো গবেষণা হচ্ছে। বই পুস্তক লিখা হচ্ছে, চর্চা করা হচ্ছে। সভা সেমিনার হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। এগুলো আমাদের গৌরবের বিষয়। বাঙালি আজ পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছেন। তাদের উপর গুরু দায়িত্ব আমাদের গৌরবের ধন ‘বাংলা ভাষাকে’ সেই অঞ্চলের মানুষের কাছে বেশি বেশি করে তুলে ধরা। সভা, সেমিনার, গান, কবিতা, গল্পের মাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশ করা। সর্বোপরি বাঙালি হিসাবে সৎ, নিষ্ঠাবান, আদর্শ মানুষ হিসাবে মূল্যবান করা।
শিশুর মুখে যেহেতু প্রথম ভাষা ফোটে মায়ের মাধ্যমেই। তাই মায়েদের দায়িত্ব বেশি শিশুকে শুদ্ধভাষা চর্চা করানোর। এজন্য মা-কে খুব বড় বড় বই মুখস্থ বা প্রতিষ্ঠানে যেতে হবে না। বর্তমানে টেলিভিশন, রেডিও শহর, গ্রাম, হাট বাজারে এমনকি ঘরে ঘরে আছে। এসব মিডিয়াতে উচ্চারিত প্রমিত বা শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ একটু মনোযোগ সহকারে মায়েরা ঘরে বসে শুনেও নিজে চর্চা করতে পারেন। শেখার জন্য ইচ্ছাশক্তি-ই যথেষ্ট। মা যদি শুদ্ধ ভাষাটার উচ্চারণ শিখতে পারেন, শিশুর সাথে তা ব্যবহার করেন তবে শিশু অনায়াসে তা রপ্ত করতে পারবে। শিশুদের সাথে স্কুলে, ঘরে শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বললে ক্ষতি নেই কিন্তু লাভ অনেক বেশি। শিশু যখন স্কুলে ভর্তি হবে তার বই এ শুদ্ধ ভাষায় ছড়া, কবিতা, গল্প লিখা আছে। এগুলো শুদ্ধ উচ্চারণে সহজেই পড়তে পারবে, লিখতে পারবে, বুঝতে পারবে এবং মনে রাখতে পারবে।
বানান ভুলের প্রধান কারণ শুদ্ধ ভাষার চর্চা না করা। অশুদ্ধ উচ্চারণের কারণে ভাই কে ‘বাই’ ‘ভাত’কে ‘বাত’ উচ্চারিতও হবে এবং লিখার সময়েও লিখলে বানান ভুলের জন্য অর্থ বোধগম্য হবে না, পড়ে আনন্দ পাওয়া যাবে না। পরীক্ষার খাতায় বানান ভুলের জন্য নাম্বার কাঁটা যায়। ফলাফল বা গ্রেড নীচে নেমে আসবে। বানান ভুলের কারণে উচ্চারণ ভুল হবে, বিষয়বস্তু অর্থবহ হবে না। শিক্ষার্থী অশুদ্ধ উচ্চারণ ব্যবহারের কারণে বানান ভুল হওয়াটা যদি প্রধান কারণ হয়, তবে কেন মায়েরা এই কাজে সহজেই সন্তানকে সাহায্য করবেন না?
বানান ভুলের আরও একটি কারণ, রাস্তাঘাটে, দোকানে, গাড়িতে, রিক্সায় বানান ভুল শিখে ও লেখে। যেমন- দোকানে লিখা আছে, ‘এখানে ভালো ধই পাওয়া যায়, খাইলে মজা না খাইলে যায় না বুজা, ভিবেক থাকতে আদালত কেন, এখানে বাঁশ ও বেথের কাজ শিখুন ইত্যাদি ইত্যাদি বাক্যগুলি আমাদের চোখে পড়ে। এগুলো পড়ার ক্ষেত্রে ভুল উচ্চারণ ও লিখার ক্ষেত্রে বানান ভুল হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত হবে। তাই সাইন বা আর্ট এর দোকান ও লেখক যারা তাঁরা শুদ্ধ বাংলা বানান লিখার একখানা বই হাতের কাছে রাখবেন। আর্ট, পোস্টার, ব্যানার, দোকানের সাইনবোর্ড নির্মাণে অবশ্যই শুদ্ধ বানানের কথা মাথায় রাখবেন। বানান নিশ্চিত হয়ে তবে লেখার কাজ শুরু করবেন।
মায়েরা শিশুর সাথে দৈনন্দিন আলাপ আলোচনায় কথায়-বার্তায় প্রমিত উচ্চারণ চর্চায় সাহায্য করবেন সন্তানকে। আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করলেও লেখার ক্ষেত্রে শুদ্ধ চর্চা করাবেন। শিশুকে কিছু লিখতে দিয়ে অথবা বলতে দিয়ে তাঁর অশুদ্ধ উচ্চারণকে শুদ্ধ বাংলায় শিখিয়ে দিবেন। ঘরে একা মা হয়তো সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করতে না পারলেও বাবাকেও খেয়াল রাখতে হবে। কারণ শিশুর প্রথম শিক্ষালয় বা পাঠশালা হলো পরিবার। আর পরিবাসে বসবাস করেন ভাই-বোন, বাবা-মা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন। সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে শিশুর ভাষা শেখা এবং শুদ্ধ উচ্চারণে তা প্রকাশ করার প্রতি। এটা একা মায়ের পক্ষে পালন করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে অঞ্চলভেদে ভাষার ভিন্নতা আছে। শুদ্ধ চর্চার মাধ্যমে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে সচেতন হওয়া যায়। আঞ্চলিক ভাষা এবং তাঁর উচ্চারণকে মা-বাবা কৌশলে শুদ্ধ ভাষায় শেখাবার চেষ্টা নিবেন। শিশু যখন ধীরে ধীরে বড় হবে, ষ্টেজে কবিতা, গান, ছড়া, গল্প বলতে যাবে তখন তাঁর শুদ্ধ উচ্চারণ মাধুর্যতা দর্শক বা শ্রোতাকে আকৃষ্ট করবে। সংস্কৃতি চর্চা করার জন্য শুদ্ধ বাংলা ভাষার উচ্চারণ অবশ্যই চর্চা করতে হবে। বর্তমান প্রতিযোগিতার যুগে টিকে থাকতে হলে মুখের ভাষা উচ্চারণ বা প্রকাশ ভঙ্গী অর্থাৎ বাচনভঙ্গী সঠিক হওয়া একান্ত দরকার। গৃহ পরিবেশ ছাড়াও অনেক পাড়ায় বা মহল্লায় সংস্কৃতি চর্চার স্কুল খোলা আছে। সেখানে শুদ্ধ উচ্চারণের মাধ্যমে বক্তৃতা, গান, কবিতা আবৃত্তি গল্প বলা ইত্যাদি শেখানো হয়। মায়েরা শিশুর জন্য যে সব প্রতিষ্ঠানেও যেতে পারেন এবং শিশুর লব্দ জ্ঞানকে মর্যাদা দিয়ে নিজেরাও তা ব্যবহার করলে সন্তানের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT