পাঁচ মিশালী

জীবনের সাথে সাহিত্যের সম্পর্ক

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০২-২০১৮ ইং ২৩:৪৬:৫১ | সংবাদটি ১৪৪ বার পঠিত

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজকে অবলম্বন করেই তার জীবন ধ্যান-ধারণা ও আদর্শ গড়ে ওঠে এবং সামাজিক সম্পর্ক ও পটভূমিকে কেন্দ্র করেই মানুষের কল্পনা ও ভাবমন্ডল রূপ লাভ করে। বলা বাহুল্য এই সামাজিক মানুষ সাহিত্য সৃষ্টি করে থাকে। কাজেই সাহিত্য জীবনের প্রতিফলন না হয়ে পারে না। কিন্তু জীবনের হুবহু নকল বা প্রতিচ্ছবি কখনও সাহিত্য নয়। জীবনের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক অতি নিবিড় এবং একটি অপরটির পরিপূরক বটে, কিন্তু তাই বলে দৈনন্দিন জীবনের ফটোগ্রাফি কখনও সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করতে পারে না। তাই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘সাহিত্য ঠিক প্রকৃতির আরশি নহে।’ সামাজিক উপকরণ দিয়ে সাহিত্য রচিত হয় বটে, কিন্তু তার সঙ্গে লেখকের ভাব ও কল্পনার সংযোগ থাকতে হবে। ব্যক্তিজীবন যদি সমাজকে প্রত্যক্ষ না করে তাহলে সেই সাহিত্যিকের সাহিত্য কখনও সার্থক হতে পারে না। সাহিত্যের সত্য ও প্রকৃত সত্য এক নয়। তাই এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের এই উক্তিও স্মরণীয় ‘সাহিত্যের মা যেমন করিয়া কাঁদে, প্রকৃতির মা তেমন করিয়া কাঁদে না। তাই বলিয়া সাহিত্যের মার কান্না মিথ্যা নহে।’
২.
মানুষ সজীব ও চলিষ্ণু-তার জীবন, তার ধ্যান-ধারণা ও আদর্শ চিরকাল একভাবে অটল অচল হয়নি। যুগে যুগে তার পরিবর্তন হয়েছে। সেই পরিবর্তন মানুষের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনকে ডিঙিয়ে সাহিত্য ও শিল্পে প্রতিফলিত হয়েছে। রামায়ণ-মহাভারত বা আরব্য উপন্যাসের যুগে মানুষের জীবন আর শেক্সপিয়ারের যুগে মানুষের জীবন এক নয় এবং শেক্সপিয়ারের যুগের জীবন আর রবীন্দ্রনাথ-নজরুল ইসলামের যুগের জীবনে আকাশ-পাতাল পার্থক্য আছে। প্রত্যেক জীবনের ছবি সে যুগের সাহিত্যের উপকরণ না হয়ে পারে না। কিন্তু মানুষের মধ্যে একটি চিরন্তন ধর্ম আছে যাকে আমরা ব্যাপক অর্থে মনুষ্যত্ব বলি। এই মনুষ্যত্বের ক্ষেত্রে সব মানুষ এক। শিক্ষা-দীক্ষা ও সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মনুষ্যত্বেরও বিকাশ ঘটে এবং যুগ পরিবর্তনের ফলে তার প্রকাশেরও রূপ পরিবর্তন ঘটতে পারে। কিন্তু একই মনুষ্যত্বের অংকুর সব মানুষের মধ্যে নিহিত আছে। যে সাহিত্যে এই চিরন্তন মনুষ্যত্বের রূপ ফুটে ওঠে, সেই সাহিত্যই মহৎ সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করে। সাহিত্যের ইতিহাসে তাকে ক্লাসিক সাহিত্য নামে অভিহিত করা হয়। এই সাহিত্যে জীবনের রূপায়ন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তার সুর ও বাণী অভিন্ন। তাই ইউরোপ-আমেরিকার লোকও রামায়ণ-মহাভারত পড়ে মুগ্ধ হয়, আমরাও ইলিয়ড-ওডেসি পড়ে আনন্দ পেয়ে থাকি। দেশ, কাল, পাত্রের উর্ধ্বে একই মনুষ্যত্বের সুর সব মানুষের মনে বাধা বলে এটা সম্ভবপর হয়।
৩.
সাহিত্যকে মোটামুটি দু’ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। ১। বাস্তববাদী ২। আদর্শবাদী। এই আদর্শবাদীদের ত্যাগ ও সাধনায় জীবন হয় সুন্দর ও মহৎ। এরাই প্রবর্তন করেন নতুন সভ্যতা, গড়ে তোলেন নতুন সমাজ জীবন। এদের স্মরণ করেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-
শুধু জানি, যে শুনেছে কানে
তাহার আহবান গীত, ছুটেছে
নির্ভীক পরাণে
সংকট আবর্ত মাঝে। দিয়েছে
সে বিশ্ব বিসর্জন
নির্যাতন চলেছে বক্ষ পাতি;
মৃত্যুর গর্জন
নিছে শুনে সংগীতের মতো।
৪.
জীবনের সংগ্রাম আজ কঠোর থেকে কঠোরতর হয়েছে। জীবন সংগ্রামের এই ধাক্কা হতে শিল্পী-সাহিত্যিকও আজ আত্মরক্ষা করতে অক্ষম। আগে শিল্পী-সাহিত্যিকের আশ্রয়স্থল ছিল গুণবাহী রাজসভা। আজ রাজসভা নিশ্চিহ্ন, তার স্থান দখল করেছে পাবলিক। এ পাবলিকের সঙ্গে শিল্পী-সাহিত্যিকের জীবনও আজ একাকার হয়ে গেছে। তাই জনতার জীবন হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘গজদন্ত মিনারে’ বসে সাহিত্যচর্চার দিন আজ শেষ। ফলে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ এ মতবাদ আজ মুষ্টিমের পলাতক মনোবৃত্তির সাহিত্যিক ছাড়া আর কারও মনে আশ্রয় পায়নি। তাই আজ পৃথিবীর সব সাহিত্যে ‘জীবনের জন্যই সাহিত্য’ এ কথা বড় হয়ে উঠেছে।
৫.
জীবনের ক্ষেত্র বিশাল ও বহু ব্যাপক। সভ্যতার বিশেষ করে বস্তুবাদী সভ্যতার বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে মানব জীবনের জটিলতা ও রহস্য অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে সাহিত্যের প্রধান বিষয়বস্তু ছিল নর-নারীর প্রণয়, তার সংঘাত ও প্রতিক্রিয়া। অবসরভোগী সমাজে এটাই ছিল বড় ঘটনা এবং সেই সময় সাহিত্যও ছিল অবসরভোগী সমাজের অবসর বিনোদনের বস্তু। আজ অবসরভোগী সমাজ নিশ্চিহ্ন ও শক্তিহীন। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং গণতন্ত্রের আবির্ভাবের ফলে এখন শ্রমিক অর্থাৎ মেহনতি জনতাই সব দেশের সামাজিক জীবনের প্রাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এদের জীবনের বিচিত্র ঘটনা ও সমস্যা আজ বড় হয়ে উঠেছে। আধুনিক জীবন সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র এই শ্রমিক শ্রেণির জীবনও তাই আজ সাহিত্যের বিষয়বস্তু। অন্ন-বস্ত্রের সমস্যাই এদের জীবনের সমস্যা। তাই প্রণয়ের পরিবর্তে আধুনিক সাহিত্য, এমনকি কাব্যেও এই সমস্যারই ছায়াপাত হয়েছে বেশি করে। জীবনের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক যে কত নিবিড় ও গভীর তা তার এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
৬.
তবুও একথা সত্য যে, অন্ন-বস্ত্র সমস্যার সমাধান সাহিত্যের ধর্ম নয়, সাহিত্যের কাজও নয়। জীবনের মহত্ব  ও সৌন্দর্যের দিকে ইঙ্গিত করা ও তার রসমূর্তি গড়ে তোলাই সাহিত্যের প্রধান কাজ। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের অভাব-অভিযোগ এবং প্রাণ ধারণের নিত্য বস্তু থেকে বঞ্চিত হলে মহত্ত্ব ও সৌন্দর্য চর্চা নিছক বিলাস হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্য সাহিত্য জীবনের প্রাথমিক চাহিদা ও প্রয়োজন হতে বিস্তৃত হতে পারে না। বলা বাহুল্য, মানুষের জন্য সাহিত্য।
৭.
মোট কথা, সাহিত্য ও জীবন শুধু পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল নয়, পরস্পরের পরিপূরকও বটে। জীবনের জয়গান, বিরহ-ব্যথা সাহিত্যে না থাকলে, সে সাহিত্য অর্থহীন হয়ে পড়ে। সুতরাং একজন সাহিত্যিককে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সাথে মিশতে হবে, চলতে পথে সবকিছুর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে হবে। কল্পনার রাজ্য থেকে সাহিত্যিককে বাস্তব জগতে ফিরে আসতে হবে। বাস্তববাদী সাহিত্য রচনা করতে হবে। তবেই তা পাঠক গ্রহণ করবে। নইলে হেলায় ফেলে দিবে সে সাহিত্য। সাহিত্যিককে হতে হবে আরও সচেতন, মুক্তমনের অধিকারী। শ্রেষ্ঠ সাহিত্য রচনা করতে দরকার শ্রেষ্ঠ সময়। সেই শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত সাহিত্যিককে বের করে নিতে হয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT