ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য তথ্য কোষ

আতিকুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০২-২০১৮ ইং ২২:৩৬:৩৬ | সংবাদটি ১৪৬ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
পাহাড়ী ও বাঙালিদের প্রতি সরকারিভাবে কিছু কিছু বৈষম্য ও অবিচার হচ্ছে, যা দুর্ভাগ্যজনক। সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে জমি বন্দোবস্ত বন্ধ রেখেছেন। শহর-বাজারে এই নিষেধাজ্ঞা পাহাড়ী বাঙালি সবার প্রতি প্রযোজ্য। গ্রামাঞ্চলে এই নিষেধাজ্ঞা উভয়ের প্রতি প্রযোজ্য হলেও পার্বত্য শাসন আইনের ৫০ ধারা বলে উপজাতিদের বেলায় তা ৩০ শতক পর্যন্ত শিথিল। কার্যত এই নিষেধাজ্ঞা জনস্বার্থবিরোধী। পাহাড়ি-বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ই এই নিষেধাজ্ঞার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত। এটা সংবিধানের ৪২ ধারার গুরুতর লঙ্ঘন, যা নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত বিষয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকারও এই অধিকার লঙ্ঘনের বিরোধী। জমি-বাড়ি লাভ মানুষের মৌলিক চাহিদার বিষয়। সংবিধানের ১৫নং ধারা নাগরিকদের এই মৌলিক চাহিদাপূরণকে সরকারের দায়িত্ব বলে ঘোষণা করেছে। এই সাংবিধানিক আইন লঙ্ঘন করা গুরুতর অন্যায়। ক্ষমতাসীনদের মাঝে এই অন্যায়বোধ না থাকা দুর্ভাগ্যজনক।
বাঙালি বসতি স্থাপনকারীদের উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে সরকার ২৮ হাজার পরিবারকে তাদের বাড়িঘর ও জমি-জমা থেকে তুলে নিয়ে, নিরাপত্তা ক্যাম্পসমূহের পাশে, একেকটি ঘরের জায়গায় মাত্র পুনর্বাসিত করেন। পার্বত্য অঞ্চলে এভাবে অসংখ্য বাঙালি গুচ্ছগ্রাম গড়ে উঠেছে, যাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র সম্বল পরিবার প্রতি প্রদত্ত একটি ফ্রি রেশন কার্ড মাত্র। তাতে মাসিক বরাদ্দ ৮৫ কেজি ৭২ গ্রাম চাল অথবা গম। এ থেকে একটি কল্যাণ ফান্ডের জন্য ৫ কেজি কেটে রাখা হয়। গত বিশ বছরে বর্ণিত ২৮ হাজার পরিবার গুচ্ছ গ্রামবাসী ৫০ হাজার পরিবারের অধিক হয়ে গেছে। তাদের লোকসংখ্যাও দেড় লাখ থেকে বেড়ে প্রায় আড়াই লাখে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাড়েনি তাদের গৃহসংস্থান। সেই আগের ১০/১৫ হাতের জায়গাটিতে বাড়তি মানুষ ও পশু পাখি একসঙ্গে গাদাগাদি করে থাকে। রেশন কার্ডের সংখ্যাও বাড়েনি। অনাহার, অর্ধাহার, অশিক্ষা, অচিকিৎসার এক মানবেতর জীবনযাপনে তারা আবদ্ধ। পাহাড়ের এই বস্তিবাসী, শহরের বস্তিবাসীদেরও অধম। এদের কোনো কর্মসংস্থানও নেই। গুচ্ছগ্রামবাসী রেশন কার্ডধারীদের ৫০% প্রায় অভাব, অসুবিধা রোগে-শোকে নিজেদের রেশন কার্ড হয় বন্ধক দিয়ে আর ফেরত নিতে পারেনি অথবা বিক্রি করে দিয়েছে। এখন ওই ফ্রি রেশন ভোগ করছে স্থানীয় ভাগ্যবান দোকানী, মহাজন, ফড়িয়া ও মাতবর লোকেরা। গঠিত কল্যাণ তহবিলেরও হর্তাকর্তা তারা। স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে গঠিত কল্যাণ তহবিল পরিচালনা কমিটিতে ১৫/২০ জন স্থানীয় গণ্যমান্য লোকের ভেতর প্রকৃত কোনো তহবিল মালিক নেই বললেই চলে। এ তহবিলে একেক উপজেলায় প্রায় কোটি টাকার মতো জমেছে। কিন্তু ভুক্তভোগীদের কল্যাণে তা মোটেও ব্যয়িত হচ্ছে না। ভুক্তভোগী, দুর্দশাগ্রস্ত লোকদের শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন ইত্যাদি কাজে আজ পর্যন্ত একটি টাকাও ব্যয়িত হয়নি। তহবিল পরিচালকরা বড় বড় আশার বাণী শুনিয়ে কেবল বৃথা সান্ত¦নাই দেন। সন্দেহ হয়, সুযোগমত ঐ তহবিল পরিচালকরা একমত হয়ে ওই টাকাগুলো ভাগ করে খাবেন। মিল-কারখানা গড়ে তুললেও তাতে তাদেরই লাভ হবে। সমবায় বা সরকারি পরিচালনায় আজ পর্যন্ত কোনো মিল-কারখানাই লাভজনক হয়নি।
পার্বত্য বাঙালিরা দুর্দশা-দুর্ভোগের শিকার। তারা সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার এবং জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকার থেকেও বঞ্চিত। পার্বত্য চুক্তির বলে উপজাতিরা সংবিধান প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে অধিক পাচ্ছে। পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ও পার্বত্য শাসন আইনে সংবিধান লঙ্ঘিত হচ্ছে। বাঙালিরা মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে অবিচার ও বৈষম্যের শিকার। সরকার ও প্রশাসন তাদের কোণঠাসা করে রেখেছে। বাঙালিরা সুবিচার পাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে তাদের একমাত্র করণীয় হলো সুপ্রিমকোর্টের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়া। সুপ্রিমকোর্ট একমাত্র কর্তৃপক্ষ যে সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষায় সরকারকে বাধ্য করতে পারে।
পার্বত্য বাঙালিদের মাঝে শিক্ষিত, সচেতন, বিত্তশালী লোকের অভাব। তবু তাদের দ্বারা সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টে বেশ কিছু মামলা দায়ের হয়েছে ও তা বিচারাধীন আছে। ওই মামলাগুলোর প্রায় সবই সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের নিষ্ক্রিয়তা, তদবিরের অভাব এবং খচর যোগানোর অসুবিধায় এগুচ্ছে না। বসতি স্থাপনকারী বাঙালিদের কল্যাণ তহবিল থেকেও এই মামলা সংক্রান্ত ব্যয় সংকুলান করা যেতো। কিন্তু তহবিল পরিচালনা কমিটি তৎপ্রতি অনীহ। এটি কি কারুনের ধন যে, মূল মালিক শুধু জমিয়েই যাবে এবং পরে লুটেপুটে খাবে ওৎ পেতে থাকা সুযোগসন্ধানী লোভীরা।
ঠিক একই ঘটনার শিকার ত্রিপুরা ফেরত উপজাতীয় শরণার্থীরাও। তাদের খয়রাতী রেশন থেকেও একাংশ কল্যাণ তহবিলে জমা হচ্ছে। অনুমান তার পরিমাণ হবে কয়েক কোটি টাকা। কিন্তু টাকাগুলো কি কোনো কল্যাণ কাজে ব্যয় হচ্ছে বা হবে? এই প্রশ্নের কোনো জবাব নেই।
সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা ও পাহাড়ীদের রণপ্রস্তুতি ইত্যাদি :
ভাল হোক, মন্দ হোক পূর্ববর্তী আওয়ামী সরকার পর্যন্ত পর্বত নিয়ে ত্বরিত সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছে। এখন যেন এই প্রক্রিয়া থেমে গেছে। উপজাতীয় তোষণ আর দেখি কি হয়, এই অপেক্ষায় ,দ্বিতীয় আরেক বিদ্রোহের দ্বারপ্রান্তে দেশ। জেএসএস আর ইউপিডিএফ এর মধ্যে রীতিমতো যুদ্ধ চলছে। রোজ লোকজন আটক আর হতাহত হচ্ছে। ধরা পড়ছে প্রচুর অস্ত্র আর গোলাবারুদ। উদঘাটিত হচ্ছে সন্ত্রাসী ঘাটি। তবু হুশ নেই এর পরিণতি নিয়ে। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে ইউএনডিপি উন্নয়নের নামে গোপন বেঠক করছে বিদ্রোহী নেতা সন্তু লারমার সাথে। এ কি কেবল উন্নয়নের জন্য নেতাকে বাগে আনার চেষ্টা? উন্নয়নের জন্য ইউএনডিপি’র এত কি দায়?
এটা সঠিক নয়, সরকার চুক্তি বাস্তবায়নের নামে কিছু অকাজও করছেন। চুক্তির মুখবন্ধের অঙ্গিকার অনুসারে সাংবিধানিক আইন রক্ষাটাও চুক্তিভূক্ত দায়িত্ব। চুক্তি বাস্তবায়নের সাথে অসাংবিধানিক ব্যবস্থাদি রহিতকরণে তো বাধা নেই। উপজাতীয় পক্ষে মন্ত্রী ও চেয়ারম্যান পদ সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন সুযোগ সুবিধামূলক অগ্রাধিকার দান, খোদ সংবিধানই যদি অনুমোদন না করে এবং তা ঐ সর্বোচ্চ আইনের সাথে অসমঞ্জস হওয়া হেতু বাতিল হয়ে যায়, তাতে সরকারের দোষ হবে কেন? এও তো চুক্তির অঙ্গিকার পালনমূলক অন্যতম দায়িত্ব। এটি দোষ হলে হবে চুক্তিকারী জেএসএস ও আওয়ামী পক্ষের। সরকার সার্বিকভাবে চুক্তি বাস্তবায়নের চাপের মুখে, সাংবিধানিক কাজটি সহজভাবে করে নিতে পারেন। সমালোচিত বা আক্রান্ত হলে, চুক্তির মুখবন্ধটা তুলে ধরাই হবে অকাট্য জবাব। এতো বড় অস্ত্র হাতে থাকতে সরকার অযথাই ভয় পাচ্ছেন। সরকার কি খবর রাখেন যে, চুক্তিকারী সরকারের আমলে আরদ্ধ চুক্তি বহির্ভূত কিছু বাড়াবাড়ি অনুসরণ এখনো চলছে। এটি এক অপ্রিয় রহস্য। জানতে পারলে সবাই থত মত খেয়ে যাবেন। ঘটনাটি ঘটেছে প্রশাসনিক পর্যায়ে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট ভৌগোলিক আয়তন ৫০৯৩ বর্গমাইল। কিন্তু এর সবটাই বসতি অঞ্চল নয়। পার্বত্য শাসন আইন হিলট্রাষ্টস ম্যানুয়েল এটিকে ৫টি সার্কেলে বিভক্ত করেছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চল মৌজাভূক্ত নয়, যা বন আইনে শাসিত হয়। এর সাথে আরো কিছু এলাকাও যুক্ত যথা : ১. শিল্পাঞ্চল, ২. অধিগ্রহণকৃত কর্ণফুলী হৃদ ও অন্যান্য জায়গা জমি, ৩. বন আইন ৭ (২) ১৮৬৫ মূলে ঘোষিত রাষ্ট্রীয় বনাঞ্চল, ৪. আবগারি আইনে পরিচালিত পাহাড় ও খনিজ এলাকা, ৫. নদী, জলা, খাস ও সরকারি দফতর এলাকা, ৬. প্রকৌশল স্বার্থসংশ্লিষ্ট এলাকা, ৭. সড়ক, আকাশপথ ও প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট অঞ্চল। চুক্তিতে এসবের সংস্থান নেই, এগুলো চুক্তিমুক্ত জাতীয় অঞ্চল। জনসংহতি সমিতির পাঁচ দফা দাবীভূক্ত ২ (৫-ক) ও ২ (৫-খ) মতে, গোটা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিরোধীয় অঞ্চল নয়। পার্বত্য চুক্তি দফা নং খ./২৬ ও পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন নং- ৬৪ অনুসারে ও জেলা পরিষদের আওতামুক্ত একটি পৃথক জাতীয় অঞ্চল স্বীকৃত। পৃথক জাতীয় অঞ্চলটি কি করে জেলা পরিষদের অন্তর্ভূক্ত হলো? এটা কি চুক্তি লঙ্ঘনমূলক বাড়াবাড়ি নয়?
[চলবে]

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন সাদেক
  • বানিয়াচংয়ের ভূপর্যটক রামনাথ
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র এবং বাগ্মী বিপিন
  • সিলেটের গৌরব : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রকৃতিকন্যা সিলেট
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম ক্ষেত্র
  • ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ জামালপুর
  • সুনামগঞ্জের প্রথম নারী সলিসিটর
  • ইতিহাস-ঐতিহ্যের লীলাভূমি সোনারগাঁও
  • হারিয়ে যাওয়া বর্ণমালা
  • স্বামী হত্যার বিচার পাননি সাহার বানু
  • বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম মিয়ারচর
  • বিভীষিকাময় একাত্তর শ্বাসরুদ্ধকর পাঁচঘণ্টা
  • সিলেটের প্রথম সংবাদপত্র এবং কবি প্যারীচরণ
  • সিলেটের প্রথম সাংবাদিক, প্রথম সংবাদপত্র
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • মুক্তিযোদ্ধা নজরুল এবং অন্যান্য
  • বানিয়াচং সাগরদিঘী
  • খুন ও ধর্ষণ করেছে চরমপন্থিরাও
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • Developed by: Sparkle IT