পাঁচ মিশালী

প্রান্তিকের বাবর ভাই

নবেরা আক্তার প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০২-২০১৮ ইং ০১:০৫:১০ | সংবাদটি ২১৫১ বার পঠিত

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে, সিলেট অঞ্চলে শিশু সংগঠনগুলোর কাজ তখনও তেমনভাবে শুরু হয়নি। তেমনি এক সময়ে আজ থেকে প্রায় ৪৩ বছর আগে সিলেট শহরে শিশুদের প্রতিভা বিকাশের জন্য এগিয়ে আসেন উনিশ বছরের এক তরুণ যার অদম্য উৎসাহে কয়েকজন সৃজনশীল মানুষের সহযোগিতায় ১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে সিলেটে আত্মপ্রকাশ করে কেন্দ্রীয় কচি কাঁচার মেলার একটি অঙ্গসংগঠন ‘প্রান্তিক কচি কাঁচার মেলা’। সেদিন যে তরুণের গভীর উৎসাহ আর আন্তরিক প্রচেষ্টায় প্রান্তিক কচি কাঁচার মেলা সিলেট শহরে যাত্রা শুরু করে, সে তরুণ হচ্ছেন মাহবুব আহসান চৌধুরী বাবর। আমাদের সবার প্রিয় ও পরম শ্রদ্ধেয় বাবর ভাই।  বাবর ভাই শুধু প্রান্তিক প্রতিষ্ঠা করেই থেমে থাকেন নি; বরং মননশীল কিছু ব্যক্তির সহায়তায় সিলেটের বিভিন্ন পাড়ায় কেন্দ্রীয় কচি কাঁচার মেলার আরও কয়েকটি শাখা খোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন । এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৬ -৭৭ সালে সিলেটের বিভিন্ন পাড়ায় কচি কন্ঠ, দিপালী, বর্ণালী কচি কাঁচার মেলা নামে বেশকিছু শিশু সংগঠন কাজ শুরু করে।
প্রতিষ্ঠার শুরুতেই বাবর ভাই ছিলেন প্রান্তিক কচি কাঁচার মেলার প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক। সাথে ছিলেন এক ঝাঁক উৎসাহী মানুষ যারা প্রান্তিকের উপদেষ্টা মন্ডলী, সহযোগী পরিষদ  এবং কর্মী পরিষদের সদস্য ছিলেন। প্রথম দিকে সিলেট শহরের সুবিদ বাজার, মিরের ময়দান, সাগরদিঘীর পাড়, বাগবাড়ী, পাঠানটুলা এসব পাড়ার শিশুদেরকে নিয়েই প্রান্তিকের নানা ধরনের কর্মকান্ড শুরু হয়। আমি যখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি, তখন প্রান্তিক কচি কাঁচার মেলার সদস্য হিসেবে যোগদান করি। এত বছর পরে অনেক কিছু স্মৃতিতেও নেই। তবে এখনও মনে আছে প্রান্তিকের যাত্রার শুরুতে আমাদের পাড়ায় একটি বড় খেলার মাঠ ছিল (প্রেসক্লাবের উল্টো দিকে বর্তমানে যেখানে ব্লু বার্ড ¯ু‹ল)। সে মাঠে বিকেলে আমরা জড়ো হয়ে নানা ধরনের কাজে অংশ নিতাম যেমন; সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা, শরীর চর্চা, খেলাধুলা ইত্যাদি। আর এসব কর্মকান্ডের নেতৃত্ব দিতেন বাবর ভাই।
১৯৭৭ সালে কেন্দ্রীয় কচি কাঁচার মেলা, ঢাকার গুলশান পার্কে আয়োজন করে ১২ দিনব্যাপী শিক্ষা শিবির যেখানে; সারা দেশ থেকে কচি কাঁচার সদস্যরা অংশ গ্রহণ করে। সিলেট প্রান্তিক থেকে আমরা ৪ জন (২ জন ছেলে, ২ জন মেয়ে) সেই শিক্ষা শিবিরে অংশ নেই। অংশগ্রহণকারীদের মাঝে আমরা দু’মেয়েই ছিলাম সর্বকনিষ্ঠ। আমি তখন চতুর্থ এবং অন্যজন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। সারাদিন সেই শিবিরে আমরা নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতাম। শরীরচর্চা, লাঠিখেলা, ব্রতচারী নৃত্য, ডাম্বেল খেলা ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। রাতে আবার গান এবং নাচেরও চর্চা হতো। কেন্দ্রীয় সাথী ভাইদের সাথে বাবর ভাইও এসব বিষয়ে আমাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করতেন। ঐ শিক্ষা শিবিরেই দেখেছিলাম বাবর ভাইয়ের প্রতি কী পরম ¯েœহমাখা দৃষ্টি ছিল  কচি কাঁচাদের প্রাণপুরুষ রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাইয়ের! যা পরবর্তীতেও নানা অনুষ্ঠানে আমরা দেখেছি।  
ঐ শিক্ষাশিবিরে প্রশিক্ষণ সহায়তার পাশাপাশি বাবর ভাইয়ের আরেকটি প্রধান কাজ ছিল আমদের দুই সর্বকনিষ্ঠার সকল বিষয়ে তদারকি করা। এমন কি সন্ধ্যার সময় আমাদের দু’জনের জুতা মোজা ধুয়ে, শুকিয়ে পরদিন ভোরবেলা পরার উপযোগী করে রাখতেন। আমাদের বাবর ভাই ছিলেন এমনই একজন দায়িত্বশীল সংগঠক আর উদার মনের মানুষ।
শিক্ষা শিবির শেষে আমরা সিলেটে ফিরে এলাম, শুরু হলো প্রান্তিক কচি কাঁচার নবযাত্রা। ধীরে ধীরে প্রান্তিকের পরিসর বাড়তে থাকল। গানের, নাচের, ছবি আঁকার ক্লাস শুরু হলো। প্রান্তিকের পরিচালক এবং উপদেষ্টাদের সাথে বাবর ভাইকেও দেখতাম নানা বিষয়ের প্রশিক্ষক যোগাড় করা, প্রশিক্ষণ রুমের ব্যবস্থা করা, সদস্য সংগ্রহকরার মতো কাজগুলো খুবই উৎসাহের সাথে করতে। আমাদের বাসায় একটি পুরাতন খালি ঘর ছিল। যেখানে বেশ কিছুদিন প্রান্তিকের অফিস ছিল। বাবর ভাইকে দেখেছি, সে অফিসে সহযোগী পরিষদের ভাইদের নিয়ে রাত অবধি কাজ করতে। কচি কাঁচাদের আঁকা ছবি নিয়ে চিত্র প্রদর্শনীর জন্য ছবি নির্বাচন, ছবি বাঁধাই, প্রদর্শনী কক্ষে ছবি সাজানো, শিশু একাডেমি বা নতুন কুঁড়ি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা, কচি কাঁচাদের তালিকা তৈরি করে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, প্রান্তিকের সদস্যদের লেখা নিয়ে দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করা, সদস্যরা লেখা জমা দেয়ার পর সেগুলো নির্বাচন করা, ঠিকঠাক করে দেয়া, যাদের হাতের লেখা সুন্দর বা ভাল ছবি আঁকতে পারেন তাদেরকে সাথে নিয়ে দেয়াল পত্রিকা তৈরি; এরকম নানারকম কাজ ঐ অফিসে বসেই বাবর ভাই করতেন। সেই দেয়াল পত্রিকা আবার ঢাকায় কেন্দ্রীয় কচি কাঁচার অফিসেও পাঠাতেন। কেন্দ্রীয় কচি কঁাঁচার মেলার সাথে নিয়মিত যোগাযোগের কাজটাও বাবর ভাই করতেন খুব সুষ্ঠুভাবে। কচি কাঁচাদের নানা অনুষ্ঠানের খবর তৈরি করা। সেগুলো আবার কেন্দ্রীয় কচি কাঁচায় পাঠাতেন যা দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ’কচি কাঁচার আসর’-এ প্রকাশিত হতো। এভাবে ধীরে ধীরে প্রান্তিকের কর্মব্যাপ্তি শুধুমাত্র সুবিদবাজার বা মিরের ময়দান এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সিলেট শহরের বিভিন্ন এলাকার শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল।
প্রান্তিকের প্রতিটি পদক্ষেপে সবসময় যে মানুষটি সরব থাকতেন  তিনি হচ্ছেন বাবর ভাই। শুধু সাথেই থাকা নয়, সব কাজের যেন সহায়ক শক্তি ছিলেন বাবর ভাই। সংগঠকের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় যেমন তিনি সরব ছিলেন, তেমনি যখন তিনি সে দায়িত্বে ছিলেন না তখনও ছিলেন কচি কাঁচাদের সকল আবদারের আশ্রয়স্থল। পিকনিকে যাওয়া, ঢাকায় গেলে চায়নিজ খাওয়া, শিশু পার্ক বা চিড়িয়াখানায় বেড়াতে যাওয়া ইত্যাদি নানা রকমের আবদার। আবার ক্ষেত্র বিশেষে তিনি শাসনও করতেন। ১৯৮১ সালে ৫০ জনের একটি দল ঢাকায় গেলাম শিশু একাডেমির অনুষ্ঠানে। সবাই তখন স্কুলে পড়ি। ঢাকা  স্টেডিয়ামে রাষ্ট্রপতির সামনে মার্চপাস্ট করতে হবে। প্র্যাকটিসের সময় সবার হাত-পা সমান ভাবে মিলছে না। বাবর ভাই ঘন্টার পর ঘন্টা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন একই তালে আমাদের হাত আর পা মেলানোর জন্য।
আমরা সবাই সময়ের কাছে বন্দী। আস্তে আস্তে সংসার নামক যন্ত্রের কাছে বন্দী হতে শুরু করলাম সবাই। প্রান্তিক কচি কাঁচার মেলা এবং যে মানুষটা আমাদের ছোটবেলায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিলেন সেই মানুষটার সাথে যোগাযোগ কমে গেল। কিন্তু আত্মিক একটা যোগাযোগ ছিল। সত্যিই বলছি বাবর ভাই, আমরা যারা আপনার সাথে প্রান্তিক-এ ছিলাম তারা যখনই এক সাথে হয়েছি তখনই আপনাকে মনে করেছি, নিজেদের মাঝে আপনার কথা আলোচনা করেছি, আপনার আদর আমরা উপলব্ধি করেছি । আপনি ছিলেন আমাদের পরম শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসার একজন মানুষ, এখনও তাই আছেন; থাকবেন সারাজীবন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT