পাঁচ মিশালী

মাউন্ট রয়েল

মো. আজিজুর রহমান লসকর প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০২-২০১৮ ইং ০১:০৫:৪৩ | সংবাদটি ৮০ বার পঠিত

সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে মাত্র দু’তিন মিনিট হেঁটে টিমারেন্ড সড়কের পাশে যাত্রীদের জন্য নির্মিত কাচঘেরা যাত্রী ছাউনিতে যখন পৌঁছলাম, হাত ঘড়িতে তখন আট’টা চল্লিশ মিনিট। মনে হলো বুঝি সাড়ে আটটার বাস মিস করেছি। পরবর্তী বাস নিশ্চয় ন’টায়। এখনো বিশ মিনিট বাকী। হেঁটে তেরো-চৌদ্দ মিনিটে পানামা বাস টার্মিনালে পৌঁছা যায়। কিন্তু আবহাওয়া খুব উইন্ডি। তাই তাপমাত্রাও নিচে। তা বিবেচনা করে হাঁটার চিন্তা বাদ দিলাম।
এদিকে সময় গড়িয়ে চললো। ঘড়ি ন’টা বাজিয়ে আরো এগিয়ে গেল। কিন্তু কোনো বাস এলো না। আবাসিক এলাকায় টাউন বাসের আনাগোনা অত্যল্প। বাসের সিডিউলও আমাদের কাছে নেই। অগত্যা অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা বড় বিরক্তিকর। যা হোক, অবশেষে কাঙ্খিত বাসখানা এলো। বাসে ঢুকতেই গুড মর্নিং বলে মৃদু হেসে ড্রাইভারকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ইলেকট্রনিক যন্ত্রের পিঠে প্রিপেইড কার্ড স্পর্শ করলাম। যন্ত্র ইতিবাচক মৃদু শব্দ তুললো। বাসের একমাত্র কর্তৃপক্ষীয় ব্যক্তি ড্রাইভার তা সিটে বসে লক্ষ করলেন। প্রিপেইড কার্ড নিঃশেষ হয়ে গেলে যন্ত্র ভিন্ন ধরনের শব্দ করে থাকে। তখন যাত্রীকে নতুন কার্ড অথবা নগদ ৩.২৫ ডলার কাছের ছোট বাক্সে ফেলে বাস চড়তে হয়।
বাস প্রবেশ করতেই শুনতে পেলাম কে একজন উচ্চ কণ্ঠে আমাকে উদ্দেশ্যে করে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে দোয়া করলেন। প্রত্যুত্তরে আমি ‘ওয়ালাইকুম সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ’ বললাম। চেয়ে দেখি মুখে দাড়ি ও মাথায় বিশেষ ধরনের পাগড়ি পরিহিত তিনি একজন শিখ ভদ্রলোক। আমার মুখে দাড়ি দেখেই তিনি সালাম দিয়ে থাকবেন। খালি সিট খোঁজে আমাকে দূরে গিয়ে বসতে হলো। নইলে শিখজীর কাছে বসে গল্প করা যেত। আফসোস পরবর্তী স্টপেজে তিনি নেমে গেলেন। তাঁর সাথে আর কথা হলো না। পানামা বাস টার্মিনালে পৌঁছেই ডাউনটাউনের বাস পেয়ে গেলাম। প্রায় পনের-বিশ মিনিট পর সেন্ট লরেন্ট নদীর পশ্চিম পারে ডাউনটাউনের আন্ডারগ্রাউন্ড বাস টার্মিনালে পৌঁছলাম। আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে এসকেলেটারে দাঁড়িয়ে বেশ আয়েশ করেই গ্রাউন্ড ফ্লোরে উঠে এলাম। কাচঘেরা প্রশস্ত খোলা জায়গা; মাথার উপর প্রায় পঞ্চাশ ফুট উর্ধ্বে কাচের ছাদ। এ খোলা জায়গাটি প্রায় কুড়ি তলা আকাশচুম্বী ভবনের অংশ বিশেষ। এখানে বসার জন্য সিমেন্ট বা ওরকম কোনো দ্রব্য দিয়ে বানানো মসৃন প্রশস্ত চৌকির ন্যায় ক’খানা বস্তু। বসার জন্য আরো ক’টি অদ্ভুত ভাস্কর্যের ন্যায় ধাতব বস্তুও রয়েছে।
টাউন বাসের দেরীর জন্য আমি বিলম্ব করে এখানে পৌঁছলেও বিদ্যুৎ ভৌমিক এখনো এসে পৌঁছেন নি। ভৌমিকের বাসায় ফোন করে জানলাম যে, তিনি কিছুক্ষণ আগে বাসা থেকে বেরিয়েছেন। বিরাট কাচের দরোজার দিকে ভৌমিকের অপেক্ষায় আমি তীর্থের কাকের মতো চেয়ে রয়েছি। অহরহ লোকজনের যাওয়া আসা। কাচের ওপাশে প্রতিটি আগন্তুককে মনে হয় বিদ্যুৎ ভৌমিক। কিন্তু দরোজা ঠেলে ঢোকলেই দেখি না ভৌমিক নয়। একবার গ্লাসের ওপাশে এক ব্যক্তিকে দেখে নিশ্চিত হলাম, এই ভৌমিক। হায়রে কপাল। গ্লাস ঠেলে ভেতরে এলে দেখা গেল, ভৌমিক তো নয়ই, তিনি একজন পুরুষও না। কোট পরিহিতা একজন নারী। এভাবে বার বার ধোঁকা খাওয়ার পর প্রবেশ পথ থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম।
আন্ডারগ্রাউন্ডে প্রথম ধাপে বাস টার্মিনাল এর নিচে মেট্রো অর্থাৎ পাতাল রেল স্টেশন। তাই এখানে অহরহ লোকজনের চলাফেরা। বিচিত্র বর্ণের মানুষ, ততোধিক বিচিত্র তাদের বেশভূষা। প্রকৃতিতে এখন শীতের পদধ্বনি, কিন্তু অনেক মানুষের গায়ে এখনো গ্রীষ্মের সংক্ষিপ্ত পোশাক। এ ব্যাপারে রমণীকুল অগ্রে। মন্ট্রিয়লে বাংলাভাষী মানুষের মুখে প্রায়ই শোনা যায়, ‘এখানে শীতকালে গাছগুলো ন্যাড়া হয়ে যায় আর গ্রীষ্মকালে রমনীগণ ন্যাংটা হয়ে যান।’ এই তো একজন তরুণীকে লাল গেঞ্জি ও শর্ট পরে আসতে দেখছি। কিন্তু তার শর্টটি এতোই শর্ট যে, এটাকে ‘শর্টেস্ট’ বলা উচিত। আর জাঙ্গিয়ার মতো শর্টেস্টটির নিচের প্রান্ত দেখে মনে হচ্ছে, পুরানো একটি ট্রাউজার তাড়াহুড়ো করে টেনে ছিঁড়ে ছোট করে এই মাত্র গায়ে জড়িয়ে নিয়েছে। এখন এটি চূড়ান্ত দারিদ্রতার জীবন্ত প্রতীক। আমার সম্মুখ দিয়ে এইমাত্র চলে গেল এক তরুণ, গায়ে জ্যাকেট ও জিনসের ট্রাউজার; ট্রাউজারটির হাঁটু অংশ তো ছেঁড়া আছেই, অধিকন্তু ট্রাউজারের উপরের দিকে অর্থাৎ উরু অঞ্চলে রয়েছে অসংখ্য কাঁচিকাটা ছোট ছোট ছিদ্র। এ ছিদ্রগুলো হয়তো রাখা হয়েছে কিউট্যানিয়াস রেস্পিরেশনের সময় বায়ু চলাচলের সুবিধার জন্য। বায়োলজির ছাত্ররা অবগত আছেন, শীতঘুমের সময় কুনো ব্যাঙ ত্বকের সাহায্যে কিউট্যানিয়াস রেস্পিরেশন সম্পাদন করে থাকে, তখন বাতাসের প্রয়োজন হয়। যা হোক। এসবকে ওরা ফ্যাশন বলে দাবি করে থাকে। আসলে এগুলো ফ্যাশন নয়, বিকৃত রুচির বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
এবার দৃঢ় মনে অন্য মনস্ক থাকার সংকল্প করলাম। কতক্ষণ অন্য মনস্ক ছিলাম খেয়াল নেই। আর ঠিক ঠিক অন্য মনস্ক থাকতে পারলে, কতক্ষণ ছিলাম, তা খেয়াল না থাকারই কথা। কারণ সব দিকে খেয়াল রেখে তো অন্য মনস্ক থাকা যায় না। হঠাৎ শুনি, চলেন, চলেন। দেরী হয়ে গেছে। রাস্তায় গাড়ি রেখে এসেছি। কাছে এসে বিদ্যুৎ গতিতে বলে চলেছেন বিদ্যুৎ ভৌমিক। সাথে সাথে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে চললেন। ভৌমিকের প্রিয় নীল বর্ণের হোন্ডা করে চড়ে আমরা ডাউন টাউনের উত্তর দিকে মাউন্ট রয়েলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। গাড়িতে বসেই দেখা যাচ্ছিল দূরে মাউন্ট রয়েল। শরতের আগমনে মাউন্ট রয়েল যেন চোখ ধাঁধানো নানা বর্ণ খচিত শাড়ি জড়িয়ে নিয়েছে দেহে। গাড়ি বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে আশেপাশের বড় বড় অনেক স্থাপনা, বেশ ক’টি প্রাচীন গির্জা অতিক্রম করে ক্রমান্বয়ে পাহাড়ের উচ্চতায় আরোহণ করতে লাগলো। বর্ণাঢ্য শরতের আগমনে ছোট আকারের ঝেপঝাড় থেকে শুরু করে বিশাল বৃক্ষ সবাই সৃষ্টিকর্তার রং এর ভান্ডার থেকে উজ্জ্বল সব রং গায়ে মেখে নিয়েছে। তাকালেই চারদিকে দেখি উদ্ভিদকুলের গায়ে বিভিন্ন শেডের লাল, কমলা, হলুদ, বাসন্তী, খয়েরী, বাদামী ও অন্যান্য রং এর বিচিত্র সমাবেশ। গন্তব্যে পৌঁছার একটু আগে রাস্তার পাশে পরিপাটি কবরস্থান, মানুষের শেষ ঠিকানা। কোনো কোনো কবরে কেউ ঘুমিয়ে আছেন হয়তো হাজার বছর ধরে। অথচ পৃথিবীতে ছিলেন হয়তো ষাট বা সত্তর বছর মাত্র। পুনর্বার জেগে উঠার আগ পর্যন্ত আরো কতোকাল এখানে থাকতে হবে কেউ জানে না। কবরগুলো ইট, সিমেন্ট ইত্যাদি দিয়ে তৈরি, এপিটাফে নাম, জন্ম-মৃত্যুর তারিখ ইত্যাদি উদ্ধৃত; অধিকাংশ কবরে খ্রিস্টীয় প্রতীক ক্রসযুক্ত।
অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা মাউন্ট রয়েলের উপরে পৌঁছে গেলাম, সামান্য উচুঁনিচু বিশালভাবে বিস্তৃত ভূমি। গাড়ি রাখার নির্দিষ্ট স্থানে ভৌমিক গাড়ি পার্ক করলেন। এখানে স্থায়ীভাবে স্থাপিত অটোমেশিনে কয়েন নিক্ষেপ করে পার্কিং ভাড়া পরিশোধের রিসিট নিলেন।  সব কাজ সরু, উঁচু পিলারের মতো মেশিন করলো। এ কাজে কোনো ব্যক্তি নিয়োজিত নেই। আহারে! এ কাজটি যদি মেশিন না করতো, তাহলে হয়তো একজন বেকার অভিবাসী নিয়োগ পেতে পারত! ভৌমিক রিসিটখানা গাড়ির সামনের কাচের ভিতর এমনভাবে রাখলেন যাতে সহজে বাইরে থেকে সংশ্লিষ্ট বিভাগের লোক মুদ্রিত কথাগুলো সহজে পড়তে পারেন। চার পাশের গাছগুলোর পাতায় বিচিত্র উজ্জ্বল রং এর সমাবেশ দেখে হৃদয়-মন উতলা হয়ে যায়। রং-এর সৌন্দর্য শব্দে উচ্চারণ করা যাবে না, কাগজে লিখে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। তা কেবল দু’চোখ ভরে অবলোকন এবং হৃদয় মন নিয়ে উপলব্ধি করা যায়।
স্কুলের ডেস্ক-ব্যাঞ্চের মতো এখানে গাছের ছায়ায় অনেক ডেস্ক ও ব্যাঞ্চ স্থায়ীভাবে রয়েছে। হেলান দিয়ে আরাম করে বসার জন্য ব্যাঞ্চের মতো লম্বা চেয়ার রয়েছে। বসে বসে প্রাকৃতিক দৃশ্য অংকনের জন্য চিত্র শিল্পীদের বসার জন্য চেয়ার রয়েছে। আমরা দু’জন একটি ডেস্কযুক্ত ব্যাঞ্চে বসলাম। ভৌমিক তার ব্যাগ থেকে বের করলেন মুড়ি-গুড় দিয়ে তৈরি মোয়া, নিমকপাড়া, তিলের লাড্ডু ইত্যাদি। এগুলো সবই বৌদির হাতে তৈরি। ক’দিন হয়ে বৌদি বাংলাদেশে নাইওর গেছেন। যাবার আগে খাবারগুলো বানিয়ে রেখে গেছেন। বাড়ির লক্ষ্মী বউ। আগে থেকে অনুমান করতে পেরেছিলেন যে, এগুলোর প্রয়োজন পড়বে। আমরা ম্যাপল শাখার রক্তিম পত্রপল্লবের নিচে বসে পরম তৃপ্তির সাথে খাবারগুলো গ্রহণ করলাম। আর দোয়া করলাম বৌদি যেন হাজার বছর ধরে এভাবে তিলের লাড্ডু, মোয়া ইত্যাদি বানিয়ে যেতে থাকেন।
হঠাৎ একটি গাঙচিল ডানা গুটিয়ে আমাদের সামনে এসে ল্যান্ড করলো। একখ- নিমকপাড়া ওর দিকে ছোড়ে দিলাম। সে তা গোগ্রাসে গিলে ফেলে তার স্বরে ডাকতে লাগলো। ক্ষণিকের মধ্যে আরো ক’টি গাঙচিল যেন জরুরি অবতরণ করলো আমাদের সামনেই। অভিজ্ঞ ভৌমিক বললেন, এদের খাবার দিয়ে সামলাতে পারবেন না। বৌদির তৈরি খাবারে এদেরও কিঞ্চিত অংশ রয়েছে। হেসে বললাম এবং এদের প্রতি সামান্য খাবার ছোড়ে দিলাম। এক সময় দেখতে পেলাম গাঙচিলগুলো যেন ঝগড়ায় মেতে উঠেছে। অতঃপর একজন আরেক জনকে ঠোঁট দিয়ে আক্রমন করছে এবং কর্কশ কণ্ঠে যেন বকাঝকা করছে। ওদের উদ্দেশ্য করে বললাম, পাশ্চাত্যে বাস করেও তোমরা তৃতীয় বিশ্বের মানুষের মতো খামোকা ঝগড়াঝাঁটি করছো কেন? সভ্য লোকে কি বলবে? আমার কথায় বোধ হয় ওরা লজ্জা পেল। হঠাৎ দেখি ঝগড়া বিবাদ বন্ধ করে সবাই উড়ে চলে গেল। এবার ভৌমিক বললেন, এই যে এতো লোকের সমাবেশ, বিভিন্ন স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি, বিভিন্ন পিকনিক গ্রুপের আগমন। অথচ দুই ব্যক্তি বা দুই গ্রুপের মধ্যে নেই কোনো কথা কাটাকাটি, নেই ঝগড়া।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT