পাঁচ মিশালী

স্মৃতির ক্যানভাসে ফিরে যাওয়া

নওরোজ জাহান মারুফ প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০২-২০১৮ ইং ০১:০৬:১১ | সংবাদটি ২০ বার পঠিত

এসএসসি পরীক্ষা দিলাম ১৯৭৬ সালে। অনেক বড় ব্যাচ ছিল ’৭৬ সাল। স্কুল সহপাঠীরা যারা ছিল যে যার যার মত চলে গেছে এসএসসি’র পর। কে কোথায় গেছে জানা নেই। এভাবে সময় যেতে যেতে ৪০ বছর চলে গেলো।
গত বছর সমমনা ক’জন যোগাযোগ করলাম একে অপরের সাথে। সিদ্ধান্ত নিলাম ’৭৬ ব্যাচ এসএসসি সিলেটে সব স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীর অংশগ্রহণে আয়োজন করবো রি-ইউনিয়ন। আমরা লেগে গেলাম কাজে। তার আগে আমরা অবশ্য ’৭৬ ব্যাচ এইডেড স্কুল রি-ইউনিয়ন করেছিলাম স্বল্প পরিসরে সতেরোর ফেব্রুয়ারীতে। সেই রি-ইউনিয়নেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল বৃহৎ আকারে মিলনমেলা উদ্যাপন করার। আমাদের উদ্যোক্তাদের অন্যতম বন্ধু এইডেডিয়ান আব্দুল্লা জাহেদ মিলনমেলা আয়োজনে কাজ করতে মাঠে নেমে গেল।
১৯৭৬’র ব্যাচ সহপাঠীদের মিলনমেলার (২০১৭) রেজিষ্ট্রেশন করার হিড়িক পড়ে গেল। অনেকেই খুব আগ্রহী হয়ে রেজিষ্ট্রেশন শুরু করে দেয়। কেউ কেউ বার কয়েক তাগিদ দেওয়ার পরও রেজিষ্ট্রেশন করতে গাফিলতি দেখায়। আসলে সবার বয়স হয়েছে ঢের, অনেকের শারীরিক অবস্থাও খুব সুবিধার নয়, তাই এ আলসেমি। অনেকের আবার এসব রি-ইউনিয়ন টি-ইউনিয়ন করতে ইন্টারেস্ট নেই। তারপরও ঘটা করে আড়ম্ভরপূর্ণ ভাবে রি-ইউনিয়ন মিলনমেলা হল সোমবার ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে। ঐদিন ছিল খ্রিষ্টীয় ধর্মাবলম্ভীদের সবচেয়ে বড় উৎসব ‘বড়দিন’।
সিলেটের সুবিদ বাজারে সুপরিচিত গেস্ট হাউজ রেইনবোতে সন্ধ্যা ঠিক ছ’টায় আনন্দচিত্তে আসতে থাকে সহপাঠীরা। ঘন্টা খানেক পর সন্ধ্যা সাতটার মধ্যেই রেইনবো গেস্ট হাউজের বলরোম কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল। পুরনো বন্ধুদের পদচারনায় মুখরিত হয়ে উঠলো অনুষ্ঠানস্থল, রেইনবো গেস্ট হাউজটি। মুহুর্মুহু করতালি আর ধ্বনী দিতে দিতে সহপাঠী বন্ধুরা কোলাকুলি করে, হাসি তামাশা আর গল্প গোজবে মেতে উঠে। হারিয়ে যাওয়া বাল্যবন্ধুদের দীর্ঘদিন পর পেয়ে সবাই খুশি এবং আনন্দে আপ্লুত। এক সময় দেখা গেল পুরো মিলনমেলাটি এক আনন্দমেলায় রূপ নিল। দল বেঁধে সেল্ফি তোলার হিড়িক লক্ষ করা গেল। মাঝখানে সুযোগ করে আমরা এশার নামাজ জামাতে পড়ার জন্য তৈরী হয়ে গেলাম। এশার জামাতে ইমামতি করে আমাদের আরেক এইডেডিয়ান বন্ধু তেতলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম। পরে আরো জামাত হলেও কেউ কেউ একাই এশার সালাত আদায় করে নেয়। হিন্দু বন্ধুরাও নেহায়েত কম নয় বরং সংখ্যায় অনেক বেশিই ছিল। তাদের সরব উপস্থিতিও মিলনমেলাকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলে।
এশার নামাজের পর চা পর্ব শুরু হয়। চিকেনরোল, সমুচা আর সিলেট দাড়িয়াপাড়ার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি গলাধঃকরণ করে সবাই তৃপ্তির ঢেকুর তুলে। মজাদার আর মুখরোচক নাস্তা পর্ব শেষ হলে শুরু হয় মেলায় আগত অতিথিদের পরিচিতি পর্ব। একে একে সবাই নিজের নাম, ঠিকানা, পেশা, স্ত্রী, ছেলে-মেয়ের বিশদ বিবরণ দিয়ে সংক্ষিপ্তাকারে বক্তৃতা শেষ করেন। তার আগে উদ্যোক্তা বন্ধু আব্দুল্লা জাহেদ স্বাগত বক্তব্য রাখে এবং উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানায়। জাহেদের পর শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখে আরেক বন্ধু মুফতি মোহাম্মদ সুহেল উদ্দিন আহমদ। সুহেল সাবলিল ভাষায় তিন-চার মিনিট শুভেচ্ছা বক্তব্য দেয় এবং কৌতুক করে অনুষ্ঠান জমিয়ে রাখে।
দীর্ঘ পরিচিতি পর্ব শেষ হলে ডিনারপার্টিতে সবাইকে আহ্বান জানানো হল। রেইনবো গেস্ট হাউজের একঝাঁক কর্মীরা অতি যতেœর সাথে নানা পদের খাবার দিয়ে বিশাল টেবিল সাজিয়ে রাখে। সহপাঠীবৃন্দ সবাই ভুড়িভোজন শেষ করে। পরে আবার ডিজার্ড পর্বেও অংশ নেয় সকলে। ফিরনি, সফ্ট ড্রিংকস্ ছাড়াও পান-সুপারীরও ব্যবস্থা রাখা হয়। যারা পান-সুপারীতে আসক্ত তারা যেন চাঁদ হাতে পেলো।  
অনুষ্ঠান শুরুর পূর্বে ’৭৬ ব্যাচ এসএসসি (রিইউনিয়ন) মিলনমেলায় রেইনবো বলরোমকে মনোরম সাজে সজ্জিত করা হয়। নানা জাতের ফুল, বেলুন দিয়ে বলরোম সাজানো হয়। আরো সাজানো হল বলরোমের বিশাল টেবিল। টেবিলকে নজর কাড়া গোলাপ সহ বিভিন্ন জাতের ফুল দিয়ে আচ্ছাদিত করে রাখা হয়। টেবিলের শেষার্ধে, ওয়ালে টানানো ছিল ব্যানার, তাতে সুন্দর করে লিখা ছিল- সহপাঠী মিলনমেলা-২০১৭, এসএসসি ’৭৬ ব্যাচ, সিলেট।
নৈশভোজ পর্ব বেশ সময় নিয়েই শেষ হল। ভোজনপর্ব শেষে শুরু হল র‌্যাফেল ড্র প্রতিযোগিতা। নানা জাতের প্রাইজ, নানা ধরণের রঙিন কাগজে মোড়ানো ছিল। উদ্যোক্তা বেশ কয়েকজন গিফ্ট স্পন্সর করে। উপস্থিত অনেকেই র‌্যাফেল ড্রতে অংশ নিয়ে প্রাইজ পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে। অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং জমজমাট ছিল র‌্যাফেল ড্র পর্বটি। ইতোমধ্যে শিবতোষ চক্রবর্তী ও মিহির চক্রবর্তীর পরিচালনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করে এ প্রজন্মের শিল্পী সুপ্রিয়া ও ইমন। একদিকে গান অন্যদিকে র‌্যাফেল ড্র উপভোগ করেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাই। র‌্যাফেল ড্র পর্বে আমি ও সহপাঠী শিবতোষ, জাহেদ আর সোহেলকে সহযোগিতা করি। পুরো সঙ্গীতায়নের সাউন্ড সিস্টেম এর ঝাজালো শব্দে কান টাস্কি লাগার যোগাড়। সাংস্কৃতিক পর্বের শেষাংশে শিবতোষ ও অজয় দৈত কণ্ঠে ‘সোনা বন্ধু আমার কেহ নাই’ এই জনপ্রিয় বাউল সঙ্গীত পরিবেশন করে সহপাঠী সব বন্ধুদের প্রশংসা কুড়ায়। অত্যন্ত মনোরম এবং জমজমাট এই মিলনমেলায় সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হকের সানুগ্রহ উপস্থিতি মেলায় বাড়তি আনন্দ দেয়। আরিফ এলে আনন্দ আড্ডা আরো জোরালো হয়ে উঠে। এর আগেই (বন্ধুসভায়) মিলনমেলায় এলেন একই ব্যাচের মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ। এলেন একই ব্যাচের সহপাঠী জেলা বারের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান সিলেট স্টেশন ক্লাবের সভাপতি এডভোকেট এমাদ উল্লাহ শহিদুল ইসলাম (শাহীন), সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রিজের সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ আমাদের সাথে আগে থেকেই রেইনবোতে উপস্থিত ছিল। সময় যত গড়াচ্ছে এরপর সেই সোনাঝরা সন্ধ্যায় এখন কে আসছে দেখে নিতে সবার চোখ বলরোমের ফ্রন্ট গেইটের দিকে। এমনি করে করে রেইনবোতে এলো দেবাশীষ দে বাসু, আহমেদ কবির, সৈয়দ মুজিবুর রহমান, মোঃ নজরুল হোসাইন, আশরাফ হোসাইন চৌধুরী, পরিমল বণিক, প্রদীপ ভট্টাচার্য্য এডভোকেট, অহিদুজ্জামান চৌধুরী, মোঃ আজিজুর রহমান (সুন্দর), এহতেশামুল হক বাহার, এ.কে.এস বদরুল আমিন (হারুন), সৈয়দ নাহিদ আহমদ টিপু, আজিজুর রহমান, এডভোকেট খাদেমুল মিল্লাত মোঃ জালাল, অধ্যাপক মোঃ হেনা সিদ্দিকী, মুফতি মোহাম্মদ জাহিদ, খলিলুর রহমান রাজা, মঈনুল ইসলাম, জয়ন্ত কুমার বর্ধন, সাধন চন্দ্র দত্ত, শেখর ভট্টাচার্য্য, মোঃ আজাদ উদ্দিন, মোস্তাক আহমদ, নাজমুল ইসলাম, ডা: নজমুল, মুহিবুর রহমান জিলু, মোঃ নাজমুল ওয়াহিদ চৌধুরী, অজয় কুমার, মোঃ গোলাম মোস্তফা, শওকত আলী শান প্রমুখ, তারও আগে আমি, আব্দুল্লাহ জাহিদ, মুফতি সুহেল, শিবতোষ রেইনবোতে অবস্থান করছিলাম।
সন্ধ্যা ছ’টা থেকে বিরতিহীনভাবে মধ্যরাত অবধি চলা মিলনমেলা সাঙ্গ হয় ক্রেস্ট আর লটারীর আয়োজনের মধ্যে দিয়ে। বাল্য স্মৃতি জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মৃতি। বাল্যকালে স্কুলের অসাধারণ স্মৃতি মানসপটে ঝলমল আলোর মত জ্বলে সারাটি জীবন। এসব স্মৃতি রোমন্থন করতে, স্মৃতিকে ধরে রাখতে মিলনমেলায় স্মারক গ্রন্থ “জীবনের জয়গানে হৃদয়ের টানে’ এক নান্দনিক ম্যাগাজিন সবার হাতে তুলে দেয়া হয়। দূর পরবাসে থাকলেও এই স্মারক গ্রন্থটি মনে করিয়ে দিবে হে বন্ধু তুমি আছো আজও আমার দিল মন্দিরে।  
দীর্ঘ দিনপর সহপাঠীদের একে অন্যকে পেয়ে আমরা যেন আগের দিনেই ফিরে গিয়েছিলাম। রেইনবো’র পুরো বলরোম জুড়ে বাঁধ ভাঙ্গা হাসি, খুশি, খুনসুটি, মিষ্টি ভালোবাসা আর ভাল লাগার নির্মল আনন্দ যেন অন্তরে ছুঁয়ে যেতে লাগলো।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT