উপ সম্পাদকীয় সৈয়দ মুজতবা আলী : মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

শান্তিনিকেতনে শিক্ষক মুজতবা আলী ও কয়েকটি করুণ ঘটনা

মুহিত হাসান প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০২-২০১৮ ইং ০১:০৬:০৫ | সংবাদটি ৮৫ বার পঠিত

অল ইন্ডিয়া রেডিওর চাকরি চূড়ান্তভাবে ছেড়ে দেবার পর সৈয়দ মুজতবা আলী কলকাতায় ফিরে এলেন আবারও, ১৯৫৭ সালে। চাকরি নেই, বয়স বাড়ছে, শরীরও আগের তুলনায় দুর্বল। সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটবে তাই নিয়ে দুশ্চিন্তার অন্ত না থাকলেও আশেপাশে ভরসা জোগাবার মতো মানুষ কম। কলকাতার একাধিক বৃহৎ পুঁজির পত্রিকাগোষ্ঠী তাঁর কাছ থেকে লেখা চায়, কিন্তু উল্টোদিকে তাঁকে একটা সম্মানজনক বেতনে চাকরি দেবার ব্যাপারে সেসব প্রতিষ্ঠানের বড়ই অনীহা। অবশ্য তখন একবার বসুমতী পত্রিকার মালিকপক্ষ তাঁকে ওই পত্রিকার সম্পাদক করতে চেয়েছিল। তিনি তাতে সম্মত হননি। তখন ওই পত্রিকার খুব দুরবস্থা চলছিল, তাঁর মনে হয়েছিল, মালিকপক্ষ গ্যাঁড়াকলে পড়ে তাঁকে মই হিসেবে ব্যবহার করে হারানো জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধার করতে চাইছে। আর পত্রিকা পুনরায় দাঁড়িয়ে যখন যাবে, তখন পত্রপাঠ বিদায় করে দেবে। বরং আনন্দবাজার গোষ্ঠীর কোনো পত্রিকায় মুজতবা চাকরি পেতে আগ্রহী ছিলেন বলে অন্নদাশঙ্কর রায় জানিয়েছেন, কিন্তু সেখান থেকে পরে আর কোনো সাড়া তিনি পাননি।
জীবিকা নিয়ে অস্থির অবস্থার মধ্যেই মুজতবা আলী কলকাতার পাট চুকিয়ে চলে গেলেন শান্তিনিকেতনে। সম্ভবত কলকাতায় এত পরিচিতজন থাকা সত্ত্বেও তাঁর কোনো কাজের ব্যবস্থা হলো না, এই বিষয়টি তাঁর মনঃপীড়ার কারণ হয়েছিল। তাই নিজের তারুণ্যের চারণভূমিতে গিয়েই স্বস্তি পেতে চাইছিলেন। তিনি শান্তিনিকেতনের গুরুপল্লীতে একটি বাসা ভাড়া করে সেখানে থাকতে শুরু করেন ১৯৫৭-র ফেব্রুয়ারি মাসে। ওই মাসের ৮ ফেব্রুয়ারি অমলেন্দু সেনকে এক চিঠিতে ভয়ানক অভিমানের সঙ্গে লিখলেন: ‘চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখানে একটি বাসা ভাড়া করে বাড়ি করেছি। অর্থাৎ এ স্থান আমি জীবনে ত্যাগ করতে চাইনে। দিবারাত্র সেই প্রার্থনাই করছি। এখানে এসেছি মৃত্যুর জন্য তৈরি হবার জন্য। পেটের ভাতের জন্য লিখতে হবে। সেইটুকু লিখবো। এবং কোনোদিন যদি লেখা বন্ধ করেও পেটের ভাত জোটে তবে চেষ্টা করবো, বই-পড়া থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য। আমি এ জীবনে কলকাতা আর পারতপক্ষে যাবো না।’
শান্তিনিকেতনে চলে আসার পরও মুজতবা আলী মানসিকভাবে খুব শান্তি পেয়েছিলেন বলে মনে হয় না। আর্থিক কষ্ট তাঁকে থিতু হতে দিচ্ছিল না। বেশি বেশি পরিমাণে লিখে যে অধিক রোজগার করবেন, সেটাও শারীরিক কারণে সম্ভব হচ্ছিল না। নিজেই জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত মোটরগাড়ি বিক্রির টাকা দিয়েই তখন চলতে হয়েছিল। এমনকি সেই টাকা শেষ হয়ে গেলে সঙ্গে থাকা একটা বাইসাইকেল বিক্রি করে দেবার কথাও ভেবেছিলেন, তাতে করে কয়েক সপ্তাহের খরচা উঠে আসবে। আর্থিক কারণই তাঁর মনোকষ্টের একমাত্র কারণ ছিল, তা অবশ্য নয়। তারুণ্যে দেখা বর্ণিল শান্তিনিকেতনের সঙ্গে তিনি রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুপরবর্তী এই শান্তিনিকেতনকে মেলাতে পারছিলেন না। সেই বন্ধুবৎসল পরিবেশ সেখানে তখন উধাও, সঙ্গ দেবার মতো বন্ধুরাও তেমন কেউ আর নেই। উল্টো চারিদিকে ঈর্ষাকাতরতা আর হীনম্মন্যতার প্রকাশ।
এই মনোকষ্ট ও পরিবর্তিত শান্তিনিকেতনের পরিবেশ থেকে রেহাই পেতে অর্থাভাব সত্ত্বেও ১৯৫৮ সালের শেষার্ধে মুজতবা আলী একবার জমানো টাকা দিয়ে ইউরোপ ভ্রমণ করে আসেন। এই প্রসঙ্গে তাঁর এক শুভানুধ্যায়ী, শিলংয়ের লাবান এলাকার অধিবাসী সুনন্দা সেনকে লেখা পত্রে তিনি রম্যভঙ্গিতে বলেছিলেন: ‘আমি যা জমিয়েছিলুম তা তো বিলেতে গিয়ে ফুঁকে দিয়ে এলুম। ‘যত টাকা জমাইছিলাম/ শুঁটকি মৎস্য খাইয়া/সকল টাকা লইয়া গেল/গুলবদনীর মাইয়া।’ এবারে নাগাড়ে শুঁটকি মৎস্য খেলেও আর টাকা জমবে না।’ তবে পয়সা সব খরচ হয়ে গেলেও ইউরোপে বন্ধুসঙ্গে তাঁর সময়টা বেশ ভালোই কেটেছিল। এর প্রমাণ মেলে সুনন্দা সেনকে লেখা আরেকটি চিঠির এই বাক্যে: ‘ইউরোপে পুরনো বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে গল্প-গুজব করেছি আর ডাইনে বাঁয়ে তাকিয়ে দেখেছি।’
১৯৫৭ থেকে ১৯৬১ সাল অব্দি শান্তিনিকেতনে মুজতবার জীবনব্যয় লেখালেখি হতে প্রাপ্ত পারিশ্রমিক দিয়েই মূলত নির্বাহ হতো। আর পকেটে টান পড়লে পরিচিতজনদের থেকে অর্থ ধার নিতেন। এমনটা মাঝেমধ্যেই ঘটতো। ১৯৫৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর অবিনাশ চক্রবর্তীকে এক চিঠিতে লিখেছেন: ‘অত্যন্ত বিপদে পড়ে তোমাকে লিখছি। আমাকে পত্রপাঠ যদি ঞ.গ.ঙ. করে একশতটি টাকা পাঠাও তবে বড় উপকৃত হই। সব কথা খুলে লেখার মতো আমার মনের অবস্থা নয়।’ ১৯৬০ সালে দেশ পত্রিকায় তাঁর শবনম উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করে। সেই বাবদ প্রাপ্তব্য পারিশ্রমিক আদায়ের জন্যও তাঁকে সম্পাদক সাগরময় ঘোষের কাছে একাধিকবার চিঠি লিখতে হয়েছে। এমন অবস্থা চললো ১৯৬১ সালের মাঝামাঝি অব্দি।
ওই সময় নিজের এই অনিশ্চিত জীবন নিয়ে হতাশা জানিয়ে লেখক পরিমল গোস্বামীকে মুজতবা একাধিক চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে লেখালেখি নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা, জীবন নিয়ে তৃপ্তি-অতৃপ্তির নানা চিত্র পাওয়া যায়। ১৯৫৭-র ৩১ জুলাই লেখা চিঠিতে জানাচ্ছেন, ‘লেখালেখি বাবদে আমি কোনকালে ভাল ছেলে ছিলুম বলুনতো? আমার দাদারা, বোনেরা, বাপঠাকুদ্দা কেউই লিখতে চাইতেন না, এই আমার পাক্কা খবর। আমি যখনই ভালো হই তখনই জানবেন সেটা পারিবারিক ঐতিহ্যকে পীড়িত করে। আপনিও তো লেখেন অনিচ্ছায়, হাতের লেখা দেখেই তো বোঝা যায়। আমাদের এই সদ্দৃষ্টান্ত যদি বাঙালি লেখক অনুকরণ করতো’। ১৯৬০ সালের তেসরা মার্চ লেখা আরেকটি চিঠিতে জানাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একটি প্রামাণিক বই লিখবার স্বপ্নের কথা: ‘প্রিয়বরেষু, ‘পট বয়লার’ না লিখতে হলে রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একখানা প্রামাণিক বই লেখার বাসনা ছিল। বছর তিনেক লাগত। ততদিন খাব কি? তাই অবসর সময়ে পূরবীর একটি টীকা লিখছি। বিপদ হয়েছে, সাধারণ পাঠক কতখানি রবীন্দ্রনাথ বোঝে তার স্ট্যান্ডার্ডটা ধরতে পারছি না। বাংলায় এম এ পাস ছোকরার কবিতা-বোধশক্তি দেখে তো নিরাশ হতে হয়। অতএব একটু বাখানিয়াই টীকাটি ‘প্রস্তুত’ (বেতারের ভাষায়) করছি। আপনাকে আবার কবে দেখব কে জানে?’
উল্লেখিত পত্রাংশদ্বয় থেকে বোঝা যায়, মুজতবা আলী তখন জীবিকার জন্য টানা লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন। একদিকে শান্তিনিকেতনের মধ্যেকার অসহ্য অবক্ষয়, অপরদিকে ‘রাইটিং মেশিন’ হিসেবে ক্রমাগত অনিচ্ছা সত্ত্বেও হালকা লেখার চাপ-এই দুইয়ের পাল্লায় পড়ে তাঁর জীবন ওষ্ঠাগত হচ্ছিল। রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর আশৈশব প্রীতি ও শ্রদ্ধার কারণে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একটি বড় বই লেখার ইচ্ছা বহুদিন ধরে পোষণ করলেও এই হালকা লেখার চাপেই তা আর সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষে। বাংলা সাহিত্যের দুর্ভাগ্য বৈকি!
এরপর এক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি বিশ্বভারতীতে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগলাভ করলেন। ওই সময় বিশ্বভারতীর উপাচার্য হয়ে এসেছিলেন শান্তিনিকেতনের প্রাক্তন ছাত্র বিচারপতি সুধীরঞ্জন দাস। তিনি আগে থেকেই মুজতবা আলীর যোগ্যতা ও গুণাবলী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তখন আবার বিশ্বভারতীর ইসলামের ইতিহাস বিভাগে ‘রিডার’-এর একটি পদ শূন্য ছিল। সুধীরঞ্জন দাসের উদ্যোগে ওই পদে মুজতবাকে ‘ভারপ্রাপ্ত’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৬১ সালের ১৮ আগস্ট তিনি বিভাগে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন। এই বিষয়ে নিয়োগপ্রাপ্তির দুদিন পর সোমেন চট্টোপাধ্যায়কে লেখা চিঠিতে তিনি জানাচ্ছেন: ‘শেষটায় আমিও চাকরি নিয়েছি। গত শুক্রবার, পয়লা ভাদ্র বিশ্বভারতীতে জয়েন করেছি ধং জবধফবৎ ড়ভ ওংষধসরপ ঐরংঃড়ৎু ্ এবৎসধহ. ১৫ আগস্ট দেশ স্বাধীন হলো, আমি ১৮ আগস্ট স্বাধীনতা হারালুম। এ কাজ নিয়ে হয়তো মুহম্মদের (দ.) জীবনীটি লেখা যাবে–এই যা সান্তনা।’ প্রসঙ্গত, মুজতবা আলী বহুদিন ধরেই মহানবীর একটি জীবনী লেখার কথা ভাবছিলেন।-এই বিষয়ে তাঁর সম্ভাব্য গবেষণা-পরিকল্পনা জেনে বিশ্বভারতী সেটি প্রকাশের ব্যাপারে আগ্রহীও হয়েছিল।
তবে বিশ্বভারতীতে তখন ইসলামের ইতিহাস বিভাগে কোনো শিক্ষার্থী ছিল না। তাই প্রথমদিকে শুধু মুজতবা আলীকে অতএব নিয়োগপত্রে লিখিত চুক্তি অনুযায়ী জার্মান ভাষা বিষয়ে ক্লাস নিতে হতো। তবে পরে উক্ত বিভাগে ছাত্ররা ভর্তি হয়েছিল কিনা সে সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। এসবের পাশাপাশি উচ্চতর ডিগ্রি যেমন পিএইচডি থিসিসের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্বপালনও করছিলেন তিনি। তবে নতুন চাকরি নিয়ে খুব একটা স্বস্তিতে ছিলেন না। এর প্রকাশ দেখা যায় ১৯৬১ সালে অমলেন্দু সেনকে লেখা একটি পত্রে: ‘আমি চাকরি নিয়ে ন্যাজে-গোবরে। জার্মান আর ইসলামিক কালচার পড়াতে হয়। কেরালা ফ্রেস্কো সম্বন্ধে দু-একটি ছোকরা থিসিস লিখছে। সেটাও দেখে দিতে হয়।’ ১৯৬১ সালে আরেকটি প্রাপ্তিযোগ ঘটে, তিনি আনন্দ পুরস্কার পান।
অস্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্তির এক বছর পর, ১৯৬২ সালে মুজতবা আলীকে রিডার পদে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর জন্য তাঁকে আরেকজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সঙ্গে নিয়োগবোর্ডের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ওই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর তারিখে নিয়োগবোর্ডের সামনে সাক্ষাৎকার দেবার পর ২২ সেপ্টেম্বর তারিখে তাঁকে স্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্তির সংবাদটি পত্র মারফত অবহিত করা হয়। ভাতাসহ স্থায়ীপদে তাঁর মোট বেতন দাঁড়ায় ১১০০ টাকা। এই বছরের জুনে তিনি আরেকবার জার্মানিতে যান। ফিরে আসেন আগস্টের প্রথম সপ্তাহে।
তবে দিন যত গড়াচ্ছিল, ততই শান্তিনিকেতনের পরিবেশ তাঁর নিকট আরো বেশি অসহ্য হয়ে উঠছিল। এমনও নাকি তিনি বলতেন যে কবিগুরুর মৃত্যুর সাথে সাথে শান্তিনিকেতনের শান্তি গিয়েছে উবে, আর এখন দিকে দিকে খালি নিকেতনই গজাচ্ছে কেবল। ১৯৬১ সালে সেখানে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে যে অনুষ্ঠানাদি হয়, সেসব তাঁর বিন্দুমাত্র পছন্দ হয়নি। এই প্রসঙ্গে কথাশিল্পী রাজশেখর বসুর নাতি দীপংকর বসুকে তিনি বলেছিলেন: ‘এখানে যা হয়েছে তা অবর্ণনীয়। বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথকে কেউ স্মরণ করেনি। করেছে পোয়েট টেগোরকে। প্রধান পুরোহিত ছিলেন প-িতজী [জওহরলাল নেহেরু] ও রাধাকৃষ্ণন[সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন]। এঁরা তো ‘সোনার বাংলার’ কবি রবিঠাকুরকে চেনেন না; এঁরা চেনে গীট্যানজলি, চিট্রা, স্যাডনার (সাধনা) লেখক মিস্টার টেগোরকে। আর তাবৎ কার্যক্রম ইংরাজিতে! আমি অবশ্য কোনো পরবে যাইনি বেতারে যা শুনেছি তার থেকে বলছি।’ লেখিকা লীলা মজুমদার ওই সময় শান্তিনিকেতনে ছিলেন, তিনিও খেয়াল করেছিলেন, অভিমান ও নব্য শান্তিনিকেতনীদের ওপর বিরক্তির কারণে মুজতবা আলী রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষের কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চাননি।
যেহেতু বিভাগে ছাত্র নেই, সেহেতু মুজতবা আলীর নিয়োগ নিয়ে দিল্লির বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন প্রশ্ন তুলতে পারে এমন শঙ্কা ছিল। এই নিয়ে পরে যেন কোনো সমস্যা না হয় সেজন্য উপাচার্য সুধীরঞ্জন দাস মুজতবা আলীকে বিশ্বভারতী পত্রিকায় মুসলিম সংস্কৃতি নিয়ে ধারাবাহিক আকারে বেশ কয়েকটি গবেষণা প্রবন্ধ লেখার জন্য অনুরোধ করেন। কারণ, গবেষণা প্রবন্ধ লিখলে অন্তত তিনি কিছু একটা করছেন, এমন কথা কমিশনকে বুঝিয়ে দেওয়া যাবে। সেই পরিকল্পনা মোতাবেক বিশ্বভারতী পত্রিকার ১৩৭০ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ-আশ্বিন সংখ্যায় ‘বঙ্গে মুসলিম সংস্কৃতি’ শিরোনামে একটি সুলিখিত প্রবন্ধ লিখলেন মুজতবা। কিন্তু এর পরের প্রবন্ধগুলো তাঁর আর লেখা হয় না। ওই একটি প্রবন্ধেই সুধীরঞ্জন দাস পরিকল্পিত প্রবন্ধমালার ইতি ঘটলো। মহানবীর জীবন ও কর্ম সংক্রান্ত বই লেখার কাজও আর এগোয়নি।
মুজতবার মন তখন আড্ডায় মজেছে। শান্তিনিকেতনে পরিমাণে কলকাতার মতো না হলেও কতিপয় ভক্ত তাঁর জুটেছিল। তাঁদের সাথে আড্ডায়-গল্পে তাঁর অনেকটা সময় কেটে যেতো। ছোট বোন সৈয়দা জেবুন্নেসাকে ওই সময় লেখা এক চিঠিতে জানিয়েছেন: ‘সপ্তাহে তিন ঘন্টা পড়াতে হয়। বাকি সময় শুয়ে বসে কেটে যয়। সাহিত্যচর্চাও বন্ধ করে দিয়েছি।’ মুজতবার এমন স্বভাববৈশিষ্ট্যকে পুঁজি করে বিপক্ষের কেউ কেউ তাঁর বিরুদ্ধে শান্তিনিকেতনে তখন অপপ্রচার চালাতে থাকে। অভিযোগ, তিনি ঠিকমতো ক্লাস নেন না ও গবেষণাও করেন না। কেউ কেউ এমনও বলতে থাকে, মুজতবা আলীকে আর অধ্যাপক পদে না রাখাই শ্রেয়। এসব কুৎসা রটনা ও অন্য আরো কিছু কারণে মুজতবার মন শান্তিনিকেতন কর্তৃপক্ষের ওপর ক্রমে ক্রমে বিরূপ হয়ে উঠছিল। এমনকি নিজের জন্য একটি টেলিফোন সেট বরাদ্দ চেয়েও তিনি পাননি।
১৯৬৪ সালে মুজতবা আলীর বিরুদ্ধে কলকাতার কিছু পত্র-পত্রিকাও ভিন্ন কারণে কুৎসা রটনা শুরু করেছিল। ওই বছর শারদীয় বেতার জগৎ পত্রিকায় বহু আগে দেওয়া তাঁর এক বেতার ভাষণ পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল, সেটি নিয়ে যুগান্তর পত্রিকার ‘বেতার-সমালোচনা’ বিভাগে এক লেখক যারপরনাই মিথ্যাচার করেন। মুজতবা আলীর বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক আচরণের অভিযোগ আনা হয়। এমনও বলা হয়, তিনি নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে হিন্দুধর্মের ওপর আঘাত হেনেছেন ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষের সুযোগ নিয়ে! ওই লেখকের কুৎসা-রটনা ও মিথ্যাচারের বিপক্ষে কলম ধরে মুজতবা আলীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পরিমল গোস্বামী। তিনি একটি দীর্ঘ পত্র-প্রবন্ধ লিখে মুজতবার বিরুদ্ধে করা অসার অভিযোগগুলোর সব কটিই খ-ন করেন। পরিমল গোস্বামী ঘটনাটির প্রতিবাদ করেছেন জেনে মুজতবা তা পড়তে চেয়েছিলেন। তাঁকে লেখা একটি পত্রে (তারিখ: ২২ নভেম্বর ১৯৬৪) এই পাঠ-আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি নিজের নানান বিড়ম্বনা নিয়েও কিছু কথা বলেছিলেন: ‘আমি অনিদ্রায় কাতর এই গরমি কাল থেকে। ইতিমধ্যে নিবেদন, আমি শুধু এইটুকুই জানতুম, কে যেন আমাকে যুগান্তরে এক হাত নিয়েছে। আমি সেটা দেখতে চাইনে। কিন্তু তোমার লেখা আমি সর্বদাই সাগ্রহে সানন্দে পড়ি। বরহক বলছি। অতএব ভদ্র, তোমার উত্তরের কাটিংগুলো পাঠালে অত্যন্ত চরিতার্থ হব। মফস্বলে বিশেষ কাগজের বিশেষ সংখ্যা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তবু এই শনিবারের প্রতি শ্যেনদৃষ্টি রাখবো। তবু ব্রাদার তুমিই পাঠাও। ইতিমধ্যে ঢাকায় একটি কাগজে এডিটোরিয়ালরূপে সিরিয়াল বেরচ্ছে আমার বিরুদ্ধে আমি হেঁদু হয়ে গিয়েছি। সে সব আর এখানে তুলছি না। পুনরায় নিবেদন, এসব লড়াইয়ে তুমি কি জিতবে! আর আমিই বা যাই কোথায়? ওরা বলে আমি কাফের, এরা বলে আমি লেড়ে। ভালোই, রাইকুল শ্যামকুল দুই-ই গেল। নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।’ পরে পরিমল গোস্বামীর লেখা জবাবিপত্রটি তাঁর হাতে পৌঁছেছিল, সেটি পড়ে অত্যন্ত প্রীত হয়ে মাসখানেক পর (৭ ডিসেম্বর ১৯৬৪) তিনি তাঁকে লেখেন: ‘গোঁসাই, তোমাকে মারবে। এদেশে গোডসের অভাব নেই। তবে প্রশ্ন, তোমাকে কি আর ‘মারটার’ হওয়ার ‘লাক্সারি’টা এনজয় করতে দেবে? খাসা লিখেছ। আর শেষ কথাটাই আসল’।
তিনি ধারণা করছিলেন বিশ্বভারতীতে ষাট বছর বয়স পর্যন্ত অধ্যাপক পদের মেয়াদ থাকলেও তাঁর ক্ষেত্রে এই মেয়াদ বাড়ানো হবে। কর্তৃপক্ষের সেই অধিকার নিয়মবলে ছিল। এবং তখন সেখানকার প্রায় সব অধ্যাপকেরই মেয়াদ বর্ধিত করা হচ্ছিল। মুজতবা আলীর বয়স ষাট বছর পূর্ণ হয় ১৯৬৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। ১৩ তারিখে তিনি একষট্টিতে পদার্পণ করেন। ওইসময় মুজতবাকে চাকরি ছাড়ার নোটিশ দেওয়া হয়নি। কাজেই তিনি ধরে নেন আরো পাঁচ বছর তিনি বিশ্বভারতীতে থাকার সুযোগ পেয়ে গেছেন। কিন্তু আট মাস পরেই এক পত্রযোগে তাঁকে জানানো হয় যে, ১৯৬৫ সালের ৩০ জুন তারিখ হতে তাঁকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দান করা হলো। মুজতবা এই চিঠি পেয়ে যারপরনাই হতাশ হয়েছিলেন। রাগে-ক্ষোভে পত্রপাঠ তিনি শান্তিনিকেতনের আবাস গুটিয়ে বোলপুরে চলে যান। তিনি বোলপুরে গিয়ে উঠলেন ভাড়া বাসায়, নিচাপট্টি নামের এক পাড়ায়। যাওয়ার আগে শিল্পী-বন্ধু বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়কে বলে যান, ‘আমি যাচ্ছি। এখন হয়তো আমি শুনবো যে তুমি মারা গেছো, নয়তো তুমি শুনবে আমি মারা গেছি।’
তবে শান্তিনিকেতনে তাঁর শুভা

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সনদ অর্জনই কি শিক্ষার লক্ষ্য?
  • সড়ক দুর্ঘটনা
  • সিসিক মেয়র এবং আমাদের প্রত্যাশা
  • মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু
  • বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা
  • ১৫ আগস্ট ’৭৫ : ধানমন্ডি ট্রাজেডি
  • সেই দিনটির দুঃসহ স্মৃতি
  • মুক্তিযোদ্ধার দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু
  • মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু
  • চিরঞ্জিব বঙ্গবন্ধু
  • ক্ষমা করো পিতা
  • এক নেতা এক দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ
  • পোয়েট অব পলিটিক্স
  • শুধু সাক্ষরতা বৃদ্ধি নয়, প্রকৃত শিক্ষা চাই
  • নাগরিক সাংবাদিকতা ও দায়বদ্ধতা
  • শিক্ষার্থীদের আন্দোলন : আমাদের শিক্ষা
  • বঙ্গবন্ধু ও ১৫ই আগস্ট ট্র্যাজেডি
  • কান্নার মাস
  • ছাতকে সহকারী জজ আদালত পুনঃ প্রবর্তন প্রসঙ্গে
  • মধ্যপ্রাচ্য কেন এতো সংঘাত ও যুদ্ধ প্রবণ অঞ্চল
  • Developed by: Sparkle IT