সাহিত্য

রুবাই প্রসঙ্গে রুবাইয়াত-ই-বাকী

গাজী আজিজুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০২-২০১৮ ইং ০১:০৭:৫৯ | সংবাদটি ৬৬ বার পঠিত

রবীন্দ্রনাথ যদি পদাবলী লিখতে পারেন, মধুসূদন সনেট, তাহলে কাবেদুল-দুলারী বা বাকীরা কেন রুবাইয়াত রচনা করতে পারবেন না। বিশেষত বাকীর রুবাইয়াত পড়ে মনে হয় আমিই খৈয়াম, আমিই হাফিজ। তিনি মন প্রাণ উজাড় করে পাগলপারা হয়ে লিখে চলেন একের পর এক ক্লান্তিহীন নিদ্রাহীন রুবাইয়াত কুসুম। যেন তার জীবনে এসেছিল চেরির মৌসুম। ’আহা আজি এ বসন্তে কত ফুল ফোটে’র মতো তিনি ফুটিয়েছিলেন রুবাই ফুল। সৃষ্টির আনন্দে এমনি করেইতো রচিত হয় শাহনামা, মসনবি, মেঘনাদ বধ, গীতাঞ্জলি, প্যারাডাইস লস্ট। এ সব ফুটেছিল যুগের মৃনাল ধরে, বহু যুগের গর্ভকে আলোকিত করে। কিন্তু যে একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের বসবাস সে শতাব্দী কি রুবাইয়াতের উপযোগী? অবশ্য ক্লেদে কুসুম ফোটে এও তো সত্যি। তবু ভেবে অবাক হতে হয় যখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে অউশভিতসের পর বলা হয়ে ছিল আর একটি কবিতারও জন্ম হবে না, তখন এই শতকে এসে কবিতা তো লেখা হলোই, এমনকি শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে লেখা হলো রুবাই পর্যন্ত? এটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল নাকি; ফারসি রুবাইয়াতের মধ্যে মিস্টিক অদ্বৈতবাদি-আধ্যাত্মবাদি-দেহতত্ত্ববাদি-প্রেম ও প্রকৃতিবাদি দার্শনিক ধারা, আধুনিককালের রুবাই রচয়িতাদের মধ্যে সেই সুরের স্বরগমের সাথে বেজে উঠেছে আরো বৈচিত্রের অর্কেস্ট্রা। তারা সুরা-সাকী -প্রেম-প্রকৃতি ও অদ্বৈত তত্ত্বের সাথে সমন্বয় ঘটিয়েছেন দেশ-কাল-সমাজ-সভ্যতা-শিল্প-সাহিত্য-জ্ঞান-বিজ্ঞান-ব্যক্তি বিশ্বাস, জন্মান্তর, লৌকিক আচার, পুরাণসহ আধুনিক নানা অনুসঙ্গ-যা রুবাইয়াতকে করে তুলেছে বিচিত্রমুখী, শতদলে শতপথমুখি বা বিটোফেন-মোজার্টের সঙ্গীতের মতো বহু কলোরিত।  
রুবাই রচনার ক্ষেত্রে শুধু আমাদের দেশে নয় খৈয়াম-হাফিজকেও সংখ্যাধিক্যে হার মানিয়ে দিয়েছেন আবদুল্লাহেল বাকী। তার মোট রুবাইর সংখ্যা ১৫৭৪টি। চরণ সংখ্যা ৬২৯৬ এবং শব্দ সংখ্যা ১ লক্ষ ২৬ হাজার, যা কেবল মহাকাব্যের সাথেই তুলনীয়। শুধু শব্দ নয় যথাশব্দ ব্যবহারের প্রয়োজনে তিনি শুদ্ধ শব্দ, আঞ্চলিক শব্দসহ শরণাগত হয়েছেন ইংরেজি, আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি ও সংস্কৃত শব্দের। বলা যায় এটি একটি বহুভাষিক অভিধান। যেমনটা করেছেন জেমস জয়েস, খগেন্দ্রনাথ দত্ত, নজরুল ইসলাম, পাউল-মেলান বা সুধীন দত্ত। অতএব বাকীর রুবাইয়াত বিচারের দাবি রাখে বহু ভঙ্গিমের।
রবীন্দ্রনাথ বৈষ্ণব পদাবলী সম্পর্কে বলেছিলেন ’এ সংগীত রসধারা নহে মিটাবার।’ আর কবি বাকীর রুবাই সম্পর্কে যদি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায় বলি যে তোমায় ’ভুলে ভুলুক, কোটি মন্বন্তরে/ আমি ভুলিব না, আমি কভু ভুলিব না।’ (শাশ্বতী)। ড. অসিতকুমার বন্দোপাধ্যায় রুবাই সম্পর্কে বলেছেন এর ’একপিঠে যেমন রঙ্গরসের রক্তিম উচ্ছ্বাস, আর এক পিঠে গৈরিক বৈরাগ্য।’ আমি বলি,-প্রেমের গান, জীবন ও ভালোবাসার গান, ঐশী প্রেমের গান। যে প্রেম স্বর্গ ও মর্তের মধ্যে একটা সেতুবন্ধন। তাই এর উন্নত ভাব-দর্শন বোঝাতে যেয়ে কবিদের আশ্রয় নিতে হয়েছে রূপের, রূপকের, প্রতীকের, চিত্ররূপকল্পের ও বাক্ প্রতিমার। এছাড়া কাব্যলংঙ্কার শাস্ত্রের নানা অনুষঙ্গ তো আছেই। সব মিলে রুবাইয়াত যেন ছোট ছোট স্ফটিকরূপী একেকটি শুভ্র সমুজ্জ্বল তাজমহল। ভারতের আধুনিক কবি আনসার-উল-হক বাকীর রুবাইয়াত সম্পর্কে বলেছেন ওঃ রং ধ এড়ষফবহ ঞৎবধংঁৎব.
কবি বাকীর সাথে আধুনিকতার দীর্ঘ বসবাস। ফলে তার রুবাইগুলোতে ঘটেছে অতীতের সাথে আধুনিকতার মেলবন্ধন। তাই রচনাকালে তিনি পরিভ্রমণ করেছেন ভূলোক-দ্যুলোক বিশ্বচরাচর। পাখা মেলেছেন ইতিহাস-পুরাণ থেকে সমকালে। বিস্তর ভাষা, বিস্তর প্রকৃতি, বিস্তর দর্শন ও ইতিহাসের সাথে’ 'ঝঃৎবধস ড়ভ ফৎবধসং,' 'ঝঃৎবধস ড়ভ পড়হংপরড়ঁংহবংং' এর মতো আধুনিক প্রকরণকে কাজে লাগিয়ে বিষয় ও বৈচিত্রে ঋদ্ধ করেছেন রুবাইগুলোকে। যা তাকে দান করেছে স্বতন্ত্র রুবাইয়াত রচনার মর্যাদা তার রুবাইর স্বাদ গ্রহণ করতে হলে পাঠককে জানতে হবে মোঘল বাদশাদের, কোহিনুর, সুলায়মানীঅঙ্গুরী থেকে জিউস, প্রমিথিয়ুস, ক্লিওপেট্রা, মার্ক অ্যান্টনি, সীজার, হেলেন, পম্পি, ট্রয়, ক্রিস্টোফার মার্লোসহ কারবালা, ফোরাত, এজিদ, ইউনুস নবী, লাইলি-মজনু জোলেখাবিবি, নূহের নৌকা, তহমিনা, ইরান-তুরান, হাফিজ, আনারকলি, সাহারা মরুকে। আরো জানতে হবে সক্রেটিস, চর্যাপদ, বিভীষণ, সোহরাব-রুস্তম, হাসান-হোসেন, হারুত-মারুত, কৌটিল্য, দ্য ভিঞ্চি, মোনালিসা, পদ্মাবতী, রূপ কানোয়ার, তিতুমীর, মোহনলাল, ক্ষুদিরাম, প্রীতিলতা, আইনস্টাইনসহ হিরোশিমা-নাগাসাকি, লালন,
পাগলা কানাই, অক্টোপাস, ড্রাগন, আইফেল টাওয়ার, ক্যাকটাস, মিথষ্ক্রিয়া, এ্যান্টিনা, বাবেল দেশ, ডেলিস্টার, চ্যানেল আই, সিডর, ইভটিজিং পর্যন্ত। অতএব রুবাইগুলোর রসাস্বদনে পাঠককে পূর্বাপর ইতিহাস-পুরাণ ও আধুনিকতার জ্ঞান খুব জরুরি। কবির জ্ঞান ও পাঠকের জ্ঞান অন্তত সমান্তরাল না হলে কাব্য রস আহরণ অধরাই থেকে যায়। বাকীর রুবাই পাঠক তাই সকলেই নয়-কেউ কেউ।
রুবাইর ঞবীঃ গ্রহণে জ্ঞানের সাথে রুবাইর শিল্প সৌন্দর্য, রুবাইর ছন্দ-মাত্রা ভাব সম্পদ ও রুবাইর ইতিহাস-দর্শন না জানলে, নানা জনের রুবাই পড়া না থাকলে বাকীর রুবাইগুলোর অর্থ অনর্থ ঘটাবে।                                                      
কেবল প্রেম, কেবল রঙিন শরাব, কেবল প্রেয়সীর অঙ্কতল নয় রুবাইর সবখানি, এর সুফিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব,                           
রূপকতত্ত্ব, স্রষ্টা ও সৃষ্টিতত্ত্বের যে 'হেডাল জোন’ (সমুদ্রের সর্বনিন্মস্তর) যা রুবাইর আত্মাও বটে সেখানে পৌঁছেই ঘটাতে হবে এর রস নিষ্পত্তি। তবেই এর শরীর ও আত্মা দর্শনে অর্থ-মুক্তি।
পরিশেষে কিছু উদ্ধৃতি কেবল তাদের জন্য যারা বাকীর রুবাই পড়েননি।  ১ম খন্ড:                          
 ১. লিখছি কেন এই রুবাইয়াত জানতে ব্যাকুল হাজার মন,/ খৈয়াম-ভুতে ধরছে একে উল্টা ভাবে আশেকগণ।/ সাকী বাকী আর শরাবের এ দীন গাঁথা পড়ার পর,/ হৃদয় যদি একটু দোলে মিলবে তাতেই অধিক ধন। (১৮৩)
৫. ঊষার কোলে রবি যেমন চমকে দিয়ে দোল দোলায়,/ প্রিয়ার হাতের অঙ্গুরিটি তেমনি সাজে মন ভোলায়। (২৮৩)  
৬. ধর্ম আমার প্রণয় প্রিয়ার কর্ম আমার তাহার লালন,/ এই প্রেমেতে থাকতে মজে বাঁধা-বিঘœ করবো দলন। (২য় খন্ড,২৪)
৭. নুড়ির ক্ষয়ে জন্ম বালুর ঝর্ণা বুকের উপল স্রোতে,/  সেই সিলিকায় তৈরী যে কাঁচ স্বচ্ছতা পায় শিল্প হতে। (৩৮)
৮. বিত্ত আমার নেইকো কিছু আমি ফকির স্বপ্নচারী,/ থলের ভিতর রুবাই আছে চাইলে আমি দিতে পারি।/ আর যে আছে পাত্র-শরাব খোদাই করা নামটি প্রিয়ার,/ বুকের মাঝে এই যে বিত্ত এতেই দিবো সাগর পাড়ি। (৯৫)
বিন্দু মাত্র এই উদ্ধৃতিসমূহের মধ্যে কবি বাকীর কণ্ঠস্বর, আত্মার স্বর নানা বর্ণে বর্ণিত। এখানে উপচে পড়েছে তার জীবনের বহু বর্ণিল গান, প্রিয়ার গান, রূপ-রসের গান,বসন্তের নও তুফান। সুরা-সাকী,
দ্রাক্ষ্মাকুঞ্জ, ভ্রমর, বুলবুলি, গোলাপ-চামেলী, মহুয়া-মুরলী, চাঁদ-সেতারা আর নবী মসনবীর প্রেম-জোশে উতলা কবির দিল-কোকিল। তবু পাপ-পীড়ন-দহন,অন্যায়-অমঙ্গল, ছল-চাতুরী-শয়তানির বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে কবির বিদ্রোহ। এখানে প্রেম ও দ্রোহ একই সমান্তরালে বয়ে চলে। এখানেই তার রুবাইর বিশিষ্টতা, অনন্যতা।
আধুনিক বাংলা কাব্যের একটি বাঁকে রুবাই দাঁড়িয়ে থাকবে সুগন্ধি তমাল হয়ে। কারণ এ যে প্রেমের গজল-যে প্রেম যাযাবরের ভাষায় ’জীবনকে দেয় ঐশ্বর্য মৃত্যুকে দেয় মহিমা’, এবং ‘প্রেমই ভক্তি, প্রেমই জ্ঞান, প্রেমই মুক্তি’ বিবেকানন্দের এই বাণী নতুন রূপে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিলেন জীবনবাদী মরমী কবি আবদুল্লাহেল বাকী।
বলা অসমীচীন হবে না আধুনিক মনষ্ক কবি বাকী আধুনিকতার সোনালী ফাঁসে জড়িয়ে উপভোগ করেন এক উপসমহীন জীবন যন্ত্রণা, যে যন্ত্রণার শিকার হয়েছিলেন কবি ও দার্শনিক খৈয়াম। আর সে যন্ত্রনার হাত থেকে মুক্তির জন্য এবং আত্মিক প্রশান্তির জন্য আশ্রয় নিতেন রুবাইর সরোবরে। কবি বাকী কি সেই একই উৎস থেকে উৎসারিত হয়ে রচনা করেছেন ক্লান্তিহীন রুবাইয়াত, দূর শতকের দূরত্ব হলেও এমন আত্মিক মিল ও বাস্তবতা অসম্ভব নয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT