উপ সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের আবির্ভাব ও বাংলা ভাষা

মোঃ মোস্তফা মিয়া প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০২-২০১৮ ইং ০০:১৫:০৪ | সংবাদটি ১৮৭ বার পঠিত

১৯৭১ সালে এক সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য এ দেশের মানুষ যে, ত্যাগ স্বীকার করেছে বিশ্ব ইতিহাসে তা বিরল ঘটনা। ৩০ লক্ষ শহীদের আতœদান এবং দু লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে এ দেশটির স্বাধীনতা অর্জিত হয়। স্বাধীনতা অর্জনের ৫ম দশক আমরা অতিক্রম করছি। বাংলাদেশের আবির্ভাবের পিছনে বাংলা ভাষার অবদান অপরিসীম। পৃথিবীতে বাংলা ভাষাভাষি যত মানুষ আছে এবং তারা যে কোন প্রান্তেই বসবাস করুকনা কেন তাদের সকলেরই জানা উচিত বাংলা ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের সকল কৃতিত্বের দাবীদার হচ্ছে বাংলাদেশের আপামর বাংলা ভাষাবাসী জনসাধারণ, প্রবাসীগণ এবং ভাষা শহীদগণ। জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ভাষা।
বাংলাদেশের আবির্ভাবের কারণগুলো হলো সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, প্রশাসনিক, সামরিক, ভৌগলিক কারণ এবং কায়েমী স্বার্থবাদীদের চক্রান্ত। উলে¬খ করা আবশ্যক যে, বাংলাদেশের আবির্ভাবের কারণগুলোর মধ্যে উল্লে¬খিত কারণ ছাড়া অন্য কোন বিশেষ মতাদর্শগত কারণ নাই। বাংলাদেশের আবির্ভাবের প্রেক্ষাপটের মূলে ছিল ভাষা আন্দোলন এবং বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করেই স্বাধীকার তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের সূত্রপাত হয়।
দেশ ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষার উপর যে আঘাত আসে তার জন্য কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ একক দায়ী নহে। এর জন্য দায়ী হলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগের অযোগ্য ও অদক্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। মুসলিম লীগের অযোগ্য ও অতি ক্ষমতালোভী নেতৃবৃন্দ কর্তৃক এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা সম্পর্কে জিন্নার নিকট ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছিল। ফলে অল পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা সম্পর্কে ঢাকায় কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বক্তব্য দিয়েছিলেন। পরবর্তী জীবনে তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভাষা নিয়ে কোথাও কোন বক্তব্য উপস্থাপন করেন নাই। বৃটিশ ভারতে প্রধান যে, দুইটি সম্প্রদায় ছিল তাদের বেশির ভাগ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উর্দু ও হিন্দী ভাষার দ্বারা প্রভাবিত ছিল। ভারতে ও পাকিস্তানে বর্তমানেও তা বহাল আছে। বিশেষ করে সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনৈতিক চেতনায় ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও উর্দুর যথেষ্ট প্রভাব ছিল। বাংলার অনেক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের এবং রাজনৈতিক নেতৃবর্গের পারিবারিক ভাষা ছিল উর্দু। ৪৭ উত্তর বাংলা ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক রুপদানের ক্ষেত্রে এটাও একটি প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করেছিল। ভারতের ন্যায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় শাসন পরিচালনায় আমলাদের চেয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ববর্গের প্রভাব যদি দৃশ্যমান হতো তাহলে বাংলা ভাষার প্রশ্নে অনাকাংখিত ঘটনার সূত্রপাত ঘটতো না।
এখানে প্রাসংগিক একটি তথ্য উপস্থাপন করা আবশ্যক। তা হল: কায়েদে আজম এর মৃত্যুর কিছু দিন পূর্বে জিয়ারত শহরে অবস্থান কালে তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক কর্ণেল এলাহী বখশকে পাকিস্তানের ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনা প্রসংগে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন,“দেখ ডাক্তার, আমি জীবনে, দুইটি ভুল করেছি, তাও পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে। প্রথম ভূল করেছি লাহোর প্রস্তাবকে বিকৃত করে, যা দেশের একজন নেতা হিসাবে আমার পক্ষে আদৌ উচিত হয়নি। আমি দিব্যি চক্ষে দেখতে পাচ্ছি পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের কর্তৃত্ব মানবে না। তারা নিশ্চয়ই স্বাধীন হয়ে যাবে। আর এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, ওদের প্রতি বিমাতা সুলভ আচরণ। প্রকৃত পক্ষে পাকিস্তান ওদের ত্যাগের জন্যই এসেছে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা ওদের প্রতি অবিচার করছে। আমার দ্বিতীয় ভুল আমি করেছি ঢাকায় গিয়ে। গভর্ণর জেনারেল হিসাবে ভাষা সমস্যা নিয়ে কথা বলা আমার উচিত হয়নি। আসলে ভাষা সংক্রান্ত প্রশ্নের মীমাংসা পার্লামেন্ট করতে পারতো। কিন্তু আমি কয়েকজন পূর্ব পাকিস্তানী নেতার দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে ভাষার প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলাম। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানী ছাত্র ও জনগণের যে দৃঢ় মনোভাব লক্ষ্য করেছি তাতে আমি বিশ্বাস করি, বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবী তাদের অযৌক্তিক নয়। মিষ্টার জিন্নাহ আরো বলে ছিলেন “উর্দু পশ্চিম পাকিস্তানী জনগণের ভাষা নয়, পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত। অথচ পূর্ব পাকিস্তানে যার জনসংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশী, সেখানে শতকরা ১০০ জনই বাংলা ভাষী। সুতরাং বুঝতে পারছ বাংলা ভাষার দাবী কত জোরালো। আর এ জন্যই আমি ভাষা সম্পর্কে আর কোন কথা কোন দিন উচ্চারণ করিনি।” (ইতিহাস কথা কয়-মোহাম্মদ মোদাব্বের, পৃষ্টা-২৪৫)। এই ভূল স্বীকার করে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ একজন বিজ্ঞ, বিচক্ষণ, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ও মহান রাজনৈতিক নেতার পরিচয় দিতে সক্ষম হন।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উলে¬খ করা প্রয়োজন তা হলো কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নার মাতৃভাষা উর্দু ছিল না। তারঁ মাতৃভাষা এবং মাতৃভূমি ছিল গুজরাটি ও গুজরাট। মহাতœা গান্ধীর মাতৃভাষাও ছিল গুজরাটী এবং অখন্ড ভারতের স্বার্থেই রাষ্ট্র ভাষার প্রশ্ন তিনি হিন্দীর পক্ষে ছিলেন এবং এর দ্বরা জিন্নাহও বিপরীতে প্রভাবিত হয়ে যান। এ ঐতিহাসিক সত্য অনেকেই জানে না। কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নার ঐতিহাসিক দ্বি-জাতি, ঐতিহাসিক ১৪ দফা, ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব এবং ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট ভারত বর্ষ বিভক্তির মধ্য দিয়ে স্বাধীন, সার্বভৌম অখন্ড পাকিস্তানের জন্ম যেমন রূঢ় সত্য, তেমনি রূঢ় সত্য মাতৃভাষা বাংলা ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান এবং বাংগালী হিন্দু সম্প্রদায়ের নিজস্ব মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম তথা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম। ঐতিহাসিক এ ধারাবাহিক অবদানকে কেউ অস্বীকার করতে পারেনা। বাংগালী মুসলিম সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা বাংলা যেমন সত্য তেমনি সত্য বাংগালী হিন্দু সম্প্রদায়েরও মাতৃভাষা বাংলা।
বাংলাদেশের আবির্ভাবের পটভূমিতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন একটি মাইল ফলক ঘটনা ছিল। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংগালী জাতি সত্তার বিকাশের পথ সূচিত হয়ে এর চেতনা বিভিন্ন ভাবে ও বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামের উপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের ভিত্তিতে আমাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। সে গুলো হলো সংগ্রামী চেতনার সৃষ্টি, দাবী আদায়ের শিক্ষা দান, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির উন্মেষ সাধন, ছাত্র বুদ্ধিজীবিদের সাথে জনগণের একাত্মতার সুযোগ সৃষ্টি, মাতৃভাষার স্বীকৃতি এবং বাঙালিদের মধ্যে একাত্মতার চেতনা আনয়ন। ভাষা সংগ্রামের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিকাশ সাধন হয়েছিল ঠিকই তবে এর অর্থ এই নয় যে, বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বিশেষ মতাদর্শের নামে ধ্বংস করা বা আঘাত করা। অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির উন্মেষ সাধন এর মূল উদ্দেশ্য হলো প্রত্যেক জাতি ও ধর্মের মানুষ স্ব-স্ব অবস্থান থেকে রাজনৈতিক কার্যক্রমে স্বাধীন ভাবে সম্পৃক্ত হবে এবং সকল প্রকার ন্যায্য অধিকার ভোগ করবে। রাজনীতিকে যেন ধর্মের দোহাই দিয়ে কলুষিত করা না হয়। ধর্মের ভিত্তিতে রাজনীতিকে চিহ্নিত না করা। কারণ প্রত্যেকের রাজনৈতিক বিশ্বাস এক জিনিস এবং ধর্মীয় বিশ্বাস অন্য জিনিস।
ভাষার দাবীকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির তথা স্বাধীকারের সংগ্রামে সম্পৃক্ত হওয়া আবার স্বাভাবিক পন্থায় এগুলো অর্জিত না হওয়ায় সশ্রস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এটা স্বাভাবিক কোন ঘটনা নয়, এটা হলো ঐতিহাসিক ঘটনা, এ নিয়ে বাংলাদেশে বসবাসরত মুসলিম এবং হিন্দু বাংগালী উভয় সম্প্রদায়ই একমাত্র কৃতিত্বের, গৌরবের এবং অহংকারের দাবীদার। সুতরাং এ কথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ধর্মকে রাজনৈতিক অংগনে হীণ স্বার্থে ব্যবহার না করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বাংগালী জাতিয়তাবাদী চেতনার আনুষ্ঠানিক স্ফূরণ ঘটে। যার ফলে আমরা আজ বিশ্ব দরবারে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের গর্বিত নাগরিক। ভাষা ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা অবশ্যই যে কোন মূল্যে ও ত্যাগ স্বীকার করে সমুন্নত রাখতে হবে। রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বায়নের প্রভাবে বাংলা ভাষার প্রকৃত চরিত্রকে যে ভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে তা অবশ্যই রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার মাধ্যমে প্রতিরোধ করতে হবে। বাংলা ভাষাকে অন্য ভাষার উচ্চারণে এবং অশালীন শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করার নেতিবাচক প্রবনতাসমূহ চিরতরে বন্ধ করা অপরিহার্য। অন্যথায় ভাষা শহীদদের আতœা এবং ইতিহাস আমাদেরকে ক্ষমা করবে না।
লেখক : কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সনদ অর্জনই কি শিক্ষার লক্ষ্য?
  • সড়ক দুর্ঘটনা
  • সিসিক মেয়র এবং আমাদের প্রত্যাশা
  • মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু
  • বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা
  • ১৫ আগস্ট ’৭৫ : ধানমন্ডি ট্রাজেডি
  • সেই দিনটির দুঃসহ স্মৃতি
  • মুক্তিযোদ্ধার দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু
  • মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু
  • চিরঞ্জিব বঙ্গবন্ধু
  • ক্ষমা করো পিতা
  • এক নেতা এক দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ
  • পোয়েট অব পলিটিক্স
  • শুধু সাক্ষরতা বৃদ্ধি নয়, প্রকৃত শিক্ষা চাই
  • নাগরিক সাংবাদিকতা ও দায়বদ্ধতা
  • শিক্ষার্থীদের আন্দোলন : আমাদের শিক্ষা
  • বঙ্গবন্ধু ও ১৫ই আগস্ট ট্র্যাজেডি
  • কান্নার মাস
  • ছাতকে সহকারী জজ আদালত পুনঃ প্রবর্তন প্রসঙ্গে
  • মধ্যপ্রাচ্য কেন এতো সংঘাত ও যুদ্ধ প্রবণ অঞ্চল
  • Developed by: Sparkle IT