উপ সম্পাদকীয়

আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে

মোহাম্মদ ছয়েফ উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০২-২০১৮ ইং ০২:৩৫:৫৭ | সংবাদটি ১১৪ বার পঠিত

ষড়ঋতুর দেশ আমাদেরই বাংলাদেশ। এখানে ছ’টি ঋতু স্ব স্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয়। ঋতু পরিবর্তন রূপসী বাংলার রূপকে করে তুলে আরো সুন্দর, আরো হৃদয়স্পর্শী। একজন রুচিশীল যুবতী আপন সৌন্দর্য বিকশিত করতে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন পরিধেয় বস্ত্র পরে থাকে। রূপসী বাংলার ঋতু পরিবর্তন যেন সেই যুবতীর বস্ত্র পরিবর্তনের অনুরূপ।
ফাল্গুন-চৈত্র মাস মিলে গঠিত হয় বসন্তকাল। ঋতুচক্রে শীতের পরই আসে বসন্ত। শীতের কনকনে মলয় শেষ হতে না হতেই একদিন আমরা দেখি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে। শীতের তিক্ততায় প্রকৃতির তৃণ-লতা, গুল্ম-বৃক্ষ পুষ্প পল্লব হারিয়ে যেন প্রতীক্ষায় থাকে কখন বসন্তের আগমন ঘটবে। অবশেষে হাজির হয় বসন্ত তার অতুলনীয় রূপমাধুর্য্য নিয়ে। বৃক্ষ লতা যেন পুনরায় ফিরে পায় নতুন যৌবন। প্রস্ফুটিত হয় ফুল বৃক্ষ শাখে সবুজ কচি পাতা জন্মে প্রকৃতিকে করে তুলে সবুজ। বহে মৃদু মন্দ দখিনা মলয়। আমের মুকুলে মৌমাছির গুঞ্জন। রঙিন পাখা নিয়ে ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ায় প্রজাপতি, কোকিল, বৌকথা কও বিহঙ্গের কলগীতি প্রকৃতিকে মুখরিত করে। তাই বসন্তকে ঋতুরাজ বলে। এমনি দিনে প্রকৃতি প্রেমে নিমগ্ন হয়ে কবি সাহিত্যিকগণ সৃষ্টি করেছেন কাব্য, সাহিত্য। ঋতুরাজ বসন্ত পূর্ণ যৌবনে কবি সম্মুখে উপস্থিত, এমনি সময় কবির গুনমুগ্ধ ভক্ত অন্যমনস্ক কবিকে বসন্তের কথা স্মরণ করাতে গিয়ে বলেন। কবির ভাষায়-
“হে কবি নীরব কেন-ফাল্গুন যে এসেছে ধরায়/বসন্তে বরিয়া তুলি ল’বে নাকি তব বন্ধনায়?”
ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করার জন্য প্রকৃতি নিজেই তৈরি হয়ে নেয় এবং তার আগমনি সঙ্গীত যেন বাতাসে বেজে ওঠে। কবির ভাষায়-“আসিবে এবার ঋতুরাজ বুঝি/তারি বাঁশি ওঠে মলয়েতে বাজি।” বসন্তের মৃদু মন্দ বাতাস পুষ্প পল্লবের মনমাতানো গন্ধ ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয় দিকবিদিক। বনে বনে পড়ে যায় সাড়া। কবি গেয়েছেন-“আসিবে ফাগুন বাজাইবে বেণু বেদনারে/যাবে ভুলি/বিকচ কুসুম ঢালিবে গন্ধ গান গেয়ে/যাবে ওলি।”
কোকিল বসন্তের পাখি। শীত চলে যাওয়ার পর বসন্তের বার্তা নিয়ে মধুর কন্ঠে ডাকে কুহু-কুহু। কবির ভাষায়-“আয়রে বসন্ত তোরও/কিরণ মাখা পাখা তুলে।/নিয়ে আয় তোর কোকিল পাখির/গানের পাতা গানের ফুলে।” শীতের ধূসর প্রকৃতি একটি নব দিনের ইঙ্গিতে যে পোষাক বদলে নিচ্ছে তা স্পষ্ট ধরা পড়ে। কবির ভাষায়-“ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে,/ডালে ডালে পাতায় পাতায় রে,/আড়ালে আড়ালে।”
ঋতুরাজ বসন্ত তার এতসব রূপের প্রাচুর্য এক সময় হারাতে বসে, সেই ফাঁকে চৈত্রের শেষ দুপুরে সূর্য্য আরো উত্তাপ বিকিরণ করে প্রকৃতিকে যেন জানিয়ে দিতে চায় যে গ্রীষ্ম অতি নিকটে। তখন কি যেন এক তৃষ্ণার সঞ্চার হয় প্রাণী জগতে। কবির ভাষায়- “চৈত্র মাসের দুপুর বেলায়/আগুন হাওয়া যে,/দস্যি ছেলে ঘুরায় বেড়ে/সকল পাড়া ময়,/কাকেরা সব ছায়ায় বসে/এদিক সেদিক চায়।/শুকনো গলায় ডাঁকচে কা-কা/হঠাৎ উড়ে যায়।”
ধীরে চলে যায় ঋতুরাজ বসন্ত। কোথায় যেন বিদায় বীণা বেঁজে ওঠে। বসন্তের পরই আসে গ্রীষ্ম। চৈত্রের শেষে শুধু বসন্তের শেষ নয়। শেষ হয় বর্ষও। শুরু হয় নতুন দিনের। এভাবে চলে যায় ঋতুরাজ বসন্ত, আবার আসবে। আবার চলে যাবে।
ষড়ঋতুর বাংলাদেশে আধুনিক কালে তার ঋতুর বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। মনুষ্য সৃষ্ট নানাবিধ কারণ এর জন্য দায়ী। সময়মত বর্ষা নামছেনা। অসময়ে বর্ষার আগমন ঘটছে। বসন্ত ঋতুর শেষ দিকে কিংবা ভরা গ্রীষ্মে এমনকি শরতের প্রথমার্ধে বর্ষা নামতে দেখা যায়। শীত ঋতুর পরিধি ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসছে। পৌষ-মাঘ মাস নিয়ে শীতকাল হলেও বাস্তবে এ দু’মাসের সবগুলো দিন ব্যাপিয়া আগেকার দিনের মত শীত লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। হিসেব কষলে দেখা যায় পৌষ মাসের শেষার্ধ এবং মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহে শীতের অস্তিত্ব বিদ্যমান। দীর্ঘ দিন ব্যাপিয়া তীব্র শীত লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। পল্লী গ্রামে শীতের সকালে আগেকার মত লোকজনকে রোদ পোহাতে দেখা যায় না কিংবা খড়-পাতা দিয়ে অগ্নি সৃষ্টি করে তাকে ঘিরে লোকজনকে তনু তপ্ত করতে খুব একটা দেখা যায় না। ষড়ঋতুর এ দেশে গ্রীষ্ম ঋতুর পরিধি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শীতকালের উল্লেখিত কতিপয় দিন ছাড়া বৎসরের বাকী দিনগুলো গ্রীস্মের দখলে, গরমের তীব্রতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শরৎ, হেমন্ত এমনকি বসন্ত ঋতুতে গ্রীষ্মের অস্থিত্ব পাওয়া যাচ্ছে।
এ দেশে বিভিন্ন কারণে বনাঞ্চল এবং বৃক্ষ বেষ্টিত ছোট-বড় অনেক টিলা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বাল্যকালে আমরা গ্রাম হতে গ্রামান্তর ঘুরে বেড়িয়েছি। অনেক বন-জঙ্গল, ঝোপ-ঝাড় ছিল। বনের মধ্যে শিয়াল, বেজী ইত্যাদি মাংসাশী প্রাণী পাওয়া যেত। অধিকাংশ বাড়ীর সন্নিকটে বড় বড় বন, ঝোপ-ঝাড় ছিল। শিকার ধরবে বলে শিয়াল বনের মধ্যে ওৎ পেতে আছে। হঠাৎ মোরগের ডাক ও লোকজনের শুর চিৎকার শোনা গেল। কি ব্যাপার? খানিক পরে জানা গেল শিয়াল মামা গৃহিনীর বয়োজ্যেষ্ঠ মুরগীটি ধরে নিয়ে বনের মধ্যে চলে গেছে। বনের মধ্য থেকে শেয়াল ও মুরগী খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। বিভিন্ন প্রজাতির পাখির ডাকে বন-জঙ্গল মুখরিত হতো। মাঠে-ঘাটে এক ধরনের শালিক পাখি পাওয়া যেত। এগুলো আজ বিলুপ্ত প্রায়, বনের মধ্যে গাছে গাছে বিভিন্ন প্রজাতির বনজ ফল অহরহ পাওয়া যেত। আজকাল এ সকল স্থানের বন-জঙ্গল, ঝোপ-ঝাড় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ সব স্থানে বাড়ী-ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। অথবা বৃক্ষ শূন্য করা হয়েছে। কারণে-অকারণে গাছপালা কেটে উজাড় করা হয়েছে। এ জন্য প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ফলে অসময়ে খরা ও বন্যা দেখা দিচ্ছে। ঝড়, তুফান, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। তাতে প্রাণহানী সহ অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। খাদ্য শস্যের অভাব দেখা দিচ্ছে। ঋতুগুলো আপন বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। সর্বোপরি বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রূপসী বাংলার রূপ ধরে রাখতে হলে তার ছয়টি ঋতুর বৈশিষ্ট্য অক্ষুন্ন থাকতে হবে। বনাঞ্চল ধ্বংস না করে তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করতে হবে। পাহাড়-টিলা কর্তন না করে তা অক্ষুন্ন রাখতে হবে। বেশি করে গাছ লাগাতে হবে। পরিণত বয়সে প্রয়োজনে গাছ কাটতে হবে এবং একটি গাছ কাটার পূর্বে অন্তত দু’টি গাছ লাগাতে হবে। এভাবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়াস চালাতে হবে। অন্যতায় ষড়ঋতুর বাংলাদেশ এক সময় তার ঋতুর বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলবে।
লেখক : কলামিস্ট।  

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT