উপ সম্পাদকীয়

গৌরবের ২৭ বছর, স্বপ্নের শাবিপ্রবি

জিয়া আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০২-২০১৮ ইং ০২:৩৭:২৬ | সংবাদটি ৮৬ বার পঠিত


১। ১৯৮৬ সালটি সিলেট এবং দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য অনন্য এক সাল। কারণ ১৯৮৬ সালে ২৫ শে আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যালয় শাবিপ্রবি, হাটিহাটি পা পা ২৭ টি বছর অতিক্রম করল। শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে  পর্দাপন করে সে তার আলোক উজ্জ্বল দীপ্তি ছড়াচ্ছে দেশ বিদেশে। ১৯৯১ এর ১৩ ই ফেব্রুয়ারি মাত্র তিনটি বিভাগ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় তার একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করে, বর্তমানে ০৬ টি অনুষদের অধীনে তার রয়েছে ২৮টি বিভাগ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রোলমডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যে স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপিত করা হয়েছিল, তার অর্জনের পাশাপাশি কিছু অস্বস্থিকর ইতিহাস আছে, যা কলঙ্কিত করেছে ৩২০ একরের পবিত্র ভূমিকে। সে তার ক্ষত চিহ্নকে বেশিদিন স্থায়ী হতে দেয়নি, এগিয়ে যাচ্ছে বীরদর্পে।
২। ২৭ বছরে অসংখ্য ও অগণিত অর্জন আছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যা কেবল দেশব্যাপী নয় সুনাম কুড়িয়েছে আন্তর্জাতিক পরিসরেও। দেশে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম কিনতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের লাইনে দাড়িয়ে থাকতে হত, এই বিশ্ববিদ্যালয় দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে ভর্তি প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, সুন্দর, নির্ভেজাল ও সহজতর করা যায়। মোবাইলে ভর্তি প্রক্রিয়া উদ্ভাবন ও চিন্তা এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম। এখন দেশের প্রায় সবকয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোবাইলে ভর্তি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে যার ফলে শিক্ষার্থী কিংবা অভিভাবকের যেমন মূল্যবান সময় বেচেছে তেমনি অনেক ঝ¦ক্কি-ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে না এবং অনেকেই স্বস্থির নি:শ্বাস ফেলছেন। আমরা যখন জাতীয় নিরাপত্তা গভীর চিন্তা ও উদ্বেগ প্রকাশ করছি তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় মেধাবী মুখ দেখিয়েছে কিভাবে নিরাপত্তা প্রক্রিয়াকে সুরক্ষিত ও সুনিশ্চিত করা যায়। কম খরচে কিভাবে ড্রোন আবিষ্কার করা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল মেধাবী ছাত্র তা করে দেখিয়েছে। এবং তাদের উদ্ভাবিত ড্রোন যখন দেশের জঙ্গি আস্তানা নিধনে ব্যবহৃত হয় এর চেয়ে তৃপ্তির কিংবা আনন্দের আর কি আছে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ও বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তার ল্যাবরেটরিতে আবিষ্কার করেছেন কিভাবে স্বল্প মূল্যে ক্যান্সার রোগ সনাক্ত করা যায়। যে জীবননাশকারী মরণব্যাধী ক্যান্সার সনাক্ত করতে মানুষের সময় ও অর্থ দুটিই ব্যয় হত তা খুব সহজেই এখন সনাক্ত করা যাবে। পিপিলিকা নামক সার্চ ইঞ্জিন এর নাম যখনই আসে তখনই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় মেধাবী তরুণের চেহারা চোখের সামনেই ভেসে উঠে।
৩। ২৭ বছরে আমাদের আত্মতৃপ্তি যেমন আছে তেমনিই আছে অপূর্ণতা। কারণ একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সুযোগ সুবিধা ও বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার তার অনেকাংশ থেকে আমরা বঞ্চিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ও গুরুতর যে সমস্যা তা হল আবাসন সংকট, ২৭ বছরেও এই সমস্যার সমাধান হয়নি। শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হল খুবই অপ্রতুল, যেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ ছাত্র ছাত্রী আসে মধ্যবিত্ত বা নিম্ম মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে যাদের অনেকেরই মেসে থাকার সাধ্য নেই। ছেলেদের ০৩ টি হলের  মধ্যে একটি হল অপূর্ণাঙ্গ এবং মেয়েদের ০২ টি হল আছে যা খুবই অপ্রতুল। আবাসন সমস্যার পর আরেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হল একাডেমিক বিল্ডিং এর স্বল্পতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেরব যেহেতু বাড়ছে সে তুলনাই একাডেমিক বিল্ডিং সংখ্যা বাড়ছে না। গবেষণাধর্মী কাজের জন্য বেশি সংখ্যক গবেষণাগার ও ক্লাসরুম দরকার। আর দরকার কলা ও মানবিকী, অ্যাপ্লায়েড সায়েন্স ও ফিজিক্যাল সায়েন্স সহ আলাদা আলাদা ফ্যাকাল্টি বিল্ডিং । বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোপরি যে সমস্যা সবচেয়ে ভয়াবহ তা হল শিক্ষক ও ছাত্রদের জন্য খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা না থাকা। একটা নামমাত্র ক্যাফেটেরিয়া, ভাঙ্গা কেন্টিন  ও খুপড়ি টঙ্গ দিয়ে খোড়াখোড়ি ভাবে চলছে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাল খাবারের জন্য শিক্ষক ছাত্রদের যেতে হয় প্রধান ফটকে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর দূরে শহরে। দরকার শিক্ষক লাউন্স ও অত্যাধুুনিক ক্যান্টিন যেখানে সুলভ মূল্যে শিক্ষক শিক্ষার্থীরা তাদের খাবার খেতে পারবে। বর্তমানে শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ৪০০ এর বেশি  যেখানে আবাসন সুযোগ আছে ১০০ এরও কম। শিক্ষকদের জন্য দরকার ডরমেটরি ও পর্যাপ্ত সংখ্যক কোর্য়াটার।
৪। সর্বোপরি নতুন ভাইস চ্যান্সেলর চেষ্টা করছেন বিশ্ববিদ্যালয়কে সার্বিক ভাবে এগিয়ে নিতে, এর জন্য তিনি নিরলস পরিশ্রম করছেন। তারই কর্মযাত্রাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য যে জিনিস সবচেয়ে বেশি দরকার তা হল অর্থ। সরকারের সদিচ্ছাই পারে আমাদের শাবিপ্রবি কে আর এগিয়ে নিয়ে যেতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য কম করে হলেও ৫০০ কোটি টাকার দরকার। সরকার সচেষ্ট হলে এই টাকার যোগান দিতে খুব বেশি সময় লাগবে না। যা দিয়ে আর বেশি সংখ্যক গবেষণাগার, একাডেমিক বিল্ডিং, ছাত্র-ছাত্রী হল, শিক্ষক ডরমেটরি, শিক্ষক লাউন্স এর কাজ সম্পন্ন হতে পারে।
লেখাটি যখন লিখছি তখন আমাদের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে অবস্থান করছি। ৩২০ একরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য মন্ডিত ক্যাম্পাস শাবিপ্রবিকে জন্ম দিনের শুভেচ্ছা। শুভ জন্মদিন শাবিপ্রবি, অনন্ত যৌবনা হয়ে তোমার আলোকরশ্মি ছড়িয়ে পড়–ক দেশ-বিদেশে।
লেখক : প্রভাষক, জিওগ্রাফি এন্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগ শাবিপ্রবি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT