উপ সম্পাদকীয়

জমি, জমিদার এবং কৃষক নিয়ে কিছু কথা

এম আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০২-২০১৮ ইং ০২:৩৯:১৬ | সংবাদটি ১১৩ বার পঠিত


বাংলাদেশ ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের দেশ। আয়তনটা খুব ছোট, লোক সংখ্যা অনুযায়ী। ১৬ কোটি মানুষের বাস এদেশে। অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ নয়। ভারী শিল্প সমৃদ্ধও নয়। ফলে উৎপাদন বলতে কৃষি ক্ষেত্রই প্রধান। কৃষিতেই জড়িয়ে আছে এদেশের বেশির ভাগ মানুষের ভাগ্য। কৃষিতে উৎপাদন মানে জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন। কৃষিতে বিপর্যয় মানে দেশের ভাগ্য বিপর্যয়। কাজেই কৃষি ক্ষেত্রে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি, উন্নত প্রযুক্তি ও গবেষণা সমৃদ্ধকরণ প্রয়োজন। গত ১০ ফেব্রুয়ারি জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল, চ্যানেল আইতে শায়েখ সিরাজ উপস্থাপিত কৃষি অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া চারজন ছাত্র-ছাত্রীকে কৃষি কাজে নিজেদের সম্পৃক্তকরণ দেখে বেশ ভাল লাগল। তারা ধানের চারা তুলে নিয়ে ধানের মাঠে নিজ হাতে রোপণ করছিল। আসলে উচ্চ শিক্ষিতরা কৃষি নিয়ে গবেষণা ও নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে এগিয়ে আসলে বাংলার কৃষি দ্রুতি এগিয়ে যাবে এতে কোন সন্দেহ নেই। তাই বাংলাদেশের কৃষি জমিগুলোকে উৎপাদনমুখী করতে দরকার ব্যাপক পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনারই অংশ বিশেষ আজকের লেখার প্রতিপাদ্য বিষয়।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা ৮০ ভাগ লোক দরিদ্রসীমার নিচে এখনও রয়েছে। এখনও অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং বাসস্থান নামক মৌলিক অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা পায়নি। বেঁচে থাকার জন্য, জীবন ধারনের জন্য হাতের কাছে যা পায় তাই খায়। কোন পরিকল্পনা মাফিক খাবার, বা খাদ্য মেন্যু তৈরি করে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এখনও বেশির ভাগ মানুষের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। কারণ তাদের মাথাপিছু আয় কম। পরিবারের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষই বাবা বা ভাইয়ের উপর নির্ভরশীল। পরিবারে মানুষ দশজন থাকলে একজন বা দু’জনের রোজগারেই চলে। তাদের আয় রোজগার যত বেশি সে অনুযায়ি পরিবারের স্ট্যান্ডার্ড নির্ভর করে। পরিবারের ভাত, কাপড় সংগ্রহ করতে করতেই পরিবারের কর্তা গলদঘর্ম। তাকে আর সুখ স্বাচ্ছন্দের মুখ দেখতে হয় না। পরিবারের ঘানি টানতে টানতেই টানেন জীবনের ইতি। তার অকাল মৃত্যু একটা পরিবার অসহায় হয়ে পড়ে। পরিবারের সদস্যরা ভেসে যায় খড়কুটার মত। কেউ হয় মজুর, কেউ হয় টোকাই আর কেউ যায় নিষিদ্ধ পল্লীতে। সামাজিক নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই। বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তির পরিমাণ যদি বেশি হয় তাহলে ছেলেমেয়েরা মোটামুটি প্রতিষ্ঠা পেতে পারে। আর যদি বাবার সম্পত্তি আদৌ থাকেই না তাহলে ছেলেমেয়েদের অবস্থা বড়ই করুণ হয়, তারা হয় পরনির্ভরশীল। সমাজে আগাছার মতই তাদের অবস্থান। তথাপি কেউ কেউ পরিশ্রম করে জীবনে প্রতিষ্ঠা পায়, ভাগ্য বদল করে। এদের সংখ্যা অবশ্য কম।
আজ থেকে ৫০-৬০ বছর আগের কথা। তখন গাঁওকা গাঁও ছিল কৃষিনির্ভর। সবারই ধানি জমি ছিল। গোয়াল ভরা গরু আর গোলা ভরা ধান ছিল। তিন ধরনের ফসল ছিল আউশ, আমন, বুরো। বৈশাখে বুরো, ভাদ্র মাসে আউশ আর অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান কাটা হত। ঘরে ঘরে চলত নবান্ন উৎসব। প্রকৃতি আজকের মত এত বৈরি ছিল না। সঠিক সময়ে পানি আসতো, সঠিক সময়ে বৃষ্টি হত। অকাল খরা, বন্যা মহামারি খুব কমই হত। প্রকৃতি যখন ধীরে ধীরে তার ভারসাম্য হারাচ্ছিল, তখন থেকেই বৈরী আচরণ করছে। যে বছর কৃষকের ধান ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঐ বছরই তাকে জমি বিক্রি করতে হত। সময় সময প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সে তার ধানি জমি খুইয়ে আজ হয়েছে নিঃস্ব। কৃষক আছে জমি নেই। আজ প্রতিটি গ্রামে খোঁজ নিয়ে দেখা যাবে, যাদের জমি আছে তারা বেশির ভাগই কৃষক নয়, জমিদার। অর্থাৎ একটা গ্রামের ৫/৬ পরিবারের কাছে সমস্ত জমি, আর বাকী সবার একমাত্র ভিটে ছাড়া কোন ধানি বা ফসলি জমি নেই। থাকলেও যৎসামান্য। এই জমি চাষ করে কৃষি নির্ভর হয়ে বাঁচা যায় না। এখানে আমি সিলেট অঞ্চলের চিত্রটি তুলে ধরব।
সিলেটের জনগণ বিদেশ নির্ভর। প্রবাসি অধ্যুষিত এ অঞ্চলে রাতারাতি ধনী হওয়ার প্রবণতা বেশি। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা কোথায় নেই তারা? অর্থের খুঁজে পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছে। কিন্তু চষে না নিজ গ্রাম। অর্থ বিত্ত টাকা কড়ির বদৌলতে ধানি জমি কিনে ফেলে রেখেছে। গ্রামের কয়েকজন শত শত বিগা জমির মালিক আর বাকী সব ভূমিহীন। কৃষকরা জমি চাষ করতে গেলে অর্ধেক ভূমির মালিককে দিয়ে দিতে হয়। আর কোন কারণে যদি ফসলহানি হয় তাহলে ফসল ফলাতে গিয়ে যে খরচাপাতি হয় তা ভূমির মালিক বহন করে না, কৃষককেই বহন করতে হয়। ফলে এখন ভয়ে কৃষকরা বর্গাচাষে যায় না। ফলে সিলেট অঞ্চলে দেখা যায় হাওরের পর হাওর খালি পড়ে আছে ফসলি জমি। চাষাবাদ বলতে সীমিত সংখ্যক জমিতে হয় যেখানে পানি সহজে পাওয়া যায়। অবশ্য সেখানে আগাম বৃষ্টি হলে ফসল হানি অবধারিত। তা জেনেও সেখানেই চাষাবাদ হয়। অথচ শুকনো মৌসুমে জমিদাররা সম্মিলিতভাবে পানির ব্যবস্থা করে অপেক্ষাকৃত উচু জমিতে বুরো বা সবজি চাষ করলে বন্যা কবলিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে কৃষক এবং জমিদার দুইই উপকৃত হবার কথা। কিন্তু জমিদারদের এ বিষয়ে কোন মাথা ব্যথা নেই। যাদের আছে সবখানেই আছে। যেমন ইউরোপে রেস্টুরেন্ট আছে, বাসা বাড়ি আছে, গ্রামে শত শত বিঘা জমি আছে, শহরে বাসাবাড়ি আছে ফলে আয় ইনকামের শেষ নেই। আগে বছরে একবার মা বাবার ওফাত দিবসে শিরনি দিত। সাধারণে দাওয়াত পেত। এখন আর সে সুযোগও নেই। কারণ হালে জেনে গেছে শিরনি বিতরণ না করলেও চলে। এখানে কোন ইসলামী আইন-কানুনও নেই যে শতকরা আড়াই টাকা হারে যাকাত দেওয়া বাধ্যতামূলক বা এটা কেউ আদায় করবে তারও কোন সিস্টেম নেই। ফলে কোটি টাকার মালিক গরীবের হক আড়াই লক্ষ টাকা মেরে দিয়ে লোক দেখানো লিল্লাহ বাটছে। কোন কোন কোটিপতির দ্বারে দেখা যায় সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ফকিরদের লাইন। তিনি শতকরা আড়াই টাকা লিল্লাহ দেন কীনা কে জানে? আর ট্যাক্স ফাঁকির ব্যাপারতো রয়েই গেল। পুঁজিপতিদের টাকা কথা বলে। ভ্যাট, ট্যাক্স, ইনকাম ট্যাক্স ইত্যাদির দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা কর্মচারির ইচ্ছার উপর নির্ভর করে ট্যাক্স আদায় বিষয়টি। ট্যাক্স কর্মকর্তা যদি নিজে সরকার বনে ১০ লাখের জায়গায় পাঁচ লাখ আদায় করেন তাহলে কার কি করার আছে?
আমি সেদিকে যাচ্ছি না। শুধু বলতে চাই লাগামহীন অব্যবহৃত কৃষি জমির কথা। এগুলোকে কিভাবে উৎপাদনশীল করা যায় সে বিষয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। যারা কৃষিতে আগ্রহী বা কাজ করতে আগ্রহী তাদের জমির অভাবে তারা পারছে না। ফলে বেকার দিন কাটাচ্ছে আর যাদের জমি আছে অথচ তারা এখানে ফসল ফলাতে আগ্রহী নয় বা তাদের চাষাবাদ করার দরকার নেই। এভাবে দেখা যায় যে এমনিতে সরকারি উদ্যোগে মিল ফ্যাক্টরি-কারখানা গড়ে উঠছে না যেখানে বেকারদের কর্মসংস্থান হবে। আবার বেকাররা কৃষিতে ইচ্ছুক হলেও জমি পাচ্ছে না কাজ করতে বা সেটা লাভজনক নয় বলে হাত দেয় না। তাই কৃষি জমিকে উৎপাদনশীল করার নিমিত্তে এই মুহূর্তে সরকারের কিছু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। শত শত বিঘা জমির মালিক খুঁজে বের করে তাদেরকে এই সমস্ত জমিকে উৎপাদনশীল করার পরামর্শ দেয়া। এগুলোতে মিল ফ্যাক্টরি কারখানা তৈরি করতে সহযোগিতা করা অথবা সহজ শর্তে কৃষকদের সেখানে সম্পৃক্ত করা যাতে কৃষক এবং মালিক উভয়ই উপকৃত হয়। যারা দীর্ঘদিন শত শত বিঘা জমি ফেলে রেখেছে তাদেরকে নোটিশ দেয়া অর্থাৎ যাদের মালিকানায় জমি পতিত থাকবে তাদের বার্ষিক ট্যাক্স দ্বিগুণ বা তিনগুণ করা আর যদি পাঁচ বছরের অধিক পতিত থাকে তাহলে সরকারি হুকুম দখলে বাজেয়াপ্ত করা।
দেশের উন্নয়নের স্বার্থে এদেশের প্রতিটি নাগরিক কাজে লাগুক, নিজের উন্নয়ন করুক এটাই সবাই চায়। বেকার সমস্যা দূরীকরণে ভূমি মন্ত্রণালয় এবং ভূমি প্রশাসন যথেষ্ট সজাগ হলে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। ভূমি রেজিষ্ট্রি ফি ৬% থেকে ৯% করে বসে থাকলে বেকারত্ব দূর হবে না। যারা যথেষ্ট অর্থ বিত্তের মালিক তারা রেজিষ্ট্রি ফি ১৫% ও দিতে পারবে। তাদের জন্য এটা কোন ব্যাপার না। বরং ভূমিহীনরা যাতে ভূমির মালিক হতে পারে, নিজের ঠাঁই করে নিতে পারে, নিজের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ঘটাতে পারে সেই বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারি খাস জমি, ব্যক্তি মালিকানায় পতিত ভূমি, জলমহাল বনভূমি ইত্যাদির সঠিক ব্যবহার সাধারণ জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজে লাগালে বাংলাদেশের অগ্রগতি কেউ রুখতে পারবে না। ষোল কোটি মানুষের বত্রিশ কোটি হাত কাজে লাগুক, বেকার সমস্যা দূরীভূত হউক, সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলে যাক, প্রত্যেকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হউক, একুশ শতকের গোড়ায় দাঁড়িয়ে আমরা সকলে এই স্বপ্নটিই যেন দেখি।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • প্রসঙ্গ : কওমি মাদরাসা সনদের সরকারি স্বীকৃতি
  • পাহাড় ধ্বস
  • কালের গভীরে অমূল্য জীবন
  • সড়ক সন্ত্রাস প্রসঙ্গ
  • সনদ অর্জনই কি শিক্ষার লক্ষ্য?
  • সড়ক দুর্ঘটনা
  • সিসিক মেয়র এবং আমাদের প্রত্যাশা
  • মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু
  • বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা
  • ১৫ আগস্ট ’৭৫ : ধানমন্ডি ট্রাজেডি
  • সেই দিনটির দুঃসহ স্মৃতি
  • মুক্তিযোদ্ধার দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু
  • মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু
  • চিরঞ্জিব বঙ্গবন্ধু
  • ক্ষমা করো পিতা
  • এক নেতা এক দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ
  • পোয়েট অব পলিটিক্স
  • শুধু সাক্ষরতা বৃদ্ধি নয়, প্রকৃত শিক্ষা চাই
  • নাগরিক সাংবাদিকতা ও দায়বদ্ধতা
  • শিক্ষার্থীদের আন্দোলন : আমাদের শিক্ষা
  • Developed by: Sparkle IT