মহিলা সমাজ

স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আয়মন’

ইছমত হানিফা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০২-২০১৮ ইং ০২:৪৩:১৬ | সংবাদটি ৪০৯ বার পঠিত

২৬ জানুয়ারি, বিকেল, শুধু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আয়মন দেখার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়া। যতটুকু আগ্রহ নিয়ে দেখতে আসা, লোকে লুকারণ্য রিকাবি বাজারের কাজী নজরুল অডিটোরিয়ামে এসে সেই আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। তিল ধারনের জায়গা নেই। এতো লোক, সাথে আরও আছে কথাকলির আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সন্ধ্যার পরে বড় পর্দায় ঘোষণা আসলো, এখন প্রদর্শিত হবে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আয়মন। মঞ্চে আসেন, ‘আয়মনের পরিচালক রহমান মনি। খুব সংক্ষেপে তুলে ধরেন ‘আয়মন’ এর থিম এবং তার সৃজনশীল চিন্তার উৎস।
স্কিনে ফুটে উঠে দুইটি কন্যা শিশুর বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপ। ছবির কাহিনী গড়ে উঠেছে সাত বছরের একটি গ্রাম্য বালিকাকে নিয়ে। কুসংস্কার ও সামাজিক রীতিনীতির ভেড়াজালে আটকা জীবন আর কল্পনা জগতের মধ্যে ভ্রমনের এক অপূর্ব অনুভূতি নিয়ে প্রধান চরিত্র ‘আয়মনের’ নাম ভূমিকায় শিশুটির সাবলিল অভিনয় চরিত্রকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। প্রথম অংশে বাবার কথায় সাজ গোজের জিনিসপত্র লিপস্টিক, নেইলপালিশ, মেকাপবক্স রাগে ক্ষোভে ভাঙ্গতে থাকে, পা দিয়ে পিষে শিশু মনের অপ্রাপ্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। মূলত এই দৃশ্যের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে প্রগতিশীল মনোভাব। এই দৃশ্য দেখতে গিয়ে আমার মনে পড়ে যায় ‘প্রবোধ কুমার সান্যাল এর লিখার কথা। আচার ধর্মের জোরে যা চলে আসছে, তাকেই একমাত্র আদর্শ বলে স্বীকার করা যায় না। আমি তুমি এ কালের মানুষ। এ কালের শিক্ষা, এ কালের মনোভাব, এ কালের রীতিনীতি ছাড়া আমাদের চলতে পারে না। সুতরাং সে কালকে ছাঁচ বদলে এ কালের মতো হতে হবে। এই ছাঁচ বদলানোটাই হচ্ছে ইভল্যুশন, এরই নাম প্রগতি। একে যারা স্বীকার করে না, তারা জরাগ্রস্ত। তাদেরই নাম প্রাচীনপন্থী।
তেমনি এক প্রাচীনপ্রন্থি মনোভাবের বিরুদ্ধে নব উদ্যোমে উদ্দীপ্ত এক শিশু মনের আবেগ প্রকাশ পেয়েছে চলচ্চিত্রটি। ‘আয়মন’ কেন্দ্রীয় চরিত্রের মধ্যে স্বাধীনচেতা মনের যে আকুতি, আবার বাবার প্রতি সন্তানের যে সহজাত ভালোবাসা, তা স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। যদিও বাবা, মেয়ের ইচ্ছার মাঝে রয়েছে ব্যাপক ব্যবধান, যার মধ্য দিয়ে, আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য বুঝা যায়। তারপরও বাবার প্রতি মেয়ের ভালোবাসার প্রকাশ।
প্রধান চরিত্র ‘আয়মনের’ মননে লালন করে, যে পিতাকে যার কাছে সে শুধু এক কন্যা শিশু নয়, কল্পনা পিতার কাছে আয়মন হচ্ছে বাবার অতি আদরের সন্তান। আয়মনের চাওয়া, পাওয়ার জায়গা। ভাবতে অবাক লাগে কিছু কুসংস্কার মানুষের মনকে এতোটাই কুলষিত করে যে, সেখানে সন্তানের প্রতি পিতার ভালোবাসার মাঝখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, কুসংস্কারের কালো পর্দা। বর্তমান সমযে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানীরা এমন কুসংস্কারকে অনেকাংশে দায়ি করেছেন। আর প্রত্যেক ধর্মের ভিতরেও সন্তানের প্রতি মা বাবার দায়িত্ব সম্পর্কে যা আছে, তা সবাই মানতে পারে না, কিংবা সম্পর্কে যা কিংবা মানার ক্ষেত্রে ধর্মীয় গোড়ামী বাধা হয়ে দাঁড়ায় ‘আয়মন’ সাত বছর বয়সী এক মিষ্টি মেয়ে যার চিন্তা চেতনায় শিশু মনের আধুনিকতা ফুঠে উঠেছে। কিন্তু তার বাস্তব বাবা আর কল্পনার বাবা মাতে অনেক ফারাক। শুধু ফারাক নয় এ একেবারে বিপরীতধর্মী দুই চরিত্র। বাস্তবের বাবা আয়মনের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন নিজের ইচ্ছা। যার প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে আয়মন সৃষ্টি করেছে, তার নিজের কল্পনার জগৎ। সেই জগতে বিচরণ করতে করতে এক সময় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পরিচালক রহমান মনি সব দর্শকের মতো আমাদের নিয়ে যান আয়মনের কল্পনায়। নিখুঁত অভিনয়, নীরব সুক্ষ সংলাপ আমাদের মনে বাস্তব ফুটিয়ে তোলে। নান্দনিক শৈল্পিক দৃশ্য ঘোরের মধ্যে নিয়ে যায়। আর এখানেই কাহিনীকার এবং চলচ্চিত্রকারের স্বার্থকতা। যখন দেখি, প্রধান চরিত্র ‘আয়মন’ এর কল্পনার পিতা গাছে চড়েন, তাকে নিয়ে গান করেন, তার সাথে খেলা করেন। আয়মনকে নিয়ে হাটে যান, নানান জিনিস কিনে দেন আলতা, চুড়ি, লিপস্টিক। ফেরার পথে যখন রেললাইন ধরে বাবা, মেয়ে হাঁটছিল তখন হঠাৎ গাছের ডালে আয়মনের ওড়না লেগে আটকে যায়। বাবা মেয়েকে নিরাপদ জায়গায় রেখে, গাছ থেকে লাল ওড়না আনার চেষ্টা করছেন। এক পর্যায়ে, ট্রেন চলে আসে, মেয়ে বাবাকে ডাকে আর কাঁদে। আমার পাশে আয়মনের বয়সী এক মিষ্টি মেয়ে সারা সানজিদার বাবা বসা ছিলেন। লক্ষ্য করে দেখলাম, আমার মতো তারও চোখ ছল ছল করছে। চরিত্র এবং দৃশ্য এতো হৃদয়স্পর্শী ছিল। এর পরের দৃশ্য ভিন্ন, আয়মন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে এবং ওর বাবাকে কঠোর হয়ে মায়ের সাথে ঝগড়া করতে দেখে এবং এই দৃশ্যের মধ্য দিয়ে আয়মন কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে আসে। মূলত বাবার প্রতি মেয়ের ভালোবাসা, শিশুমনের চাওয়া, পাওয়ার এবং সারল্য শিশু স্বভাবের চিরায়ত রূপের স্পষ্ট প্রকাশ হয়েছে ‘আয়মন’ নাম কেন্দ্রিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT