উপ সম্পাদকীয়

অপরিকল্পিত মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনা

মাহ্বুবা ইসলাম প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০২-২০১৮ ইং ০৩:০৮:২৫ | সংবাদটি ১৭ বার পঠিত

মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনা- এটি এমন একটি ব্যাপার যা জনসমক্ষে আলোচনার কোনো বিষয় না বলে সাধারণত মনে করা হয়। তা হওয়া উচিত বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। কিন্তু কেন? একটি সহজ বাতায়নের মধ্য দিয়েই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মাধ্যমে শুরু করা যায় এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলা। প্রতিবছর বাংলাদেশে অপরিকল্পিত মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে। এই অপচয় হওয়া টাকার পরিমাণ এমন, যা উন্নয়নশীল দেশের সার্বিক উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা যেত। বর্তমান অবস্থার প্রকৃত উপলব্ধি তখনই হবে, যখন সূক্ষ্ণভাবে বিষয়টিকে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। প্রতিদিন সারাবিশ্বের মোট জনসংখ্যা দ্বারা ২৩৭ কোটি কিলোগ্রাম মানববর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে, আর সহজেই এ বিপুল পরিমাণ মানববর্জ্য বিভিন্নভাবে পুনর্ব্যবহার করা যায়, যা পরিবেশের জন্য এমনকি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে অপরিকল্পিত ও অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনার কারণে সুযোগ তৈরির পরিবর্তে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।
বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা আরও ভালোভাবে পর্যালোচনা করা যাক খুলনার উদাহরণ টেনে। শুধু খুলনায় প্রতিদিন ১২ লাখ কিলোগ্রাম মানববর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে। প্রায় ৬২ ভাগ সেপটিক ট্যাঙ্কের সঙ্গে সংযুক্ত ল্যাট্রিন ব্যবহার করে। এদের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই সোক ওয়েল (যা সেপটিক ট্যাঙ্কের পানি পরিশোধনে ব্যবহূত হয়) নেই। যেসব সেপটিক ট্যাঙ্কে এ সুবিধা রয়েছে, সেগুলোও ঠিকভাবে কাজ করে না। খুলনার ভূগর্ভস্থলে পানির স্তর ভূপৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির সঙ্গে অপরিশোধিত মানববর্জ্য সহজেই মিশে যায়। এর মাধ্যমে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ এবং আমাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। অপরিশোধিত মানববর্জ্যরে কারণে অ্যানোমিয়া, কলেরা, আর্সেনিকোসিস, ডেঙ্গু, ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস, কৃমি সংক্রমণ, ম্যালেরিয়া, চোখের সংক্রামক ব্যাধিসহ বিভিন্ন রোগের আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
উল্লিখিত বিষয় ছাড়াও আরও একটি ব্যাপার রয়েছে, যে কারণে মানববর্জ্যরে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা বেশ জরুরি। যে মানুষগুলো মানববর্জ্যপূর্ণ সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিস্কার করে, তাদেরকে আমরা সুইপার নামেই চিনি। এরা সমাজ, গোষ্ঠী, জাতি এমনকি দেশের অন্যদের দ্বারা নিগৃহীত ও অবহেলিত হচ্ছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে এ মানুষগুলোর জীবন ব্যবস্থা। পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতাকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশ রক্ষা করার গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলেও এর পরিপ্রেক্ষিতে তাদের জীবনের চিত্র বেমানানই বটে। দি ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) এ কাজের জন্য চারটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক নির্ধারণ করে দিয়েছে। আইএলওর মতে, যে কোনো কাজের ক্ষেত্রে কর্মীর সম্মান, সমতা, ন্যায্য আয় এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যকীয়।
দুঃখজনকভাবে, মানববর্জ্য পরিস্কারকর্মীরা এসব মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সমাজ এসব শ্রমিককে ‘সুইপার’ নামেই চেনে এবং তাদের সঙ্গে এমনভাবে ব্যবহার করে, যেন তারা এই সমাজের কেউ না এবং সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তারা উপস্থিত থাকার যোগ্য না। তাদের আয় অনেক কম এবং বয়স্ক শ্রমিকরা বার্ধক্য ভাতাও পান না। যেহেতু তারা সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিস্কারের কাজ করেন, সেহেতু তারা বিভিন্ন রোগে ভোগা ছাড়াও শ্বাসকষ্ট, জীবাণুর আক্রমণ, পায়ের পাতা ও শরীরের অন্যান্য অংশে আঘাত পেয়ে থাকেন। এর ওপর তাদের বেশিরভাগই পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ পান না। এক কথায়, এ মানুষগুলো কোনো সুযোগ-সুবিধাই পান না, যা একটি সম্মানজনক চাকরিতে সাধারণত থাকে এবং এ রকম দুর্বিষহ জীবন কোনোভাবেই তাদের প্রাপ্য না। তারা যদি এ পরিস্কারের কাজ না করতেন আর মানববর্জ্য পরিবেশের সঙ্গে মিলে গিয়ে বিভিন্ন রোগ ছড়াত, তবে কী হতো তা কি আমরা ভেবে দেখেছি। মাত্র একদিনের জন্য যদি এ শ্রমিকগুলো কাজ বন্ধ করে রাখে ভেবে দেখুন, আমাদের জীবন কতটা দুর্বিষহ হয়ে উঠত। তাদেরকে আজ আমরা অন্য চোখে দেখি, তাদের সঙ্গে কথা বলতে আমাদের লজ্জা লাগে; এমনকি তাদের আশপাশে যেতেও আমাদের কত সংশয়, যা মোটেই কাম্য নয়। তারাও আমাদের মতো মানুষ এবং পরিবেশের জন্য, আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি তারা করেন। কেন দিতে পারব না তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু? সমাধান শুধু মানববর্জ্য পরিস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং শ্রমিকদের সমাজের অংশ হিসেবে মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখাও একটি সমাধান। বিভিন্নভাবে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব। সুষ্ঠুভাবে অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে মানববর্জ্য সংগ্রহ, অপসারণ এবং পরিবহন করে সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে যে, পরিবহন করে মানববর্জ্য কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে? উত্তরে রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা।
পরিশোধিত মানববর্জ্য বিভিন্নভাবে পরিবেশের, এমনকি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ভ্যাকুটাগ (সাধারণত ইঞ্জিনচালিত গাড়ির ওপর স্থাপিত এমন এক ধরনের মেশিন, যার মাধ্যমে টয়লেটের পিট বা সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে মানববর্জ্য বা মল সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলা হয়) দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ে সেপটিক ট্যাঙ্কের বর্জ্য বা মল খালি করা যেতে পারে। পরে মানববর্জ্যপূর্ণ ভ্যাকুটাগটি দিয়ে মানববর্জ্য শোধনাগারে বা নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে পরিশোধন করে পুনরায় ব্যবহারোপযোগী করা যেতে পারে। যেমন- বায়োগ্যাস, জৈব সার এবং পাওয়ার প্ল্যান্টে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানো যাবে। এভাবে পরিবেশ পরিস্কার রাখার মাধ্যমে রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা যেমন কমে যায়, তেমনি নতুন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি করে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা যেতে পারে। এ ছাড়া মানববর্জ্য পরিস্কারকর্মীদের এসব প্রতিষ্ঠান সম্মানের সঙ্গে ভালো বেতনে নিয়োগ দেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। মানববর্জ্য শোধন ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন সম্ভব, যার ফলে লাভবান হবে সবাই।
বর্তমান অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে পুরো ব্যবস্থাটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে দরকার একটি উপযুক্ত পরিকল্পনা ও নীতিমালা। সম্প্রতি মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রাতিষ্ঠানিক এবং আইনি কাঠামোর আনুষ্ঠানিক প্রকাশ ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আশার আলো হিসেবে বিবেচিত। সম্প্রতি ‘বিল অ্যান্ড ম্যালিন্ডা গেটস্ ফাউন্ডেশন’ ও ‘ইউকে ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ডিএফআইডি)’-এর অর্থায়নে ‘এসএনভি নেদারল্যান্ডস্ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন’-এর এফএসএম বা ‘বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের নগরকেন্দ্রিক দারিদ্র্যবান্ধব ও ব্যবসাভিত্তিক মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক প্রকল্পটি বেসরকারি খাতের পক্ষে বর্তমান সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী একটি পদক্ষেপ। বেসরকারি সংস্থাগুলোর নেওয়া পদক্ষেপ সরকারকে এ সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করবে। সরকারি-বেসরকারি খাত এক হয়ে বর্তমান সমস্যার সূক্ষ্ম পর্যালোচনার মাধ্যমে আধুনিক এবং কার্যকর মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন সম্ভব। যার ফলে আমরা সমাজে ও অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনতে পারব। তাই এখনই সময় এক হয়ে কাজ করার।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মালয়েশিয়া ভ্রমণ
  • মাউন্ট রয়েল
  • শিক্ষকতা পেশা না ব্রত
  • জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবিলা
  • ভান্ডারে তব বিবিধ রতন
  • বই, বইমেলা এবং অমর একুশে গ্রন্থমেলা
  • বিদেশমুখী রোগীর স্রােত ঠেকানো জরুরী
  • আপন ভুবন, অচেনা আকাশ
  • ভাষা আন্দোলন
  • বিদ্যুৎ সভ্যতার মাপকাঠি
  • রাবার শিল্পের সুদিন আসছে
  • মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বরূপ
  • পতিতপাবন শ্রী রামকৃষ্ণ
  • উন্মত্ত বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা
  • শিশুদের একটি ভাবনার জগৎ দিন
  • ‘জীবন শেষের গান’ ও প্রসঙ্গ কথা
  • একটি জীবন একটি উদাহরণ
  • বিশ্বায়নে বাংলা ভাষা
  • শ্রেণী বৈষম্যই বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ
  • তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করতে হবে
  • Developed by: Sparkle IT