ইতিহাস ও ঐতিহ্য

শিল্পকলার উন্নয়নে মুঘলদের ভূমিকা

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০২-২০১৮ ইং ০৩:১০:০৫ | সংবাদটি ১২৯ বার পঠিত

বিশ্ব শিল্পের ইতিহাসে মুঘল শিল্পের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে। মুঘল মিনিয়েচার বা ক্ষুদ্রচিহ্ন বিশ্বের বিস্ময়। ক্যালিগ্রাফি চিত্রের ক্ষেত্রেও সুখ্যাতি পৃথিবীজুড়ে আর এসবের মূলে রয়েছে মুঘল স¤্রাটদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং সহযোগিতা। মুঘল সা¤্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ বাবর স্বল্পসময় রাজত্ব করলেও এবং মুঘল সা¤্রাজ্যের ভিত ততটা পাকাপোক্ত করতে না পারলেও শিল্পকলার উন্নয়ন যে তখন থেকেই শুরু হয়েছে তা বিভিন্ন চিত্রে স্পষ্ট। ভোজসভা বা ভোজ উৎসবে স¤্রাট বাবর নামক চিত্র এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ। মূলত মুঘল স¤্রাটগণ তাদের এবং তাদের পরিবারের সদস্য সভাসদদের কর্মকান্ডের চিত্র আঁকিয়ে নিতেন শিল্পীদের দিয়ে। এ জন্য শিল্পী নিয়োগ দেওয়া হতো এবং তাদেরকে সর্বতোভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা হতো রাষ্ট্রীয়ভাবে। মুঘল সা¤্রাজ্যের বিখ্যাত পন্ডিত বা ঐতিহাসিক আবুল ফজল তার গ্রন্থ আইন-ই-আকবরিতে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবেশন করেছেন। তিনি লিখেছেন, স¤্রাট আকবর শিল্পকর্ম নির্মাণের জন্য এক শ’ চিত্র শিল্পীকে তার দরবারে নিয়োগ দিয়েছিলেন যারা পারস্যের দু’জন শিল্পী মীর সৈয়দ আলী এবং আব্দুস সামাদের অধীনে কাজ করতেন। ফলে স¤্রাট আকবরের সময়কালে এসব শিল্পীর মাধ্যমে ভারতীয় এবং ইসলামিক ধারার সংমিশ্রণে বিশেষ ধরনের এক নবধারার শিল্পের সৃষ্টি হয় যাকে মুঘল ঐতিহ্যের শিল্প হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। নতুনভাবে সৃষ্ট এই মুঘল ঐতিহ্যের চিত্রকর্মে ঐশ্বরিক বা আধ্যাত্মিকতার অনুভূতি যেমন স্পষ্ট, তেমনি বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়।
স¤্রাট আকবর চিত্রকর্মকে ভাষা হিসাবে গণ্য করতেন। তাই তিনি চিত্রের মাধ্যমে বিষয় উপস্থাপনের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে বিশাল গ্রন্থে অসংখ্য কাহিনী ও বক্তব্য প্রধান চিত্তাকর্ষক চিত্রের সমাহার ঘটেছে। যেমন দস্তা-ই-আমির হামজা, আকবরনামা প্রভৃতি। বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য শিল্পী এসব হস্তলিখিত গ্রন্থ (ম্যানাস্ক্রিপ্ট) অলঙ্করণের কাজ করতেন। দাস্তান-ই-আমির হামজার চিত্রাঙ্কনের কাজ সম্পন্ন করতে একদল শিল্পীর সময় লেগেছে ১৫ বছর। হস্তলিখিত এ গ্রন্থে ১৪০০ চিত্রের সমাবেশ ঘটেছে। এসব চিত্রে নানা ধরনের কাহিনী বিধৃত হয়েছে। যেসব চিত্র দর্শনেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে কাহিনী বা গল্পের বক্তব্য। আকবরনামার একটি চিত্রের নাম ‘স¤্রাট আকবরের হরিণ শিকার’। কোনো এক পাহাড়ি জঙ্গলে স¤্রাট আকবর তার পরিবারের সদস্য ও অসংখ্য অনুচরদের নিয়ে হরিণ শিকারে ব্যস্ত। স¤্রাটসহ কয়েকজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ঘোড়ার পিঠে উপবিষ্ট। অনেকেই বন্দুক-বল্লাম হাতে হরিণকে তাড়া করেছেন। ভীত সন্ত্রস্ত হরিণ সম্মুখ পানে ছুটে চলেছে। কোথাও বা সিংহ হরিণ ভক্ষণে ব্যস্ত। স¤্রাট আকবর একটি হরিণকে লক্ষ করে ঘোড়া ছটিয়ে চলেছেন। হরিণের সঙ্গে জঙ্গলের অন্যান্য ছোট বড় জীবজন্তুও ছুটেছে প্রাণ বাঁচাতে। সব মিলে অপূর্ব শিকার দৃশ্যের চিত্র। এ চিত্রে কে কোথায় কী ভূমিকা পালন করছেন তা স্পষ্ট। এ চিত্রের বিষয় অনুধাবন করতে গ্রন্থে লেখা কোনো কাহিনী পড়ার প্রয়োজন পড়ে না। চিত্র দেখেই বোঝা যায়, চিত্র দেখেই অনুধাবন করা যায় ঘটনার পরম্পরা। কারণ প্রতিটি চিত্রে ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র এবং গুরুত্বহীন বিষয়কেও এতটাই গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে যে, যে কোনো অক্ষর জ্ঞানহীন দর্শকও চিত্রে কী ঘটেছে তা স্পষ্টরূপে অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন। শিল্পীরা কখনো কোনোরূপ সমস্যা অনুভব না করার কারণেই এতটা সূক্ষ্মভাবে প্রতিটি চিত্র অঙ্কন করতে সক্ষম হয়েছেন স¤্রাটদের অকৃপণ উদারতার কারণে।
স¤্রাট আকবর যে, শুধু ইসলামী চিত্রকলা নিয়েই ভেবেছেন তার নয় তিনি হিন্দু ধর্ম নিয়েও ভেবেছেন এবং সে বিষয়েও চিত্রঙ্কনের ব্যবস্থা করেছেন। তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় গ্রন্থ ‘রজম-নামা’ অর্থাৎ মহাভারতের চিত্রাঙ্কনেরও ব্যবস্থা করেছেন। রজম-নামাতে ১৬৯ টি দৃষ্টিনন্দন চিত্রের সমাবেশ ঘটেছে। এই গ্রন্থের কাজ সম্পন্ন হয় ১৫৮৯ সালে। শিল্পী দাসোয়ান্তের নেতৃত্বে একজন শিল্পী এ কাজসম্পন্ন করেন কাজটি যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে স¤্রাট আকবর চার লাখ রুপি শিল্পদের প্রধান করেছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে। স¤্রাট আকবরের আর এক স্মরণীয় কীর্তির নাম ‘আকবর নামা’। আকবর-নামা মুলত আকবরকে নিয়ে রচিত হস্তলিখিত (ম্যানস্ক্রিপ্ট) গ্রন্থ। গ্রন্থে স¤্রাট আকবরের প্রশন্তি গাওয়া হয়েছে। স¤্রাট আকবরের কর্মকান্ডের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। বলা যায় স¤্রাট আকবরের শাসনকালের পুরো ঘটনা এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। আর এসব ঘটনার বর্ণনা করতে অসংখ্য শিল্পী অপূর্ব সুন্দর চিত্র এঁকেছেন। এ গ্রন্থে মুঘল সা¤্রাজ্যের বিষয়গুলো অন্তর্ভূক্ত করার জন্য স¤্রাট আকবর ১৫৭৪ এ এক রেকর্ড অফিস স্থাপন করেন এবং তার দরবারের অভিজ্ঞা প্রবীণ কর্মকর্তাদের তথ্য সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত করেন। ঐতিহাসিক পন্ডিত আবুল ফজল গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। তিনি এ গ্রন্থের প্রথম অংশ তার সম্পন্ন করে ১৫৯৬ স¤্রাট আকবরের হাতে অপর্ণ করেন। স¤্রাট আকবর এ গ্রন্থে রচনার সময় নিজেও খোঁজখবর রাখতেন। গ্রন্থের চিত্রগুলো কতটা সম্পন্ন হলো, চিত্রগুলো কেমন হলো কী হওয়া উচিত, ইত্যাকার বিষয়ে শিল্পীদের সাথে কথা বলেন দিক নির্দেশনাও দিতেন। পন্ডিত আবুল ফজল স¤্রাট আকবরের পরামর্শ কিংবা দিকনির্দেশনার কতটা বাস্তবায়ন হলো যে বিষয়ে প্রতি সপ্তাহে স¤্রাট আকবরকে জানাতেন এবং গ্রন্থের অংশগুলো উপস্থাপন করতেন। প্রবীণ কর্মকর্তাদের তথ্য সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত করে রচনার সময় নিজেও খোঁজখবর রাখতেন। গ্রন্থের চিত্রগুলো কতটা সম্পন্ন হলো, চিত্রগুলো কেমন হলো কী, হওয়া উচিত, ইত্যাকার বিষয়ে শিল্পীদের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও দিতেন। পন্ডিত আবুল ফজল স¤্রাট আকবরের পরামর্শ কিংবা দিকনির্দেশনার কতটা বাস্তবায়ন হলো সে বিষয়ে প্রতি সপ্তাহে স¤্রাট আকবরকে জানাতেন এবং গ্রন্থেও অংশগুলো উপস্থাপন করতেন। এসব তথ্য লাভের পর স¤্রাট নিজে এসব বিষয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন এবং চিত্রের নান্দনিক বিষয়ে এবং রঙ প্রয়োগের যৌক্তিকতার বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। ফলে কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পীসহ সবাই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সব কাজ সম্পন্ন করতেন। স¤্রাট আকবর তার সময়কালে ২৪ হাজার ম্যানস্ক্রিপ্ট সংগ্রহ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ লাইব্রেরি গড়ে তুলেছিলেন। এসব ম্যানাস্ক্রিপ্টের প্রতি সুন্দরভাবে লিখিত এবং অলঙ্কৃত ছিল। এসব ম্যানাস্ক্রিপ্টের মধ্যে ছিল স¤্রাটের পরিবারের সদস্য আত্মীয়স্বজন এবং সভাসদদের যৌবনদীপ্ত অভিব্রক্তি এবং নান্দনিক বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হতো।
স¤্রাট জাহাঙ্গীর তার প্রসাদের দেয়ালে শিল্পীদের দ্বারা চিত্রাঙ্কন করিয়েছিলেন। রাজপুত্র হিসাবে জাহাঙ্গীর তার বাবা স¤্রাট আকবরের শিল্পীদের ওয়ার্কশপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে বাবার আদর্শে যেমন নিজেকে গড়ে তুলছেন, তেমনি শিল্পীদের প্রতিও অধিক শ্রদ্ধাশীল হতে পেরেছিলেন। শ্রদ্ধার সঙ্গে তিনি শিল্পীদের মূল্যায়ন করেছেন। তিনি তার ব্যক্তিগত শিল্পী হিসাবে ইরানের শিল্পী আগা রেজাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি দক্ষ শিল্পীদের পুরস্কৃত বা সম্মানিত করতেন। তুজুক-ই-জাহাঙ্গীর স্বার্থকভাবে অলঙ্কৃত করার জন্য তিনি শিল্পী আবুল হাসানকে সম্মানিত করেছেন। বাজপাথি মুঘল স¤্রাটদের অতি প্রিয় পাখি। স¤্রাট জাহাঙ্গীর এই পাখি খুব পছন্দ করতেন। স¤্রাট জাহাঙ্গীর পারস্য দেশ থেকে একটি বাজপাখি সংগ্রহ করেছিলেন। এই বাজপাখির সৌন্দর্যে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, এই পাখির রঙ এতই মনোমুগ্ধকর, এতই সুন্দর যে, ভাষায় তা প্রকাশ করা যায় না। বাজপাখির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে স¤্রাট জাহাঙ্গীর তার প্রিয় শিল্পী মনসুরকে সেই বাজপাখির চিত্র আঁকতে বলেন। স¤্রাটের নির্দেশ পেয়ে তিনি অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে বাজপাখির চিত্র এঁকেছিলেন। অপূর্ব সুন্দর হয়েছিল। পাখির চিত্রটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। শিল্পী মনসুর অসংখ্য পাখির চিত্র এঁকেছেন। কারণ স¤্রাট জাহাঙ্গীর পশুপাখি খুব পছন্দ করতেন। তিনি পছন্দ করতেন বলেই শিল্পী মনসুরকে দিয়ে সেগুলোর চিত্র আঁকিয়ে নিতেন। সাদা বক, তুর্কি মোরগ, হরিণসহ বহু চিত্র এঁকেছেন মনসুর এবং এসব চিত্র এঁকে খ্যাতি অর্জন করেছেন। স¤্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে তার প্রচেষ্টায় মুঘল শিল্পকলার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে। পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ে মুঘল শিল্পের সুখ্যাতি। মুঘল স¤্রাটদের প্রায় সবাই শিল্পকলার উন্নয়নে কমবেশি সহযোগিতা করেছেন।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • জাফলং নামকরণের ইতিকথা
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • জলপ্রপাতের নাম হামহাম
  • কেমুসাসের কাচঘেরা বাক্সে মোগল স¤্রাটের হাতে লেখা কুরআন
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বরইতলা গণহত্যা সম্পর্কে আজিজুল হক
  • ঐতিহ্যবাহী গ্রাম জলঢুপ
  • বাংলাদেশের বয়ন ঐতিহ্য
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • ইতিহাস গবেষক দেওয়ান নূরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী
  • লৌকিক শিল্প নকশি পিঠা
  • জেনারেলের বাড়িতে গণহত্যা
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • হত্যাকারির নাম বলা যাবে না
  •  প্রযুক্তির অপব্যবহারে বিপন্ন নারী-শিশু ও যুবসমাজ
  • মুক্তিযুদ্ধে লাউয়াই
  • সুবিধাবাদীদের পরিণতি
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঝরনা কলম : আজ বিলুপ্তপ্রায়
  • মুক্তিযুদ্ধে পুণ্যভূমি সিলেটের সূর্যসন্তানরা
  • Developed by: Sparkle IT