উপ সম্পাদকীয়

আপন ভুবন, অচেনা আকাশ

প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০২-২০১৮ ইং ০৩:১০:৩৯ | সংবাদটি ১৩ বার পঠিত

পরে জেনেছিলাম, নাটকটি যারা করেছিল তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাই অনুষ্ঠান পন্ড করার চেষ্টা করেছিল। তাদের বিরুদ্ধে অধ্যক্ষ মহোদয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে চেয়েছিলেন। আমিই তখন তাঁকে অনেক বলে-কয়ে নিরস্ত করি।
ওই দগদগে স্মৃতিটা তখনও মন থেকে মুছে যায়নি। পরের বছর হোস্টেলের ছাত্রদের অনুরোধে তাই চট করে হ্যাঁ বলতে পারলাম না। ছেলেরা তখন ফার্স্ট ব্লকের তাদের জনপ্রিয় সুপারিন্টেন্ডেন্ট, আমাদের সিনিয়র সহকর্মী, উদ্ভিদবিদ্যার গোলাম রসুল সাহেবের শরণাপন্ন হল। তিনি আমাকে খুব করে ধরলেন এবং বললেন, অনুষ্ঠান হবে নির্বিঘেœ, কোন রকম গোলমাল হবে না। তাঁর আশ্বাসে আমি রাজি হই। নাটকের নাম ছিল ‘একমুঠো আকাশ’। কার লেখা মনে নেই। হোস্টেলের কমনরুমের মোটামুটি বড়সড় হলে মঞ্চস্থ হয়েছিল নাটকটি। আমার প্রিয় ছাত্র, প্রাগুক্ত কাওসার আহমদ চৌধুরী এবং শাব্বির চৌধুরী দুইটি প্রধান চরিত্রে চমৎকার অভিনয় করেছিল।
এতে ‘নারী চরিত্র’ ছিল একটি এবং তাতে একটি মেয়েই অভিনয় করেছিল। মেয়েটির নাম ফরিদা। সুপারিন্টেন্ডেন্ট গোলাম রসুল সাহেবের মেয়ে। তবে ওই চরিত্রটিকে নাটকের ভাষায় নারী চরিত্র বলা যাবে কিনা জানি না। একটি আট ন বছরের ঘোর কৃষ্ণবর্ণ মেয়ের ভূমিকায় জবরজং মেক-আপ লাগিয়ে অভিনয় করেছিল সুদর্শনা ছোট্ট মেয়ে ফরিদা। সঙ্গে ছিল তার ভাই শিবলি। নাটকেও শিবলি ছিল তার ভাই। এই নাটকটি যখন মঞ্চায়িত হয় তখন আমি বিবাহিত। অনুষ্ঠানের দিন আমার স্ত্রী মমতাজ সিলেটেই ছিল। ছেলেদের বিশেষ আমন্ত্রণে হলে বসে পুরো নাটকটি দেখেছিল সে।
আমাদের বিয়ের পর প্রথম যে রমজান এল সেই রমজানে আমরা ছিলাম সিলেটে। কলেজ বন্ধ হয়ে গেল দীর্ঘ দিনের জন্য। আমার ভাইবোনেরা ছুটতে ছুটতে চলে গেল কুলাউড়ায় আব্বা-আম্মার কাছে। কিন্তু আমার ও মমতাজের কোথাও যাওয়া হল না। আমরা ইচ্ছা করলেই কুলাউড়া বা ঢাকা যেতে পারতাম কিন্তু কিছু উপরি উপার্জনের চক্করে পড়ে থাকতে হল সিলেটে। আমার বাণিজ্য বিভাগের সহকর্মী হোসেন আলী সাহেব ছুটির ভেতর আমাকে দু’টো বই লিখে দেয়ার প্রস্তাব দিলেন। একটা উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর জন্য ফাংশনাল ইংলিশ বা ব্যবহারিক ইংরেজির বই ও আরেকটা ¯œাতক (বাণিজ্য) ক্লাসের জন্য বাংলা ভাষায় বাণিজ্যিক ভূগোল। প্রথমটি লেখা আমার জন্য বিশেষ কঠিন কিছু ছিল না, কারণ ওই বিষয় তো আমি ক্লাসে পড়িয়েই থাকি, ওটা আমার সাবজেক্ট। তা ছাড়া বাজারে ওই বিষয়ে অজ¯্র বই পাওয়া যেত। কিন্তু ভূগোল সম্বন্ধে আমার জ্ঞান তো সেই স্কুল পর্যায় পর্যন্ত। ম্যাট্রিকের পর তো আর ভূ অর্থাৎ পৃথিবী গোল, না চ্যাপ্টা, না লম্বা সে খোঁজ রাখার দরকার পড়েনি। তাও আবার বাণিজ্যিক ভূগোল। ওটা আবার কী বস্তু। যা হোক, হোসেন আলী ভরসা দিলেন প্রয়োজনীয় বইপত্র সরবরাহ করবেন যাতে নিজে শিক্ষিত হয়ে অন্যকে শিক্ষাদানের নামে একটা কিছু গোঁজামিল দাঁড় করাতে পারি। দু’টো বইই ছুটির ভেতর লিখে দিতে হবে। বাংলায় লেখা ভূগোল বইয়ের নাকি খুব চাহিদা। ফলে লিখিবামাত্র নগদ বিদায় পাঁচ শ টাকা।
বসে গেলাম বই লিখতে। তারপর ওই ছুটির অবসরে মমতাজের সহায়তা নিয়ে একদিন লেখা হয়ে গেল বই দু’টি। দু’টোরই লেখকের নামের জায়গায় ছাপা হল ‘বাই এ্যান এক্সপার্ট প্রফেসার’। এক্সপার্ট! ইংরেজিতে যেমন তেমন, কিন্তু ভূগোলেও যে আমার এত ব্যুৎপত্তি তা আগে জানতাম না!
বই লেখা শেষ করে ছুটলাম কুলাউড়া। পরদিন না তার পরদিন জানি ঈদ। সন্ধ্যায় ইফতারের আগে পরে সবাই মিলে আকাশের আঙ্গিনায় পই পই করে খুঁজে চাঁদ বের করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু না, চাঁদ ওঠেনি। ঢাকা রেডিও থেকেও জানান হল কোথাও চাঁদ দেখা যায়নি। সবাই পরদিন রোজা রাখার প্রস্তুতি নিয়ে এক সময় ঘুমাতে গেলাম। চোখের পাতাটা কেবল লেগে এসেছে এমন সময় আশেপাশের বাসা থেকে হাঁকডাক চিৎকার। চাঁদ দেখা গেছে, আগামীকাল ঈদ কে যেন এসে ডেকে বলল, রেডিও খুলুন, রেডিওতে ঘোষণা দিচ্ছে, চাঁদ দেখা গেছে, কাল ঈদ।
কিন্তু তা কী করে হয়। রাত দশটা এগারটা পর্যন্ত তো ঢাকা রেডিও এক নাগাড়ে বলে গেল, চাঁদ দেখা যায়নি, এখন আবার উল্টো কথা বলছে কেন? রেডিও খোলা হল। সেখানে প্রচারিত হচ্ছে ‘এক জরুরি এলান’। পশ্চিম পাকিস্তানের সারগোদা না কোহাট কোথায় জানি চাঁদ দেখা গেছে, অতএব আগামীকাল পাকিস্তানের সবখানেও পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে। ... এসব ক্ষেত্রে আমাদের মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগত, দিনাজপুরে কিংবা সিলেটে, এমন কি ঢাকাও, চাঁদ দেখা গেলে কি একই ধরনের ‘জরুরি এলান’ রেডিও-পাকিস্তানের লাহোর-করাচী স্টেশন থেকে জারি করে ওসব জায়গায় ঈদের চাঁদ দেখা না গেলেও ঈদ পালনের হুকুম দেয়া হতো? আসলে পাকিস্তানি আমলে রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের ছোটবড় সব ব্যাপারে পিন্ডি-ইসলামাবাদের কথাই ছিল শেষ কথা। সে কথা আনুষ্ঠানিক-আনুষ্ঠানিক, জাহেরি বাতেনি-গায়েবি যে-ভাবেই আমাদের কাছে পৌঁছাক না কেন। চাঁদ দেখার মত ব্যাপারে হয়ত জোর করে চাপিয়ে দেয়ার মত কিছু ছিল না, কিন্তু এ কথা সত্য, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অসংখ্য বিষয়ে সেই ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের মত বাঙালির স্বার্থবিরোধী অনেক কিছুই জোর করে চাপিয়ে দেয়া হতো।
আমাদের প্রথম সন্তানের আগমনী বার্তা পাওয়ার পর মমতাজ ঢাকায় তার মা’র কাছে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এতে আমার তরফ থেকে না করার কিছু ছিল না। বাঙালি মেয়েরা এ সময়টাতে তাদের মায়ের ¯েœহচ্ছায়ায় থাকাটাই সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক মনে করে। আমার বোন রুকিয়াকে তো দেখেছি সুদূর করাচী থেকে বরমচালের মত নিভৃত পল্লীতে মায়ের কাছে ছুটে আসতে। আমি নিজে গিয়ে মমতাজকে ঢাকায় তার পিত্রালয়ে রেখে এলাম।
যতরপুরের বাসাটা হঠাৎ করে আমার কাছে খালি খালি লাগল। বিয়ের পর থেকে কয়েক মাস আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে এক সঙ্গে ছিলাম। আমাদের ছোট্ট বাসায় আমার স্ত্রীর সার্বক্ষণিক উপস্থিতি ও তার অপটু হাতের স্পর্শ ছিল সর্বত্র। তার চলে যাওয়াতে হঠাৎ করে একটা শুন্যতা অনুভব করলাম আমি। একটু রাগও হল তার ওপর; মনে হল, আমাকে ছেড়ে এভাবে না গেলেও বোধ হয় পারত সে।
যা হোক, আমি আবার ডুবে যাওয়ার চেষ্টা করলাম আমার আপন ভুবনে। কলেজ তো আছেই, সেই সঙ্গে ইউএসআইএস পুরান লেইন-জগদীশ বাবুর বাসা ইত্যাদি আবার চাঙ্গা হয়ে উঠল। সেই সঙ্গে কিছু কিছু ছাত্রের প্রতিদিন সকালে গুরুগৃহে এসে আমার কাছে নিখরচায় পাঠগ্রহণ চলল। যতরপুরে বাসা নেয়ার পর থেকেই এটা চলে আসছিল। এবার একটু বাড়ল।
এই প্রসঙ্গে আমার দু’তিনজন ছাত্রীর কথা মনে পড়ে। আমাদের বাসার ঠিক উত্তরে একটা খালি ডোবামত জায়গা ছিল। তার ওপারে ছিল একটি জুনাগড়ি পরিবার। ওই পরিবারের মেয়ে বিলকিস আমার ছাত্রী ছিল। লেখাপড়ায় সে বেশ ভাল ছিল। তাকে টাকার বিনিময়ে প্রাইভেট পড়ানোর জন্য তাদের বাসা থেকে একটি প্রস্তাব আসে। আমি সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করি। তবে সে ছাত্রী ভাল ছিল বলে আমি মাঝে মাঝে তাদের বাসায় গিয়ে তাকে পড়িয়ে আসতাম। এই পরিবারটি অত্যন্ত ভদ্র ও সৎ ছিল। বিলকিস সিলেট মেডিক্যাল কলেজের প্রথম অথবা দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্রী হিসেবে ডাক্তারি পাশ করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় শুনেছি অত্যন্ত ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে তারা পাকিস্তানে পালিয়ে যায়। বিলকিস এখন করাচীতে একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ ডাক্তার।
আমার আরেক ছাত্রী অধ্যাপক জগদীশ ভট্টাচার্য মহাশয়ের মেয়ে মঞ্জুশ্রীও ডাক্তারি পাশ করে সিলেট থেকে। সেও ছাত্রী মোটামুটি ভালই ছিল। ইন্ডিয়াতে গিয়ে তার বিয়েও নাকি হয়েছিল ভালই। দুঃখের বিষয় সে অকালবৈধব্য বরণ করে। অন্যান্য ছাত্রীদের মধ্যে রায়হানা সরকারি কলেজে ইংরেজির অধ্যাপনা করত বলে জানতাম। আর কারও খবর জানি না।
এই মুহূর্তে আরেকটি ছাত্রীর কথা মনে পড়ে গেল। সে ঠিক সরাসরি ছাত্রী ছিল না। মহিলা কলেজ না কোথায় থেকে আই.এ পরীক্ষা দিয়ে সে অকৃতকার্য হয়ে আবার পরীক্ষা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তবে কোন কলেজ থেকে নয়, প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে। তার বাবা ছিলেন আমার এক সহকর্মী জনাব ফিতরাত হোসেন ওয়াস্তি। উর্দুর অধ্যাপক দীর্ঘাকৃতি সুপুরুষ জনাব ওয়াস্তি মাথায় রোজ ফেল্ট হ্যাট পরে আসতেন কলেজে। কারও সঙ্গে বড় একটা মিশতেন না। তিনি একদিন আমাকে অনুরোধ করলেন, আমি যেন তাঁর বাসায় গিয়ে দু’একদিন তাঁর মেয়েটিকে ইংরেজি পড়াই। সহকর্মীর অনুরোধ ফেলা যায় না। আমি গেলাম। গিয়ে দেখি মাথায় ঘোমটা দেয়া খালাম্মা টাইপের এক মহিলা আমার ছাত্রী। পরে শুনেছিলাম বিবাহ-বিপর্যয়ের কারণে সে পিত্রালয়ে অবস্থান করছিল। প্রথম দিনেই বুঝলাম, ইংরেজিতে তাকে বোধ হয় তার পিতাও পাশ করাতে পারবেন না : ইংরেজি ভাষাজ্ঞান তার একেবারে ডডনং। আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম সে ভীষণ একগুঁয়ে টাইপের। আমি যদি বলি এটা পড়, সে বেঁকে বসে বলবে, না এখন আমি ওটা পড়ব। (বুঝলাম, কেন সে স্বামীর ঘর করতে পারেনি)।বিশেষ কিছু বলতে পারতাম না। একে তো বয়স্কা ছাত্রী-বয়স বাইশ-তেইশের কম হবে না, তার ওপর তার আব্বা হুজুর সারাক্ষণ পাশেই একটা চেয়ারে বসে পত্রিকা-টত্রিকা পড়তেন। (পড়তেন, না তরুণ শিক্ষকের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন, বলা মুশকিল। তবে কন্যা¯েœহে অন্ধ পিতাটি বোধ হয় জানতেন না তাঁর সব সময় কপাল কুঁচকে থাকা বিষাদাক্রান্ত কন্যাটি দুঃখজনক হলেও সত্যি তাঁর মত এত সুদর্শন ছিল না যে কোন ‘এলিজিবল ব্যাচেলরের’ সবিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে।...উপসংহার ‘পরিবেশগত কারণে’ এই ছাত্রী দিন কয়েক পড়িয়ে ক্ষান্ত দিয়েছিলাম আমি। তার বাবাকে অন্যান্য ব্যস্ততার অজুহাত দিয়েছিলাম। শুনেছিলাম সে ওইবারও পরীক্ষায় ডাব্বা মেরেছিল। তার জন্য আমার অজ¯্র সহানুভুতি।)
ছাত্রদের মধ্যে সে আমলে কাওসার আহমেদ চৌধুরীকে নিয়ে আমি বিরাট স্বপ্ন দেখতাম। হুট করে আর্ট কলেজ ছেড়ে এসে এম.সি কলেজে আই.এ ক্লাসে ভর্তি হয় সে। তার ইংরেজি খাতায় কলম ধরা যেত না। বাংলা, ইংরেজি ও অন্যান্য সব বিষয়ে সে ছিল দারুণ তুখোড়। শিক্ষকদের সবাই তার ব্যাপারে ছিলেন খুবই আশাবাদী। সে ছিল ভীষণ খেয়ালি ধরনের। কারও সঙ্গে বড় একটা মিশত না। কথাবার্তা বলত কম। ক্লাসে বসত পেছন দিকে। (যে অভ্যাসটা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমারও ছিল)। আই.এ ফাইন্যাল পরীক্ষায় সে ফার্স্ট-সেকেন্ড কিছু একটা হবেই, এমনটি ধারণা ছিল আমার। কিন্তু সবাইকে হতাশ করে এই খেয়ালি, ভাবুক প্রকৃতির, আমার অতি প্রিয় ছাত্রটি পরীক্ষাই দিল না। পরে সে কবি ও গীতিকার হিসেবে সুনাম অর্জন করেছে। তার আরেক পরিচয় সে জ্যোতিষী। আজকাল হঠাৎ কখনও-সখনও তার সঙ্গে সাক্ষাত হলে দেখি সেই আগের মতই সে আত্মস্থ হয়ে আছে, কী যে ভাবে সারাক্ষণ, সে যেন এই মাটির পৃথিবীতে থেকেও নেই। তার সঙ্গে ১৯৬৬ সালে শেষ দেখা হওয়ার প্রায় চার দশক পর বিদেশে হঠাৎ একদিন তার একটা চিঠি পাই। দেখি, পাগলাটা আমার হাতে লেখা আমারই একটা কবিতা পাঠিয়ে দিয়েছে, সঙ্গে একটা ছোট্ট চিঠি। ‘স্যার, এম.সি কলেজে আমার সম্পাদিত সাহিত্যপত্রের জন্য এই লেখাটি আপনার কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিলাম....।’ এতদিন পর তার কাছ থেকে সেই পাংশুটে কাগজটি পেয়ে চোখের কোনে পানি জমল। অন্তর থেকে প্রার্থনা করলাম আমার সেই অতীব মেধাবী, আপাদমস্তক কবি, শিল্পী, প্রাক্তন ছাত্রটির জন্য : সে যেখানেই থাকুক, যেভাবেই থাকুক, ভাল থাকুক।
এম.সি কলেজের আমার ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন অঙ্গনে দেশে-বিদেশে দুর্লভ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছে। এদের সাফল্যে আমি দারুণভাবে আপ্লুত। বয়সের দিক থেকে এরা আমার সমবয়সী না হলেও প্রায় কাছাকাছি। তবুও এদের অনেকেই যখন পথে-ঘাটে দেখা হলে সর্বসমক্ষে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে তখন বুকটা ভরে যায়। মনে হয় যেন বহুকাল পর আমার নিজের সন্তানের সঙ্গে দেখা। শিক্ষক-তিনি যেই হোন, সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত অথবা বিপর্যস্ত, বিত্তশালী অথবা হতদরিদ্র-তিনি শিক্ষকই, ছাত্রের কাছে তিনি আজীবন পিতৃতুল্য। এই বিশ্বাসকে হৃদয়ে চিরকাল স্থান দিয়ে আমিও আমার শিক্ষকদের আজও পায়ে হাত দিয়ে সালাম করি, যেমন করতাম আমার আব্বাকে। ‘যদ্যপি মোর গুরু শুঁড়িবাড়ি যায়/তদ্যপি মোর গুরু নিত্যানন্দ রায়’। এই নীতিতে আমি অটল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথিতযশা অধ্যাপক সুসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে আমি বেশিদিন পড়াইনি কিন্তু সে এখন আমার শিক্ষক। হ্যাঁ, আমার শিক্ষক। কোন ব্যাপারে ঠেকলে এবং বলা বাহুল্য, প্রায়ই ঠেকি, বিশেষ করে সাহিত্য বিষয়ক তত্ত্ব-তথ্য সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হতে গিয়ে মনজুরের শরণাপন্ন হই নিঃসঙ্কোচে। ভাল লাগে আমার ছাত্রের কাছ থেকে শিখতে, বৃদ্ধ পিতা যেমন শেখেন পুত্রের কাছ থেকে। তার কাছ থেকে এই জ্ঞানার্জনের বিনিময়ে আমি গুরুদক্ষিণা দেই প্রাণভরে তার শুভকামনা করে।
যতরপুরে আমার আরও দুইজন ছাত্র আমাদের প্রতিবেশি ছিল। একজন খায়রুজ্জামান চৌধুরী (বাংলাদেশের প্রথম কর ন্যায়পাল) ও অপরজন নাজমুল ইসলাম চৌধুরী (অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব)। এ ছাড়া সাহিত্যচর্চা, নাটক, খেলাধূলা ইত্যাদি প্রসঙ্গে কলেজে যারা আমার ঘনিষ্ঠ ছিল তাদের মধ্যে এম.এ মোমেন (জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি), এবাদুর রহমান চৌধুরী (সাবেক প্রতিমন্ত্রী), এম.আই চৌধুরী (অবসরপ্রাপ্ত সচিব), আহমদ মাহমুদুর রাজা চৌধুরী (অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব), মেজর জেনারেল (অবঃ) হারুন আহমদ চৌধুরী (যুদ্ধাহত বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা), চৌধুরী কয়েস সামী (বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক), ড. জায়েদ বখত (অর্থনীতিবিদ), তার বড় ভাই আমেরিকা প্রবাসী চিকিৎসক শমসের বখত (উল্লেখ্য, এদের পিতা সিলেটের সেই আমলের প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. জমশেদ বখত সিলেট গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে আমার আব্বার ছাত্র ছিলেন), ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক (রাজনীতিবিদ), এ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান মুজিব (সভাপতি, মৌলভীবাজার বার এসোসিয়েশন), সৈয়দ আহমদ আলী আজিজ মনন (কবি ও ব্যবসায়ী), শাহগীর বখত চৌধুরী (লন্ডন প্রবাসী ব্যবসায়ী ও ব্রিটিশ রাজনৈতিক নেতা), সৈয়দ মোহাম্মদ ফজলুল্লাহ (সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ), আব্দুর রহমান (জাতিসংঘের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা) প্রমুখের কথা মনে পড়ছে। এরা সবাই লেখাপড়ায় যেমন ভাল ছিল তেমনি সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চাতেও যথেষ্ট উৎসাহী ছিল। মোমেন, নুরুল ইসলাম, মনন ও আরও কারা কারা নিজ উদ্যোগে সাহিত্যপত্রিকা বের করত মাঝে মাঝে। একটা মানসম্মত সাময়িকীর নাম ছিল ঊষসী। কাওসার বোধ হয় ওটার সঙ্গেই জড়িত ছিল। আমি ও আমার কোনো কোনো সহকর্মী, যেমন আলাউদ্দিন আল আজাদ (বাংলা), আবুল বশর (বাংলা), আব্দুল আজিজ (অর্থনীতি), সুধীরচন্দ্র পাল (বাংলা) প্রমুখ ছিলাম তাদের উপদেষ্টা। পত্রিকা বের করা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ইত্যাদি ব্যাপারে ছাত্ররা সব সময় আমার পরামর্শ নিত। তাদের পত্রিকায় লেখা দেয়া ছাড়া আমি কখনও কখনও কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তিও করতাম। আমার বন্ধু, ভাতিজা আনোয়ার হোসেন (অর্থনীতি) ভাল রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইত। দু’একবার তাকে অনুষ্ঠানে গান গাইতে হয়েছে আমার অনুরোধে। আমাদের এক ছাত্রী কেয়া চৌধুরী খুব ভাল কবিতা আবৃত্তি করত। তার ছোট বোন, স্কুলছাত্রী মুক্তা ও শিবানী চক্রবর্তী বলে আরেকটি মেয়ে কলেজের অনুষ্ঠানে গান গাইতে আসত নিয়মিত। তখন সিলেটের শিল্পীদের মধ্যে আরতি ধর, ইয়ারুন্নেসা, বিদিতলাল দাস, লিয়াকত হোসেন প্রভৃতির খুব নাম।
এরা সচরাচর শহরের বড় বড় অনুষ্ঠানে গাইতেন। বেতারে ও পরবর্তীকালে টি.ভি,তে তো গাইতেনই। তখনকার বিখ্যাত শিল্পীদের মধ্যে নির্মলেন্দু চৌধুরী, রাখী চক্রবর্তী প্রমুখরা ওই সময়েই কলকাতায় গিয়ে গান গেয়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
সাহিত্যসভা, কবিতাপাঠ, সেমিনার ইত্যাদির আয়োজনে অগ্রণী ভূমিকা ছিল মুসলিম সাহিত্য সংসদের। এর প্

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বই, বইমেলা এবং অমর একুশে গ্রন্থমেলা
  • বিদেশমুখী রোগীর স্রােত ঠেকানো জরুরী
  • আপন ভুবন, অচেনা আকাশ
  • ভাষা আন্দোলন
  • বিদ্যুৎ সভ্যতার মাপকাঠি
  • রাবার শিল্পের সুদিন আসছে
  • মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বরূপ
  • পতিতপাবন শ্রী রামকৃষ্ণ
  • উন্মত্ত বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা
  • শিশুদের একটি ভাবনার জগৎ দিন
  • ‘জীবন শেষের গান’ ও প্রসঙ্গ কথা
  • একটি জীবন একটি উদাহরণ
  • বিশ্বায়নে বাংলা ভাষা
  • শ্রেণী বৈষম্যই বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ
  • তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করতে হবে
  • সূর্যলাল
  • চিত্রাঙ্কনে সারাহ্ নাদিমের কৃতিত্ব
  • সুশিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত হোক
  • ডিগ্রি অর্জন অপেক্ষা জ্ঞান মুখ্য
  • আপন ভুবন, অচেনা আকাশ
  • Developed by: Sparkle IT