উপ সম্পাদকীয়

ডিগ্রি অর্জন অপেক্ষা জ্ঞান মুখ্য

ইফতেখার হোসেন সিদ্দিকী প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০২-২০১৮ ইং ০৩:১০:৫৫ | সংবাদটি ১৬০ বার পঠিত

একটা সময় ছিল, যখন শিক্ষা অর্জনটা শুধু অভিজাত শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কালক্রমে মানুষের মধ্যে উপলব্ধি হলো শিক্ষা এমন একটি বিষয়, যা সবার জন্য প্রয়োজন। শিক্ষা অর্জন ব্যতিরেকে মানুষ অন্ধত্বের শামিল। মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই শুরু হয় শিক্ষা অর্জন নিয়ে প্রতিযোগিতা এবং বিশ্বের কোনো দেশ বা কোনো জাতির শিক্ষাব্যবস্থা কতটা উন্নত বা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের ইত্যাদি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ। শিক্ষা অর্জনের আকাক্সক্ষা থেকেই আমেরিকাকে টপকে রাশিয়ার ইউরি গ্যাগারিন পৃথিবীর সর্বপ্রথম মানব হিসেবে মহাশূন্যচারী হতে পেরেছিলেন। পরবর্তী সময়ে আমেরিকাও কম যায়নি, তাদের নিল আর্মস্ট্রং চাঁদের মাটিতে পা রেখেছিলেন। আজ মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার জন্য আমেরিকা যখন হিসাবনিকাশ কষছে, পাশের দেশ ভারতও মঙ্গলে খেয়াযান মঙ্গোলিয়ান পাঠিয়ে দেখিয়ে দিল জ্ঞানবিজ্ঞানে বিশ্বে তারাও কম নয়। আজ এ কথাটি পরিষ্কার, যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যত বেশি উন্নত, সে দেশ তত উন্নত। তাই দেখা যায়, কোনো ব্যক্তির দ্বারা শিক্ষায় বড় বড় ডিগ্রি অর্জন সত্যিই আনন্দের ব্যাপার। কয়জনের ভাগ্যে তা জোটে? তাই আনন্দ কেনইবা থাকবে না? দীর্ঘ শিক্ষাজীবন পাড়ি দিয়ে একেকটি ডিগ্রি অর্জন করতে কত মেহনত, কত পরিশ্রম, সর্বোপরি কত সাধনার প্রয়োজন হয়, তা ব্যক্তিমাত্রই ভালো জানেন এবং তার অর্জিত জ্ঞান যে দেশ ও দশের কল্যাণে ব্যয় হয়, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় একটা সময় ছিল, যখন ম্যাট্রিকুলেশন, ইন্টার পাসও বিরাট অর্জন বলে বিবেচিত হতো। শিক্ষার অনেক দ্বার উন্মোচিত হওয়ায় এবং সেই সঙ্গে শিক্ষা অর্জন আগের তুলনায় সহজতর হওয়ায় আজ বলা যায়, ঘরে ঘরে বিএ-এমএসহ উচ্চতর ডিগ্রি পাসের ছেলেমেয়ের অভাব নেই। তবু এ সনদগুলোর কদর এতটুকু কমেনি। বিয়েশাদিতে এখনও এমএ পাস ছেলের কদর আছে। তাছাড়া এ দেশে হাজার-হাজার, লাখ-লাখ শিক্ষার্থী বিএ-এমএ পাস দিয়েই তো চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষাব্যবস্থায়ও এসেছে পরিবর্তন।
সনাতন পরীক্ষা পদ্ধতি বাদ দিয়ে চালু হয়েছে সৃজনশীল পদ্ধতি। সবাই যেন শিক্ষা অর্জনের সুযোগ পায়, এজন্য শিক্ষায় নানামুখী উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড চোখে পড়ছে। ১ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠ্যবই দিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে বই উৎসব দিবস পালিত হচ্ছে। নারীশিক্ষায় অগ্রগতির কারণে সাক্ষরতার হারও বাড়ছে। পাবলিক পরীক্ষাগুলোয় পাসের হার ঈর্ষণীয়। তারপরও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থায় প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের চেয়ে বাণিজ্য বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে বলে শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মতামত ব্যক্ত করছেন, যা কোনোভাবে কাম্য নয়। কেননা আমাদের মতো জনসংখ্যায় ভরপুর একটি দেশে শিক্ষায় বাণিজ্য প্রাধান্য পেলে সবার শিক্ষা অর্জন নিশ্চিত হবে না। শিক্ষা অর্জন যে মৌলিক অধিকার, এটিকে সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে। একটা সময় ছিল, যখন সনদ অর্জন করার জন্য পরীক্ষা হলে নকলের মহোৎসব চলত। আমি যখন বিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন পাড়ামহল্লার কিছুসংখ্যক বড় ভাইবোনকে দেখতাম, এসএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই তাদের আর দেখা যেত না। পরে খবর পেতাম, এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য সুবিধামতো (যেখানে নকলের সুযোগ আছে) কোনো পরীক্ষাকেন্দ্রে চলে গেছে এবং দেখা যেত সারা বছর পড়ালেখা না করেও পাস অর্থাৎ সনদধারী। শিক্ষাব্যবস্থার এ দুরবস্থার কথা আমার মনে হয় এখন শুধুই অতীত। তবে এখন আবার শিক্ষায় নতুন করে একটি বিষফোঁড়া দেখা দিয়েছে, তা হলো পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্ন, পিইসি, জেএসসি, এসএসসি, মেডিকেল, ভার্সিটিসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এক বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করছে। প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের একাধিক উদ্দেশ্য থাকে। কিন্তু যারা জ্ঞান অর্জন বাদ দিয়ে পরীক্ষার আগে প্রশ্ন পেতে উদগ্রীব থাকে, তাদের উদ্দেশ্য হলো সরু রাস্তায় ছক্কা হাঁকানো।
শিক্ষা অর্জনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি তা-ই? ভাববাদী দার্শনিক সক্রেটিসের শিক্ষাদর্শনের মূল কথাÑ‘জ্ঞান অর্জন কর, নিজেকে জান আর নিজেকে জানার মধ্য দিয়ে সত্যের উপলব্ধি বের কর এবং মিথ্যাকে প্রতিহত কর।’ আসলে শিক্ষা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে নীতিনৈতিকতার প্রসঙ্গ এসে যায়। নীতিনৈতিকতাবিবর্জিত শিক্ষা অর্জন প্রকৃত শিক্ষা নয়। প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের কদর সবসময় ছিল, এখনও আছে। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করে এ নিবন্ধের ইতি টানার চেষ্টা করব। সেটি হলোÑ আমাদের দেশে অনেকেই আছেন, যারা নিজেদের নামের আগে বা পরে অর্জিত ডিগ্রির নাম ব্যবহার করেন, আবার অনেকে নিজ নিজ ভিজিটিং কার্ডেও এটির প্রয়োগ ঘটান। বিষয়টি দোষের কিছু নয়; কিন্তু ব্যাপারটি তখন নৈতিক স্খলনের পর্যায়ে চলে যায়, যখন জানা যায় ব্যক্তির অর্জিত ডিগ্রিটি ভুয়া। সমাজে ভুয়া ডাক্তার, ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা ভুয়া মেজরের কথা প্রায়ই শোনা যায়। এসব ভুয়া খেতাবধারী সাধারণ মানুষের উপকার করে না অপকার করে, তা সহজেই অনুমেয়। পত্রিকা মারফত জানা যায়, আমাদের দেশে ভুয়া ডক্টরেট ডিগ্রিরও জমজামট ব্যবসা করছে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এরই মধ্যে আমেরিকা ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি ৫ হাজারের বেশি পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করেছে। আশার কথা হলো, এসব ভুয়া পিএইচডিধারীর খোঁজে মাঠে নেমেছে দুদক। প্রশ্ন হলোÑযারা এ ধরনের পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে নিজেদের নামের আগে বা পরে বিশেষণটি যুক্ত করে নিজেদের সম্মানিত বোধ করছেন, নিজ প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি বা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, তারা কি কখনও নিজেদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করেছেন, ভুয়া ডক্টরেট ডিগ্রিটি কি কখনও তাদের আত্মার খোরাক হতে পেরেছে? প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেনÑস্বশিক্ষিত লোকমাত্রই সুশিক্ষিত। তাই সুশিক্ষাটাই প্রত্যাশিত।
লেখক : নিবন্ধকার, কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শান্তি সুখের সন্ধানে
  • কী চাই, কী চাই না
  • প্রসঙ্গ : প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতি বিরোধী অঙ্গীকার
  • সাংবাদিক কামরুজ্জামান চৌধুরী
  • প্রাইভেট টিউশন বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি
  • ফসল রক্ষা বাধ ও নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা
  • সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম
  • রেল ভ্রমণ কবে স্বস্তিদায়ক হবে
  • অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান
  • পৌষ সংক্রান্তি
  • আল্লামা ফুলতলীর রাজনৈতিক দর্শন
  • নতুন বছরের অর্থনীতি
  • এই কথাটি মনে রেখো
  • হকারমুক্ত ফুটপাত চাই
  • পড়িলে বই আলোকিত হই
  • গ্রামীণ নাগরিক সুবিধা প্রসঙ্গ
  • বিশ্বব্যবস্থা ক্রান্তিকাল ও নিরাপদ পৃথিবীর প্রত্যাশা
  • তুরস্ক-রাশিয়া সম্পর্ক ও পশ্চিমাবিশ্ব
  • শিক্ষার মৌলিক পরিবেশ
  • দেশপ্রেমিক ধর্মগুরু স্বামী বিবেকানন্দ
  • Developed by: Sparkle IT