ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পাহাড়কে ঘুমোতে দাও

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০২-২০১৮ ইং ০৩:১১:১৫ | সংবাদটি ১১০ বার পঠিত

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি বিখ্যাত গানের প্রথম কলি-‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ।’ কবির অন্তর্দৃষ্টিতে পাহাড়ের সার্বিক অবস্থা ধরা পড়েছে। কয়েক যুগ আগে কবির জাগ্রত কবি সত্তায় ঘুমন্ত পাহাড়ের অপরূপ রূপ বর্ণনা করা হয়েছে। পাহাড় ঘুমে নিমগ্ন। কিন্তু তার প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, প্রতি স্তর সবুজ আর সবুজে ঢাকা। লতা-গুল্মসহ লাখো লাখো বৃক্ষরাজি পাহাড়কে যেন সবুজ শাড়িতে ঢেকে রেখেছে। সেই সব সবুজে কখনো কখনো দেখা মেলে ঝর্না ধারার। সেই পাহাড়ের ঝর্না ধারায় কবি মন নেচে ওঠে। নৃত্যের তালে তালে সমগ্র প্রকৃতি যেন নাচতে থাকে। অথচ পাহাড় নীরবে সুখ নিদ্রায় মগ্ন। তার সবুজ আঁচলে মায়ের আদরে পাহাড়ি মানব সন্তানদেরকে লালন-পালন করে আসছে মায়াবী পাহাড়। শুধু পাহাড়ি মানবগোষ্ঠিই বা কেন, পাহাড়ের পাদদেশ থেকে পৃথিবীর সুবিশাল সমতলকেও কোন না কোন প্রকারে জীবন্ত করে রাখছে। ঘুমন্ত পাহাড়। এ ঘুম সাময়িক নয়, চিরদিন ঘুমিয়ে থেকে সকল মানব সন্তানই নয়, জীববৈচিত্র তথা প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতেই হয়তো চিরঘুমে মগ্ন পাহাড়ের জন্ম দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা। প্রকৃতির এক অপরূপ লীলাভূমি এই ঘুমস্ত পাহাড়।
আকাশে হেলান দেয়া এই সব ঘুমন্ত পাহাড়ের ঘুম ভাঙ্গানোর প্রতিক্রিয়া বা ফলাফল কি তা প্রকৃতি  ধ্বংসকারী কিছু কিছু অপরিনামদর্শী হয়তো আপন স্বার্থে বুঝেও না বুঝার ভান করে আসছে যুগ যুগ ধরে। কিন্তু সচেতন মানব সমাজ তাদেরকে বলে কয়ে বুঝিয়ে সুজিয়ে বা আইন প্রয়োগ করে তাদেরকে নিবৃত্ত করতে সক্রিয়ভাবে সচেষ্ট হচ্ছেন না পৃথিবীর কোন দেশেই। আর আমাদের এই বাংলাদেশে তো যা ঘটে চলেছে তা বর্ণনারও অতীত। একদল পাহাড় খেকো, ভূমিখেকো নিত্যদিন পাহাড়ের বুকে শাবল চালাচ্ছে তথা গরীব-অসহায়-হতদরিদ্র শ্রমিক নিয়োগ করে তাদের হাতে শাবল তুলে দিচ্ছে। সামান্য মজুরীর আশায় পাহাড় কাটছে; কেউ বা বোমা ফাটাচ্ছে পাহাড়ের নির্লিপ্ত মাথায়। দেশে নাকি পাহাড় রক্ষায় নির্দিষ্ট আইন কানুন রয়েছে। আইন আছে সত্যি, প্রয়োগ নাই বললে কি ভুল হবে? আইনি ঝামেলায় পড়তে হবে?
পাহাড়-টিলা নিয়ে দেশের পত্রপত্রিকায় খবরের শিরোনাম আসে-‘পাহাড় ধসে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। পাহাড়-টিলার পাশে ‘ঝুঁকিপূর্ন’ বসবাস, বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে সিলেট প্রশাসনের নির্দেশ’ (দৈনিক সিলেটের ডাক)। বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে নির্দেশ যে শুধু সিলেট প্রশাসন থেকেই দেয়া হয়েছে তা কিন্তু নয়, এমন নির্দেশ বোধ হয় রাঙ্গামাটি, বান্দরবন, চট্টগ্রামসহ সব পাহাড়ি এলাকাতেই দেয়া হয়েছে। আর দেয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিনীতভাবে কি এমন প্রশ্ন করা যায় না যে, আজ সরিয়ে নিতে এ নির্দেশ কেন, অবৈধ বসতি স্থাপন আগে থেকেই নির্দেশ দিয়ে তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করে বসতি স্থাপন করতে না দিলেই কি ভালো হতো না? পাহাড় টিলার পাশে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ স্থানে বসতি স্থাপন কি এক দিনে হয়েছে? আগে থেকেই প্রশাসন বা সামাজিক শাসন অবৈধ বসতি বন্ধ রাখতে পারলে কি আজ এ প্রাণহানির ঘটনা ঘটতো? ১৪ ও ১৫ই জুন ২০১৭ তারিখের বিভিন্ন  দৈনিক পত্র পত্রিকায় খবরের আরো শিরোনাম আসে-“রাঙ্গামাটি, বান্দরবন, চট্টগ্রাম পাহাড় ধসে মৃত্যুর মিছিল, ১১৭ লাশ উদ্ধার, আরও মাটি চাপা পড়ে থাকার আশঙ্কা, নিহতের মধ্যে রয়েছেন ৫ সেনা সদস্য”,  “১১ বছরে ৫ শতাধিক নিহত পাহাড় ধসে প্রতি বছরই ঘটেছে প্রাণহানি ঝুঁকিপূর্ণ বসতি চিহ্নিত হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেই, নিধন হচ্ছে গাছপালা দখল হচ্ছে পাহাড় নির্বিচারে কাটা হয় মাটি।
এখন প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের জন্য তো এ ঘটনা নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই যদি এমন প্রাণহানির ঘটনা ঘটে তাহলে একে নতুন বলবে কে! তবে এ বছরের ঘটনাকে অবশ্য অন্য আদলে বিচার করতে হবে। এর ভয়াবহতা প্রতি বছরের স্বাভাবিক ঘটনা বলে চালিয়ে দেবার কোন অবকাশ নেই। ঘটনার ভয়াবহতার মাত্রাকে উদ্বেগজনকই বলতে হবে। কারণ উদ্ধার কাজ করার জন্য রাঙ্গামাটি পাহাড়ি এলাকায় স্থাপিত সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্পও পাহাড়ি ঢলে মাটিচাপা পড়ে। এতে এক মেজর, এক ক্যাপ্টেনসহ ৬ সেনা কর্মকর্তা ঘটনাস্থলেই মারা যান। উদ্ধার কাজে কর্মরত সেনা সদস্যের এমনি মর্মান্তিক মৃত্যু বোধ হয় এবারই প্রথম। সেনা বাহিনীর কর্মকর্তাদের অবস্থাই যদি এমন হয় তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কেমন হবে তাতো সহজেই অনুমেয়। বলা হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি চিহ্নিত হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেই। কেন নেই? কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব কার, ব্যবস্থা না নেয়ার জন্য কোন প্রকার জবাবদিহিতা আছে কি-না তা কে খুঁজে বের করবেন, যারা ব্যবস্থা নিলেন না তাদেরকে কি কোনদিন আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে না, এসব প্রশ্নের উত্তর কাউকে না কাউকে তো একদিন দিতেই হবে। শাস্তি তাদের না দিলে মানুষ মাটি চাপার ভয়ে শঙ্কিত থাকতেই হবে। খবরে বলা হয়- নিধন হচ্ছে গাছপালা, দখল হচ্ছে পাহাড়, নির্বিচারে কাটা হয় মাটি। এ সমস্ত কুকর্মগুলো যাদের দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে তারা কি একেবারেই ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকবেন? ওরা কারা? ওদের ক্ষমতার উৎস কোথায়, এসব প্রশ্নের উত্তর কে খুঁজে বের করবেন। বলা হয়ে থাকে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য আমেরিকা-চীন-ভারতসহ অনেক উন্নত দেশের কর্মকান্ড দায়ী। কার্বন নিঃস্বরণের জন্য বদলে যাচ্ছে পৃথিবী নামক গ্রহটি। এসব অভিযোগগুলো একান্তভাবেই সত্য। তা অস্বীকার করার কোন উপায় নাই। আর সত্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই বলেই আজ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ একের পর এক বৈঠক, আন্তর্জাতিক সম্মেলন ইত্যাদির আয়োজন করছেন। জলবায়ু সুরক্ষার উপায় বের করার জন্য সম্মিলিতভাবেই চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি হবে তা থেকে কারো রক্ষা পাবার পথ নেই।
কিন্তু এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো আমাদের এই বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকারে নিজেরা কি নিজেদের পায়ে কুড়োল মারছি না। আমাদের পাহাড়গুলোর গাছপালা কি আমরাই নিধন করছি না, আমাদেরই কেউ কেউ কি পাহাড় আমরা দখল করছি না, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সাময়িক লাভের কথা মাথায় রেখে কি আমাদেরই কেউ কেউ পাহাড়ের মাটি কেটে পাহাড়কে সমতল করার জঘন্য খেলায় মত্ত হচ্ছি না? এসব কুকর্মগুলো কি লন্ডন-আমেরিকা থেকে কেউ এসে করছে? যতটুকু সম্ভব নিজেদের ঘরকে নিরাপদ রাখা তো নিজেদের ঘরের স্বার্থেই করা সমীচিন।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট, সাবেক ব্যাংকার।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • জাফলং নামকরণের ইতিকথা
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • জলপ্রপাতের নাম হামহাম
  • কেমুসাসের কাচঘেরা বাক্সে মোগল স¤্রাটের হাতে লেখা কুরআন
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বরইতলা গণহত্যা সম্পর্কে আজিজুল হক
  • ঐতিহ্যবাহী গ্রাম জলঢুপ
  • বাংলাদেশের বয়ন ঐতিহ্য
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • ইতিহাস গবেষক দেওয়ান নূরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী
  • লৌকিক শিল্প নকশি পিঠা
  • জেনারেলের বাড়িতে গণহত্যা
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • হত্যাকারির নাম বলা যাবে না
  •  প্রযুক্তির অপব্যবহারে বিপন্ন নারী-শিশু ও যুবসমাজ
  • মুক্তিযুদ্ধে লাউয়াই
  • সুবিধাবাদীদের পরিণতি
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঝরনা কলম : আজ বিলুপ্তপ্রায়
  • মুক্তিযুদ্ধে পুণ্যভূমি সিলেটের সূর্যসন্তানরা
  • Developed by: Sparkle IT