ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বাংলার ঋতু বৈচিত্র্য

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০২-২০১৮ ইং ০৩:১১:৪৪ | সংবাদটি ২৩ বার পঠিত

বাংলাদেশের সবুজ শ্যামল প্রকৃতির সুনাম আছে সবখানে। সবুজ বন-বনানী তৃণে ঢাকা ছোট ছোট পাহাড় টিলা আর নদনদী, খালবিল, হাওর নিয়ে এই বাংলাদেশ। প্রকৃতির অকৃপণ দানে ধন্য এদেশের নিসর্গ। শুধু তাই নয় এখানকার নিসর্গের আরেকটি বৈশিষ্ট্য রীতিমতো চমকপ্রদ। তা হচ্ছে ষড়ঋতুর আবর্তন। বছরে বাংলার প্রকৃতি ছয়বার রূপ বদলায়। নিসর্গের এ বৈচিত্র্য খুব কম দেশেই রয়েছে। তিন বা চারটি ঋতুর দেশই বিশ্বে বেশি দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশ এদিক থেকেও সমৃদ্ধ। ছয় ছয়টি ঋতুর সবগুলোই নিজ নিজ রূপে অনন্য। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত শীত ও বসন্ত ঋতু জানান দিয়েই আসে, জানান দিয়ে বিদায় নেয়। ঋতুর এ খেলায় বাংলার প্রকৃতি নব নব সাজ গ্রহণ করে, জনগণকে দান করে নব নব উপহার। শাশ্বত বাংলায় আবহমান কাল ধরে এই ঋতু পরিক্রমা চলে এসেছে।
ছয় ঋতুর ছোঁয়ায় এদেশের প্রকৃতি জেগে ওঠে। জনজীবনে আসে বৈচিত্র্যের দোলা। কোনো কোনো দেশে সারা বছর চলে গ্রীষ্মের দাহন, কোনো দেশে শীতের দাপট। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ ষড়ঋতুর আশীর্বাদে শীত গ্রীষ্ম বর্ষার স্বাদ আস্বাদনের সুযোগ পায়।
গ্রীষ্ম আসে কালবৈশাখির পিঠে সওয়ার হয়ে। জীর্ণ মরা পুরাতনকে দুমড়ে ভেঙে আসে বৈশাখ। ঝড়ো হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে যায় অদরকারি সব জঞ্জাল আবর্জনা। ধ্বংসের তা-বলীলায় গ্রাম গ্রামান্তরে হাহাকার শুরু হলেও সাহসের সঙ্গে মানুষ মোকাবিলা করে। জীবনের তাগিদে আবার গড়ে। ধ্বংস এবং সৃষ্টির দুটোই বৈশাখে আছে। বোশেখি বৃষ্টি চৈত্রের খরতপ্ত মাটিতে প্রাণরস সিঞ্চন করে। খাঁ-খাঁ প্রান্তরে জীবনের বান ডাকে। নতুন ফসলের বীজ বোনে মানুষ। কালবৈশাখির দুরন্ত সাহসই যেন এ দেশের মানুষকে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার প্রেরণা দেয়। বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ এই দুই মাস গ্রীষ্ম। গ্রীষ্মের অন্যরূপও আছে। এ ঋতুতে আম-কাঁঠালসহ বেশ কিছু ফল-ফসল গাছে গাছে পাকে। বাংলার জনগণ খেয়ে এবং অপরকে খাইয়ে লাভ করে তৃপ্তি।
বৈশাখের গর্জন, জ্যৈষ্ঠের ফসলি ঘ্রাণ শেষে আসে বর্ষা। আষাড়-শ্রাবণ মাস, বর্ষার ঝর ঝর বৃষ্টিতে বাংলার রূপ কেমন মেঘলা, শান্ত শীতল। খালবিল পানিতে থই থই। পল্লিবাংলায় তখন নৌকায় নাইওর যাওয়ার ধুম পড়ে। সারা দিন টিপ টিপ বৃষ্টি। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ‘এমন বাদল দিনে বাহিরে কে যায় রে’ বর্ষার প্রকৃতিতে ঘরমুখি হয়ে ওঠা মানুষের মনের কথাটি কবি এভাবে প্রকাশ করেছেন। কিন্তু হাটে মাঠে যারা কাজ করে তাদের ঘরে বসে বৃষ্টিধারার ছন্দ উপভোগের অবসর নেই। রাস্তায় হয়তো জল নয়তো কাদা। তারপরও জীবনের প্রয়োজনে বের হতে হয়। বর্ষায় বাংলার এ রূপটি সুখের এবং দুঃখের যা হোক না কেন, জনগণ মেনে নিয়েই জীবনযাপন করে। অনেক সময় বন্যা ডুবিয়ে দেয় ঘরবাড়ি, ফসলের মাঠ। কিন্তু তারপরও মানুষ ফসলের স্বপ্ন বুকে নিয়ে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে।
আষাঢ় মাস আবার নাইওরির মাস। লোককবির (শাহ আব্দুল করিম) গানে দেখুন- আষাঢ় মাসে নাইওর যাইতে কে করে মানা? স্বামী বলে-
তুমি আমি দুইজন মাত্র/ ঘরভরা জিনিসপত্র, মোরগরে কে গুড়া দিত/ আমি ইতা পারি না।
স্ত্রী বলে- আম খাইমু কাঁঠাল খাইমু/ নয়া একখান কাপড় পাইমু/ ভাই বোনেরে দেখিয়া আইমু/ আমার কি মনে চায় না।
গ্রীষ্ম আর বর্ষার দোলাচলে ক্লান্ত মানুষের জন্য নতুন উপহার নিয়ে আসে শান্ত সমাহিত শরৎ। ভাদ্র মাসে নদনদী ভরা পানি, আছে ¯্রােত। কিন্তু নেই উন্মত্ততা। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা দূরদূরান্তে ভেসে বেড়ায়। আর আশ্বিনে মাঠের পানি নেমে যায়। শিউলি ফুটতে থাকে। কমে আসে রোদের তেজ। না শীত না গরম। রাতে শারদীয় জোছনা মন কেড়ে নেয়। বস্তুত এ ঋতুর সৌন্দর্যই বাংলার মূল সৌন্দর্য। এর রূপ সামনে রেখেই কবি গেয়েছেন-
শরতে আজ কোন অতিথি এলো প্রাণের দ্বারে/ আনন্দ গান গারে হৃদয় আনন্দ গান গা-রে/ নীল আকাশের নীরব কথা শিশির ভেজা ব্যাকুলতা/ ভাসিয়ে দে সুর ভরা নদীর অমল জলধারে। (রবীন্দ্রনাথ)
শরতের পর সোনার ধানের আয়োজন নিয়ে আসে হেমন্ত। দিনের দৈর্ঘ্য কমে আসে। ভোরে এবং দিন শেষে জমতে থাকে কুয়াশা। সবুজ ঘাসের ডগায় রূপালি কুয়াশা চিক চিক করছে। দেখেই বোঝা যায়, হেমন্ত এসেছে। কার্তিকের মৃদু হিম আর নরম আলোয় বের হয় ধানের শীষ। অঘ্রাণে ভরা খেতে চাষির স্বপ্ন যেন মূর্ত হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কণ্ঠে- ‘আজি ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলারে ভাই লুকোচুরি খেলা/ নীল আকাশে কে ভাসালো সাদা মেঘের ভেলা।’ ফসল সমৃদ্ধ হেমন্তে জীবন রূপ যেন বদলে যায়। পথে পথে দেখা যায় কৃষকের মাথায় পাকা ধানের আঁটি। হাঁটতে গিয়ে ঝনঝন সুর ওঠে, মনে হয় যেন পৃথিবীর মধুরতম সঙ্গীত। হেমন্তে কৃষকের অর্থাৎ গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ধানের গাদা আর নিকানো উঠোনে মাড়াইর দৃশ্য। নবান্নের উৎসব। সকলের মুখে হাসি। পৌষ আর মাঘ মাসে নামে শীত। তখনও ফসলের গন্ধ চারদিকে। শীতের সময় গ্রামবাংলায় শোনা যায় ঢেঁকির শব্দ। পিঠে তৈরির জন্য গুঁড়ি তৈরির আওয়াজ আসে এদিক সেদিক থেকে। শীতকালে রকমারি সবজি ওঠে বাজারে। ঘরে ঘরে নতুন চাল, বাজারে শাকসবজি, বিলঝিলের মাছ সব মিলে শীত সমৃদ্ধির ঋতু। এরপরই আসে ঋতুরাজ বসন্ত। গাছে গাছে ফুলের সমারোহ, ডালে ডালে কোকিল। ফাগুনের আমেজে জমে ওঠে সাংস্কৃতিক জীবন। রোদের তাপ বাড়তে থাকে। তীক্ষè হয়ে ওঠে চৈত্রের দিন। প্রকৃতি তৈরি হয় নতুন বছরের জন্য।
বাংলার প্রকৃতিতে এবং আবহাওয়ায় পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। কিন্তু এখনো এই ছয়টি ঋতু যেকোনো লোকের চোখেই ধরা দেয়। শাশ্বত বাংলার এই ঋতুবৈচিত্র্য প্রকৃতির একটি সুন্দর উপহার।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT