ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য তথ্য কোষ

প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০২-২০১৮ ইং ০৩:১২:৩৪ | সংবাদটি ১৭ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
দ্বিতীয় কথা : বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে একটি ইউনিটারি রাষ্ট্র। রাজনৈতিকভাবে সারাদেশ একটি অখন্ড ইউনিট। ফেডারেল রাষ্ট্রের মতো এটি বিভিন্ন আঞ্চলিক খন্ডে বিভক্ত নয়। পাঁচদফা দাবীনামা সংশোধন করে জনসংহতি সমিতি এই ফেডারেল ধারণাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগও করেছে। সংবিধান অনুসারে এখন কেবল প্রশাসনিক ইউনিটসমূহেই স্থানীয় শাসন পরিষদ গঠিত হতে পারে। সুতরাং সাংবিধানিক ধারা নং ১, ৯ ও ৫৯ বর্হির্ভূত, আইনী সংস্থানহীন আঞ্চলিক পরিষদের বৈধতা কোথায়? এটি না কোনো প্রদেশ, না কোনো প্রশাসনিক অঞ্চল। এর টিকে থাকার ভিত্তি কেবল নির্বাহী আদেশ, যা অনির্দিষ্টকাল মান্য নয়। যদি এটি স্থানীয় শাসন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানরূপে গণ্য হয়ে থাকে, তাহলে তা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন নয় কেন? আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান সন্তু লারমা, স্বায়ত্তশাসিত প্রাদেশিক সরকার প্রধানের মতো কেন্দ্রীয় সরকারকে অবাধে হেনস্তা করে থাকেন এবং সরকারও তা চুপচাপ সহ্য করেন? কী করে তিনি নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী পোষণ করেন এবং তারা প্রকাশ্যে সশস্ত্র থাকে? তাহলে কি আরেকটি গোপন চুক্তি আছে, যা জাতি ও দেশের অজ্ঞাত? মনে হয় ‘ডাল মে কুচ কালা হ্যায়’। এর রহস্যটা কি? জাতি এসব জানার অধিকার অবশ্যই রাখে। জবাবদিহিতা কি কেবল কথার কথা? আশ্চর্যজনক ঘটনা : ইউএনডিপি’র মতো একটি প্রতিষ্ঠান যেটি ২০০১ সালে নিজেদের অপহৃত তিন কর্মীর কারণে বাধ্য হয়ে এদেশ ত্যাগ করেছিল। তারা সম্প্রতি কাজের জন্য উদগ্রীব। সংস্থাটি এলজিআরডি মন্ত্রী আবদুল মান্নান ভূইয়ার কাছে দাবি করেছে : পার্বত্য চুক্তিকে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। আর মন্ত্রী সাহেবের উত্তর হলো ঃ পার্বত্য  চুক্তি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হচ্ছে ও হবে। প্রশ্ন রাজনৈতিক, আর উত্তর ধামাধরা। এ ক্ষেত্রে বলা উচিত ছিলো : চুক্তির কতিপয় ধারা বাংলাদেশ সংবিধানের দ্বারা বাধাগ্রস্ত এবং সংবিধান অনুসরণের অঙ্গিকার চুক্তির মুখবন্ধে স্পষ্ট। সুতরাং সরকার উভয়পাক্ষিক ঐকমত্য আর সংবিধান লঙ্ঘনে অক্ষম। এ কারণেই চুক্তিকারী আওয়ামী সরকার চুক্তিভূক্ত অসাংবিধানিক ধারা সমূহ বাস্তবায়ন থেকে বিরত ছিলেন। বর্তমান জোট সরকারও তা থেকে বিরত। এখন এই সংকটটি সমাধানের উপায় চুক্তি অথবা সংবিধান সংশোধন। সংবিধান সংশোধন জাতীয় সম্মতির সাথে জড়িত। জাতীয় জনমত গঠন অনেক কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। জাতি যতক্ষণ না উপজাতীয় রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষার ব্যাপারে সন্দেহমুক্ত হবে, ততোদিন এ প্রশ্নটা ঝুলে থাকতে বাধ্য। এর চেয়ে সহজ হলো : চুক্তি মুখবন্ধের অঙ্গিকারের ভিত্তিতেই উপজাতীয় পক্ষ থেকে ছাড় প্রদান। এটাই বিরোধ মীমাংসার সহজ উপায়। এই কঠিন রাজনৈতিক বিরোধটি অনাকাক্সিক্ষত। এটা বাংলাদেশ পক্ষের সৃষ্টি নয়। এটাকে উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত করাও অনুচিত। বিষয়টি আমাদের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যাপারও বটে, যা মীমাংসার পক্ষে চেষ্টার ক্রটি নেই। চুক্তি পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হলেও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কোনো নিশ্চয়তাও নেই। এ ব্যাপারে উপজাতীয় কার্যক্রম সন্দেহজনক।
মনে হয়, এবারের মিশনে ইউএনডিপি সন্তু লারমাকে নিজেদের আস্থাধীন করতেই আগ্রহী। ২০ মিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন কতোটুকু হবে, তা বলা কঠিন হলেও এর বিরাট অংশ দাতাদের নিযুক্ত কর্মকর্তা কর্মচারী পোষণ কাজেই ব্যয়িত হবে, তা নিশ্চিত। এটা প্রকারান্তরে দাতাপক্ষের লোকদের কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় পাহাড়ীদের পৃষ্ঠপোষণও বটে। বাঙালিরা এ থেকে ছিটেফোটা পাবে মাত্র।
ইউএনডিপি যে পুনরায় অপহরণ ও সন্ত্রাসের শিকার হবে না তাও অনিশ্চিত। চুক্তি সম্পাদনের পর গত বছরগুলো ধরে উপজাতীয়রা সন্ত্রাস, অপহরণ, খুনোখুনি ইত্যাদি অপকর্ম একটানা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ চুক্তি অনুসারেই তাদের স্বাভাবিক শান্তজীবনযাপন শুরুর কথা। কিন্তু তা হয়নি। সরকার সহজ বাস্তবায়নযোগ্য চুক্তি দফাগুলো তৎক্ষণাৎ পর্যায়ক্রমে ও সাংবিধানিকভাবে বাস্তবায়নে আন্তরিকতার সাথে সচেষ্ট। উপজাতীয় পক্ষে অনুরূপ আন্তরিক সদিচ্ছা প্রদর্শিত হচ্ছে না। সন্ত্রাস আর বিদ্রোহ ত্যাগের সদিচ্ছা জ্ঞাপন ও কার্যকর প্রমাণ উপস্থাপন ছাড়া, সরকারকে বিভিন্ন দাবির প্রশ্নে আগাম বাধ্য করার চেষ্টা শান্তি স্থাপনের গ্যারান্টি নয়। অশান্তি জিইয়ে রাখতে উপজাতীয় পক্ষে অজুহাতের অভাব নেই। ইউএনডিপিভূক্ত এক বাঙালি অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেলের প্রতি সন্তু বাবুরা ক্ষেপা। তাদের সন্দেহ, তিনি ইউএনডিপিকে উপজাতীয় স্বার্থবিরোধী গোয়েন্দা তথ্য ও পরামর্শ দিচ্ছেন। ইউএনডিপিতে শত শত উপজাতীয় থাকা সত্ত্বেও এই একজন মাত্র বাঙালিকেও তারা সহ্য করতে পারছে না। তাদের নারাজির আরেক কারণ হলো : ঐ কর্ণেল সাহেব নাকি মহালছড়ি ঘটনাভূক্ত ধর্ষণ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বলেছিলেন, ৬০ বছরের বুড়ির ধর্ষিত হওয়া অবিশ্বাস্য। এটি রুচিসিদ্ধ নয় যে ঘটতে পারে।
ইউএনডিপি’র বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ উঠছে : তারা গ্রামাঞ্চলে রুটি, বিস্কুট, গম, গুঁড়ো দুধ আর চকোলেট বিলাচ্ছেন। ধানাই পানাই করে সময় কাটিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং অজুহাত তুলছেন অশান্তিটাই উন্নয়নের পথে বাধা। আরো শোনা যাচ্ছে : উপজাতীয় উন্নয়নই ইউএনডিপি’র মূল্য লক্ষ্য। সন্তু বাবুকে উপজাতীয় উন্নয়নের নিশ্চয়তা দেয়ার পরেও, তারা তার সহযোগিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চান। তাই তার কাছে বারবার ধরনা দেয়া হচ্ছে। এবার তাকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নগদেরও টোপ দেয়া হয়েছে। আশ্বস্ত করা হয়েছে : ইউএনডিপি আদিবাসী ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের বিরোধী নয়। জে এসএস অনুকূলে পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হলে তার বাস্তবায়নে ইউএনডিপি সহায়কের ভূমিকা পালন করবে, যেমনটি করেছে বসনিয়া ও পূর্ব তিমুরে।
জাতিগত উৎপীড়ন রোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠা ও পুর্নগঠনে দাতাগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধ করতে ইউএনডিপি সর্বদা এবং সর্বত্র তৎপর। বিশৃঙ্খলা রাজনৈতিক পরিস্থিতি দাতাদের কাছে মনিটর করা ও তাদের দায়িত্ব। সুতরাং ইউএনডিপিকে স্থানীয় উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত থেকেই এখানে টিকে থাকতে হবে। এটা উপজাতীয় স্বার্থের অনুকূল।
সরকার বেখবর : আরেকটি উপজাতীয় বিদ্রোহ সংগঠিত হওয়ার পথে। এখন জেএসএস গৃহশত্রু বিভীষণদের দমাতে ব্যস্ত। এই বিরোধ ও সংঘাতের মীমাংসা হলেই, পার্বত্য বাঙালিদের ওপর তারা একটি মরণ কামড় দেবে। এর পাল্টা প্রত্যাঘাতই তারা কামনা করে, যাতে বৃহৎ শক্তিগুলোর পক্ষে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। তখন আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে অবশ্যম্ভাবী। পূর্ব তিমুর আর বসনিয়া এর উদাহরণ।
[চলবে] 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT