সম্পাদকীয়

‘জাতীয় সঙ্গীত প্রতিযোগিতা’

প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০২-২০১৮ ইং ০০:৪১:৩৩ | সংবাদটি ১১৮ বার পঠিত

চলছে ভাষার মাস। পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম আবির ছড়ানো ফেব্রুয়ারি মাস। সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতের লাল রক্তে রঞ্জিত ফেব্রুয়ারি মাস। মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার গৌরবান্বিত মাস ফেব্রুয়ারি। ভাষার জন্য এমন আত্মত্যাগের ঘটনা বিশ্বের  ইতিহাসে বিরল। তাই বাঙালির এই অমর কীর্তি আজ বিশ্বস্বীকৃত। বায়ান্নোর সেই ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের কাঙ্খিত বিজয়। পেয়েছি একটি স্বাধীন ভূ-খ-, একটি লাল সবুজের পতাকা। পেয়েছি একটি জাতীয় সঙ্গীত। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর সৃষ্টি ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ এই গানটি আমাদের জাতীয় সঙ্গীত। বাঙালিকে জাতীয়তাবোধ-দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করার জন্য এর চেয়ে উৎকৃষ্ট বাণী অন্য কোনো গানে নেই বলেই এটি আমাদের জাতীয় সঙ্গীত। এদেশের প্রতিটি মানুষের অন্তরে এর অবস্থান।
এবার এই ভাষার মাস স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার মাসটিতে সরকার একটি প্রশংসনীয় কর্মসূচি শুরু করেছে। আমাদের এই অতিপ্রিয় জাতীয় সঙ্গীত শুদ্ধভাবে যাতে সবাই গাইতে পারে, এর চর্চা করতে পারে, এজন্য সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে শুরু হয়ে প্রতিযোগিতা শেষ হবে জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। ইউনিয়ন পর্যায়ে এই প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে এ মাসের ১০ তারিখ। আগামী ছাব্বিশে মার্চ ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে কুচকাওয়াজে প্রধানমন্ত্রীর সালাম গ্রহণ অনুষ্ঠানে একযোগে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হবে প্রায় দুই মাস ব্যাপী কর্মসূচি। এই উদ্যোগটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং যুগান্তকারী বলে অভিমত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞগণ। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে, জাতীয় সঙ্গীত তো প্রতিটি বাঙালির অন্তরে পোষে রাখার কথা, তাহলে কেনো শুদ্ধ করে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার প্রতিযোগিতা? এর জবাবে শুধুমাত্র এটাই বলতেই হচ্ছে, সময়ের দাবিকে উপেক্ষা করা যায় না। নতুন প্রজন্মের কাছে জাতীয় সঙ্গীতের চেতনা জাগ্রত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের নতুন প্রজন্মের একটা অংশ দেশাত্মবোধ, স্বাধীনতার চেতনা ইত্যাদি ব্যাপারে একটা ভ্রান্তধারণা নিয়ে বেড়ে উঠছে। তাদের সামনে একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন অর্থাৎ আমাদের অস্তিত্বের শেকড় প্রোথিত যেখানে, ইতিহাসের সেই সব স্বর্ণালী অধ্যায় স্পষ্টভাবে উন্মুক্ত করা হয়নি। আমাদের জাতীয় জীবনের গৌরবোজ্জ্বল ঘটনাবলী প্রতিটি বাঙালির কাছে বুক ফুলিয়ে এগিয়ে চলার নিরন্তর প্রেরণা। এই প্রেরণায় কেউ উদ্বুদ্ধ হলে সে নিখাদ দেশপ্রেমে বলীয়ান হবে; তার কর্ম সাধণা সবই হবে দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের স্বার্থে। জাতীয় সঙ্গীত তেমনি একটি মন্ত, যার বাণী ও সুরের সমন্বয়ে অপরূপ দৃশ্যকল্পের অবতারণা হয়েছে। অর্থাৎ পুরো বাংলাদেশ, তার জীবন, প্রকৃতি, মানুষ সবই ওঠে এসেছে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতে। এটি অন্তরে ধারণ করলে নিজের দেশের প্রতি অনুরাগই বাড়বে, বিরাগ নয়।
এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা জরুরি। দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন পাঠদান শুরু হওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা এবং সেই সঙ্গে একযোগে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার জন্য সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই সেই নির্দেশনা কার্যকর হচ্ছে না। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে নির্দেশনা অনুযায়ী জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় ঠিকই, তবে অনেক ক্ষেত্রে সুর-তাল-লয়ের ব্যত্যয় ঘটে। কারণ, এব্যাপারে কোনো প্রশিক্ষণ ইতোপূর্বে দেয়া হয় নি। তাদের। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শুদ্ধভাবে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। আর এক্ষেত্রে সরকারের সাম্প্রতিক জাতীয় সঙ্গীত প্রতিযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই যাতে এই প্রতিযোগিতার বাইরে না থাকে, সেদিকে নজর দিতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT