শিশু মেলা

উড়ন্ত দ্বি-চক্রযান

জসীম আল ফাহিম প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০২-২০১৮ ইং ০০:৪৫:৩০ | সংবাদটি ৬ বার পঠিত

হেনুর জন্মদিনে বাবা তাকে একটি খেলনা গাড়ি উপহার দিলেন। ব্যাটারি চালিত কার গাড়ি। গাড়িটি পেয়ে হেনু খুব খুশি হলো। কারণ এমন একটি কার গাড়ি সে বহুদিন থেকে প্রত্যাশা করছিল। গাড়িটি নিয়ে সে এখন সারাদিন খেলায় মেতে থাকে।
সেদিন হেনু কোথা থেকে যেন একটি স্ক্রু-ড্রাইভার জোগাড় করলো। তারপর স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে সে একটি একটি করে গাড়ির স্ক্রুগুলো খুলে ফেললো। খুলে গাড়ির ভেতরটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলো। ভেতরে অনেক পেঁচানো তার। একটি সার্কিট এবং তিনটি ব্যাটারি  দেখতে পেলো সে। তারপর হেনু আবার স্ক্রুগুলো যথাযথ স্থানে লাগিয়ে গাড়ির সুইচ অন করলো। সুইচ অন হওয়ায় গাড়িটি আগের মতোই পিউপিউ সাইরেন বাজিয়ে চলতে শুরু করলো। কার গাড়ির আশ্চর্য চলন দেখে হেনু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। আর মনে মনে ভাবলো, বড় হয়ে আমি একদিন এমনি সুন্দর একটি মোটর গাড়ি তৈরি করবো।
কদিন পর হেনু কোথা থেকে যেন পুরনো ফ্যানের ছোট্ট একটি মোটর জোগাড় করলো। মোটরটি বাসায় এনে তার সাথে সে একটি ব্যাটারি যোগ দিলো। অমনি মোটরটি শোঁ-শোঁ আওয়াজ তুলে ঘুরতে শুরু করলো। বিষয়টি দেখে হেনু খুব মজা পেলো। মনে মনে সে ভাবলো, আচ্ছা, মোটরের সাথে পাখার সংযোগ দিয়ে দেখি না কী ঘটে! যেই ভাবা সে কাজ। মোটরের সাথে সে একটি পাখা যুক্ত করলো। অমনি পাখাটা সুন্দর করে ঘুরতে শুরু করলো। পাখা ঘোরার সাথে সাথে আশপাশের বাতাস আন্দোলিত হতে লাগলো। পাখার বাতাস পেয়ে হেনু অবাক হয়ে ভাবলো, দারুণ জিনিস তো!
তার কদিন পর হেনুদের শহরে একজন মন্ত্রী এলেন। মন্ত্রী মহোদয় হেলিকপ্টার চড়ে আকাশে ভাসতে ভাসতে এলেন। হেনু দেখলো, বন্দুক ফড়িংয়ের মতো দেখতে একটি বিশাল যন্ত্র বাতাসে ভেসে ভেসে মন্ত্রী মহোদয়কে নিয়ে তাদের স্কুলের মাঠে এসে অবতরণ করলো। হেনু আগে কোনোদিন হেলিকপ্টার দেখেনি। এই প্রথম দেখলো। হেলিকপ্টার দেখে হেনু মনে মনে ভাবলো, বড় হয়ে আমি এমনি একটি হেলিকপ্টার তৈরি করবো।
বাসায় এসে হেনু ভাবলো, আচ্ছা! একটি কাজ করলে কেমন হয়? আমার  খেলনা কার গাড়িতে মোটরটি সংযোগ করি না কেন? মোটরে পাখা লাগিয়ে দেখি-ই না কী ঘটে। ভাবনামতো হেনু সরু তার দিয়ে পাখাঅলা মোটরটি তার খেলনা কার গাড়িতে শক্ত করে বাঁধলো। তারপর সুইচ অন করতেই মোটরটি ঘুরতে শুরু করলো। মোটরের সাথে পাখাটিও অবিরাম ঘুরতে লাগলো। মোটরটি কিছু সময় ঘোরার পর আপনি হেনুর খেলনা কার গাড়িটি শূন্য উড়াল দিলো। উড়াল দিয়ে গাড়িটি বেশিদূর যেতে পারলো না। কিছুদূর গিয়েই আছড়ে পড়লো। বিষয়টি হেনুর মনে খুবই কৌতূহল জাগালো।
হেনু ভাবলো, মোটর চালানোর জন্য গাড়িতে একটি রিমোট সংযুক্ত করতে হবে। সেই সাথে গাড়িতে আরও শক্তিশালী ব্যাটারি যুক্ত করতে হবে। কয়েক দিন পর হেনু তার ভাবনামতো কাজ করলো। দেখা গেল, ব্যাটারির ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় খেলনা গাড়িটি এবার আর আছড়ে পড়লো না। অনেকদূর উড়ে গেল। হেনু তখন তার হাতের রিমোট দিয়ে উড়ন্ত খেলনা গাড়িকে তার নাগালে নিয়ে এলো। হেনু মনে মনে ভাবলো, একটা দারুণ জিনিস তৈরি করে ফেললাম তো!
সে বার হেনুদের উপজেলায় বিজ্ঞানমেলার আয়োজন করা হলো। হেনুদের স্কুলের পক্ষ থেকে সে উড়ন্ত খেলনা কার গাড়িটি নিয়ে বিজ্ঞানমেলায় অংশগ্রহণ করলো। দর্শনার্থীগণ হেনুর উড়ন্ত খেলনা কার গাড়ি দেখতে তাদের স্টলের সামনে এসে ভিড় করলো। আশ্চর্য উড়ন্ত  খেলনা কার গাড়ি দেখে সকলেই খুব মজা পেলো। মেলা শেষে হেনুর প্রজেক্টটিই সেরা হলো। পুরস্কার হিসেবে হেনুকে একটি সার্টিফিকেট, একসেট বিজ্ঞানের বই ও একটি বাইসাইকেল উপহার দেয়া হলো।
উপহার হিসেবে প্রাপ্ত বাইসাইকেল নিয়ে হেনু দুরন্তপনায় মেতে ওঠল। এরইমধ্যে বিজ্ঞানের বইগুলো তার পড়া শেষ হয়ে গেল। হেনু শহরের কেন্দ্রিয় লাইব্রেরির সদস্য হলো। কেন্দ্রিয় লাইব্রেরি তার নামে কার্ড ইস্যু করলো। কেন্দ্রিয় লাইব্রেরিটি তাদের বাসা থেকে বেশ খানিকটা দূর। বিকেল হলে হেনু বাইসাইকেলে চড়ে কেন্দ্রিয় লাইব্রেরিতে যাওয়া-আসা করে। কেন্দ্রিয় লাইব্রেরির বিজ্ঞানের প্রায় সবকটি বই ইতোমধ্যে হেনু পড়ে ফেলেছে।
সেদিন কেন্দ্রিয় লাইব্রেরি থেকে ফেরার পথে হেনুর মাথায় হঠাৎ একটি চিন্তা এলো। বাইসাইকেলে মোটর সংযুক্ত করলে কেমন হয়! মোটরের সাথে সংযুক্ত থাকবে একটি পাখা। পাখাটি ঘুরে ঘুরে বাইসাইকেলকে শূন্যে তুলে নিবে। তবে এই কাজ করার জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রিচার্জেবল ব্যাটারি লাগবে। ব্যাটারি জোগাড় করা হেনুর জন্য একটা কঠিন বিষয়। কারণ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রিচার্জেবল ব্যাটারি তাদের শহরে পাওয়া যাবে না। ব্যাটারির জন্য রাজধানীতে যেতে হবে।
হেনুর মাথায় একবার কোনো চিন্তা ঢুকলে তার বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত তার স্বস্তি থাকে না। মাথায় যখন চিন্তা ঢুকেছে, এর একটি শেষ হবে আশা করা যায়। মাসখানেকের মধ্যেই হেনু  চাহিদামতো একটি মোটর, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রিচার্জেবল ব্যাটারি এবং পাখা জোগাড় করে ফেললো। নিজের ছোট্ট ল্যাবরেটরীতে বসে কাজ শুরু করলো হেনু। সপ্তাহ দুয়েক কাজ করার পর সে মোটামুটি একটি কাঠামো দাঁড় করিয়ে ফেললো। হেনু তার এই প্রজেক্টের নাম দিলো “উড়ন্ত দ্বি-চক্রযান।”
কাঠামো তো দাঁড় হলো। এখন এটা কেমন কাজ করছে, তা তো দেখা দরকার। পরে সে উড়ন্ত দ্বি-চক্রযান নিয়ে একদিন তার স্কুলের মাঠে গেল। মাঠে এসে মোটরের সাথে লাগানো সুইচ অন করলো। সুইচ অন করতেই পাখাটি ঘুরতে শুরু করলো। আর পাখা ঘোরার সাথে সাথে বাইসাইকেলটিও শূন্য উড়াল দিলো। শূন্যে বাইসাইকেল চালিয়ে হেনুর মনে এক রোমাঞ্চকর অনুভূতির জন্ম হলো। কিন্তু কিছু সময় উড়ার পর বাইসাইকেলটি ধীরে ধীরে কেমন যেন নিচে নামতে শুরু করলো। হেনু বুঝতে পারলো, ব্যাটারি ডাউন হয়ে গেছে। ব্যাটারি চার্জ দেয়া দরকার। পরে সে শূন্যে থাকা অবস্থায় কিছু সময় বাইসাইকেলে দ্রুত প্যাডেল চালালো। এভাবে প্যাডেল চালিয়ে ব্যাটারিটি চার্জিত করলো। পরক্ষণেই দেখা গেল বাইসাইকেলটি পূর্ণ গতি নিয়ে শূন্যে উড়ে চললো।
শহরের উপর দিয়ে একটি ছেলে শূন্যে বাইসাইকেল চালিয়ে উড়ে চলেছে। ভাবা যায়! এমন আচানক দৃশ্য দেখার জন্য শহরবাসী রাস্তায় নেমে এলো। শিশু-কিশোর, জোয়ান-বুড়ো, মহিলা-পুরুষ বাদ নেই কেউ। শহরের পথে পথে যেন জনতার ঢল নামলো। মানুষ হল্লা করে হেনুকে অভিবাদন জানাতে লাগলো। আর হেনু তো আপনমনে উড়েই চললো। উড়তে উড়তে হেনু সারা শহরে একটি চক্কর মেরে নিজেদের বাসার ছাদে এসে নামলো।
সে সময় ছাদে খেলা করছিল হেনুর ছোট বোন মিনু এবং তার কয়েকজন বান্ধবী। আচমকা হেনুকে বাইসাইকেল নিয়ে উড়ে এসে নামতে দেখে মিনু এবং তার বান্ধবীরা তো ভারি অবাক। মিনু বললো, ভাইয়া তোমার বাইসাইকেলটা তো দারুণ! আমাকে একদিন বাইসাইকেলে চড়াবে তো ভাইয়া?
হেনু বললো, অবশ্যই চড়াবো। আমার দশটা নয় পাঁচটা নয় একটি ছোট বোন। তোকে চড়াবো না তো কাকে চড়াবো রে?
হেনুর কথা শুনে মিনু সহসা হেসে ওঠল। হেসে হেসে জিজ্ঞেস করলো, ভাইয়া! তোমার বাইসাইকেলটার কী নাম দিয়েছো?
হেনু বললো, “উড়ন্ত দ্বি-চক্রযান”।
মিনুর বান্ধবীরা বললো, দারুণ সুন্দর নাম তো! নামটি আমাদের পছন্দ হয়েছে।
মিনু বললো, পছন্দ তো হতেই হবে। দেখতে হবে না কার ভাইয়া নামটি রেখেছে।
ওদের কথা শুনে হেনু কিছু বললো না। মুখ টিপে শুধু হাসলো।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT