শিশু মেলা

ভাত খাওয়ার গল্প

আবদল হাই মিনার প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০২-২০১৮ ইং ০০:৪৬:১৭ | সংবাদটি ২৫৩ বার পঠিত

টুসু-পরব শেষ হলো তিনদিনও হয় নাই।
তীব্র শীত পড়েছে চারদিকে।
সময়টা ডিসেম্বরের শেষ কিংবা জানুয়ারির প্রথম। দিনের দ্বিপ্রহরেও এখন বাতাসে মাকড়সার জালের মত ফিন্ফিনে কুয়াশার আমেজ। মালনীছড়ার বাসা থেকে বেরিয়ে আমরা টাঙ্গুয়ার হাওরে পৌঁছোলাম দিন-শেষের একটুক্ষণ আগে।
ততোক্ষণে ‘ভেজা-বাতাসের-বেলচা’ হাওরের টলটলে পানি থেকে রাশি রাশি শীত উঠিয়ে নিয়ে আমাদের গায়ের ওপর ঢেলে দিতে লেগেছে। ওভারকোট জ্যাকেট সোয়েটার মাফলার আর মাঙ্কি-ক্যাপট্যাপেও শীতকে ঠিকমতো ‘বাউগ্’ মানানো যাচ্ছেনা। জুতো আর মোজার ভেতর দিয়ে কন্কনে ঠান্ডা ঢুকে পড়ছে পায়ের ভেতর। শীতে হি হি করে কাঁপছি।
ল্যান্ডরোভার আর জীপ এক মাইল দূরে এক মরা খালের ধারে দুটো জারুলের নীচে রেখে এসেছি। এক মাইল পায়ে হেঁটে হাওরের ঢালের এই সাফ-সুতরো জায়গাটায় এসে আমরা তাঁবু ফেললাম। একটা বিশাল তিরপলও সাথে আনা হয়েছে। এটি দিয়ে আরেকটি তাঁবু বানানো হলো। এই তাঁবুতে গুজরুর সাথে তার বন্ধু রঘোবীর আহীর আর বাবুর্চি ফরন মিয়া থাকবে। গুজরু আর রঘু হচ্ছে মালনীছড়া আর তেলিহাটির সবচেয়ে সেরা শিকারী। তাদের হাতের টিপ খুবই ভাল। শিকারী-জীবনে আজ পর্যন্ত একটা কার্তুজও তারা নষ্ট করেনি।  বন-মোরগ, মধুরা, হরিয়াল, খরগোশ, বাঘডাঁশ, হরিণ কিংবা চিতা আর শুয়র শিকারে প্রয়োজনের বেশি একটা কার্তুজও তাদেরকে খরচ করতে হয়নি।
যখনকার কথা বলছি তখন বন্য জীবজন্তু বা পাখি শিকারে এতো কড়াকড়ি ছিল না। বনবিভাগের অনুমতি নিয়ে লাইসেন্সধারী যে কেউ নির্দিষ্ট কিছু যায়গায় শিকারে যেতে পারতো। তা’ছাড়া আজ থেকে চল্লশি-পঁয়তাল্লশি বছর আগে সিলেটের এ’সব পাহাড়ি এলাকায় লোকজনের বসত-বস্তি  ছিল অতি অল্প। তুলনায় বনজঙ্গল আর জলমহালের প্রাচুর্য ছিল অনেক বেশি। কত রকমের পশুপাখি আর জীব-জানোয়ার যে এ’সব অঞ্চলে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াতো! মেজোমামা, ছোটমামা  আর তাদের দু’জন বন্ধুর সাথে আমরা দু’ভাই এই হাওরে এসেছি লেন্জা আর সরালী শিকারে।
যেখানে এসে তাঁবু ফেলা হলো তার ধারেই দূর গাঁয়ের একটি কৃষক-পরিবার খলা বানিয়ে ধান মাড়াইবাছাই করছিল। অনেকগুলো শুকনো খড় পড়েছিল তাদের খলার ধারে। অনুমতি নিয়ে সেখান থেকে গুজরু আর রঘু প্রচুর খড় এনে তাঁবুগুলোর মেঝেতে বিছিয়ে দিতে লাগল। কয়েকবারের খড়ে তুলতুলে জাজিমের মত দুটো স্তুপ জমে উঠল তাঁবুর  ভেতর। সেই খড়ের ওপর বাসা থেকে আনা তোষক-বিছানাচাদর বিছিয়ে তার ওপর সাদা কভারের লেপদুটো ফেলে দিতেই আমরা দু’ভাই খড়ের বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে লেপের তলায় ঢুকে পড়লাম। নিমেষেই শীত যে কোথায় পালালো।  
আহ, কি আরাম!
ওম ওম গরম খড়ের তোষক আর লেপের ভেতর হাওরের শীতের লেশমাত্র নেই। সারা দিনের পথশ্রম একটুকুতেই প্রায় দুর হয়ে গেল। এখন শুধু পেটের ভেতর ক্ষুধার ছুঁচো ডন-বৈঠক শুরু করেছে, টের পেলাম।
খাওয়া-দাওয়া আর রান্নার ব্যাপারে ফরনমিয়া বিরাট তালেবর আদমি। সিলেট থেকে বেরোনোর সময় বড় বড় দুটো টিফিন-কেরিয়ারভর্তি মোরগপোলাও নিয়ে এসেছিল। প্লাস্টকিরে সোরাইতে খাবারের পানি। দুপুরের দিকে তাহিরপুরে ঢোকার মুখে একটি মসজিদের  পুকুরপাড়ে বসে সেই পোলাওটুকু খাওয়া হলো। মামারা জোহরের নামাজও সেখানেই সারলেন। তারপর আবার যাত্রা করে তাহিরপুরের দক্ষিণ-পশ্চিম দিক দিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর এলাকায় প্রবেশ করলাম।
এখন রাতের খাবারের ব্যাপারে ফরনমিয়াকে বেশ দুশ্চন্তিতি দেখা গেল। কারণ, দুপুরের মোরগপোলাও এর সবটুকু আমরা পথেই মেরে দিয়েছিলাম। ফরনমিয়া ভেবেছিল এক টিফিন-কেরিয়ার দিয়েই সে দু’বেলা চালিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে তা’ আর হয়ে ওঠেনি। আশেপাশে কোনো গাঁওগেরাম নেই। কোথা থেকে খাবার যোগাড় করবে?
‘আমাকে একটু গাঁয়ের দিকে যেতে হবে।’ মেজোমামাকে বলল ফরনমিয়া।
মেজোমামা বলল,- ‘কি ব্যাপার, কোনো সমস্যা?’
‘রাতের খাবারে আতান্তরে পড়েছি, চাউল ডাইল লবন আলু আর ডিম নিয়ে আসতে হবে। হাওরে পাখির দেখাতো মিলছে না। নইলে শুধু চাউল আর লবন হলেই চলতো। পোড়া লেন্জার মাংস দিয়ে দুয়েকদিন চালিয়ে নেয়া যেতো। ’
‘তোমার ডেকচিরওতো অভাব, ভাত পাক করবে কি দিয়ে?’ বলল মেজোমামা।
‘সে আপনাকে ভাবতে হবে না। টিফিনের বাটি দিয়ে রান্নাবান্নার কাজ চালিয়ে নেবো। ভাল কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন, কয়েকটা বর্তনও কিনে আনতে হবে।’
মেজোমামা খাবারের জিনিষ কিনে আনতে তাকে টাকা দিয়ে গ্রামে পাঠিয়ে দিলো। তার সাথে রঘুকেও দিয়ে দিলো। বলল,- ‘জলদি ফিরবি রে ভাই, ক্ষিধায় জান বেরিয়ে যাচ্ছে।’
ফরনমিয়া আর রঘু গ্রাম থেকে রসদ নিয়ে ফিরে এল আমাদের ধারনারও আগে। দ্রুত সে চাউল-ডাইল দিয়ে খিঁচুড়ি পাকিয়ে ফেলল। গ্রাম থেকে শুধু ময়নাশাইল চাউলই আনেনি, দু’সের কালোজিরা চাউল আর এক শিশি গাওয়া-ঘিও নিয়ে এসেছে। খিঁচুড়িটা হলো সেই কালোজিরা চাল দিয়ে। সাথে সেদ্ধ ডিম। ফেরার পথে ওরা চৌদ্দটা বড় বড় তাজা ভেড়া মাছ (ভেদা) আর মশলাপাতি কিনে নিয়ে এসেছিল। খিঁচুড়ি পাকানো শেষ করেই ফরনমিয়া অসাধারণ ঘ্রাণের ভেড়ামাছের ভূনা রেঁধে ফেলল।
কিন্তু হতভাগা রাতের খাবারের সময় সেই মাছের ভুনা আর পরিবেশনই করল না।    
আমরা যখন রাতের খাবার খাচ্ছি মেজোমামা বলল,- ‘ফরনমিয়া, তোমার এত খুশ্বুঅলা ভেড়ামাছের ভুনা কোথায়! আমাদের খাওয়াবে না?’
ফরনমিয়া ঝক্মকে চোখে মেজোমামার  দিকে তাকিয়ে বলল,- ‘সব কিছুরই একটা নিয়মকানুন আছে, ভাইজান। ভেড়ামাছের ভূনা এ’ভাবে খাওয়া হয় না। এটা আজ সারা রাত শীতের হিমে সরার নিচে ডেকচির ভেতর জমতে থাকবে। ভোরে যখন ডেকচির সরা সরাবো তখন দেখবেন মজা! সবটুকু মাছের ভুনা জমে চাকার মতন হয়ে আছে। গরম ধোঁয়া-ওড়া ময়নাশাইলের ভাত বর্তনে দেয়ার পর সেই ভাতের ওপর ডেকচি থেকে চামচ দিয়ে কেটে কেটে ভেড়ামাছের ভূনা সেখানে ফেলব। দেখবেন মাছভূনার চাকাটা গরম ময়নাশাইলের ভাতের ওপর পড়ে কেমন গলে গলে যাচ্ছে! তখন মজা করে সেই গরম ভাত দিয়ে মাছের ভূনাটা খান। বহেস্তেরে খাবারও এর সামনে কিছু না।’
অতএব, ধৈর্য্য ধরে সে রাতে আমরা শুধু মুগডাল আর নূতন আলু ঘি দিয়ে পাকানো খিঁচুড়িটুকু পেট পুরে খেয়ে নিলাম। তারপরই খড়ের তোষকের আরামের বিছানায় শুয়েই ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি টাঙ্গুয়ার হাওরের চারদিক কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে আছে। তীব্র শীতে লেপের তলা থেকে বেরোনো যাচ্ছে না।
ও’দিকে তাঁবুর বাইরের চুলায় ফরনমিয়া ময়নাশাইলের ফেনসা ভাত রাঁধছে। কী মজার ঘ্রাণ নাকে এস লাগছে। সাধারণ ভাতেরও যে এত সুঘ্রাণ হয় কোনওদিন কল্পনাও করিনি।
আমরা সবাই শীতে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে হাওরের পানিতে হাতমুখ ধুয়ে এলাম। তারপর লেপের তলায় বসে বসেই সেই বিখ্যাত ভাত খাওয়া।
নরম হয়ে জমে যাওয়া ভেড়ামাছের ভূনা আর ময়নাশাইলের গরম ধোঁয়াওড়া ভাত!  
আশ্চর্য! ফরনমিয়া যেমন যেমন বলেছিল ঠিক সে ভাবেই মাছের চর্বির মত ভূনাটা আস্তে আস্তে গরম ভাতের ভেতর গলে গলে গেল। সকালের খাবার খেলাম একটা ঘোরের ভেতর। এত স্বাদের ব্রেকফাষ্ট আমার জীবনে এই প্রথম। ঠান্ডা জমাট ভেড়ামাছের ভূনা দিয়ে ধোঁয়াওড়া ময়নাশাইলের ফেনসা ভাত খাওয়া শেষ করে ফরনমিয়াকে একটা স্যালুট আমাদের দিতেই হলো। তার মুখটা ঝল্মলে হয়ে উঠল। ঝক্ঝকে চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল,- ‘বলি নাই ভাইজান, এই মাছ খাওয়ার একটা আলাদা তরিকত আছে? এখন বুঝলেন তো?’
‘বিলক্ষণ।’ মেজোমামা আবার তাকে বাউ করলেন।   
শীতের সেই ভোরে টাঙ্গুয়ার পারে অত্যাশ্চর্য সুস্বাদু এক ভাত খাওয়ার গল্প সারা জীবনের জন্য আমার মগজে সেদিন ঠাঁই করে নিলো।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT