মহিলা সমাজ

ভাষাসৈনিক নারীরা

তামান্না আক্তার প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০২-২০১৮ ইং ২৩:৪২:৩৩ | সংবাদটি ১০৬ বার পঠিত

বাঙালি হৃদয়ের আবেগের জায়গার নাম একুশে। একুশে মানে ভাষা আন্দোলন। ত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস। তাই একুশ মানে চেতনা। যে চেতনার স্মারক আমাদের ভাষা আন্দোলন। আমাদের এই ভাষা আন্দোলন শুধু পুরুষের সংগ্রামই ছিলো না, ছিল নারী-পুরুষের মিলিত সংগ্রাম। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ আন্দোলনে পুরুষের পাশে সহযোদ্ধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সাহসী নারীরা। পাকিস্তানি আর্মি ও পুলিশের বন্দুকের নলকে উপেক্ষা করে ভাষার দাবির মিছিলে নারীরা ছিলেন সামনের কাতারে।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা রাতের বেলা লুকিয়ে ভাষার দাবির বিভিন্ন শ্লোগান সংবলিত পোস্টার আঁকতেন। বায়ান্নর ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে নারীরাই প্রথম রাস্তায় নামেন এবং পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে ব্যারিকেড ভাঙেন। সেদিন যারা আহত হয়েছিলেন, তাদের চিকিৎসায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রীরা। আহতদের চিকিৎসা সাহায্যের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েরা চাঁদা তুলে আনেন। পুলিশের তাড়া খাওয়া ছাত্রদের লুকিয়ে রাখেন নিজেদের কাছে। আন্দোলনের খরচ চালানোর জন্য অনেক গৃহিণী খুলে দেন নিজের অলঙ্কার। শুধু তা না, ভাষা আন্দোলনে জড়িত হওয়ায় অনেক নারীকে জেলও খাটতে হয়েছে। কেউ হারিয়েছেন সংসার। কেউ বহিষ্কৃত হয়েছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে।
কেবল ১৯৫২ সালে নয়, ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনেও নারীরা বিশেষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে বাংলা ভাষার দাবিকে চাঙা করতে গঠিত হয় ‘তমুদ্দিন মজলিস’। আবুল কাশেমের স্ত্রী রাহেলা, বোন রহিমা এবং রাহেলার ভাইয়ের স্ত্রী রোকেয়া আন্দেলনকারীদের আজিমপুরের বাসায় দীর্ঘদিন রান্না করে খাইয়েছেন। বায়ান্নর ২৩ ফেব্রুয়ারি রাত ৪ টার দিকে আবুল কাশেমের বাসা ঘিরে ফেলে পুলিশ। ভিতরে আবুল কাশেম ও আব্দুল গফুরসহ অন্যরা ভাষা আন্দোলনের মুখপাত্র ‘সৈনিক’ পত্রিকা প্রকাশের কাজে ব্যস্ত। পুলিশ দরজায় বারবার আঘাত করলে মিসেস রাহেলা কাশেম ফ্যামিলি বাসায় রাতে পুলিশ প্রবেশের চেষ্টার বিরুদ্ধে পুলিশের সঙ্গে দীর্ঘ তর্কবিতর্ক জুড়ে দেন। এ সুযোগে আবুল কাশেমসহ অন্যরা পেছনের দেয়াল টপকে পালাতে সক্ষম হন। এরপর পুলিশ ভিতরে ঢুকে কাউকে দেখতে না পেয়ে চলে যায়। ভাষা আন্দোলন শুরুর দিকে অন্দরমহলে নারীর এই অবদান আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচিগুলো এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ সেই রাতে আবুল কাশেমসহ অন্যরা গ্রেপ্তার হয়ে গেলে প্রচারপত্র হয়তো থেমে যেত।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে’ লিখেছেন, ‘১১ মার্চ ভোর বেলা থেকে শত শত ছাত্রকর্মী ইডেন বিল্ডিং... ও অন্যান্য জায়গায় পিকেটিং শুরু করল। ... সকাল ৮ টায় পোস্ট অফিসের সামনে ছাত্রদের ওপর ভীষণভাবে লাঠিচার্জ হলো। ... কয়েকজন ছাত্রীও মার খেয়েছিল। ... তখন পূর্ব পাকিস্তান আইন সভার অধিবেশন চলছিল। ... আনোয়ারা খাতুন ও অনেকে মুসলিম লীগ পার্টির বিরুদ্ধে (অধিবেশনে) ভীষণভাবে প্রতিবাদ করলেন।’
বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘যে পাঁচদিন আমরা জেলে ছিলাম, সকাল ১০ টায় স্কুলের মেয়েরা (মুসলিম গার্লস স্কুল) ছাদে উঠে শ্লোগান দিতে শুরু করত, আর ৪ টায় শেষ করত। ছোট্ট ছোট্ট মেয়েরা একটু ক্লান্তও হতো না। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই’, ‘পুলিশি জুলুম চলবে না’- এমন নানা ধরনের শ্লোগান দিত।’
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে নারীরাই প্রথম রাস্তায় বের হয়ে আসেন। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারিতে করাচিতে তৎকালীন পাকিস্তানের গণপরিষদের বৈঠকে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের আন্দোলনে এ দাবি আরও জোরালো হয়। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি সারা পূর্ববাংলায় হরতাল ডাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় এক সমাবেশ আয়োজন করে। তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার ভাষা আন্দোলনের সমাবেশ বন্ধ করতে ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে ২১ শে ফেব্রুয়ারি পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে নারীরাই প্রথম মিছিলে বের হন।
১৪৪ ধারা ভঙ্গে নেতৃত্বে ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট ইউনিয়নের তৎকালীন জিএস ড. শাফিয়া খাতুন। তার সঙ্গে ছিলেন ড. সুফিয়া আহমেদ, মাহফিল আরা খোরশেদী খানম, সারা তৈফুর, সুরাইয়া, ড. হালিমা প্রমুখ বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রীনেতারা। ব্যারিকেড ভাঙার মূল কাজটি করেন রওশন আরা বাচ্চুসহ কয়েকজন ছাত্রী। কারণ ১০ জন করে বের হওয়া প্রথম দুটি দলের অনেকেই গ্রেপ্তার হন। ছাত্ররা ব্যারিকেডের ওপর ও নিচ দিয়ে লাফিয়ে চলে যান। পরে তৃতীয় দলে বেরিয়ে ব্যারিকেড ধরে টানাটানি করেন ছাত্রীরা। ব্যারিকেড ভাঙায় পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ার সেলে সেদিন সারা তৈফুর, রওশন আরা বাচ্চু, শামসুন, সুফিয়া ইব্রাহীম, সুরাইয়া ডলিসহ অনেক নারী আহত হন। শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে নারীদের ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো।
মিছিলে অংশগ্রহণের জন্য বিভিন্ন স্কুল থেকে অসংখ্য ছাত্রী আসেন। নারায়ণগঞ্জ মর্গান হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম ১৯৫২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার হয়ে জেলে গেলে আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। কারাবন্দি অবস্থায় বন্ড দিয়ে কারাগার থেকে মুক্তি লাভে অস্বীকৃতি জানালে মমতাজ বেগমের স্বামী তাকে তালাক দেন। ভেঙে যায় তার সাজানো সংসার। মমতাজ বেগমের ছাত্রী ইলা বকশী, বেনু ধরের মতো কিশোরীকেও সেদিন পুলিশ গ্রেপ্তার করে।
ভাষা আন্দোলনে কোমলমতি কিশোরীদের অংশগ্রহণও ছিল স্মরণ রাখার মতো। মৌলভাবাজারের কুলাউড়ার সালেহা বেগমকে ময়মনসিংহ মুসলিম গার্লস স্কুলে থাকাকালীন ভাষা-শহীদদের স্মরণে স্কুলে কালো পতাকা উত্তোলন করার অপরাধে তিন বছরের জন্য স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তীতে তার পক্ষে আর পড়ালেখা করা সম্ভব হয়নি। এভাবে অনেক নারী আমাদের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা রেখে গেছেন। একুশের এই দিনে সেই সাহসী নারীদের প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা।
(লেখক : শিক্ষার্থী, নর্থইস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT