ক্রোড়পত্র

ভাষা আন্দোলন স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তি

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০২-২০১৮ ইং ০২:২৪:৪৩ | সংবাদটি ১৯৫ বার পঠিত

একুশ মানে মাথা নত না করা। শত রক্তচক্ষু, জুলুম, নির্যাতনে বাঙালি মাথা নত করেনি কখনো আজও করে না। বাঙালির জাতীয় সংকটে সংগ্রামে ২১ ফেব্রুয়ারি সাহস যুগিয়েছে। একুশে যেন সকল প্রেরণার প্রাণশক্তির অফুরন্তÍ ফল্লুধারার অন্তÍহীন উৎস। তাই ২১ ফেব্রুয়ারির পর্যালোচনায় একটু পেছনে যেতে হয়।
’৪৭ এ ভারতবর্ষ দু’ভাগ হয়ে দুটি রাষ্ট্র জন্ম নিল। একটি ভারত, অপরটি পাকিস্তান। ভৌগোলিকভাবে ভারত একক ভূখন্ড থাকলেও পাকিস্তান এক অদ্ভূত রাষ্ট্ররূপে আবির্ভূত হল। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান নামে দু’টি অঞ্চল, পরস্পরের দূরত্ব প্রায় এক হাজার মাইল। পৃথিবীতে এরকম আর কোন উদাহরণ পাওয়া যায় না। সে যাই হোক, অত্যন্তÍ দুঃখজনক ব্যাপার হলো, বাংলার মানুষ মুসলিম লীগের পক্ষে শতকরা ৯৫% ভোট দিয়ে পাকিস্তান দাবির আন্দোলনকে জোরদার করেছিল। আর অন্যদিকে পশ্চিম অংশে মুসলিম লীগ কোন আসন পায়নি। তাছাড়া পূর্ব পাকিস্তানীরা জনসংখ্যার দিক দিয়েও ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তৎসত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা পূর্ব বাংলাকে তাদের স্থায়ী কলোনীরূপে পদানত করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন।
পাকিস্তানের রাজধানী করা হলো করাচীতে। বাঙালিদের যাতে চিরদিনের জন্য পঙ্গু করে রাখা যায়, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে যাতে বিকাশ ঘটতে না পারে, বাঙালির হাজার বছরের লালিত জাতিসত্তা, যাতে রুদ্ধ করে দেয়া যায় সে লক্ষ্যে শুরু হলো নানা কূটকৌশল, ষড়যন্ত্র।
একটি জাতিকে পদানত করে রাখতে হলে প্রথমে আঘাত হানতে হবে তার ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর। এই আপ্তবাক্য অনুসরণে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির অধিকার আকুতির প্রতি ন্যূনতম সম্মান প্রদর্শন না করে ১৯৪৮ সালেই ঘোষণা করলেন, “একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা”। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানের কারো মাতৃভাষা উর্দু নয়। সিন্ধি, পাঞ্জাবী, পশতু ইত্যাদি। জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় দৃপ্তকন্ঠে ঘোষণা করলেন, ‘ঙহষু টৎফঁ অহফ টৎফঁ রিষষ নব ঃযব ংঃধঃব খধহমঁধমব ড়ভ চধশরংঃধহ’
তবে গর্বের বিষয়, বীর বাঙালি তার মুখের ওপর ঐ ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ল। সেই থেকে শুরু। ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ এই দাবিতে শুরু হলো বাঙালির আন্দোলন। মাতৃভাষার আন্দোলন। অধিকারের আন্দোলন, স্বাধিকারের আন্দোলন, স্বাধীনতার আন্দোলন। সে যে শুরু হলো বাঙালি আর ঘরে ফিরে যায়নি। একই পথ বেয়ে এলো ১৯৫২ সাল, কেন্দ্রে মুসলিম লীগ সরকার। পূর্ব পাকিস্তানে নূরুল আমিন এর সরকার ক্ষমতায়। চরম দমন নীতি চালানো হচ্ছে বাংলার মানুষের ওপর। তাদের একটাই দাবি, ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই, নূরুল আমিনের কল্লা চাই’। এই দাবিতে সমগ্র পূর্ব বাংলায় আহ্বান করা হলো ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট, কিন্তু মুসলিম লীগ সরকার ঐদিন ঢাকায় জারি করল ১৪৪ ধারা। কোন মিটিং-মিছিল করা যাবে না। ৫ জনের বেশি লোক জমায়েত হতে পারবে না, কিন্তু সংগ্রামী ছাত্র সমাজ ওই নিষেধাজ্ঞার মোটেই পাত্তা দিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। পুলিশ ছাত্রীদেরসহ অনেককে গ্রেফতার করল, কিন্তু না, মিছিল থামানো যাচ্ছে না। ততক্ষণে গোটা ঢাকা শহর লোকে লোকারণ্য। অবস্থা বেগতিক দেখে পুলিশ গুলি চালালো নির্বিচারে। ছাত্র ভাইদের বুকের তাজা রক্তে লাল হয়ে গেল ঢাকার পীচঢালা কালো রাজপথ। শাহাদাত বরণ করলেন, সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে।
সারাদেশের মত চট্টগ্রাম উত্তাল। ঢাকায় গুলিবর্ষণের খবর পেয়ে সর্বদলীয় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক রাউজানের কৃতি সন্তÍান আমাদের গৌরব মরহুম মাহবুব উল আলম চৌধুরী ঐ রাতেই চরম আক্রোশে লিখলেন তাঁর ঐতিহাসিক একুশের প্রথম কবিতা, ‘কাঁদতে আসিনি আমি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।’
ঐ দিনই শপথ নিল বাঙালি, শহীদদের রক্ত ছুঁয়ে। মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, বাঙালির সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক মুক্তি, স্বাধিকার তথা পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার। এই সংগ্রামের পথ ছিল দীর্ঘ, ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর অবধি। ছিল বন্ধুর, কন্টকময়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক বিজয়ে পাকিস্তানীরা প্রমাদ গুনল। বাঙালি কতিপয় দালালের সহযোগে শুরু হলো আবার ষড়যন্ত্র। রাতের আঁধারে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করল জেনারেল আইয়ুব ১৯৫৮ সালে। আইয়ুব-মোনায়েম চক্র নানা চক্রান্তÍ করলেও সবই ব্যর্থ হল। তারা এক দশকের স্বৈরাচারী নির্যাতনে বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামকে স্তব্ধ করতে পারেনি। বরং আরো দুর্বার হলো। অন্যান্যরা কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও অকুতোভয় সিংহ পুরুষ বঙ্গশার্দুল শেখ মুজিবকে দাবিয়ে রাখা যায়নি। ১৯৬৬ তে তিনি ঘোষণা করলেন বাংলার মুক্তি সনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা। বহু জেল, জুলুম, নির্যাতন, অবশেষে ফাঁসিতে হত্যার উদ্দেশ্যে সাজানো হল তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। আইয়ুব, ভুট্টো বাঙালি দালালদের পরিকল্পিত এ ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্নভিন্ন করে তাঁর ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’ ও ছাত্র সমাজের ১১ দফার ভিত্তিতে ঘটল ১৯৬৯ এ ব্যাপক গণ অভ্যুত্থান। গণবিস্ফোরণের সাইক্লোনে খড়-কুটার মত উড়ে গেল আয়ুবশাহী সদল বলে। মুজিব হলেন বাংলার বন্ধু, বঙ্গবন্ধু। সাথে আরেক মহান সংগ্রামীনেতা মাওলানা ভাসানী।
এবার ১৯৭০ এর নির্বাচন। সাড়ে ৭ কোটি মানুষ বঙ্গবন্ধুর পেছনে ঐক্যবদ্ধ। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দল আওয়ামী লীগ অর্জন করল অকল্পনীয় সাফল্য। সমগ্র পাকিস্তানে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেন। কিন্তু ইয়াহিয়া-ভুট্টো জনমতকে তোয়াক্কা করল না। ফলে শুরু হলো বাঙালির মরণজয়ী মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৫২ থেকে ’৫৪, ’৬৬, ’৬৯, ’৭০ প্রভৃতি বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের একেকটি মাইলস্টোন। তবে ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম মাইলস্টোন বা মাইলফলক। যেটি আজ সারা বিশ্বে পালিত হয় ‘আন্তÍর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ রূপে। এ মহান গৌরবের অধিকারী আমরাই। কারণ আমরাই বুকের রক্ত দিয়ে এর প্রতিষ্ঠা করেছি। বিশ্বে কোন জাতি মাতৃভাষার জন্য জীবন দেয়নি। অতএব ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ অবধি সুদীর্ঘ ২৪ বছর বাঙালির তাবৎ আন্দোলন। সংগ্রাম দ্রোহ তথা বুকের রক্তঢালার প্রেরণার মূল উৎস। যেটি অফুরন্তÍ ফল্লুধারার নহর আজও বহমান।
এই সুদীর্ঘ রক্তাক্ত সংগ্রামের পথ বেয়ে ১৯৭১ এর ৯টি মাস লক্ষ কোটি বাঙালি ‘জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্ত ভাবনাহীন’ মন্তেÍ উজ্জীবিত হয়ে পাকিস্তানের তথাকথিত ‘বিশ্ব সেরা’ সেনাবাহিনীকে পিটিয়ে অর্জন করে নিল বাংলার স্বাধীনতা। আমেরিকা, চীন, সৌদি আরব সক্রিয় সহযোগিতাও তাদের রক্ষা করতে পারল না। লক্ষ সৈন্য বাহিনী নিয়ে পাকিস্তানীরা পরাজিত হলো ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্সে।
কবির ভাষায় বলতে চাই, ‘সাবাস বাংলাদেশ, পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়। জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়’ জয় মহান একুশে।                                 
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT