ক্রোড়পত্র

মাতৃভাষার গুরুত্ব এবং আত্মপরিচয়

মোহাম্মদ আব্দুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০২-২০১৮ ইং ০২:২৫:০৭ | সংবাদটি ২২৭ বার পঠিত

ভাষা না থাকলে আমাদের সকল প্রকাশ কেবল অন্যান্য প্রাণির মতোই করতে হতো। তাই মানুষে মানুষে মনের ভাব বিনিময় এবং দুঃখ আর সুখের কথা প্রকাশক একান্ত আপন আপন ভাষাজ্ঞান অর্জন মানুষ হিসাবে আমাদের এক অনন্য এবং অতুলনীয় অর্জন। এখানে আমি একজন বাঙালি হিসেবে বাংলা ভাষার গুরুত্ব আমার চেতনায় কতোটুকু তা তুলে ধরতে সচেষ্ট থাকবো। সবচেয়ে বড় কথা হলো ভাষা এই আমাদেরকে নিজস্বতা দিয়েছে। অনেক দার্শনিক জ্ঞান আমরা পেয়েছি ভাষা শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জন থেকেই। জার্মান দার্শনিক ফিকট জাতি গঠনের ক্ষেত্রে ভাষার ভূমিকাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন, আমরা জানি। আমাদের বাংলায় লালিত কবি, গবেষক ও সাহিত্যিকগণ অনেক মূল্যবান কথা বলেছেন যা মাতৃভাষার প্রতি গভীর প্রেম ও মর্যাদাপূর্ণ। ভাষা, মাতৃভাষা এবং বাংলা ভাষা আজ আমাদের আলোচনায় আছে। তবে এখানে ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস উল্লেখ আমার মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। আবার যেহেতু একুশ আমাদেরকে পথ দেখায় তাই একেবারে পাশ কাটিয়ে যাবো এমন ধৃষ্ঠতা দেখানোর দুঃসাহস কেউ যেন না দেখাই।
আমরা ফ্রেব্রুয়ারি মাসকে ভাষার মাস বলে সহজেই চিনি। এ মাসে কবি, গবেষক, প্রাবন্ধিক অর্থাৎ সাহিত্যানুরাগী মানুষেরা মাথায় ‘মাতৃভাষা’ এবং ‘একুশে’ শব্দ নিয়ে একটু বেশি মাত্রায় আবেগপরায়ণ হয়ে উঠেন, এ দোষের কিছু নয়। বরং আমাদের লেখক ও পাঠক সমাজের এই আবেগকে সচেতনভাবে আমাদের সকল বাঙালির সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানো উচিত মনে করি। আমরা বাঙালি এবং আমাদের স্বপ্ন, আমাদের স্বকীয়তা, আমাদের অগ্রগতির পথে হাঁটা আমাদের ভাষাকে অবহেলা করে সম্ভব নয় কিছুতেই। প্রতিবারের মতো ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ আমাদের রাজধানী ঢাকায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে উদ্বোধন হয় বৃহত্তম বইয়ের মেলা ‘অমর একুশে বইমেলা’। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যথার্থ উচ্চারণ করেছেন, ‘নিজেদের সংস্কৃতি, নিজেদের ভাষা, নিজেদের শিল্প-সাহিত্যকে যদি আমরা মর্যাদা দিতে না পারি, তার উৎকর্ষ সাধন করতে না পারি, তাহলে জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বের দরবারে আরো উন্নত হতে পারবো না।’ এই যে আরো উন্নতির কথা এসেছে তাতে বুঝা যায় আমরা জাতি হিসেবে অনেক উন্নত হয়েছি এবং আমাদের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। হ্যাঁ কেবল নিন্দুক ছাড়া একথা অস্বীকার করার লোক শুধু বাংলাদেশে, কেনো পৃথিবীর কোথাও আর নাই। কারণ আমরা স্বকীয়তা ধরে রাখতে কতোটা সচেতন এবং বোধশক্তি সম্পন্ন তা আজ এক ঝলমলে ইতিহাস, যার মাইলস্টোন হিসেবে চিহ্নিত ঊনিশ’শ বায়ান্ন খৃষ্টিয় সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। আমাদের ভাষা আন্দোলনে অর্জিত ‘মাতৃভাষা দিবস’ যা ছিলো একান্তই আমাদের এবং আজকে তা বিশ্ব স্বীকৃত ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। এ অর্জন বীর বাঙালির অর্জন যা শহিদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ আরো আরো বাঙালির প্রাণ ও রক্তের বিনিময়ে পাওয়া। সেই থেকেই আমরা বাঙালি সম্মিলিত কণ্ঠে এক সুরে গাই, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি।’
জানা আছে, ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) তৎকালীন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। বাংলা ভাষার সন্তানেরা প্রতিবাদ করে এবং বহু ত্যাগের বিনিময়ে ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বে নিজেদের অধিকার আদায়কারী বীর বাঙালি হিসেবে তুলে ধরে। আমরা জাতি হিসেবে উন্নতির এক শক্ত মাইলফলক দেখতে পাই সেই থেকেই। আর সেই মাইলফলকই আমাদের জাতিগত স্বাতন্ত্র্য এবং স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যেতে প্রেরণা যুগিয়েছে। তাইতো আমরা দুঃশাসনের বেড়াজাল ছিন্ন করে ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমাদের মাতৃভূমিকে স্বাধীন করে উন্নয়নের আরেক মাইলস্টোন গড়েছি ‘বাংলাদেশ’ নামক এক স্বাধীন রাষ্ট্র, যা ১৯৭১ খৃষ্টিয় সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় পতাকা উড়ায় বিশ্বের আকাশে। এরই ধারাবাহিকতায় এখন আমরা নিজস্ব পরিচয়ে আছি বিশ্বময়। দেখি আজকের একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে শত শত ভাষায় মানুষ কথা বলে। আমরা জানি অনেকের ভাষা আছে অথচ নিজেদের বর্ণ নেই। সেখানে আমাদের বাংলাভাষা নিজস্ব অক্ষর আর ভাষা নিয়ে পৃথিবীতে ষষ্ঠ স্থান নিয়ে আমাদেরকে উন্নত আসনে রেখেছে। এটা সম্ভব হয়েছে ভাষার প্রতি আমাদের মাটির সন্তানদের ভালোবাসার কারণেই।
আমরা মাকে ভালোবাসি। আমরা ভালোবাসি মায়ের মুখের ভাষা। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, “মাতৃভাষা মাতৃস্তন্যের ন্যায়।’ তিনি এও বলেছেন, প্রত্যেক মানুষের তিনটি করে মা থাকে। একটি হচ্ছে জন্মধাত্রী মা, একটি মাতৃভাষা, আরেকটি হচ্ছে মাতৃভূমি। তাঁর কথার গুরুত্ব সর্বকালব্যাপী। আমরা মায়ের কোলেই থাকতে পছন্দ করি এবং মায়ের মুখ থেকে শিখে কথা বলি মায়ের ভাষায়। যে মাটির খেয়ে বড় হই, আলো বাতাসে বেড়ে উঠি সেই মাটি যে মায়ের মতোই পরম আশ্রয় আমাদের। এখন আমাদের মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি স্বাধীন। অতএব এখন তা আর অন্যের সরাসরি হস্তক্ষেপে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কম। আমরা জানিতো যেকোনো অর্জন রক্ষা করা আরও বেশি কঠিন। তাই আমাদের উদাসীনতায় যেন আমাদের মায়ের মতো ভাষা কলুষিত না হয় সেদিকে দৃষ্ট দিতে হবে। হ্যাঁ আমরা খুব ভালোভাবেই লক্ষ্য করেছি, বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে এবং এফএম বেতার থেকে আমাদেরই সন্তানেরা এক অদ্ভুত শব্দ প্রয়োগে কথা বলেন। এতে না খুঁজে পাওয়া যায় আমাদের মায়ের কাছ থেকে শেখা ভাষা, না হিন্দি, না ইংলিশ। আমি ওইসব বাংলা মায়ের সন্তানদেরকে বলবো একটু সংযত হোন। অন্যের ভাষার ঢং নিজের মর্যাদাপূর্ণ ভাষায় মিশিয়ে নিজের মাকে অপমান করবেন না। এ কাজতো কেবল আত্মপ্রবঞ্চনা। এতে গৌরব বাড়ে না। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, নিশ্চয় বাংলা কবিতা পড়েন। কবি রামনিধি গুপ্ত তাঁর ‘স্বদেশী ভাষা’ কবিতায় সুন্দর বলেছেন, ‘নানান দেশে নানান ভাষা/বিনে স্বদেশী ভাষা/পুরে কি আশা।’ আমরা আমাদের ভাষাকে অসম্মান করলে আমাদের সংস্কৃতি হারাবো। আমাদের গৌরবের ঐতিহ্যের সংস্কৃতি হারালে আমাদের আত্মপরিচয়ের অহংকার বলতে কিছুই থাকবেনা।
আমাদের অনেক অর্জন আমাদেরকে শক্ত এক ভিত্তি দিয়েছে। এখন আমরা জ্ঞান বিজ্ঞানের নানান শাখায় আমাদের ভাষা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা স্মার্টফোন বা কম্পিউটারে বাংলা ভাষায় লিখছি। আমরা বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে বাংলায় সংবাদ জানছি ও সাহিত্য চর্চা করছি। আমাদের এসব অর্জন উন্নয়নের অংশ। আসুন মাতৃভাষাকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে কথা বলি আর লিখি-‘ফুল, পাখি, ঘাষ, ফড়িং/দোয়েল দোলে তিড়িং বিড়িং/তোমরা বলো নাইরে নাই/আমি বলি আর কি চাই?’/রক্ত দিয়ে ভাষা পেলাম/ভাষা সৈনিক তোমায় সালাম।/ভাষার পথে হেঁটে হেঁটে/রক্ত সাগরে ভেসে উঠে/বাংলাদেশ বাংলাদেশ/মুক্ত ভাষার মুক্ত স্বদেশ।’
প্রিয় পাঠক আসুন বই কিনি, বই পড়ি। সুন্দর শুদ্ধ বাংলায় কথা বলি। একুশ আমাদের সামনে থাকুক অন্ধকার দূর করার দিশারি হয়ে।
লেখক : কমামিস্ট।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT