ক্রোড়পত্র

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের স্মৃতিগুলি

এডভোকেট মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০২-২০১৮ ইং ০২:২৬:৪৬ | সংবাদটি ৩৯৪ বার পঠিত

১৯৫২ তে আমি তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। সিলেটের গণ-শিক্ষা কর্মকর্তা আমার দাদা (বাবার মামা) বিশ্বনাথ উপজেলার রায়কেলি গ্রামের সজ্জাদুর রহমান চৌধুরী ভারপ্রাপ্ত ডিপুটি ডাইরেক্টর, হিসাবে সাময়িকভাবে নতুন প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকায় বদলি হয়েছিলেন। বাসা পেয়েছিলেন নব-নির্মিত আজিমপুর সরকারি কলোনির চার নম্বর ইমারতের নীচ তলায়। পূর্বদিকে ছিল পলাশি ব্যারেক নামক মধ্যশ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের টিনশেড আবাসিক এলাকা। পাশেই ছিল পুরান ঢাকার সাথে সংযোককারী তদানীন্তন অতি ব্যস্ত সড়ক পথ পলাশি রাস্তা।
দাদার বড়বোন-আমার দাদি-দাদার সিলেট শহরস্থ বারুতখানার বাসায় ছিলেন। নতুন প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকা দেখতে দিন কয়েকের জন্য ঢাকা যেতে দাদা তার বোনকে আমন্ত্রণ জানালে দাদিও ঢাকায় যেতে রাজী হন। আমিও ঢাকা শহর দেখতে আগ্রহী থাকায় দাদি বাবাকে বলে আমাকেও সাথে নেন। আমাদের প্রধান সাথি হিসাবে ছিল নিজ গ্রামেরই দীর্ঘদিনের দাদার বিশ্বস্থ লোক ভোলাই ভাই। তখন ঢাকা যাওয়ার একমাত্র বাহনই ছিল রেল গাড়ী যা লোহার বড় পাতের (রেল) উপর দিয়ে ইঞ্জিনের সাহায্যে চলে। তখন রেল স্টেশন ছিল খোজারখলা গ্রামেরই পাশে যা এখনও পুরনো স্টেশন হিসাবে পরিচিত। অনেক বগি এক সাথে যুক্ত থাকায় একে বেশ লম্বা দেখাত। তাই গাড়ীকে অনেকে ঠাট্টা করে খোজারখলার লম্বা গাড়ী বলতেন। গাড়ীর নাম ছিল সুরমা মেইল যা দিয়ে সিলেট থেকে চিঠি পত্রের ব্যাগ/ মেইল ঢাকায় যেত। গাড়ী ছাড়ত সন্ধ্যার পর আট ঘটিকার সময় এবং সারারাত চলে পরের দিন সকালে ঢাকার পুরাতন রেল স্টেশন ফুলবাড়িয়ায় পৌঁছাত। গাড়ী সকল স্টেশনেই থামতে হত এবং যাত্রিও উঠানামা করতেন। জংশনে একটু বেশি সময় থামত এবং আখাউড়ায় ইঞ্জিন বদলের জন্য বেশি সময় থামতে হতো।
আমরা ভোলাই ভাইয়ের সাহায্যে ইন্টারক্লাশের টিকিট করে সুরমা মেইলে চেপে বসলাম। ঠিক সময়ই চলা আরম্ভ হল। উল্লেখ্য গাড়ীর চালক থাকলেও প্রধান কর্মকর্তা হলেন গার্ড সাহেব, যার জন্য গাড়ীর সর্ব-পিছনে একটি ছোট বগি আলাদা থাকে, যেখান থেকে প্রয়োজনমতো তিনি ফ্ল্যাগ দেখিয়ে/হুইসেল বা রাতে বাতি দেখিয়ে গাড়ী চলার ও থামার অনুমতি দেন। সারারাত পথ চলতে চলতে রাতে মেঘনা নদীর দীর্ঘ সেতু পার হয়ে ভোর বেলা আমরা ঢাকা নগরীর তখনকার ফুলবাড়িয়া রেল স্টেশনে এসে পৌঁছলাম। স্টেশন থেকে বের হয়ে ভোলাই ভাই ঘোড়ার গাড়ীর চালকের সাথে ভাড়া নিয়ে দরকষাকষিসহ ভাড়া সাব্যস্ত করে আমরা আজিমপুরায় বাসায় পৌঁছি। তখন রিকসা গাড়ী ছিল না। ঘোড়ার গাড়ীর চালকেরা পুরান ঢাকার খাটি বাসিন্দা ছিল। বাংলা-উর্দু মিশিয়ে সুন্দরভাবে কথা বলত। ভাড়া কম বললে বলত-আস্তে বলিয়েন ছাব, ঘোড়া শুনলে হাসবে ইত্যাদি হাসানো মজার কথা।
ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যদিকে আমরা ঢাকা শহরে যাই। পাকিস্তানে আসা ভারতের উর্দু-ভাষিদের প্রভাবে নব-প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের নেতা মুহম্মদ আলি জিন্নাহ কর্তৃক ১৯৪৮ইং সনে একমাত্র উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণার প্রেক্ষিতেই ভারত থেকে আগত উর্দু-ভাষী বিহারিদের দৌরাত্মে এবং চাকুরি হারানোর ভয়ে পূর্ব-পাকিস্তানের প্রাদেশিক সচিবালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীগণ আন্দোলন শুরু করেন। পরবর্তীতে তাদের সমর্থনে এবং প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট এবং নিরপেক্ষ কিছু ছাত্রনেতাদের উদ্যোগে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রগণ বাংলাভাষাকেও উর্দুর সাথে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুলতে থাকলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যেও উত্তেজনা সৃষ্টি হতে থাকে। এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-সভা-মিছিল ইত্যাদি চলতে থাকলে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। আন্দোলনটি দল-মত নির্বিশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের স্বতস্ফূর্ত আন্দোলনে রূপ নিলেও বিরোধী দলীয় নেতাদের তাতে বেশি সায় ছিল না। নেতাদের বক্তব্য ছিল আসছে নির্বাচনে বিরোধীদল জিতলে উর্দু ভাষার সাথে বাংলাকে সহজেই রাষ্ট্রভাষা করার সুযোগ আসবে। আপাতত এ বিষয় প্রকাশ্যে বিরোধে না গিয়ে লেখাপড়ার ক্ষতি করার প্রয়োজন নেই এবং নিরাপদে নির্বাচন হতে দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু প্রগতিশীল কিছু ছাত্রনেতা তা মানতে রাজী না হয়ে মিছিল সহকারে আইন ভঙ্গ করতে গেলে পুলিশ গুলি চালালে মিছিলের কয়েকজন ছাত্র নিহত ও আহত হন। দিনটি ছিল ২১শে ফেব্রুয়ারির প্রায় মধ্যাহ্ন। ছাত্র হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে চারদিকে আতঙ্ক ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই খানিক দূরে পলাশি আজিমপুরার জনবসতি এলাকায়ও আতঙ্ক ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আমাদেরকে বাসার এলাকা থেকে বেশি দূরে যেতে নিষেধ করা হয়। গুলিবর্ষণে ছাত্র হত্যার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশেই ছাত্র-ধর্মঘট ডাকা হয় এবং ঢাকাসহ সারা দেশে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। এতে করে সিলেটের সাথে একমাত্র রেল যোগাযোগ যদি বন্ধ হয়ে যায়। এ ভয়ে দিন কয়েকের মধ্যেই দাদা আমাদেরকে সিলেটে পাঠিয়ে দেন। রাষ্ট্রভাষা বাংলা ভাষাপ্রশ্নে ছাত্রহত্যার কারণেই পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ বিরোধী যুক্তফ্রন্টের কাছে পরাজিত হয়। পরবর্তীতে নির্বাচনের পর ১৯৫৬ সনে প্রণীত সংবিধানে উর্দুর সাথে বাংলা ভাষাও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায়। কিছুদিন পর দাদাও তার সাময়িক দায়িত্ব পালন শেষে সিলেটে তার পূর্বপদে ফিরে আসেন। আমিও পরের বৎসর দাদার উৎসাহে ভাল লেখাপড়ার জন্য সিলেটে এসে আমারই আগ্রহে এবং দাদার সাহায্যে রাজা গিরিশচন্দ্র হাইস্কুলে ক্লাশ ফোরে ভর্তি হই এবং দাদার বাসায়ই আমার থাকার ব্যবস্থা হয়।
১৯৫২ সনের ২১শে ফেব্রুয়ারির ছাত্রহত্যার পর থেকেই ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের প্রশাসন যন্ত্র রাজনীতিক ক্যাডার, গুন্ডা-পান্ডাদের কারণেই বাংলা-ভাষা রাষ্ট্র ভাষার আন্দোলন প্রথমে বেসরকারি স্কুল-কলেজে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। পরবর্তীতে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররাও তাতে যোগ দেয়। আমরা সিলেটের রাজা স্কুলের ছাত্ররা উপরের শ্রেণির ছাত্রদের নেতৃত্বে প্রায়ই স্কুলের ক্লাশ বর্জন করে মিছিল করে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, ছাত্র হত্যার বিচার চাই, ঘাতক নুরুল আমিনের ফাঁসি চাই, ইত্যাদি শ্লোগান দিয়ে প্রথমে যেতাম কালিঘাটে নদীর পাড়ে নিকটস্থ সরকারি হাইস্কুলে। মিছিল যাওয়ার পূর্ব থেকেই স্কুলের লোহার গেইট তালা দিয়ে বন্ধ করে ভিতরে পাহারাদার দাঁড়িয়ে থাকত। হেড মাস্টার সাহেব অফিস ও প্রবেশদ্বারের কাছে এবং স্কুলের উর্ধ্বতন শিক্ষকগণ বেত হাতে নিয়ে হেঁটে হেঁটে পাহারা দিতেন যাতে ছাত্ররা ক্লাশ বর্জন করে বাইরের মিছিলে যোগ দিতে না পারে। আমরা ঘন ঘন ‘মাতৃভাষা বাংলা চাই, ছাত্র হত্যার বিচার চাই, ছাত্রভাইয়েরা বেরিয়ে আসেন’ ইত্যাদি শ্লোগান দিয়ে ছাত্রদেরকে ক্লাস বর্জন করে মিছিলে যোগ দিতে আহবান জানাতাম। ইতিমধ্যে খবর পেয়ে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে পুলিশও এসে গেলে আমরা মিছিল নিয়ে লালদীঘির পার হয়ে জিন্দাবাজারস্থ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে যেতাম। বিদ্যালয়ের উঁচু দেয়াল ঘেরা থাকায় এবং বড় প্রবেশ দ্বার ভিতর থেকে বন্ধ থাকায় আমরা কতক্ষণ শ্লোগান দিয়ে এইডেড হাইস্কুলের দিকে চলে যেতাম। এইডেড হাইস্কুল তাঁতিপাড়া গলির ভিতরে থাকায় স্কুলটি সংরক্ষিত এলাকার মত ছিল এবং কোন কোন দিন ছাত্ররা মিছিলে যোগ দিত, কোন দিন না। আমরা আমাদের স্কুলের উচ্চ শ্রেণির নেতাগণ দক্ষিণ-সুরমা কোচাই-পাঠান পাড়ার ফজলুর রহমান খান, রিকাবি বাজারের দুদু মিয়া, নবিগঞ্জের রহিমদাদ চৌধুরী, দয়ামীরের লোকমান আহমদ, ধোপাদীঘির উত্তরপারের অযুত দাস, প্রখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড় লাল মিয়া প্রমুখদের নেতৃত্বে মিছিল সহকারে পূর্ব জিন্দাবাজার-নাইওরপুল-বন্দরবাজার হয়ে আমাদের স্কুলের পাশের তদানীন্তন গোবিন্দ পার্কে (বর্তমান হাসান মার্কেট) জমায়েত হতাম। তখন ছাত্রনেতাগণ বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিসহ ছাত্র হত্যার বিচার চেয়ে এবং ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ নেতা বিশেষ করে তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিয়ে সভা শেষ হত। সিলেটের তদানীন্তন মুসলিম লীগ নেতা ও মন্ত্রী মোদাব্বির হোসেন চৌধুরীর নয়াসড়কস্থ বাসভবনও আমরা একবার ঘেরাও করে শ্লোগান দিয়েছিলাম। পরবর্তীতে পুলিশ এলে ঘেরাও মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এভাবে প্রায়ই কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতাদের ডাকে সিলেটে ছাত্র ধর্মঘট হত এবং সিলেট শহরে আমরা রাজা স্কুলের বর্ণিত ছাত্রনেতাদের উদ্যোগে বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানসহ নিরীহ ছাত্রহত্যার বিচারের দাবি করে মিছিলমিটিং করতাম।
পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের ভাষা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলনের প্রথম দিকে পূর্ব বাংলার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আসন জাতীয় নির্বাচনের কারণে প্রত্যক্ষ সমর্থন না থাকলেও পরবর্তীতে ছাত্র হত্যার কারণে সকল বিরোধী দলিয় রাজনৈতিক দল বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের দাবিতে দলমত নির্বিশেষে এগিয়ে আসেন এবং আন্দোলন শুরু করে। এ জন্যে একদিকে যেমন বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের আন্দোলন তীব্র হতে থাকে অন্যদিকে তেমনি আসছে জাতীয় নির্বাচনে সম্মিলিত বিরোধীদল তথা তদানীন্তন জাতীয় নেতৃবৃন্দ হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দ্দির উদ্যোগে গঠিত যুক্তফ্রন্টের বিজয় লাভের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ১৯৫২ সনের একুশে ফেব্রুয়ারি স্মরণে যুক্ত ফ্রন্টের ঐতিহাসিক একুশ দফার প্রধান দফাই ছিল দেশের সংবিধানে উর্দু ভাষার সাথে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষা বাংলা ভাষাকেও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হবে। নির্বাচনে জয়লাভের পর জাতীয় সংবিধান প্রণয়ন কালে (১৯৫৬ সনে) তা করাও হয়েছিল। 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT