ক্রোড়পত্র

বিনা স্বদেশী ভাষা, পুরে কি আশা

বেলাল আহমদ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০২-২০১৮ ইং ০২:৩২:৩৮ | সংবাদটি ৩৬৯ বার পঠিত

অতুল প্রসাদ সেনের কবিতায় বলতে হয়-
‘মোদের গরব, মোদের আশা/আ-মরি বাংলা ভাষা।/তোমার কোলে তোমার বোলে/কতই শান্তি ভালবাসা’-
আবার ঘুরে এলো ফেব্রুয়ারি মাস। অন্তহীন প্রেরণার মাস। মাতৃভাষার জন্য উৎসর্গকৃত ভাষা শহীদদের জন্য ভালবাসার মাস। একুশ এখন কেবল একটি দিবস মাত্র। বাইশে ফেব্রুয়ারি থেকেই একুশের চেহারা পাল্টে যায়। একুশ উপলক্ষে অনুষ্ঠানমালা, বই মেলার আয়োজন এ সবটুকু আজকাল ট্র্যাডিশন বা প্রচলিত সংস্কৃতি ধারা। একুশের দিবসের রাতের আঁধারের সাথে সব উচ্ছ্বাস ও আবেগ চলে যায় নির্বাসনে। আর তখন একুশের আর্তিগুলো চাপা পড়ে যায়।
অথচ ’৫২ একুশ ছিল স্বাধীনতার অপর নাম। একুশ ছিল বাংলা সংস্কৃতির অপর নাম। একুশ ছিল বাঙালী জাতি সত্তার অপর নাম। একুশ ছিল ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভালবাসার নাম।
ড. মুহাম্মদ এনামুল হকের মতে, একুশ কোন বিশেষ দিনক্ষণ বা তিথি নয়, একটি জাতির জীবন্ত ইতিহাস। এ ইতিহাস অগ্নিগর্ভ। যেন সমীর ‘লাভা ¯্রাবক আগ্নেয়গিরি, কখনও অন্তদাহে গর্জন করছে। আবার কখনও চারিদিকে অগ্নি ছড়াচ্ছে। সত্যি এ ইতিহাস মৃত নয়। একেবারে জীবন্ত। বাঙালি জাতীয় চেতনার উপলব্ধির ক্রমবিকাশে এখানে এসে গাঢ়তার রূপ নেয়।
ইংরেজ জাতি তার ভৌগলিক সা¤্রাজ্য হারিয়েছে বটে, কিন্তু ভাষার সা¤্রাজ্য হারায়নি। ইংরেজি শুধু ভাষা সাহিত্যের ক্ষেত্রে নয় ব্যবহারিক ভাষা হিসাবেও বিশ্বে কদর রয়েছে। বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে আমাদের ভাষাবিদরা ইংরেজিকে অনুবাদ করে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের সমৃদ্ধি ঘটাতে পারেন এটা দূষণীয় নয়। তবে অফিস আদালতসহ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা ও কারিগরি শিক্ষার সকল পর্যায়ে বাংলাকে অগ্রগণ্য করতে হবে। তাছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত বাংলা প্রচলন করা এবং বহির্বিশ্বে নথিপত্র চালাচালির ক্ষেত্রে ইংরেজি প্রচলন অব্যাহত রাখা। এতদ্ব্যতিত বাংলাভাষাকে সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা করতে হলে দৃশ্যমান বিষয়গুলো যেমন সাইনবোর্ড, পোষ্টার, ব্যানার ও বিলবোর্ডের ভাষা বাংলা প্রচলনের ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে কোমলমতি শিশুদেরকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে বাংলা ভাষার ইতিহাস, বিবর্তন, ভাষার বিভিন্ন রূপ বা রীতি পাঠ্যক্রমে রাখতে হবে। তাছাড়া জীবনের শুরু থেকে শ্রেণী পার্থক্যের বিভেদ যেন না জন্মে সে জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত দেশের সকল শিক্ষাবোর্ডে একই শিক্ষাক্রম চালুর ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা ব্যবস্থা রহিত করতে হবে।
বাংলার আকাশ মুক্ত থাকার কারণে ইদানিং আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনের ফলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে রোগাক্রান্ত করছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে একুশের মূল শ্লোগান ছিল-‘মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে দিব না’। একুশের যে আন্দোলন ছিল তা মায়ের ভাষার জন্য। আমার মা সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন-‘হি সময় তার বড় পুয়া ক্ষেতে ছিল’। সেটা মূখ্য নয়, সবটাই মায়ের ভাষা। তবে বাংলা সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্রে আঞ্চলিক ভাষার ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। এই আঞ্চলিক ভাষা ও বাংলা ভাষার নিজস্ব সম্পদ। তবে ভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখার প্রয়োজনে স্থান, কাল পাত্র ভেদে বিশুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা ব্যবহৃত হওয়া আবশ্যক। অনেকে চিবিয়ে চিবিয়ে শব্দের আগে পিছে চন্দ্রবিন্দু যোগ করে এমন সব বাংলা বলেন যা শুনে অনেক সময় ভিমরি খেতে হয়। একুশের আন্দোলনে মায়ের ভাষা জীবনের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠার জন্য রফিক, সফিক, জব্বার, বরকত রক্ত দিয়েছিল। কবি শামসুর রহমানের কবিতায় বলতে হয়Ñ
এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়?/তেমন যোগ্য সমাধি কই?/মৃত্তিকা বলো, পর্বত বলো/অথবা সুনীল সাগর জল/সব কিছু ছেঁদো তুচ্ছ শুধুই/তাইতো রাখিনা এ লাশ আজ/মাটিতে পাহাড়ে কিংবা সাগরে/হৃদয়ে হৃদয়ে দিয়েছে ঠাঁই। এ কবিতার মধ্যে মূর্ত হয়েছে আমাদের গৌরব এবং অহংকারের ঋদ্ধ শহীদানের আত্মত্যাগে।
মাতৃভাষার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগের মহিমা ব্যাপ্ত রয়েছে পৃথিবীর সব জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষার স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে। দুঃখের বিষয় ধর্মীয় আচার, পূজা পার্বন অনুষ্ঠানে বাংলা অনেকটা বিতাড়িত। সেখানে শোনা যাবে হিন্দি, ইংলিশ ডিসকো গান আর বাদ্যযন্ত্রের ঝঙ্কার, নাচে-গানে চলনে-বলনে, পোশাক-পরিচ্ছদে, আচার-আচরণে, বিদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসন সমাজের সর্বাঙ্গে ভর করে আছে।
বিশ্বের প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজ নিজ মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশের বিষয়টি তাদের রাজনৈতিক অধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল, আজও জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলাভাষার প্রবর্তন হয়নি। সরকারি কাজকর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য, উচ্চশিক্ষা, গবেষণাসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ইংরেজির প্রাধান্য রয়েছে। আদালতে বাংলা চালু হয়নি, বিদ্যালয়ে বাংলা অবহেলিত। ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ব্যাপক হারে ঘটেছে। এখনও জাতীয় ভাষা পরিকল্পনা নেয়া হয়নি। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন বাংলা ভাষা বিকাশের লক্ষ্যে নিরীক্ষার প্রদক্ষেপ নেয়া। কাজেই সময় এসেছে আমাদের অস্তিমজ্জায় ভাষা ও সংস্কৃতিতে একুশের সংগ্রাম অব্যাহত রাখা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT