পাঁচ মিশালী

আস্থার সংকট

মুহাম্মদ আবদুল হাকীম তাপাদার প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০২-২০১৮ ইং ০৩:০৮:১২ | সংবাদটি ১১৩ বার পঠিত

বেলা বাড়ার সাথে পাইকার-খদ্দেরের ভিড় বাড়তে লাগলো। পাইকাররা প্রধানত বাকিতেই মালপত্তর নিয়ে থাকেন। তাঁরা আগের বারের দেনা ঢুকিয়ে নতুন করে নেন মালপত্তর, ওই বাকিতেই নেন। মহাজন লাল মোহন তিওয়ারি; বংশানুক্রমে ব্যবসায়ী। জন্ম তার বাংলায়, ¯œাতক করেছেন এ দেশে। মহাজন চমৎকার খোশ মেজাজি দিল দরিয়া আদমি। আগত সব পাইকারকে উমদা চা নাশতা করিয়ে থাকেন। নিজে নিরামিষাশী হলেও পাইকারদের নাশতায় আমিষের ব্যবস্থা থাকে, মুসলমানদের জন্য থাকে হালালের ব্যবস্থা।
শাতির আলী পুরনো পাইকার। লেনদেনে বিশ্বস্ত মানুষ। আগের দেনা কথা মতো বিলকুল বুঝিয়ে দেন। পুরনো দেনার দামটি ও বকেয়া রাখেন না। কোনো কোনো পাইকার আগের দেনার আংশিক শোধ করে আংশিক রেখে দেন যা নতুন মাসের মূল্যের সাথে যোগ হয়। শাতির আলী কিন্তু বিলকুল ব্যতিক্রম, তার কথা মাল নিবার সময় যখন কথা দেওয়া হয়েছে পরের বার গোটা দেনা চুকিয়েই নতুন মাল নেওয়া হবে, তাই কথা রাখতে হবে তো। আগের নেওয়া সব মাল বিক্রি হয়েছে কি না মহাজন তিওয়ারি জানতে চাইলে শাতির আলী বলেন কিছুটা রয়ে গেলেও কথা রাখতে হবে তো।
শাতিরের কথায় ও ব্যবহারে বেজায় খুশি মহাজন, বলতে গেলে কিছুটা বাড়তিই খাতির করেন তাকে। কখনো নিজে থেকে যেচেই বাড়তি মালও দেন। আর পাইকারদের একে অন্যে বাতচিত পোছাপুছি করতে করতে আর পুরনো হিসেব নিকাশ করতে এবং নতুন মালের চাহিদা পেশ করতে দুপুর গড়িয়ে যায়। পাইকারগণ চলে গেলেন কাছের নবাবি মসজিদে জোহরের নামাজ আদায় করতে। শাতির আলী বসেই থাকলেন মহাজনের বিশাল বারান্দায় আর সেবন করতে থাকলেন পান সুপারি আর খোশ গল্প করছিলেন দোকানের কর্মচারীদের সাথে।
নিজ নিজ মালপত্তর বুঝে নিয়ে পাইকারগণ বিদায় নিচ্ছিলেন একে একে। সরকার মানে প্রধান কর্মচারী মালের লিস্টি করে মূল্য লিখে রাখছিলেন লাল কাপড়ে বাঁধাইকরা হিসেবের খাতায়। শাতির আলীর পালা এলো মাল বুঝে নিয়ে বিদায় নিতে। দু’পাশে দু’টো বালিশে বাকিয়া দিয়ে বসা ভুড়িওলা মহাজন তাঁকে বললেন, শাতির সাহেব, আমি দুঃখিত আপনাকে মাল দিতে পারছি না। মানে আপনাকে বাকিতে এখন থেকে মাল দিতে পারবো না আর।
শাতির আলী তো অবাক, বললেন একি কথা কন তিওয়ারি বাবু। এতোটা দিন ধরে লেনদেন করছি, কখনো কথার এতোটুকু খেলাফ পেয়েছেন কি? তিওয়ারি বললেন, আমার সাথে কথার খেলাফ করেন নি সত্যি, এ আপনার বকবৃত্তি মানে অভিনয়ও তো হতে পারে। এ কথা বলে তিওয়ারি বাবু জিভে কামড় দিয়ে বললেন এ কড়া কথা বলার জন্য আমি দুঃখিত, লেখিন না বলে পারলাম না।
বিস্ময়ের সাথে শাতির বললেন, কী কসুর করলাম বাবু, আপনি এমন ছ্যাছাছোলা কথা কইলেন? তিওয়ারি বললেন, বিলকুল সাচ বাত বটে আমার সাথে লেনদেনে এখনো কোনো বরখেলাফ করেননি বটে, লেকিন করতে কতোক্ষণ। আমি তো এক ছোট্ট দোকানদার, সকল মহাজনের বড় মহাজন হলেন ও উপরওলা। আপনি ওই উপরওলা মহাজনের পাওনা শোধ করতে থাকলেন গাফিল। মুসলমানদের কাছে নেমাজ হলো উপরওলার পাওনা, সে দেনা মিটাইবার চাইতে পান সুপারির সোয়াদ আপনার কাছে উত্তম ঠেকলো।
আপনিই বলুন, সর্ব মহাজনের মহাজন প্রভু উপরওলার দেনা চুকাতে ধোঁকাবাজি করে যে তার উপর কি আস্থা রাখা যায়? আমি যদি মনে করি আমার থেকে একটা বড় দাও মারতে আপনি এমন আস্থাবানের অভিনয় করছেন এতে গলত হবে কি? ঠিক আছে শাতির সাব, আপনি আপনার মতো ঠিকই আছেন। কিন্তু আমি পড়েছি আস্থার সংকটে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT