সম্পাদকীয়

তেল-গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পাঁয়তারা

প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০২-২০১৮ ইং ০২:১৩:০২ | সংবাদটি ৮৭ বার পঠিত

বাড়ছে আবারও তেল-গ্যাসের দাম। খবরটি প্রকাশিত হয়েছে গত বুধবার একটি জাতীয় দৈনিকে। এতে বলা হয়- জ্বালানী তেল এবং গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী এপ্রিল মাসে ব্যয়বহুল এলএনজি-তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানী শুরুর পর দেশজ গ্যাসের সাথে তা মিশিয়ে বিক্রি শুরু হবে। আর ওই মাস থেকেই দেশীয় এবং আমদানীকৃত গ্যাসের দাম সমন্বয় করে নতুন এবং বর্ধিত দাম কার্যকর করতে চায় সরকার। এ ব্যাপারে যে আইনী বাধা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা কাটিয়ে কীভাবে মূল্য হার সমন্বয় করা যায় সেটি খতিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিপিসি বলছে- বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়ে দেশের বর্তমান বাজারদরকে ছাড়িয়ে গেছে। তাই বর্তমানে আবার লোকসান গুণতে শুরু করেছে বিপিসি। প্রায় তিন বছর বিশ্ববাজার থেকে কম দামে তেল কিনে দেশে বেশি দামে বাজারে বিক্রি করে লাভের মুখ দেখে বিপিসি। কিন্তু গত নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে আবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় লোকসানে পড়ে যায় বিপিসি।  
জানা গেছে, আগামী এপ্রিলের শেষ দিকে কিংবা মে মাসের প্রথম দিকে এলএনজি আমদানী শুরু হবে। ইতোমধ্যেই কাতার ও ইন্দোনেশিয়া থেকে এলএনজি আমদানীতে চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে। এই আমদানীকৃত গ্যাসের সঙ্গে দেশজ গ্যাস মিশিয়ে বিক্রি করলে দাম বেড়ে যাবে সরাসরি দ্বিগুণ। দেশে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম দুই দশমিক ১৭ ডলার। সমপরিমাণ গ্যাসের আমদানী মূল্য আট ডলার। সেই হিসেবে এই দুই গ্যাস মিশ্রণের মাধ্যমে বিক্রি করলে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয়সহ দাম পড়বে বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ। জ্বালানী তেলের দামও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করার জন্য বাড়ানো হবে উল্লেখযোগ্য হারে। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর বক্তব্য হচ্ছে, বাজার ব্যবস্থা এবং জনগণের ক্রয় ক্ষমতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। অপরদিকে নির্বাচনী বছরে সেবাখাতের এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্যের দাম বাড়াতেও দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে সরকার। তাছাড়া এক বছরের মধ্যেই তেল-গ্যাসের দাম বৃদ্ধি জনজীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও ভাবছেন সংশ্লিষ্টরা।
তেল-গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এমনই একটা বিষয়, যা সবাইকে চিন্তার মধ্যে ফেলে দেয়। এই দুইটি দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে বেড়ে যায় মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়। অর্থাৎ গ্যাস-তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে বাড়বে জনদুর্ভোগ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানী তেলের দাম বাড়লে বৃদ্ধি পায় আমাদের দেশে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে আমাদের দেশে সেই হারে কমানো হয় না। ইতোপূর্বে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানী তেলের দাম কমতে কমতে যখন তলানীতে নেমে আসে তখন চিন্তা ভাবনা শুরু হয় আমাদের দেশে দাম কমানোর। অনেক কসরত করার পর দাম অবশ্য কমানো হয়েছে। যা উল্লেখ করার মতো নয়। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে যে হারে দাম কমেছে সেই হারে কমানো হয় নি। অজুহাত হচ্ছে লোকসান। বিপিসি দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানী তেল ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করছে; এই ঘাটতি পুষিয়ে নিতেই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তেলের দাম কমানো হয় নি। সরকার এই রকম প্রচারণা চালালেও বিপিসির সেই লোকসান কাটিয়ে উঠতে কতোদিন লাগবে, তা বলা হয়নি। ফলে বছরের পর বছর এভাবে গ্রাহকদের কাছ থেকে অযৌক্তিক দাম নেয়া হচ্ছে তেলের। গ্যাসের দামও বাড়ানো হচ্ছে বারবার বিশ্বব্যাংকের দোহাই দিয়ে।
সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে তেল, গ্যাস কিংবা বিদ্যুৎ এইসব সেবার মূল্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকার জনমতের প্রতি খুব একটা তোয়াক্কা করে না। মাঝে মধ্যে দাম বৃদ্ধি সংক্রান্ত গণশুনানী হয়ে থাকে। কিন্তু গণশুনানীতে যেসব অভিমত ওঠে আসে তাতে মূল্য দেয়া হয় না। সরকার যে সিদ্ধান্ত নেয় সেটাই কার্যকর হয়। আর এই গণশুনানী হয়ে ওঠে লোক দেখানো, প্রহসন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে আমাদের দেশে গ্যাস-তেলের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা প্রদর্শন করা হয়। কিন্তু যেসব দেশের উদাহরণ দেয়া হচ্ছে সেইসব দেশের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা আর আমাদের দেশের মানুষের আর্থ সামাজিক অবস্থা এক নয়। এই ব্যাপারটি মাথায় নেই সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের। তার চেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের যে দুর্ভোগ বৃদ্ধি পায়- এ নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো মাথাব্যাথা নেই। অথচ তারা এই মানুষদের জন্যই রাজনীতি করেন। তেল, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির যে পাঁয়তারা চলছে, এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে সকল শ্রেণির মানুষকে। 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT