উপ সম্পাদকীয়

পাখির জন্য ভালোবাসা

মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০২-২০১৮ ইং ০২:১৫:২৮ | সংবাদটি ১৫৫ বার পঠিত

প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংসে আজ উন্মত্ত পৃথিবী। এ কঠিন বাস্তবতায় ষড়ঋতু ও বৃক্ষলতাবিহীন এ নগরীতে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে চড়ুই পাখি। শক্তিমানরা টিকে থাকে, দুর্বলরা বিলুপ্ত হয়- ডারউইনের এ যুক্তি মানতে পারছি না। কারণ শক্তিমান পাখি চিল, শকুন, বাজ প্রায় হারিয়ে গেছে; কিন্তু ক্ষুদ্র পাখি চড়ুই টিকে আছে এখনও। নগরায়ণের নখরে ক্ষতবিক্ষত হয়েও চড়ুই পাখির চঞ্চলতা এ নগরীর প্রাণবৈচিত্র্যে দিয়েছে অনন্য শোভা। মানুষের সঙ্গ তাদের মন ছুঁয়ে যায়। খাবার পেলে কাছে আসে, আবার অনাদর আর অবহেলায় অভিমানে দূরে সরে যায়। নগরায়ণের পরিধি যত বিস্তৃত হচ্ছে, জীববৈচিত্র্যের জগৎ তত সংকুচিত হচ্ছে। এ ক্রান্তিলগ্নে ফ্ল্যাট সংস্কৃতির সম্মোহনে প্রকৃতি ও পাখির সঙ্গে বন্ধনহীন মুঠোফোনের পর্দায় বন্দি আমাদের জীবন। যে জীবনে আছে শুধু স্বার্থপরতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, অন্তর্মুখিতা। প্রাণহীন পুতুল, মনোগ্রামের ছবি, খেলনা পাখি এ যুগের শিশুদের সঙ্গী। অথচ চোখ ফেরালেই আমাদের চারপাশে শুধু চড়ুই আর চড়ুই। দলবেঁধে আসা, চঞ্চু দিয়ে খুটে খুটে খাওয়া, ঠোঁট ডুবিয়ে পানি খাওয়া, উড়ে যাওয়া, মিটমিট করে তাকিয়ে থাকা, বালি বা মাটিতে গর্ত করে শয়ন, রোদে অবগাহন। হঠাৎ উড়াল, হঠাৎ আড়াল- এত মায়াবী, এত আদুরে পাখি, মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকি! চড়ুইয়ের এ দুরন্তপনা আমাদের চিরচেনা।
পাখি এ বিশাল নভোম-ল ও ভূম-লের প্রতিপালক গ্রষ্টার অপূর্ব সৃষ্টির অনুষঙ্গ। এরা নিজস্ব ভাষা ও স্বকীয়তায় মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর গুণগান করে। মহান ঐশীগ্রন্থ কোরআনের বর্ণনা মতে, পাখিদের ডানার সম্প্রসারণ, সংকোচন এবং বায়ুম-লে স্থিতি মহান আল্লাহ্র মহাজাগতিক ব্যবস্থাপনার এক অনন্য অভিব্যক্তি। ইংরেজি ‘ভি’ অক্ষরের আকারে পাখির দলবদ্ধ যাত্রা মানুষের একতাবদ্ধ থাকার জন্য এক অতুলনীয় শিক্ষা। মানুষের মতোই পাখিদের প্রেম-বিরহ, হাসি-কান্না এবং জীবন পরিক্রমা আছে। আছে ভাষা, তারা কান পেতে শোনে মানুষের কথা। বোঝে তাদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা বা বিরূপতা। আমাদের কত প্রাচুর্য আর সুস্বাদু খাবার। অথচ শ্রমনিষ্ঠ এ পাখি সারাদিন নগরজুড়ে খুঁজে বেড়ায় আহার। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অনিবার্য শর্ত খাদ্য, যা মানুষ, পশু, পাখি- সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। মানুষের একটু খাবার, একটু আদরে এদের অনাবিল প্রশান্তি। ঘরের বারান্দায়, জানালায় ছোট পাত্রে সামান্য চাল, ভাত, পানি রাখলে চড়ুইদের ভীষণ তুষ্টি। পরিবেশ অধিদফতরের ভবনের ছাদে তাদের জন্য খাবার আর পানির ব্যবস্থা রেখেছিলাম দীর্ঘদিন। স্থানটিতে সকাল-সন্ধ্যা প্রবল আকুতি নিয়ে খাবারের অপেক্ষায় তারা ব্যাকুল হয়ে থাকত, রুটিন মেনে খাবার খেতে আসত। আমার বাসার বারান্দায় একদল চড়ুই জটলা বেঁধে নিয়মিত আসে খাবার খেতে। গুঁটিসুটি মেরে খাবারের অপেক্ষায় বসে থাকে। নিয়মিত খাবার পেলে এরা কাছে আসবেই, এটা পরীক্ষিত।
অলসতায়, জড়তায় মানুষের ঘুম না ভাঙলেও সূর্য উঁকি দেয়ার আগেই চড়ুইরা দশদিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে। ভোর থেকে শুরু হয় কিচিরমিচির ডাক। সারাদিনে একটি চড়ুই মাত্র ৫-৭ গ্রাম খাবার খায়। কত খাবার আমাদের নষ্ট হয়, বিদেশি কুকুর পুষে কত অর্থের অপচয় হয়, আবর্জনায় কত খাবার ফেলে দেয়া হয়। অথচ হাঁড়ির কোনায় লেগে থাকা সামান্য ভাতটুকু পাখিদের জন্য বিরাট কিছু। সুবোধ চড়ুই পাখি আমাদের জীবন বিঘিœত করে না, কাকের মতো ছোঁ মেরে খাবার নিয়ে যায় না। ইঁদুরের মতো গর্ত করে খাবার মজুদ করে না।
চড়ুইয়ের বিষ্ঠা গৃহিণীদের কাছে বিরক্তিকর। বারান্দায় বা ছাদে শুকানো জামা-কাপড়ে বিষ্ঠা পেলেই রাগান্বিত, বিরক্ত হন তারা। পাখিদের এ স্বভাব প্রকৃতিপ্রদত্ত, তাই পাখিদের প্রতি সংবেদনহীনতা নয়, চাই মনের উদারতা। আমাদের বৈরী আচরণে তারাও বিরক্ত, অতিষ্ঠ।
নগরায়ণের দিগন্ত যতই প্রসারিত হচ্ছে, ততই বিলুপ্ত হচ্ছে চড়ুই পাখিদের জলাধার, খাবার, ঝোপঝাড়। ১৯৮৯ সালে ঢাকার বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ছিল ১৮-২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০০৯-এ তা দাঁড়ায় ২৪-৩০ ডিগ্রি। ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল তাপমাত্রা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯ ডিগ্রি। এ উষ্ণতা বৃদ্ধি পাখিদের জন্য ঝুঁকি। এমনকি রাতদিন যন্ত্রদানবগুলোর হাইড্রোলিক হর্নের অসহনীয় শব্দদূষণে চড়ুইরা আজ সংকটাপন্ন। শব্দ দূষণের মাত্রা এখন ঢাকা মহানগরীতে ১৩১ ডেসিবলে পৌঁছেছে। এ ছাড়া আতশবাজি, মাইকের গগনবিদারী শব্দ, ভবন নির্মাণযজ্ঞ, বিমানের কানফাটা শব্দ, যানবাহনের তির্যক আলো, ইলেকট্রনিক্স ও মোবাইল টাওয়ারের তেজস্ক্রিয়তা- সব মিলে এ নগরী যেন আগ্নেয়গিরির লাভা, পরিণতিতে চড়ুইদের শ্বাসরোধী অবস্থা। আমার বাসার কাছেই একজোড়া কাঠঠোকরা ছিল। ইট-পাথরের আবরণে এক বছরে তারাও হারিয়ে গেছে। ৬০ শতাংশ কংক্রিটের এ নগরীতে পাখিকুল আজ ছিন্নমূল। তারাও শীতার্ত, ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত এবং জীবনযুদ্ধে লিপ্ত। নগরায়ণ, ধোঁয়া ও ধুলার আস্তরণ এবং অগণিত এসির সিএফসি গ্যাসের আগ্রাসনে চড়–ই পাখি বিলুপ্তির পথে। উঠান নেই, বাগান নেই, অথচ নগরীর ভবনগুলোর কার্নিশ, ছাদ, বারান্দা ও চিলেকোঠায় নিজেদের আবাস নিশ্চিত করেছে তারা। মাত্র ৫-৬ বছর আয়ুষ্কালের এ পাখি মানুষের আড়াল হতে চায় না, শত সংকটেও এ নগরী তাদের প্রাণপ্রিয় চারণভূমি।
একসময়কার সবুজ আঙিনা, মাধবীলতার ঝাড়, ফুলের বাগানে সমৃদ্ধ ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের বাড়িগুলো হারিয়ে যাচ্ছে এ নগরী থেকে, স্থান পাচ্ছে আকাশচুম্বী অট্টালিকা, ভূ-স্থাপত্যিক এ বিবর্তনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে চড়–ইদের বংশবৃদ্ধি ও টিকে থাকা। তথাপি চড়ুইরা এ ব্যস্ত নগর জীবনের অংশ, আমাদের কবিতা, গল্প ও উপন্যাসের উপজীব্য। মেঘের গর্জনে, মুষলধারে বৃষ্টিতে, কালবৈশাখীর ঝড়ে এরা দলে দলে আশ্রয় নেয় প্রকৃতির কোল ছেড়ে বাসাবাড়ির বারান্দায়, চিপেচাপায়। এ নগরীর হিমশীতলতা, তপ্ত হাওয়া, মশার যন্ত্রণার মাঝে তারা জীবন-জীবিকার সন্ধানে পেতে চায় মানুষের উষ্ণতা। যত নিঃসীম আকাশ থাকুক, যত অনন্তে ওড়ার ডানা থাকুক, বারবার ফিরে আসে মানুষের কোলাহলে। অজগ্র কীটপতঙ্গ এবং মাছি সাবাড় করে পরিবেশের রক্ষাকবচ হিসেবে অবদান রাখছে চড়ুই।
ইদানীং অনেকে চড়ুই ধরে খাওয়া শুরু করেছে বলে জেনেছি। এ নিষ্ঠুরতা ক্ষমার অযোগ্য ও অমানবিক। নির্বিচারে চড়ুই পাখি হত্যার পরিণামে ভয়ানক প্রাকৃতিক দুর্যোগের শাস্তি ভোগ করেছিল চীন। চড়ুই ফসলের ক্ষতি করে, এ ভ্রান্ত ধারণায় পঞ্চাশের দশকে মাও সেতুংয়ের নির্দেশে লাখ লাখ চড়ুই নিধন করা হয়, পুরস্কৃত করা হয় নিধনকারীদের। কিন্তু ঠিক ৪-৫ বছরের মাথায় চড়ুইয়ের অভাবে শস্যক্ষেত্রে পোকামাকড়ের বিধ্বংসী আক্রমণে খাদ্য সংকটের কবলে পড়ে চীন। দুর্ভিক্ষে মারা যায় প্রায় ২০ মিলিয়ন মানুষ। এরপর আবার শুরু হয় চড়ুই রক্ষার আন্দোলন। সুতরাং জীবন পুড়ে ছাই হয়ে যাবে পাখির অনিষ্টতার অভিশাপে, এমন অজগ্র নজির আছে পৃথিবীর বুকে।
চড়–ই পাখিদের বাঁচতে দিন। তাদের খাবার দিন। বারান্দায় বিষ্ঠা ছড়ালেও গৃহিণীরা তাদের আপন করে নিন। স্নেহের তরুণ প্রজন্ম, তোমাদের চারপাশ ঘিরে আছে প্রযুক্তি, তাই ক্রমেই সরে যাচ্ছে পাখি ও প্রকৃতি। পড়া আর বিনোদনের ফাঁকে প্রতিদিন দু’বেলা ছাদে বা বারান্দায় চড়ুইদের জন্য সামান্য খাবার ছিটিয়ে দাও। দেখবে তাদের কত আনন্দ, আহ্লাদ। প্রিয় গৃহিণীরা, সাংসারিক ব্যস্ততার মাঝেও মিটিয়ে দিন চড়ুইদের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার যন্ত্রণা। ক্ষুধার জ্বালা প্রকাশে অক্ষম যারা, তাদের জন্য উজাড় করে দিন প্রগাঢ় ভালোবাসা, এখানেই মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির সার্থকতা। এ মহৎ কাজে সন্তানদের অনুপ্রাণিত করুন। ড্রইংরুমের দেয়ালে ছবির পাখি কিংবা খাঁচায় পোষা পাখির চেয়ে চাই বাস্তব পাখির সঙ্গে সখ্য। মহান গ্রষ্টার প্রতিটি সৃষ্টির মর্যাদা আছে। বিশাল এ প্রকৃতির রাজ্যে জীবনটা পারস্পরিক, সামষ্টিক। কোনো জীবনই ক্ষুদ্র নয়, কোনো প্রাণীই সামান্য নয়, শুধু জৈব প্রবৃত্তি পূরণের জন্য মানুষের জীবন নয়। পশু-পাখি, গাছপালা ও মানুষ মহান আল্লাহর ঐশী নিয়মে এক অখ- সূত্রে নিবদ্ধ। আমাদের প্রতিটি ঘরবাড়ি যেন হয় চড়ুই পাখির জন্য পরম মমতায় ভরা ভুবন, নির্ভয় আবাসন। জালের মতো জড়িয়ে আছে আমাদের জীবনে ফেসবুক, টিভি, ক্রিকেট। তাই হারিয়ে যাচ্ছে সব অনুভূতি, আবেগ। আসুন, কম্পিউটার গেমস আর টেলিভিশননির্ভর যান্ত্রিক বিনোদনের আসক্তি কমিয়ে একই সমতলে গড়ে তুলি চড়ুই পাখির সঙ্গে মিতালী। মানুষ ও পাখির সখ্যে পূর্ণ হয়ে উঠুক নগরীর প্রতিটি বাড়ি। আসুন, নিশ্চিত করি তাদের জন্য নিরুপদ্রব আবাসন, বিচরণ ও জীবনধারণ। এ নগরীতে তারা চায় নিরাপদ অভিবাসন।
পাখি ও প্রকৃতি বিলুপ্তির এ যুগসন্ধিক্ষণে সচেতন নাগরিকদের কাছে বিনীত অনুরোধ, শত ব্যস্ততার মাঝে যেন আমরা উন্মেষ ঘটাই চড়ুই পাখিদের প্রতি মমত্ববোধের। আমাদের সামান্য ত্যাগ আর কষ্ট সৃষ্টি করতে পারে কংক্রিটের এ জঙ্গলে চড়ুই পাখিদের জন্য একখ- প্রকৃতির অংশ।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • দেশীয় চ্যানেল দর্শক হারাচ্ছে কেন?
  • বিশ্ব বরেণ্যদের রম্য উপাখ্যান
  • আশুরা ও কারবালার চেতনা
  • জলবায়ু পরিবর্তন ও সংকটাপন্ন বন্যপ্রাণী
  • অধ্যাপক ডাক্তার এম.এ রকিব
  • শিশু নির্যাতন ও পাশবিকতা
  • প্রবীণদের প্রতি নবীনদের কর্তব্য
  • রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে আগস্টের শোকাবহ ঘটনাবলী
  • সংযোগ সেতু চাই
  • টিবি গেইট ও বালুচরে ব্যাংকিং সুবিধা চাই
  • হাসান মার্কেট জেল রোডে স্থানান্তর হোক
  • ২৭নং ওয়ার্ডের কিষণপুর-ঘোষপাড়ার রাস্তা মেরামত প্রসঙ্গে
  • প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
  • দেশীয় রাবার শিল্প বাঁচান
  • পরিবর্তিত হও : ছকের বাইরে ভাবো
  • শিক্ষা ও চিকিৎসায় প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ
  • কতটা ভালোবাসি দেশ?
  • রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান আন্তর্জাতিক চাপেই সম্ভব
  • শুধু একবার বলুন : আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি
  • Developed by: Sparkle IT