মহিলা সমাজ

নারী নির্যাতনে যৌতুকের প্রভাব

সৈয়দা মানছুরা হাছান (মিরা) প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০২-২০১৮ ইং ০১:৫৪:২৭ | সংবাদটি ২৮২ বার পঠিত

নারী নির্যাতন বর্তমানে একটি বড় ধরনের সমস্যা বলে চিহ্নিত হয়েছে। নারীকে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হতে হচ্ছে। মানবতার বিকাশে হযরত আদম ও হাওয়া এবং পরবর্তী স্বামী-স্ত্রী রূপে নারী-পুরুষ যার যার ভূমিকা রেখেছেন। পরলোকেও তাদের মর্যাদা রয়েছে সৎকাজের প্রতিদান নারী পুরুষের জন্য সমান। ঐতিহাসিক বিদায় হজ্জের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, ‘ভ্রাতৃগণ, শ্রবণ কর। নারীদের অধিকারের ব্যাপারে সতর্ক থাক। নারীদের প্রতি তোমরা সদ্ব্যবহার করবে। তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি তোমরা অন্যায় আচরণ করবে না।’
কিন্তু আমাদের সমাজব্যবস্থায় নারীর প্রতি সহিংসতা দিন দিন বেড়েই চলছে। এর নানাবিধ কারণের মধ্যে অন্যতম একটি যৌতুক। এই যৌতুক প্রথা একটি জঘন্য সামাজিক ব্যধি। ছোঁয়াচে রোগের মতো এই যৌতুক প্রথা বিভিন্ন জাতি ও সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে প্রবেশ করেছে। ‘সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই কন্যা দায়গ্রস্ত পিতারা এই পণপ্রথার অভিশাপের শিকার হয়েছেন। মেয়েদেরকে শশুরবাড়িতে এর জন্য বহু নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছে। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় যৌতুকের কারণে নির্মম হত্যার শিকার নারীদের চিত্র চোখে পড়ে। নিজেকে তখন খুব ছোট মনে হয় এবং মনে প্রশ্ন জাগে তবে কি নারী হয়ে জন্ম নেওয়াটা পাপ? এ প্রশ্ন শুধু আমার না এটা আমাদের সমগ্র নারী জাতির।
ইসলাম যৌতুক প্রথাকে নিষিদ্ধ করেছে। যৌতুক হলো- বিবাহ উপলক্ষে বরকে উপহারাদি দান করা। অর্থনৈতিক অসমতা যৌতুক প্রথার একটি অন্যতম কারণ। কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা হয়তো মেয়ের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা চিন্তা করে তার যথা সর্বস্ব দান করে পাত্রপক্ষকে সন্তুষ্ট করতে চান। কিন্তু কোনো কারণে প্রতিশ্রুতিমতো পণের সামগ্রী দিতে ব্যর্থ হলে মেয়েটির ওপর নেমে আসে অমানুষিক অত্যাচার আর নির্যাতন। অনেক ক্ষেত্রে মেয়েটিকে হত্যা করতেও তারা দ্বিধাবোধ করে না। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি এখানে নির্যাতিতা এবং তার পরিবার সঠিক বিচারটুকু থেকেও বঞ্চিত হয়। যৌতুক প্রথা আমাদের সমাজকে পদে পদে কলুষিত করছে। এর কারণে কতো বালিকা বধূর হাতের মেহেদির রং যে অকালেই মুছে গেছে তার ইয়ত্তা নেই। তাছাড়া যৌতুক পারিবারিক জীবনে স্বামী-স্ত্রীর শ্রদ্ধাপূর্ণ সম্পর্ককে বিনষ্ট করে।
যৌতুক প্রথা বিলোপে সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। পত্র-পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে যৌতুকের কুফল সম্পর্কে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। যৌতুক গ্রহণকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ছাড়াও সরকার নারী নির্যাতন বিরোধী ও পারিবারিক আদালত গঠন করেছে। নারী নির্যাতনের শাস্তি সর্বোচ্চ মৃত্যুদন্ডে উন্নীত করা হয়েছে।
আমাদের সমাজের মধ্যবিত্ত, নি¤œ মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকল শ্রেণির মধ্যে যৌতুক গ্রহণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের যৌতুক গ্রহণ করার ধরনের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। এ থেকে আমাদের সকল শ্রেণির মানুষকে বেরিয়ে আসতে হবে। ‘যৌতুক’-কে, না বলতে হবে। এটা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। তবেই এ সমাজে নারী নির্যাতন কিছুটা হ্রাস পাবে নিঃসন্দেহে। নারী-পুরুষ সম্মিলিতভাবে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হলে অর্থাৎ যৌতুক গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করলে এর প্রবণতা কমে যাবে। নারী নির্যাতনের অন্যতম মাধ্যম হল এই যৌতুক বা পণপ্রথা। এটি সমাজের জন্য একটি মারাত্মক অভিশাপ। এ অভিশাপ থেকে আমাদের সমাজ তথা নারীদেরকে মুক্ত করতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গির এবং মানসিক পরিবর্তন এখানে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। নারী নির্যাতন বন্ধে সকলকে সচেতন হতে হবে। তবেই যৌতুকের অভিশাপ থেকে রেহাই পাব আমরা। নারীকে মানুষ হিসেবে ভাবতে হবে নারী হিসেবে নয়। ‘সুখী-সুন্দর সমাজ জীবনের জন্য নারী নির্যাতন বন্ধ করুন’- এটাই আমাদের কাম্য।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT