মহিলা সমাজ

অপমানের জ্বালা

নিষাত জেসমিন প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০২-২০১৮ ইং ০১:৫৫:৪২ | সংবাদটি ১০৭ বার পঠিত

মোল্লা সাহেব আর বড় দাদা উঠোনের দু’মাথায় দু’জন। মোল্লা সাহেব দু’হাত পেছনে নিয়ে তসবি পড়ছেন আর হাঁটছেন। বড় দাদা লাঠি ভর করে আস্তে আস্তে হাঁটছেন। যখন উঠোনের মাঝামাঝি এসে দু’জন মিলিত হন, তখন কিছু কথা বলেন ফিস ফিস করে। কিন্তু এখন যখন দু’জন মিলিত হলেন, বড় দাদা চেচিয়ে জোরে জোরে বলছেন, দেখি ছেলেটি এসে কীভাবে ঘরে ঢুকে, কত বড় সাহস তার, আমার সাথে চ্যালেঞ্জ। বড় দাদার সব কথায় মোল্লা সাহেব জ্বি জ্বি করেন। এবার উনার মুখ খুলল, বললেন আপনি ঠিক বলেছেন দাদা, আমার সামনে আপনাকে, আপনার পরিবারকে অপমান, দেখি ছেলেটি কীভাবে এসে ওকে নিয়ে যায়, আমরা সারা রাত পাহারা দিব।
পুরো ঘর নীরব, কবির একদমে এটুকু বলে থেমে গেল। নিজু বলে উঠল, দারুণ তো গল্পটি! তবে কিছু এখনও বুঝিনি। পরে কি হল বলুন কবির ভাই। কবির আর কথা না বলে শুয়ে পড়ল, তার শুয়ার ভঙ্গিটা দেখে মনে হচ্ছে সে কতো রাত জেগে ছিল, হাই তুলতে তুলতে শুয়ার সময় কবির শুধু বলল, লাইট অফ কর। কবির শুয়ে শুয়ে বলছে, বুঝলিরে নিজু গল্পের মোল্লা হলাম আমি আর বড় দাদা হলো তোর বাপ, মনে মনে এসব কথা বলে কবির ঘুমিয়ে গেল। নিজু আর সুমন বিছানা গুছাতে গুছাতে বলল, হ্যাঁ রে সুমন লোকটি কতো ভালো না, বাড়িওয়ালার কি আত্মীয়, আমাদের সাথে কীভাবে তাড়াতাড়ি মিশে গেলেন। সুমন বলল হ্যাঁ, আমারও কবির ভাইকে খুব ভালো লাগে। জানিস সেদিন তুই কলেজে ছিলি তখন কবির ভাইকে একটি গান গাইতে বললাম, উনি বললেন, গান তো ভাই নকল করে না গাইলে সুর আসে না, পরে বললাম, আচ্ছা নকল করেই একটু শুনান, পরে প্রেমের তাজমহল ছবির একটি গান নকল করে শুনালেন। কি তোকে এখন শুনাব আমি? নিজু বলল, আয় শুয়ে পড়ি, শুয়ে গান বলার আর গান শুনে শুনে ঘুমিয়ে যাব। সুমন গান বলছে-
এ চোখে রয়েছে মেঘনা, সাদা পানির নল,/ তার মাঝখানে করব আমার চলাকৌশল/ তুমি জানো, আমি জানি, আরও অনেকে জানল/ আমার চোখের পানির কতো মূল্য,/ কিছু বৃষ্টি হয়নি খরা... তোমার প্রেমের সমতুল্য।
না রে প্রেমের সমতুল্য না, আরও কি যে বললেন। এই নিজু, কি রে সুন্দর না। নিজু তো ঘুমিয়ে গেছে কোনো শব্দ নাই। সুমন ও ঘুমিয়ে গেল। নিজু আর সুমন একসাথে একটি বাসা ভাড়া করে থাকত, নিজু অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ে আর সুমন চাকরি করে, একটা বেড রুম, কিচেন আর বাথরুম। সেদিন বাড়িওয়ালা আনসার সাহেব কবিরকে সাথে নিয়ে এসে বললেন, বেড রুমে দুইটি বিছানা, একটিতে কবিরকে দিতে হবে আর তোমরা দু’জন এক বিছানায় শুবে। কবির আমার আত্মীয়, দু’মাস পর চলে যাবে। ও একটি কাজে এখানে আসছে। ও তোমাদের রুমে থাকায় তোমরা পাঁচশ টাকা কমিয়ে দিবে। এতে তোমাদের কোনো আপত্তি আছে? সুমন আর নিজু দু’জনই বললো না, না চাচা কোনো সমস্যা নেই। সেই থেকে কবির থাকে। একটি বুয়া আছে, সে এসে রান্না করে দিয়ে যায়। কবির যে কি কাজে এখানে এসেছে কেউ জানে না। সুমন একবার জিজ্ঞেস করেছিল, সে বললো, বুঝবে ভাই, সময় হলে সব-ই বুঝবে। সবার থেকে ছোটো নিজু, আর বড় হলেন কবির। কবির দেখতে এতো বিশ্রী অথচ তার কথাবার্তা, গল্প, গান অসাধারণ। আল্লাহ জন্ম থেকে মানুষের একটি সুন্দর প্রতিভা দিয়ে দেন। কবির কালো, নাক ছোট হয়ে উপরের দিকে তোলা, নাকের টানে ঠোঁটটিও উপরে গেছে, আর সুপারি সব সময় মুখের ভিতর থাকে। তাই মুখটি বানরের ন্যায় দেখায়। নিজুকে সবার চাইতে বেশি ¯েœহ করেন, সে ছোট ¯েœহ করাটাই স্বাভাবিক। কবিরের দুই মাস হতে আরও বিশ দিন বাকি। একদিন সকালে কবিরকে ঘুমে রেখে নিজু আর সুমন বের হয় মর্নিং ওয়াকে। সুমন বললো, কাল রাতে কবির ভাইকে একটা ছবি হাতে দেখলাম, আর কি যেন বলছেন বুঝতে পারলাম না। আচ্ছারে নিজু কবির ভাইয়ের ওই ব্যাগের ভিতরে কি? কাউকে দেখতে দেন না? নিজু বললো, হয় তো উনার প্রিয় কিছু হবে। সুমন আবার বললো, তোকে কবির ভাই এতো ¯েœহ করেন কেন? নিজু বলল, আমি ছোট তাই। সুমন ধমক দিয়ে বললো, সব কিছু এতো সহজ ভাবে নিস না। আমার সন্দেহ হচ্ছে কবির ভাইকে। চল এক কাজ করি, তোদের বাড়িতে যাই, গত চিঠিতে যে রতœা জানিয়েছিল, ওর হাউজ টিচার নাকি মানুষের নাম শুনে বলেদেন, তার ভিতরে আসল মতলবটা কি? চল না, উনার কাছে গিয়ে কবির ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করি। নিজু হেসে ফেললো, বললো কি রতœাকে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে, এটি স্বাভাবিকভাবে বললে তো হয়, এতো ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলার দরকারটা কি? সুমন হেঁসে বললো, আসলে তুই আমার সমন্ধিক কি না। পরে দু’জন বাসে উঠলো নিজেদের বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। নিজুর দুই বোন, অনন্যা আর রতœা। অনন্যা নিজুর বড় আর রতœা ছোট। নিজুর ছোট বোনের সাথে সুমনের ভাব আছে। নিজুকে সুমন সব বলেছে, নিজু মেনেও নিয়েছে তবে তার একটি শর্ত, রতœা যেন কখনো জানতে না পারে, নিজু তাদের সম্পর্ক জানে কারণ তার ধারণা হল যদি রতœা জানতে পারে তাদের সম্পর্ক সে মেনে নিয়েছে তবে রতœার প্রতি বড় ভাইয়ের মতো যে একটি ভাব আছে, এটি চলে যাবে। সুমন শর্তে রাজি, তাই প্রেম শুরু। গত ছুটিতে যখন সুমন নিজুদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল তখন পুকুরে মাছ ধরতে সবাই নেমেছিল। রতœা পুকুরে দাঁড়িয়ে মাছ ধরা দেখছিল, আর সুমন একটি রুই মাছ তুলে উপরে ফেলার উদ্দেশ্যে ছুড়ে মারে, আর তখন রতœার মুখে এসে পড়ে, চোখে কাদা ঢুকে, ডাক্তারে নিয়ে যাওয়া, চোখে ড্রপ দেয়া, সে কি কেলেঙ্কারী ব্যাপার। সেই থেকে ওদের ভাব জমেছে। রতœা যতো চিঠি দেয় আগে নিজু পড়ে, এরপর সুমনকে দেয়। সুমন বলে, তুই যে এতো খারাপ, নিজের বোনের দেয়া চিঠি, ছিঃ তোর লজ্জা করে না? নিজু হেসে বলে আলাদা মজা আছে তুই বুঝবি না। সুমন বলে, আমি বিয়ের পর রতœাকে সব বলে দেব। নিজু তখন ঝগড়া লাগিয়ে দেয়। ওরা নিজুর বাড়িতে চলে আসল, রাতের খাবারের পর, নিজুর বাবা আসলেন আর বললেন তোমরা তো সবই শুনলে এখন দেখ কি পদক্ষেপ নেয়া যায়, আমি আমার ছেলেকে হারাতে চাই না। আমার একটাই মাত্র ছেলে আর মেয়েরা তো পরের ঘরে চলে যাবে দু’দিন পর। পরের দিন আবার নিজুরা শহরে চলে গেল। ওই রাতে কবির ভাইকে তারা ধরে বসলো, আজ গল্পটি শেষ করতে হবে। কারণ কাল আপনি চলে যাবেন কাল দুই মাস আপনার। কবির বলল, হ্যাঁ আজ গল্পটি শেষ করতে হবে, কারণ আজই আমার কাজের শেষ রাত। সবাই গল্প শুনতে বসলো, কবির বলছে, তারা পাহারা দিচ্ছিল যেন ওই ছেলেটি এসে মেয়েটি কে না নিয়ে যায়। ছেলেটির নাম হিরা আর মেয়েটির নাম, নাই বললাম, উম ধরো ঝর্ণা। ঝর্ণার বাবার কিন্তু অনেক সম্পত্তি, তা দেখে মোল্লা সাহেবের লোভ হয়ে গেল, লোভ হওয়াটাই স্বাভাবিক। মোল্লা সাহেব বড় দাদাকে বললেন, যদি আপনি কিছু মনে না করেন তবে আপনার মেয়েকে আজ রাতের ভিতরে না হয় আমার সাথে, মোল্লা সাহেব কথাটি শেষ করতে পারেন নি, বড় দাদা জুতা খুলে মোল্লা সাহেবের গালে মারলেন। রাতে রশি দিয়ে বেঁধে রাখলেন, আর সকালে জুতার মালা পরিয়ে সারা গ্রামে... কবির আর কিছু বলতে পারলো না। তার চোখ লাল হয়ে পানি পড়ছে, চোখ বন্ধ করে ফেলেছে সে। কাঁপতে কাঁপতে বলছে, আচ্ছা নিজু তুমি বল সে দিন আমার কি অপরাধ ছিল। তোমার বোনের বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে। কবির চোখ খুলে হকচকিয়ে গেল, উনি নিজের অজান্তেই গল্পের নায়ক এবং নায়িকার সঠিক চরিত্র বলে ফেলছেন। ঠিক তখনি সুমন উনার ব্যাগটি নিল, ব্যাগের ভিতরে একটি পিস্তল এবং নোটবুক পেল। নোটবুকে গল্পটি লিখা ছিল, আর গল্পের শেষে লিখা ছিল, আমি অপমানের বদলা নিব, নিজুকে খুন করব, উনার একমাত্র বংশের প্রদীপ উত্তরাধিকারীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিব। এতোক্ষণে কবির, নিজুর ওপর ঝাপিয়ে পড়েছে। ঠিক তখনি বড় দাদা উনার দুই মেয়ে অন্যান্য রতœাকে নিয়ে উপস্থিত, সাথে ইন্সপেক্টর রাহাত খান। কিছুক্ষণের মধ্যে পরিবেশ শান্ত হল। নিজুর বাবা কবিরের কাছে এসে বললেন, এই চোরটাকে ধরুন ইন্সপেক্টর সাহেব, ও আমার ছেলেকে খুন করতে চায়। রাহাত খান বললেন- আপনারা সবাই বসুন, আমি সবই শুনেছি সুমনের কাছে। কবির তো খুন করতে চায় কিন্তু করেনি, আর খুন করার কারণটি কি? আমি সবই তদন্ত করেছি। এখানে আপনারও দোষ আছে। সেদিন আপনি যদি কবিরকে এভাবে অপমান না করতেন তবে ওর মনে প্রতিশোধের স্পৃহা জাগত না। আপনি ওকে বুঝিয়ে আপনার মেয়ের প্রতি বিয়ের প্রস্তাবটি প্রত্যাখান করতে পারতেন। এসব কথাবার্তা হচ্ছে এমন সময় সবার দৃষ্টি কবিরের দিকে পড়ল, সে ট্রেতে করে চা নিয়ে কিচেন থেকে বের হচ্ছে। চা এনে সর্ব প্রথম বড় দাদাকে দিল, এরপর অনন্যা, এভাবে সবাইকে, কবির বলর, নিজুকে আমার প্রতি আকৃষ্ট করার জন্যে যে ¯েœহ আমি তাকে করেছিলাম, সেই আদর ¯েœহগুলো ওকে খুন করার পথে দেয়াল হয়ে দাঁড়াল। কত দিন সুযোগ পেয়ে আমি ওকে মারতে পারলাম না। আমি চলে যাচ্ছি। আজ আমার রাগ যন্ত্রণা সব মিটে গেছে। কবির শুধু দরজা থেকে পা টি বের করবে, ঠিক তখনি নিজুর বাবা বলে উঠলেন- কেউ চা খেওনা, নিশ্চয় ওই চোরাটি চা এর মাঝে বিষ মিশিয়ে দিয়েছে। কবির আবার ফিরে এসে নিজুর বাবার হাত থেকে চা এর কাপ নিয়ে এক চুমুকে চা এর কাপ খালি করল।। নিজুর হাত থেকে কাপ নিবে ঠিক তখনি নিজু বলল, না কবির ভাই আমি তোমাকে ট্রাস্ট করি। এই চা আমি খাব। কবির নিজুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। এরপর কবির চলে গেলো। নিজু বাবার কাছে এসে বললো, তোমার এমনটি করা ঠিক হয়নি বাবা। অনন্যা বলল, বাবা আমি ওই মোল্লা সাহেব কবিরকে বিয়ে করব, একথা বলে অনন্যাও ঘর থেকে বের হয়ে গেল কবিরের সন্ধানে। নিজুর বাবা তখন নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT