শিশু মেলা

জমিদার বাড়ির ভূত

মোঃ ছাবির উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০২-২০১৮ ইং ২৩:৩৩:২৪ | সংবাদটি ২৮৫ বার পঠিত

আমাদের গ্রামের পুরনো জমিদার বাড়িটা অনেক দিন ধরে খালি পড়েছিল। জমিদার বাড়িতে যারা থাকত, তারা এখন সবাই শহরের বাসিন্দা। দাদুর মুখে শুনেছি আমি যখন খুব ছোট ছিলাম, তখন একবার জমিদার গৌতম বারীর নাতনী সেতারা বেগম গ্রামে এসেছিলেন। তার সাথে ছিল স্বামী আর দুই পুত্র। সেতারা বেগমের দুই পুত্রই ছিল ফুটফুটে আর শান্ত স্বভাবের। তারা গ্রামে এই প্রথমবার এসেছিল। সেতারা বেগম শহরে একটি বড় কোম্পানীর ম্যানেজার। স্বামী সরকারি চাকরিজীবি। শহরেই তাদের নিজস্ব বাসা আছে। ছেলেরা ভালো স্কুলে লেখাপড়া করে।
জমিদার সাহেবের ছেলে যখন দশ ক্লাস পাশ করলো, তখন গ্রামে কী যে আনন্দ বইছিল। পুরো গ্রাম জুড়ে খুশির জোয়ার। কেননা গ্রামে এই প্রথম একজন ছেলে যে কি না দশ ক্লাস পাশ করেছে সেই খুশিতে জমিদার সাহেব ২০টি গরু জবাই করে সাত গ্রামকে দাওয়াত করে খাওয়ান। তারপর ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে তাকে বিলেতে পাঠানো হয়। ছেলেকে বিলেতে পাঠাতে জমিদার সাহেবের কী কান্না! এ কথা বলতে বলতে দাদুও কেঁদে ফেললেন। আমি ভাবলাম জমিদার সাহেবের দুঃখে দুঃখী হয়ে হয়তো দাদুও কাঁদছে। তাই দাদুকে বললাম- দাদু বাকিটা বল না।
দাদু বললেন- জানিস জমিদার সাহেবের ছেলে আমার ছোটবেলার খেলার সাথী ছিল। একসাথে ঘুরতাম, খেলতাম, কত দুষ্টুমি করেছি দুজনে তার সাক্ষী ছিল পুরো গ্রামের মানুষ এমনকি জমিদার সাহেবও। সবাই জানত জমিদারের ছেলের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলাম আমি। যে যখন শহরে লেখাপড়া করতো, তখন মাসে একবার করে বাড়িতে আসতো। এসেই আমার সাথে কি আড্ডা! সারাদিন শহরের সবকিছু নিয়ে কত যে কথা। এমনকি দিন শেষ হয়ে সন্ধ্যা নেমে আসতো নদীর ঘাটে দুজনে গল্প করে।
আর এদিকে জমিদার সাহেবের এ একমাত্র ছেলে। তার সাত কুলে আর কেউ নেই। ছেলে বিলেতে চলে যাওয়ার পর জমিদার সাহেব পুরো একা হয়ে যাবেন। বুকের ধন, তার অমূল্য সম্পদ তার থেকে দূরে চলে যাবে তাই তিনি বিরামহীন কেঁদেই যাচ্ছেন। জমিদার আর উনার ছেলের বুকফাটা কান্নায় সাত গ্রামের মানুষের চোখের আর জল আটকালো না। জমিদার বাড়ির আঙ্গিনা জুড়ে বইছে বিদায়ের করুণ আর্তনাদ। প্রতিটি মানুষ নিরবে চোখের অশ্রু বিসর্জন দেয়।
কয়েক বছর পরে শোনা গেল জমিদার সাহেবের ছেলে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে দেশে ফিরবেন। জমিদার সাহেবের আনন্দ তখন কে দেখে। আবার পুরো সাত গ্রামকে তিনি দাওয়াত করেন। বিশ গরু জবাই করে গ্রামবাসীকে খাওয়ান। সাথে একটি সংবাদ দেন। জমিদার সাহেবের ছেলে নাকি একজন বিলেতি উচ্চ শিক্ষিত মহিলাকে বিয়ে করেন। যদিও মহিলা বিলেতে লেখাপড়া করেছে। সেখানেই বড় হয়েছে। বাংলাদেশ ছিল তার পূর্বপুরুষের দেশ। এদেশেই তার স্থায়ী বাসিন্দা। বিলেতে প্রবাসী বলে থাকতো। জমিদার সাহেব আরো বললেন- উনার পুত্রবধূ নাকি গর্ভবতী। মানে জমিদার বাড়ির উত্তরসূরী। কী যে আনন্দ সবার মনে!
প্রতিটা মানুষের চোখে-মুখে স্বপ্ন। কৌতুহলের ছাপ। কবে আসবেন জমিদার সাহেবের ছেলে আর ছেলের বউ। বাড়ি চমৎকার করে সাজানো হয়েছে। এ যেন জমিদার বাড়িতে বিয়ের আয়োজন চলছে। চারদিকে খুশির জোয়ার। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা সারা বাড়ি মাতিয়ে তুলেছে হৈ চৈ করে। চলছে আমোদ-ফূর্তি।
হঠাৎ করে অনেক সুন্দর একটি গাড়ি এসে থামল জমিদার বাড়িতে। সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। গাড়ি থেকে নামলেন জমিদার পুত্র আর তার বউ। এতো সুন্দর মেয়ে তার আগে এ গ্রামের মানুষ আর দেখেনি। সবাই বলা-বলি করতে লাগল এতো সুন্দর মেয়ে জমিদার পুত্র বিয়ে করেছেন। বাহ! চমৎকার! খুব সুন্দর। জমিদার সাহেব কতটা আনন্দিত, তা বলে বোঝানো যাবে না। কিন্তু এই আনন্দ বেশিদিন থাকলো না জমিদার বাড়িতে। কয়েকদিন পর জমিদার বাড়িতে জ্যোৎ¯œার আলোর মতো আলো ছড়িয়ে দিতে জন্ম হলো এক রাজকন্যার। পুরো বাড়িকে আলোকিত করে তুললো। জমিদার বাড়ি তখন সর্বদা হাসি-খুশিতে ভরপুর থাকতো। কিছুদিন যেতে না যেতেই জমিদারের ফুটফুটে নাতনী আর হাসে না। সারাক্ষণ শুধু কাঁদতে থাকে। সবাই চিন্তায় পড়ে গেল। কোনো ভাবেই তার মুখে-হাসি ফোটানো যাচ্ছে না। কবিরাজকে ডাকা হলো! কবিরাজ পরীক্ষা করে দেখলেন- বাড়িতে ভূত এসেছে। আর সেই ভূতেরা রাজকন্যাকে ভর করেছে। এর এতো মিষ্টি হাসি তাদের হিংসা হয়। তাই তারা তাকে হাসতে দিচ্ছে না।
জমিদার বললেন- যেভাবেই হোক আমার নাতনীকে ভূতের কবল থেকে রক্ষা করো কবিরাজ। জমিদার সাহেবের কী কান্না। আবার জমিদার বাড়িতে শোক নেমে এলো।
কবিরাজ বললেন- এর একটাই ঔষধ। গভীর রাতে কবর স্থানের মাটি আনতে হবে। যে কেউ হলে হবে না। আনতে হবে জমিদার পুত্রকে। জমিদার পুত্র রাজি হয়ে গেলেন। মেয়েকে বাঁচাতে তিনি বলিদান করতেও রাজি।
জমিদার বললেন- আর কোনো পথ দেখুন কবিরাজ। কবিরাজ বললো- এ ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই। ভয়ঙ্কর রাত। চারদিক নিস্তব্ধ। প্রকৃতি ঘুমিয়ে পড়েছে। ভয়ে ভয়ে রাতের অন্ধকারে জমিদার পুত্র কবর স্থানে পৌঁছালেন। তিনি কবরের মাটি নিয়ে চলে আসতে লাগলেন। এমন সময় কেউ একজন জমিদার পুত্রকে ডাকলেন। জমিদার পুত্র সামনেই চলতে লাগলেন। ভয়ে পুরো শরীরটা কাঁপছে। তখন কবিরাজের কাছে এসে মাটি দিয়েই জমিদার পুত্র মাটিতে পড়ে যান অজ্ঞান হয়ে। জমিদার সাহেবের নাতনিকে ভূতের আশ্রয় হতে রক্ষা করা হলো। কিন্তু জমিদার পুত্র আর উঠলেন না। ডাক্তার ডাকা হলো। ডাক্তার এসে বললো- তিনি মারা গেছেন। জমিদার বাড়িতে শোকের ছায়া বইল। মেয়েকে বাঁচাতে জমিদার পুত্র পৃথিবী হতে চলে গেলেন। জমিদার সাহেব পুত্রের মৃত্যুতে ভীষণ ভেঙে পড়েন। কেউ থামাতে পারেনি জমিদার সাহেবের করুণ আর্তনাদ। তিনি কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ কান্না থেমে গেল। ডাক্তার পরীক্ষা করে বললো- জমিদার সাহেব স্ট্রোক করেছেন। সাত গ্রামে কান্নার জোয়ার বয়ে গেল। সবাই জমিদার বাড়িতে বসে চোখের জলে ভাসিয়ে দিচ্ছে জমিদার বাড়ি। আমার চোখেও জল চলে এলো। দাদু জমিদার বাড়ির করুণ কাহিনী বলতে বলতে কাঁদতে লাগলেন। তখন আমি বললাম- জমিদার সাহেবের পুত্রবধূ তার নাতনির কি হলো।
দাদু বললেন- তারা শহরে চলে যায়। আর এই সেই জমিদার সাহেবের নাতনি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT