শিশু মেলা

দুষ্টুদের বাড়ি

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০২-২০১৮ ইং ২৩:৩৪:২৩ | সংবাদটি ১৮০ বার পঠিত

স্কুল থেকে ফিরেই ব্যাগ ফেলল খাটের উপর দুজনে। তড়িঘড়ি শার্ট, প্যান্ট, টাই খুলে বাথরুমে দিল দৌড়। শাওয়ার ছেড়ে আচ্ছামত পানি খেলা শুরু করেছে দুজন। পাঁচ মিনিটেই দুজনের চক্ষু রক্তজবা। হেই আবু লেবু। মা চিৎকার করেন। শাওয়ার বন্ধ কর।
কানেই যেন গেল না তাদের।
কখন থেকে বলছি শাওয়ার বন্ধ করতে অথচ ছেলেদের কানেই যাচ্ছে না। মা গজ গজ করতে করতে বাথ রুমে ঢুকে আবুর কানে এক মলা দিয়ে লেবুর পিটে এক থাপ্পর।
দুটোই ভ্যা করে দিল কেঁদে। বাথরুম যেন কান্নার শব্দে ফেটে যাচ্ছে। উপুর ঝুপরি কয়েক ঘা পিঠে বসিয়ে বললেন, ‘বন্ধ কর- বন্ধ কর আর ভ্যা ভ্যা করিস না। দুষ্টুমির সীমা নেই। যেটা মানা করবো ওটাই করবে। ভাল হওয়ার কোন লক্ষণই নেই। দিন দিন দুষ্টুমি বেড়েই চলেছে। যত বড় হচ্ছে ততই যেন বখে যাচ্ছে। আজ তোদের একদিন কি আমার একদিন।
বলে বাথরুম থেকে বেরিয়ে ঘরের কোণে রাখা ছোট্ট কঞ্চি এনে পিঠের মাঝখান দিয়ে চালালেন বাড়ি। শফাং শফাং বাড়ির শব্দে লেবু মুখ বন্ধ করে ফোঁফাতে লাগলো কিন্তু আবু থামল না। চিৎকার চেচামেচিতে ঘরটা মাথায় তুলে ফেলল। অনেকক্ষণ বিছানায় পড়ে কেঁদে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল। লেবুর হাত ধরে টেনে নিয়ে লাঞ্চ খাওয়ালেও আবুকে নেওয়া গেল না। ও খুব রাগী। রেগে গেলে সে কিছু শোনে না। মারতে মারতে মেরে ফেললেও ওর কান্না থামানো যায় না। এটা ভাঙ্গে ওটা ভাঙ্গে, খেলনা ভাঙ্গে, প্লেইট ভাঙ্গে-... ভাঙ্গাই যেন তার কাজ। সেদিন ফিজায় গিয়ে বায়না ধরেছে। রেকে রাখা একটি কার কিনে দিতেই হবে। আম্মু কারটা কিনে দাও না আম্মু... । বলে চিৎকার করে মেঝেতে পড়ে গড়াগড়ি দিতে শুরু করল। এখন আর ওকে টেনে তোলা যায় না। লজ্জা শরমে চন্দ্রবান বিবি একদিকে ওকে থামাতে চেষ্টা করেন অন্যদিকে কারের দাম কত জিজ্ঞেস করেন। সেলসম্যান যা মূল্য বলল পার্স হাতড়ে দেখলেন কার কিনার পর মাত্র ১০০ টাকা অবশিষ্ট থাকবে। চন্দ্রবান বিবি বাধ্য হয়ে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে খেলনা কার কিনে ওর হাতে দিলেন। কার দেওয়ার সাথে সাথেই ঝাপটে ধরল সেটা। কোথায় গেল তার কান্না নিজেই জানে না। ফোটা ফোটা বৃষ্টির পর হঠাৎ রোদ উঠলে এই মাত্র পড়া বৃষ্টির ফোটা যেমন দেখায় আবুর গাল বেয়ে পড়া কান্নার জল ওরকমই মনে হল। তার হাসি দেখে মনেই হল না একটু আগে সে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল।
দুদিনের মধ্যে একটি বারের জন্য সেই কারটা লেবুকে দেয়নি ধরতে। লেবু উঁ উঁ করে কাঁদে আর মায়ের পিছে পিছে হাটে। ‘আম্মু আমাকে ধরতে দেয় না। বলে যেই যে কার ধরতে যাবে এমনি গেল তার মেজাজ বিগড়ে।
আমার কার ছুইলে কেন বলে ধাক্কা দিয়ে লেবুকে দিল ফেলে। লেবু মেঝেতে পড়ে কান্না জুড়ে দিল। আর অমনি চন্দ্রবান বিবি কঞ্চি নিয়ে দিলেন কয়েক ঘা লাগিয়ে।
দুষ্টু ছেলে কিচ্ছু যে বুঝতে চায় না। একটা মাত্র ভাই, ওকে নিয়ে খেলস না। না তা হবে না। সে একাই সবকিছু দখল করবে। আর করবে এসব। বলে শফাং শফাং মারতে লাগলেন।
আবু চিৎকার করতে করতে কাঁদছিল। হঠাৎ কী যেন মনে হল, দৌড়ে এসে কার ধরে আছড়ে ফেলল মাটিতে। শালার কার আর রাখব না তোকে। ভেঙ্গে চুরমার করে দিল কারটি।
চন্দ্রবান বিবি দুই ছেলে নিয়ে থাকেন একাই। স্বামী থাকেন মধ্যপ্রাচ্যে। প্রতি দু’বছর অন্তর আসেন বাড়িতে। বাচ্চা কাচ্চা দেখে আবার চলে যান নিজ কর্মক্ষেত্রে আর সংসার সামলান চন্দ্রবান। ওদের দুষ্টুমির জন্য শাশুড়ির সাথে বনিবনা নেই। শাশুড়ির সাথে প্রায়ই ঝগড়া হত ওদের নিয়ে। ওরা বাচ্চা মানুষ। দুষ্টুমিতো একটু আধটু করবেই। কিন্তু চন্দ্রবানের শাশুড়ি তা মানতে নারাজ। এতো দুষ্টুরে বাবা থালা বাসন বিছনা পত্র কিছুই ঠিক রাখা যায় না। পাঁচ মিনিটের ভিতরেই সব তছ নছ করে ফেলবে। এই দৌড়ে উঠোনে যায় খালি পায়ে। কাঁদামাটি পায়ে নিয়ে দৌড়ে উঠবে বিছানায়। নামবে উঠবে যেন জীবন্তে ইঁদুর। খাটের রেলিং, বালিশ বিছানায় চাঁদর সোফা কোনটাই বাদ যায় না। সবখানেই পদার্পন। সবকিছু এলোমেলো করতে ২/৩ মিনিট লাগে।
ওরা বাড়িতে থাকলে শাশুড়ি চোখে চোখে রাখেন। তারপরও কোন দিকে ওরা কী ঘটায় বুঝার কোনো উপায় নাই। শাশুড়ির একটু শুঁচিবাইয়ের ধরা। এমনিতে সব সময় নাক উঁচুতে নিয়ে হাঁটেন। তার উপর যখন তার ব্যবহারিক জিনিসপত্র এলোমেলো হয়, ধুলাবালি, ময়লা আবর্জনার মিশ্রণ ঘটে তখন তার মাথা ঠিক থাকে না। নাতিদের মারবে না ছেলের বৌকে ধরবে তা তার খেয়াল থাকে না। অকথ্য ভাষায় গালাগালি এমনকি হাতের কাছে পেলে মারামারি শুরু করে দেন। তাই ভেজাল, বিপত্তি ভাঙ্গার নিমিত্তে চন্দ্রবানের স্বামী সুরুজ মিয়া বউকে ভাড়াটিয়া বাসায় রেখে গেছেন। ঝগড়া ঝাটির স্থায়ী সমাধান এটি ভেবেই এ কাজ করে গেছেন।
সুরুজ মিয়া ভাবলেন মাও ফেলা যাবে না বাচ্চা কাচ্চাও ফেলা যাবে না। কাজেই উভয়ের সম্মানের স্বার্থে আলাদাই থাকা ভাল।
স্কুলে আবু-লেবু বেশ নাম করেছে দুষ্টু ছেলে হিসেবে। স্যারের টেবিল থেকে চক চুরি করতে উস্তাদ তারা। চক লুকিয়ে পরে চক দিয়ে স্কুলের ওয়াল, বেঞ্চ, টেবিল ইত্যাদিতে আঁকিবুকি তাদের প্রতিদিনের অভ্যাস। আর এসব করেছে কে তা সবারই মুখস্থ। ফলে প্রতিদিন দু’তিনবার হেড স্যারের রুমে তাদের চালান করা হয় আর নিত্যনৈমিত্তিক ‘আর এসব করব না’ বলে প্রতিজ্ঞা করে আসা হয়। এদিকে চন্দ্রবান বিবিও খালি যান না। প্রতিদিন হেডস্যারের রুমে অন্তত একবার আবু-লেবুর বিষয়ে নালিশ শুনতে হয়। বাসায় খেয়াল নিব- আর এসব করবে না এরকম অনেক কিছুই তাকে শান্তনা সুলভ জবাব দিতে হয়। অবশ্য দুষ্টুমী করবে না এ রকম নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। সেটা সবাই ভালই জানে। আর প্রথম শ্রেণির বাচ্চাদের স্কুল থেকে বিতাড়ন করাও শোভা পায় না। অন্যদিকে প্রাইভেট স্কুলের যা ছাত্র-ছাত্রী তাতে এক্সপেন্ট করার মত চিন্তা নিজের পায়ে কুড়াল মারার শামিল। প্রাইভেট স্কুলে হেডমাস্টারি, কচু পাতার পানির মত। কখন যে চাকরি যায় বলা মুশকিল। ছাত্র-গার্জিয়ান, স্কুল প্রশাসন, টিচার সবাইকে খুশি রাখাই যেন হেডমাস্টারের প্রধান কাজ। তাই প্রাইভেট স্কুলে হেডমাস্টারি ধরার আগে তৈল বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিষয়টি একান্ত প্রয়োজন।
সেদিন বৃহস্পতিবার। ক্লাসের অন্য একটা ছেলেকে ধাক্কা মেরে মাখা ফাটিয়ে দিল আবু। হেড স্যার তৎক্ষণাৎ আবুর মাকে খবর পাঠালেন। তড়িঘড়ি আবু-লেবুর মা গেলেন স্কুলে। হেড মাস্টার চটে গিয়ে বললেন আবু সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত স্কুলে আসার দরকার নেই। লজ্জায় ক্ষোভে দুঃখে আবুর মা চন্দ্রবান অস্থির হয়ে ছেলে দুটোকে দু’হাতে ধরে নিয়ে চললেন বাসায়। আর রাগত উচ্চারণ করতে লাগলেন ‘আয় চল- বাসায় চল, আর স্কুলে আসার দরকার নেই। তোদের জন্য স্কুল চিরতরে বন্ধ। এত করে বলি দুষ্টুমী কর না, সেটা কানে যায় না।’
পরের দিন চন্দ্রবান ঘুম থেকে উঠলেন অনেক দেরিতে। স্কুলের টাইম অভার হয়েছে প্রায় ১ ঘন্টা সেদিকে ভুক্ষেপ নেই। চন্দ্রবান নিজেকে বড়ই ক্লান্ত অনুভব করেন। বাচ্চা কাচ্চা থাকলে বিপদ না থাকলেও বিপদ। এতটুকুন বাচ্চাদের সামলাতে হিমসীম খেতে হচ্ছে। ঠিক এই সময় পাশের বাসার খালু আসলেন কৈরে আবু-লেবু, আজ তোরা স্কুলে যাসনি? চন্দ্রবান এগিয়ে এসে দরজা খুলে বসতে দিলেন। আর বললেন না খালু আজ ওরা স্কুলে যায়নি বলে ড্রয়িং রুমে বসে বিস্তারিত বললেন চন্দ্রবান। সব শুনে খালু বললেন চিন্তা করো না। আমার জানা একজন হুজুর আছেন। ওনার কাছে কিছু দিন পড়তে দেও ওদের, দেখবে দুষ্টুমি ছেড়ে দিয়েছে। সত্যি খালু? খালু যত টাকা লাগে আমি দেব। আর সহ্য করতে পারছি না। আজই ব্যবস্থা করে দিন খালু। বিকালে ফোন দেব বলে খালু উঠলেন।
একদিন পর খালু হুজুর নিয়ে বাসায় আসলেন সকালে। আলাপ আলোচনার পর খালু চলে গেলেন। হুজুর আবু-লেবুকে নিয়ে পড়াতে বসলেন। হুজুরের সৌম্য চেহারা, লম্বা দাড়ি আর আলখেল্লা দেখে ঘাবড়ে গেল আবু। কোনো রকম পড়তে বসল মেঝেতে সুন্নতি তরিকায়। হুজুর স্ব ¯েœহে ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আর বললেন আমার সাথে পড়ে আউজুবিল্লাহিমিনাস শাইতোয়ানির রাজিম। আবু বলল এর অর্থ কি হুজুর। তিনি বললেন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। এই দোয়া পড়লে শয়তান বিতাড়িত হয়। আবু বলল সত্যি? হুজুর বললেন হ্যাঁ। তাহলে আমি সব সময় এই দোয়া পড়ব। জানেন হুজুর আমি শুধু শুধু দুষ্টুমী করি। আম্মু বকে, টিচার বকে, তার পরও আমার দুষ্টুমি যায় না। হুজুর বললেন বল আমার সাথে ‘বিছমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’। পরম করুণাময় আল্লাহর নামে আরম্ভ করছি। এই দোয়া পড়লে সকল কাজে বরকত হয়।
হুজুর দেখলেন আবু-লেবু খুব মেধাবী যা বলা হয় চট করে মুখস্থ করে ফেলে। তিনি তাদের কাজের স্বীকৃতি দিতে লাগলেন। যখন পড়াটা মুখস্থ বলে দিতে পারে তখন বলেন মারহাবা তুমি খুবই ভালো ছাত্র। বড় হয়ে তুমি এ জগৎ জয় করবে। তুমি হবে সবার নেতা। লেবুকেও উৎসাহ দিতে লাগলেন। কিছুদিনের মধ্যে আবু-লেবুর মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। এখন মা যা বলেন সেটা শুনে। কারণ হুজুর বলছেন মা বাবার কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে হবে। পদে পদে সে হুজুরের কথা স্মরণ করে। হুজুর বলেছেন মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত। আবু বেহেস্ত দোযখ সম্পর্কে হজুরের কাছ থেকে জেনেছে। তাই ইদানিং মায়ের কথার অবাধ্য হয় না। সে বুঝতে শিখেছে। অনেক বড় হতে হলে অনেক পড়ালেখা করতে হবে। দুষ্টুমী করলে পড়ার সময় নষ্ট হবে। তাই সব সময় সে আঁকিবুকি আর কলকব্জা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সে আর লেবুকে মারে না; কারণ সে জেনেছে ছোটকে ¯েœহ করতে হবে। হযরত মুহাম্মদ (স:) ছোটদের ¯েœহ করতেন। এটা একজন মানুষের বড় গুণ।
সপ্তাহ দুই পরে চন্দ্রবান বাচ্চা দুটোকে নিয়ে স্কুলে হাজির হলেন। হেড স্যারের সাথে আলাপ করে বললেন এখন ওরা ইচ্ছা করে স্কুলে এসেছে। আশা করি দুষ্টুমি করবে না। হেড স্যার বললেন আমরা তো তাই চাই। বাচ্চাদের জন্যই তো স্কুল। ওরা না থাকলে স্কুল খুলে কী লাভ।
ষান্মাসিক পরীক্ষায় আবু হল ফাস্ট আর লেবু হল সেকেন্ড। ক্লাসেও ওরা বেশ শান্ত। ক্লাস টিচার ভাবলেন প্রকৃতির উপর বয়ে চলা ঝড়ের পর প্রকৃতি যেভাবে শান্ত দেখায় আবু-লেবুর উপরও হয়ত ঝড় বয়ে গেছে তাই তাদের এত পরিবর্তন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT