সম্পাদকীয় তোমরা বন্দীকে মুক্ত করো, ক্ষুধার্তকে আহার দান করো এবং রোগীর সেবা ও শুশ্রƒষা করো। -আল হাদিস

সুনামগঞ্জের হাওর রক্ষা বাঁধ

প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৩-২০১৮ ইং ০১:৪৬:১৪ | সংবাদটি ১০১ বার পঠিত

নির্ধারিত সময়ের আগে শেষ হয় নি সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলার হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ। খবরটি গতকাল এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। খবরে বলা হয় হাওর রক্ষা বাঁধের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিলো ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। কিন্তু কাজ শেষ হয় নি। ফলে এবারও অকাল বন্যায় হাওরের ফসল বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন হাজার হাজার কৃষক। নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠুভাবে কাজ সম্পন্ন করার জন্য এ বছর ঠিকাদারী প্রথা বাতিল করে প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু জেলার কোনো উপজেলায়ই শতভাগ কাজ শেষ হয় নি। কোনো কোনো হাওরে সর্বোচ্চ ৫০ ভাগ বাঁধের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আবার কোনো কোনো বাঁধে কাজই শুরু হয়নি। এর জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতিকেই দায়ী করছেন প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটির সদস্যরা। তাদের বক্তব্য হচ্ছে এই কমিটি গঠন করতে দেরী হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে বাঁধের কাজ শুরু করা যায় নি।
জেলার ১১ উপজেলার বিভিন্ন হাওরের ফসল রক্ষায় এবার সাড়ে পাঁচশ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়। এতে বরাদ্দ হয় ৯৮ কোটি টাকা। গত বছর অকাল বন্যায় সুনামগঞ্জসহ ভাটি অঞ্চলের বোরো ফসল বিনষ্ট হয়েছে। সে বছর বাঁধের কাজে সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়। তখনও বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ করার সময়সীমা ছিলো ২৮ ফেব্রুয়ারি (২০১৭)। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় বানের পানি ঢুকে হাওরে এবং তলিয়ে যায় ফসল। সে বছর বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ লুটপাট হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে এবার বাতিল করা হয়েছে ঠিকাদারী প্রথা। গঠন করা হয়েছে প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয় নি। অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে এবারও। আর এটাই স্বাভাবিক। কারণ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত সর্বত্রই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছড়াছড়ি। স্বাভাবিকভাবেই তারা নিজেদের পকেট ভারী করার ধান্ধায়ই ব্যস্ত থাকবে। হাওরের ফসল রক্ষা তাদের কাছে কোনো ব্যাপারই নয়। তাদের সঙ্গে উল্লিখিত প্রজেক্ট কমিটির সদস্যরাও যে হাত মেলাবে না, সেই নিশ্চয়তা নেই।
অথচ আমাদের হাওর অঞ্চল খুবই সম্ভাবনাময়। সুনামগঞ্জ ছাড়াও সিলেট বিভাগের অপর তিন জেলা এবং পার্শ্ববর্তী কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ৪৮টি উপজেলার ২০ হাজার ২২ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত হাওর অঞ্চল। পরিকল্পিতভাবে চাষ করা গেলে হাওর অঞ্চলের উর্বর জমিতে প্রতি বছর দুই কোটি টন ধান উৎপাদন করা সম্ভব। সেই সঙ্গে হাওরের মাছও রপ্তানী করে প্রতি বছর আয় করা সম্ভব কয়েকশ’ কোটি টাকা। মুক্তার মতো মূল্যবান সম্পদও চাষ হয় হাওর অঞ্চলে। কিন্তু বরাবরই এই হাওর অঞ্চল অবহেলিত। বিশেষ করে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে প্রায় প্রতি বছরই হাওরগুলোর বোরো ফসল বিনষ্ট হয়। এই অঞ্চলে বছরে একটি মাত্র ফসল এই বোরোই উৎপন্ন হয়। উৎপাদন বিঘিœত হলে কৃষকদের না খেয়ে থাকতে হয়। জরিপের তথ্য হচ্ছে বন্যায় এই অঞ্চলে বছরে গড়ে সোয়াশ কোটি টাকার বোরো ফসল বিনষ্ট হয়।
হাওরবাসীর এই দুর্ভোগ পুরনো। বলা যায়, প্রতি বছরই তাদেরকে অকাল বন্যাসহ নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। সমস্যার স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয় না। প্রতি বছর হাওর রক্ষা বাঁধসহ অন্যান্য প্রকল্পে সরকার বরাদ্দ করে কোটি কোটি টাকা। কিন্তু তার বেশির ভাগই লুটপাট হয়। দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা, ঠিকাদারসহ একটি চক্র বছরের পর বছর সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে চলেছে। এই চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে সমস্যাটি জিইয়ে থাকবে আর সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়তেই থাকবে। এই প্রসঙ্গে হাওর উন্নয়ন বোর্ডের কথা উল্লেখ করা যায়। হাওর অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নে এই বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয় ১৯৭৪ সালে। এর পর থেকে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে এটিকে ‘হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড’ নামে পুনর্গঠন করা হয় ২০০০ সালে। কিন্তু এর কোনো কার্যক্রম নেই। আমরা মনে করি, এই বোর্ডের মাধ্যমে হাওরের ফসল রক্ষাসহ সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT