ধর্ম ও জীবন

জবানের হেফাজত

আব্দুস সালাম সুনামগঞ্জী প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৩-২০১৮ ইং ০১:৫২:৪৩ | সংবাদটি ২৪৫ বার পঠিত

আল্লাহ তায়ালার আশ্চর্য ও কৌশলময় সৃষ্টির মধ্যে রসনা বা জিহ্বা একটি অতি বিচিত্র সৃষ্টি যাকে জবানও বলা হয়। আল্লাহ পাক আমাদেরকে যতো নিয়ামত দান করেছেন এর মধ্যে জবান বড় একটি নিয়ামত। বাহ্যিক দৃষ্টিতে ইহাকে একখন্ড মাংস পি- বলেই বোধ হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সমগ্র সৃষ্ট জাতের উপরই ইহার অপ্রতিহত ক্ষমতা এবং অধিকার রয়েছে, বর্তমান সমাজে যাতে বাক শক্তির অধিকার বলা হয়।
রসনার অধিকার আত্মার ন্যায় অসীম। আত্মা বা অন্তঃকরণ যেমন সমস্ত বস্তু বা বিষয়ের উপর স্বীয় ক্ষমতা চালাতে পারে রসনার ক্ষমতাও তদ্রুপ ব্যাপক। রসনা/জিহ্বা যেহেতু অন্তঃকরণের মোকাবিলায় রয়েছে অর্থাৎ অন্তঃকরণ হতে পদার্থ সমূহের আকৃতি গ্রহণপূর্বক ইহাকে কথায় প্রকাশ করতেছে, এই রূপে জবানও অন্তঃকরণের মধ্যে নতুন নতুন আকৃতি পৌঁছিয়ে থাকে। জিহ্বা যা কিছু কথায় ও শব্দে প্রকাশ করে ইহার ভাব অন্তরে প্রবেশ করতঃ এক নতুন অবস্থার সৃষ্টি হয়ে থাকে।
দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায় মানুষ যখন ক্রন্দন ও বিলাপ আরম্ভ করে এবং মুখে শোক সন্তাপ সূচক বাক্য উচ্চারণ করতে থাকে, তখন এই বাক্যগুলির মর্ম হতে এক প্রকার করুণ ভাব এবং ব্যাথা বেদনার অবস্থা অন্তরে উৎপন্ন হয়। এই শোক সন্তাপমূলক ব্যাথার অগ্নি অন্তরে দহন আরম্ভ করলে তথা হতে এক প্রকার বাষ্প উত্থাপিত হয়ে মস্তিষ্ককে আক্রমণ করে। সেই বাষ্পই অশ্রুতে পরিণত হতে চক্ষুপথে বের হতে থাকে। এরূপে মানুষ যখন আনন্দ ও উৎকৃষ্ট গুণাবলী প্রকাশক বাক্য উচ্চারণ করতে থাকে তখন অন্তরের মধ্যে আনন্দ ও আহলাদের আলোড়ন হতে থাকে এবং তৎপ্রভাবে নানাবিধ কামনা ও প্রবৃত্তি আলোড়িত হতে আরম্ভ করে এরূপ মানুষ যে প্রকার শব্দ ও বাক্য রসনার সাহায্যে উচ্চারণ করে তদ্রুপ একটি ভাব বা অবস্থা অন্তঃকরণে উৎপন্ন হয়। কটু ও অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ করলে অন্তঃকরণ মলিন ও অন্ধকার হয়ে যায়, আর সৎ ও সত্য কথা বললে হৃদয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
যেহেতু রসনার আপদ অপরিসীম এবং যে সমস্ত আপদ হতে নিজেকে রক্ষা করা মানুষের পক্ষে কঠিন, সেহেতু বাক শক্তি নিয়ন্ত্রণ অবলম্বনপূর্বক বাগেন্দ্রিয়কে যতোটুকু সম্ভব শাসনে রাখা ছাড়া সে সব বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার অন্য কোনো উপায় নেই। সুতরাং মানুষের উচিত প্রয়োজনের অধিক কথা মোটেই না বলা। উলামায়ে কেরামগণ বলেছেন-সেই মহাপুরুষই ‘আবদাল’ নামক উন্নত স্তরের ওলী হতে পারেন, যিনি একান্ত বাধ্য হয়ে কেবল প্রয়োজন পরিমাণ আহার করে থাকেন, নিদ্রা যান এবং বাক্যালাপ করেন। এ সম্পর্কে আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন-‘তাদের গোপন কথার অধিকাংশের মধ্যে কোনো মঙ্গল নেই, তবে হ্যাঁ, যে ব্যক্তি ছদকা প্রদানের পরামর্শ দেয় কিংবা সৎকাজের উপদেশ দেয় অথবা মানুষের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ মিটিয়ে সদ্ভাব স্থাপনের উপদেশ দেয়। (সূরা : নিসা, আয়াত : ১২৪)
যে ব্যক্তি জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে না শয়তান তাকে দিয়ে নিজ ইচ্ছানুযায়ী কাজ হাসিল করে এমনকি তার দ্বারা নানা অপকর্ম করিয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে জাহান্নামের অগ্নিকা-ে নিক্ষেপ করে। কোনো পরিণাম না ভেবে বেফাঁস কথা বলতে নবীজী নিষেধ করেছেন। আসলে অবগুণ্ঠনমুক্ত ভাষা মানুষকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়।
হে মানুষ! তুমি তোমার জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ করো। এ যেন তোমাকে দংশন করতে পারে। এ কিন্তু বিষধর সাপ। জিহ্বার দংশনে নিহত হয়ে কতো লোক কবরে পড়ে আছে। অথচ বড় বড় বাহাদুর তাদের মুখোমুখি হতে ভয় করত। কতো নারীকে স্বামী তার যবান দোষের কারণে তালাক দিয়ে দেন। স্বামীর সাথে বিরোধ হলে এমন নারীরা বারংবার বলতে থাকে আমাকে তালাক দিয়ে দাও। আমি তোমার সাথে চ্যালেঞ্জ করছি তালাক দিয়ে দাও। যদি পুরুষ হয়ে থাকো, তা হলে আমাকে তালাক দাও দেখি।
স্বামী তাকে নীরব হতে আদেশ করেন। চেঁচামেচি করেন, ধমক দেন। বিরোধ জটিল আকার ধারণ করে। সংসার ভবন ভেঙ্গে পড়ে এবং স্বামী তাকে তালাক দিয়ে দেন। এজন্যই রাসূলুল্লাহ (সা.) গোস্বা উঠলে মানুষকে নীরব হওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। হ্যাঁ, নীরবই থাকতে হবে। কেননা রাগের সময় কেউ যদি জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ না করে জিহ্বা তাকে ধ্বংসের গর্তে নিক্ষেপ করে। যবান ফসকে গেলে যুবকের মৃত্যু হয় কিন্তু পা ফসকে গেলে কেউ মারা যায় না।
ইবনুল জাওযী বলেছেন, আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে মানুষ হারাম খাওয়া থেকে যেনা থেকে এবং চুরি থেকে ফিরে থাকতে পারে কিন্তু সে জিহ্বা নাড়ানো থেকে ফিরে থাকতে পারে না। এজন্য সে মানুষের ইজ্জত আব্রু নিয়ে কথা বলে এবং নিজেকে এ থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারেনা।
সুতরাং জিহ্বার গুরুত্ব অপরিসীম এবং তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই জরুরি। যে ব্যক্তি জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখেনা শয়তান তাকে দিয়ে নিজ ইচ্ছানুযায়ী কাজ হাসিল করে, এমনকি তার দ্বারা নানা অপকর্ম করিয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে জাহান্নামের অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করে। এ প্রসঙ্গে সহীত হাদিসে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন ‘জিহ্বার পরিণামই মানুষকে উপুড় করে দোযখে নিক্ষেপ করবে’। (মিশকাত শরীফ)
হযরত সুফিয়ান ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি আরজ করলাম ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা.) আমার জন্য সবচেয়ে ভয় করার বস্তু কী? তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বীয় জিহ্বাকে বের করে তা হাত দিয়ে ধরে বললেন ‘এটি; জিহ্বাকে ভয় করার অর্থ সাবধানতা অবলম্বন করা, সচেতনতার সাথে বাক্যালাপ করা এবং অনর্থক আজে বাজে কথা না বলা। এজন্য সাধনা ও প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) এর এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, মানুষ যখন সকালে ঘুম থেকে ওঠে, তখন সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ জিহ্বার দিকে ফিরে বলে-‘যদি তুমি ঠিক থাক, তাহলে আমরা ঠিক থাকতে পারব। আর যদি তুমি গোলমাল কর, তাহলে আমরাও গোলমাল করব।’ (মিশকাত শরীফ)
জিহ্বার দ্বারা মিথ্যা কথা বলে, মিথ্যা স্বাক্ষী দিয়ে মানুষকে ধোঁকা দেয়া হয়, জিহ্বার দ্বারা গালি-গালাজ করে মানুষকে কষ্ট দেয়া হয়, জিহ্বার দ্বারা ওয়াদা করে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়, জিহ্বার দ্বারা গীবত ও চোখলঘুরী করে ব্যক্তি পরিবার ও সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়, জিহ্বার দ্বারা অবাঞ্ছিত কথা বলে ফিতনা ফসাদের সৃষ্টি করা হয় প্রভৃতি। অথচ এসবই মারাত্মক কবীরা গুনাহ ও হারাম কাজ। বস্তুত ঝগড়া কলহ এবং পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য জিহ্বা শয়তানের একটি বড় হাতিয়ার।
জিহ্বার এ সকল অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষা করার একমাত্র উপায় হচ্ছে জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ করে তাকে ন্যায়ের পথে রাখা অথবা চুপ থাকা। এক্ষেত্রে যারা জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনা, তাদের জন্য এর ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য চুপ থাকাই কর্তব্য। তাই হাদিস শরীফে চুপ থাকার মাহাত্ম্য বর্ণনা করে এর প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন- ‘যে চুপ থাকে, সে অযাচিত পরিণাম থেকে মুক্ত থাকে।’
নবীজী আরো বলেন, ‘চুপ থাকা প্রজ্ঞা ও হিকমত, কিন্তু তার অবলম্বনকারীর সংখ্যা নগন্য। হযরত ওমর (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-‘যে জিহ্বাকে সংযত রাখে আল্লাহ তায়ালা তার দোষ ঢেকে দেন।’
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।’
হযরত সালে ইবনে সা’দ (রা.) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন ‘আমার জন্য যে ব্যক্তি দু’টি বস্তুর যিম্মাদার হবে, আমি কিয়ামতের দিন তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর যিম্মাদার হবো; এক. যা তার ওষ্টদ্বয়ের মধ্যখানে রয়েছে (অর্থাৎ জিহ্বা) দুই. যা তার উরু দ্বয়ের মধ্যখানে রয়েছে (অর্থাৎ লজ্জাস্থান)।’ (বুখারী শরীফ)
হযরত উকবা ইবনে আমির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-আমি রাসূল (সা.) কে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! মুক্তি কিসে নিহিত? নবীজি বললেন, তোমার জিহ্বাকে তুমি সংযত করে রাখো। (তিরমিযী)।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, অবশ্যই মানুষ এমন কথা বলে, যাতে সে কোনো অসুবিধা মনে করে না, অথচ এটা তাকে সত্তর বছরের জন্য জাহান্নামে পৌঁছে দিবে। (বুখারী, মুসলিম ও নাসাঈ)
বেশি কথা বলার মধ্যে নানারকম বিপদ রয়েছে। কথা বেশি বলার কারণে ভুল, মিথ্যা, গীবত, চোখলঘুরী, নিন্দা, রিয়া, কপটতা, নির্লজ্জতা, কথা কাটাকাটি, বাড়িয়ে বলা, অপরকে কষ্ট দেয়া, গোপন বিষয় ফাঁস করা ইত্যাদি অন্যায় ও অপরাধ ঘটে থাকে। তাই কথা মেপে হিসেব করে বলা উচিত। নতুবা চুপ থাকাই কর্তব্য। কথা বেশি বলাতে যেমন ক্ষতি, তেমনি কথা কম বলায় ও চুপ থাকতে অনেক ফজিলত রয়েছে। চুপ থাকাতে মেজাজ সংহত থাকে, অন্তরে আল্লাহর ভয়-ভীতি থাকে, যিকির ও ইবাদতের জন্য অবসর মিলে। চুপ থাকার দ্বারা দুনিয়াতে অনেক ক্ষেত্রে মুক্তি এবং পরকালের অনেক হিসাব থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়।
মানুষের সব কথাই লিপিবদ্ধ করা হয় এবং তা আল্লাহর নিকট পৌঁছানো হয়। সব বাজে কথাবার্তার উপর অভিশাপ দেয়া হয়, যা আল্লাহর নিকট দলিল এবং সর্বশেষে লজ্জার কারণ হবে। তাই এক্ষেত্রে চুপ থাকাই নিরাপদ ও কল্যাণকর।
আমরা যবানকে তিন অবস্থা থেকে যেকোনো এক অবস্থায় রাখব। (১) সৎ কাজের আদেশে বা অসৎ কাজে নিষেধ করায়। (২) আল্লাহর যিকিরে। (৩) চুপ থাকায়।
পরিশেষে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে, হে আল্লাহ! আমাদের যবানকে পবিত্র করো। আমরা আপনার নিকট মিথ্যা বলা, মিথ্যা স্বাক্ষ্য, মিথ্যা কসম, আল্লাহর যাত, সিফাত ও শরীয়ত সম্পর্কে ইলম ছাড়া কোনো কথা বলা, রাসূল (সা.) থেকে প্রাপ্ত ইলমের বিপরীত কথা বলা, গীবত, চোখলঘুরী, সামনে প্রশংসা করা, ঝগড়া-তর্ক, বাহাদুরী, গালী, অশ্লীল কথা, ঠাট্টা বিদ্রুপ, মানুষকে কষ্ট দেওয়া ও অহেতুক কথাবার্তা বলা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। এ সমস্ত কাজ থেকে আমাদের যবানকে হেফাজত রাখুন। আমিন!

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT