ধর্ম ও জীবন

মদীনার ফজিলত

আব্দুল কারীম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৩-২০১৮ ইং ০১:৫৭:৫২ | সংবাদটি ৫২১ বার পঠিত

প্রতিটি মুসলিম হৃদয়ে প্রিয় শহর মদিনার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা রয়েছে। প্রতিটি ক্ষুদ্র-বড় সবার মনে প্রিয় শহর মদিনা জিয়ারতের আকাক্সক্ষা ও ইচ্ছা রয়েছে। প্রতিটা ঈমানী সতেজ মন মদিনার প্রতি ঝুঁকে রয়েছে। যেখানে ইসলামের প্রথম রাজধানী রয়েছে। যেখানে প্রিয় নবী (সা.) এর দীর্ঘ তেরো বছরের ধূলিকণা রয়েছে। যেখানে প্রিয় রাসূল (সা.) এর মাকবারা ও জান্নাতের এক টুকরো রয়েছে। যেখানে ইসলামের অনেক নিদর্শন সহ অসংখ্য-অগণিত সাহাবাদের (রা.) মাকবারা ও স্মৃতি রয়েছে। সেই মদিনার প্রতি অবশ্যই প্রতিটা মুমিন হৃদয়ের টান ও ভালোবাসা রয়েছে।
বরকতময় শহর :
পৃথিবীর বরকতময় স্থান মাত্র তিনটি-তন্মধ্যে প্রিয় শহর মদিনা একটা। যেখানে চলতে-ফিরতে, হাটতে-বসতে ও প্রত্যেক ভালো কাজে বারাকাহ রয়েছে। যার জন্য আমাদের প্রিয় রাসূল (সা.) দোয়া করে গিয়েছেন। হুজুর (সা.) বলেন-‘হে আল্লাহ! আপনি মক্কার জন্য যে বারাকাত দিয়েছেন, তার চেয়ে দ্বিগুণ বারাকাত মদিনার জন্য দিন।’ ( বুখারী : ১৮৮৫)
অন্য হাদিসে আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন, ‘হে আল্লাহ! ইবরাহীম (আ.) আপনার বান্দা ও বন্ধু ছিলেন। তিনি আপনার কাছে মক্কার বরকতের জন্য দোয়া করেছেন। আর আমি মুহাম্মদ আপনার বান্দা ও রাসূল। তাই আমি আপনার কাছে মদিনাবাসীর জন্য দোয়া করছি। আপনি তাদের মুদ্দ ও সাতে (শস্যের পরিমাণ) বরকত দিন, যেমন বরকত দিয়েছেন মক্কাবাসীর জন্য। এক বরকতের বিনিময়ে দ্বিগুণ বরকত দিন।’ (মুসনাদে আহমদ : ৩৯১৪)
তাহলে উক্ত বিশুদ্ধ হাদিসদ্বয়তে প্রতীয়মান হলো যে, প্রিয় শহর মদিনা ও তার অধিবাসীদের জন্য বারাকাহ রয়েছে। কেননা, প্রিয় রাসূল (সা.) তাদের জন্য দোয়া করেছেন। আর আল্লাহর রাসূল (সা.) এর দোয়া আল্লাহর কাছে অবশ্যই কবুল!
মদিনা সম্মানিত ও নিরাপদ :
হুজুর (সা.) এর বিভিন্ন বিশুদ্ধ হাদিস থেকে প্রমাণীত হয় যে, প্রিয় শহর মদিনা নিরাপদ ও পবিত্র মক্কা শরীফের মতো সম্মানিত। মক্কাতুল মুকাররামায় যেমন কিছু বিধিবিধান রয়েছে, ঠিক তেমনি পবিত্র শহর মদিনাও সম্মানিত হওয়ায় কিছু বিধিবিধান রয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু কাজ নিষিদ্ধও রয়েছে।
মদিনা যে সম্মানিত ও নিরাপদ- তা হযরত সাহল বিন হুনাইফা (রা.) এর কথা থেকে প্রমাণিত হয়। তিনি বলেন, ‘রাসূল (সা.) মদিনার দিকে ইশারা করে বলেন তা সম্মানিত ও নিরাপদ।’ (মুসলিম : ২৪৪৩)
অন্য এক বিশুদ্ধ বর্ণনায় বলেন, ইবরাহিম (আ.) মক্কাকে হারাম (সম্মানিত) সাব্যস্ত করেছেন। আর আমি মদিনাকে হারাম (সম্মানিত) সাব্যস্ত করলাম। তাতে কারো জন্য রক্তপাত করা বৈধ নয়। যুদ্ধের জন্য অস্ত্র হাতে নেওয়া বৈধ নয়। বৃক্ষ কর্তন করা বৈধ নয়। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের শহরে বরকত দিন। (মুসলিম)
রাসূল (সা.) প্রিয় মদিনা শরীফকে হারাম (সম্মানিত) সাব্যস্ত করেছেন এবং এর সীমানা নির্ধারিত করে দিয়েছেন। যা হাদিস শরীফ থেকে প্রমাণীত হয়। রাসূল (সা.) বলেন, ‘ঈর থেকে সাওর পর্বত পর্যন্ত মদিনার হারামের সীমানা। এই সীমানার ভিতরে তাজা উদ্ভিদ কাটা যাবে না। তাতে কোন পশু শিকার করা যাবে না। (আবু দাউদ)
সর্বোচ্চ হাদিস বর্ণনাকারী, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, মদিনার হারামের ভিতরে যদি হরিণও দৌড়াদৌড়ি করে, তবুও আমি তাকে ভয় দেখাবো না। কারণ, নবীজী (সা.) দুই পর্বতের মধ্যবর্তী সীমানাকে হারাম বলে ঘোষণা দিয়েছেন। (মুসলিম : ১৩৭২)
মদিনায় জান্নাত :
রাসূল (সা.) এর বিভিন্ন হাদিস দ্বারা বুঝা যায়, প্রিয় শহর মদিনায় রয়েছেন জান্নাতের এক টুকরো বা বাগান। বিশুদ্ধ হাদিসে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা.) বলেছেন ‘আমার ঘর ও মিম্বরের মধ্যবর্তী জায়গাটি জান্নাতের বাগানসমূহ থেকে একটি। আর আমার মিম্বার আমার হাউজে অস্থিত।’ (বুখারী : ১১২০)
বেহেশতের বাগান দ্বারা উদ্দেশ্য কি- তা নিয়ে উলামায়ে কেরাম বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। কেউ বলেছেন, এখানে এসে ইবাদত করলে পরকালে জান্নাতে যাওয়া যাবে। আবার কেউ বলেছেন, এটা একটা জান্নাতের স্থান। তবে ইমাম মালিক (রা.) বলেন, ‘এই স্থানটুকু পরকালে জান্নাতে স্থাপন করা হবে। অথবা, বর্তমানে এটি জান্নাতের বাগান।’
‘আমার মিম্বার আমার হাউজের উপর’- এর ব্যখ্যা উলামায়ে কেরাম থেকে বিভিন্ন ধরণের পাওয়া যায়। তবে কাজী আয়াজ (রাহ.) বলেন, ‘দুনিয়ার এই মিম্বারটি হুবহু হাউজের উপর অবস্থিত। ‘মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রখ্যাত প্রফেসার ড. আয়াদ আল-মুহাত্তাব বলেন, ‘হতে পারে এই মিম্বরের নিচে হাউজে কাউসার অবস্থিত। অথবা, কিয়ামতের ময়দানে এই জায়গাটা হাউজে কাউসারে রূপান্তরিত হবে।’
মদিনা এমন এক জায়গা, যেখানে ফাসেক, ফুজার বা পাপাচারীদের বসবাসযোগ্য না। কবিরা গোনাহকারী এখানে বসবাস করতে পারবেনা। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বিশুদ্ধ রেওয়াতে বর্ণিত, তিনি বলেন- হুজুর (সা.) বলেন, ‘আমাকে এমন এক গ্রামে হিজরত করতে বলা হয়েছে, যা অন্যান্য গ্রামের উপর বিজয়ী হবে। লোকেরা তাকে ইয়াসরিব বলে ডাকে। অথচ, তা হচ্ছে মদিনা, যা মানুষের অনিষ্টতা দূর করে। যেমনি কামারের হাপর লোহার মরিচা দূরীভূত করে ফেলে।’ (বুখারী : ১৮৭১)
অন্যত্রে হুজুর (সা.) বলেন, ‘মদিনা কামারের হাপারের ন্যায়। তা সকল নিকৃষ্ট ও মন্দত্বকে বের করে দেয়।’ (তিরমিজি : ৩৯২০)
কিয়ামতের নিকটে দাজ্জালের আগমন ঘটবে। পুরা পৃথিবী গ্রাস করে ফেলবে। প্রিয় মদিনার নিকটবর্তী কোনো এক গুহা থেকে বেরুবে। তার হাতে শক্তি সামর্থ্য থাকবে। ফাসিক, ফুজ্জার, কুফফার বেঈমান সবাইকে গ্রাস করে ফেলবে। কিন্তু মদিনায় প্রবেশ করার শক্তি পাবে না। মদিনায় প্রবেশ করার সাহস সামর্থ্য রাখবেনা। কেননা, আল্লাহ তায়ালা নিজ হাতে কিয়ামতের আগে প্রিয় শহর মদিনাকে হেফাজত করবেন।
হযরত আনাস বিন মালেক (রা.) থেকে বিশুদ্ধ বর্ণনায় বর্ণিত, তিনি বলেন ‘হুজুর (সা.) বলেন, দাজ্জাল পৃথিবীর সর্বত্র বিচরণ করবে। কিন্তু, মক্কা-মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না। তার প্রত্যেক প্রবেশদ্বারে সারিবদ্ধভাবে ফেরেশতাগণ প্রহরারত থাকবেন।’ (বোখারি : ১৮৮১)
সহিহ মুসলিম শরীফে এসেছে, দাজ্জাল মদিনা প্রবেশের জন্য উহুদ পাহাড়ের পিছনে অবতরণ করবে। কিন্তু ফেরেশতাগণ তাকে শামের দিকে ফিরিয়ে দিবেন। অবশেষ, সে সেখানেই ধ্বংস হবে।’ (মুসলিম : ১৩৮০)
মদিনা শরিফ পুত ও পবিত্র। মদিনার সাথে অন্যায় করা যাবে না। মদিনার সাথে অন্যায়কারীর উপর আল্লাহর লা'নত বর্ষিত হয়। হুজুর (সা.) মদিনার দিকে ইশারা করে বলেন যে মদিনা এখান (আয়ির পর্বত) থেকে ওখান (হারাম) পর্যন্ত হারাম। তার বৃক্ষ কাটা যাবে না। তাতে কোনো ফিৎনা-ফাসাদ বা সুন্নাহ বিরোধী কিছু করা যাবে না। যে ব্যক্তি তাতে ফিৎনা সৃষ্টি করল বা কোন অন্যায়কারীকে আশ্রয় দিল, তার উপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সমগ্র মানুষের লা'নত। কেয়ামতের দিন তার কোন ফরজ ও নফল কর্ম কবুল হবে না।’ (বোখারী : ১৮৭০)
প্রিয় শহর মদিনা যেমন পুত ও পবিত্র। তেমন তার অদিবাসীদের সাথেও ভালো আচরণ দেখাতে হয়। পৃথিবীর মাঝে সবচেয়ে শান্তশিষ্ট ও ভদ্র লোকেরা হলেন মদিনাবাসী। তাদের সাথে ষড়যন্ত্রমূলক কোনো আচরণ বা অহংকার ভাব দেখানো যাবেনা। মদিনাবাসীর সম্মান অবশ্যই অনেক উর্ধ্বে। তাদের সাথে দুর্ব্যবহারের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। হযরত সা’দ বিন আবু ওয়াক্কাস (রা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মদিনাবাসীর সাথে ষড়যন্ত্র করবে, সে পানিতে লবণ দ্রবীভূত হওয়ার মত গলে যাবে।’ ( বুখারী : ১৭৪৪)
অন্য এক হাদিসে পাওয়া যায়, তিনি বলেন ‘যে ব্যক্তি মদিনাবাসীকে ভয় দেখাবে, আল্লাহ তাকে ভয় দেখাবেন।’ (ইবনে হিব্বান)
এছাড়াও মদিনা শহরের অসংখ্য- অগণিত ফজিলত রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে মক্কা-মদীনা জিয়ারতের তাওফিক দান করুক আমিন!

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT